ফিরে দেখা – রোমার ইতালি জয়

ইতালিয়ান সিরি আ তে নিঃসন্দেহে এএস রোমা একটি অত্যন্ত সমর্থনপুষ্ট ক্লাব। ১৯২৭ সালে প্রতিষ্ঠিত এই ক্লাবটি সেই ১৯৫১-৫২ মৌসুম বাদ দিলে সব মৌসুমেই খেলেছে ইতালির শীর্ষ পর্যায়ে, এইবার নিয়ে টানা ৬৩ মৌসুম ধরে লড়ছে সিরি আ এর জন্য। ইতালির শীর্ষ চার পাঁচটি ক্লাবের নাম করলে তাই তাদের নামও আসবে অনায়াসেই। কিন্তু তা সত্বেও রোমার সিরি আ জয়ের ইতিহাস কিন্তু বেশী নেই। মাত্র তিনবার সিরি আ জিতেছে তারা, যার সর্বশেষটি এসেছে সেই ২০০০-০১ মৌসুমে। আজ আমরা ফ্ল্যাশব্যাকে করে চলে যাব রোমার সেই রূপকথার মত ঐতিহ্যবাহী ২০০০-০১ মৌসুমে, ইতালি জয় করেছিল যেবার তারা, যে ট্যাকটিক্সের ওপর ভর করে তারা জিতেছিল সিরি আ।

বিখ্যাত সেই রোমা স্কোয়াড
বিখ্যাত সেই রোমা স্কোয়াড

রোমার চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ক্লাব হল লাজিও, ফুটবল সমর্থক মাত্রই জানা আছে সেটা, কিন্তু মজার ব্যাপার হল, ঠিক আগের মৌসুমেই নিজেদের ইতিহাসের দ্বিতীয় সিরি আ শিরোপা জিতে রোমার পাশে চলে এসেছিল লাজিও। প্রতিদ্বন্দ্বীদের সাফল্যগাথা দেখেই কি না, সেবার একেবারে আঁটঘাট বেঁধেই নেমেছিল রোমা। আর তার ফল কি হয়েছিল, তা ত সকলের জানাই, নিজেদের ইতিহাসের তৃতীয় সিরি আ জিতে লাজিওর থেকে একধাপ এগিয়ে যেতে রোমা আর একটা মৌসুমও অতিরিক্ত ব্যয় করেনি। কোচ ছিলেন বিখ্যাত ইতালিয়ান ম্যানেজার ফাবিও ক্যাপেলো, ১৯৯৯ সালে রোমায় যোগ দেওয়ার পর যিনি লীগ জিততে সময় নিয়েছিলেন মাত্র দুই বছর।

দেখে নেব রোমার সেই বিখ্যাত স্কোয়াডটাকে –

  • গোলরক্ষক :  ফ্র্যান্সেসকো আন্তোনিওলি, মার্কো অ্যামেলিয়া, ক্রিটিয়ানো লুপাতেল্লি
  • ডিফেন্ডার :  ওয়াল্টার স্যামুয়েল, আন্তোনিও কার্লোস জাগো, জোনাথান জেবিনা, কাফু, আলদাইর, ভিনসেন্ট ক্যান্ডেলা, আলেসসান্দ্রো রিনালদি, আমেদেও ম্যাঙ্গোনে
  • মিডফিল্ডার : এমারসন, ক্রিস্টিয়ান জানেত্তি, মার্কোস অ্যাসুনসাও, ইউসেবিও ডি ফ্র্যানসেসকো, হিদেতোশি নাকাতা, গায়েতানো ডি’অগাস্টিনো, জিয়ান্নি জিগু, দামিয়ানো টমাসি
  • স্ট্রাইকার : ফ্র্যানসেস্কো টট্টি, গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতা, ভিনসেঞ্জো মন্টেলা, মার্কো দেলভেচ্চিও, আবেল বালবো
গোলরক্ষক ফ্র্যানসেস্কো আন্তেনিওলি
গোলরক্ষক ফ্র্যানসেস্কো আন্তেনিওলি

আগেই বলেছিলাম, আগের মৌসুমে লাজিওর লিগ জয় একরকম টনিকের কাজ করেছিল রোমার ক্ষেত্রে। তাই পরের মৌসুমেই নিজেদের মূল একাদশ বলতে গেলে একরকম ঢেলে সাজায় রোমা। ডিফেন্সে আসেন বোকা জুনিওর্স থেকে ১৬.৫ মিলিয়ন ইউরোর বিনিময়ে আর্জেন্টাইন সেন্টারব্যাক ওয়াল্টার স্যামুয়েল, ক্যালিয়ারি থেকে প্রায় ১৮ মিলিয়ন ইউরোতে  দলে আসেন ফরাসী রাইটব্যাক জোনাথান জেবিনা, ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডে জার্মান ক্লাব বেয়ার লেভারক্যুসেন থেকে ২০ মিলিয়ন ইউরোর বিনিময়ে আনা হয় ব্রাজিলিয়ান হার্ডম্যান এমারসনকে, আর টানা দশ বছর ফিওরেন্টিনায় খেলার পর ক্যারিয়ার সায়াহ্নে একটা সিরি আ জয়ের আশায় ৩২.৫ মিলিয়ন ইউরোর বিনিময়ে রোমায় যোগ দেন আর্জেন্টাইন কিংবদন্তী স্ট্রাইকার গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতা।

শেষ বয়সে এসে অবশেষে একটা সিরি আ জিতেই ছাড়েন বাতিস্তুতা
শেষ বয়সে এসে অবশেষে একটা সিরি আ জিতেই ছাড়েন বাতিস্তুতা

পুরো মৌসুম ক্যাপেলো তাঁর দলকে খেলান ৩-৫-২ বা ৩-৪-১-২ ফর্মেশানে। তখনকার অধিকাংশ সিরি আ এর দলের ৪-৪-২ ফর্মেশানের বিপক্ষে ছিল যা অত্যন্ত কার্যকরী। বিপক্ষ দলের দুইজন স্ট্রাইকারের বিপক্ষে থাকত তখন তিনজন সেন্টারব্যাক, ফলে একজনের অ্যাডভান্টেজ পেত রোমা। দুই উইং দিয়ে পুরো নব্বইটা মিনিট ধরে মেশিনের মত দৌড়াতেন দুই উইংব্যাক কাফু ও ভিনসেন্ট ক্যান্ডেলা। ৪-৪-২ তে খেলা বিপক্ষ দলের দুই ওয়াইড মিডফিল্ডারকে তাই তাঁরা ভালোই সামলাতে পারতেন।

ইতিহাস সেরা কাফু খেলেছেন এই দলে
ইতিহাস সেরা কাফু খেলেছেন এই দলে

সেন্ট্রাল ডিফেন্সে ছিলেন মাত্রই দলে আসা ওয়ালতার স্যামুয়েল, জোনাথান জেবিনা, আর সাথে রোমার কিংবদন্তী অলদাইর ত ছিলেনই। তিনজন সেন্টারব্যাকের ডানদিকের জায়গাটা বরাদ্দ ছিল রাইটব্যাক থেকে রাইট-সাইডেড সেন্টারব্যাকে রূপান্তরিত হওয়া জোনাথান জেবিনার, বাম পায়ের খেলোয়াড় বলে বামদিকের সেন্টারব্যাক ছিলেন ওয়াল্টার স্যামুয়েল – এই দুইজন ছিলেন সেরকম রাফ অ্যান্ড টাফ তুখোড় ম্যান মার্কার। আর দুইজনের মাঝে সুইপারের ভূমিকা পালন করতেন অলদাইর বা আন্তোনিও জাগো এর যেকোন একজন। বিপক্ষ দলের স্ট্রাইকাররা কোনরকমে জেবিনা-স্যামুয়েলকে ফাঁকি দিতে পারলেও ফাঁকি দিতে পারতেন না ডিফেন্স লাইন জুড়ে স্বাধীনভাবে বিচরণ করতে থাকা অলদাইর না জাগোকে। ফলে এখনকার যুগের বল প্লেয়িং সেন্টারব্যাকের ভূমিকাটা অলদাইরই পালন করতেন, করতেন মিডফিল্ডে বল পাস দিয়ে নতুন আক্রমণ সৃষ্টির কাজ। ওদিকে বিপক্ষ দলের দুই ওয়াইড মিডফিল্ডার যদি কোনরকমে কাফু-ক্যান্ডেলাকে ফাঁকিও দিয়ে দিতেন, ব্যাকআপ হিসেবে তাঁদের পিছে সেসব ওয়াইড মিডফিল্ডারদের ঠেকাতে চলে যেতেন যথাক্রমে জেবিনা-স্যামুয়েল। ফলে ডিফেন্স ছিল একরকম নিশ্ছিদ্র।

ওয়াল্টার স্যামুয়েল
ওয়াল্টার স্যামুয়েল
কার্লোস আন্তোনিও জাগো
কার্লোস আন্তোনিও জাগো
অলদাইর
অলদাইর
জোনাথান জেবিনা
জোনাথান জেবিনা

সেন্টার মিডফিল্ডে খেলতেন মূলত দামিয়ানো টমাসি আর ক্রিস্টিয়ান জানেত্তি। ২০০০ সালের গ্রীষ্মে বেয়ার লেভারক্যুসেন থেকে ডেস্ট্রয়ার হিসেবে এমারসনকে আনা হলেও মৌসুমের শুরুতে ইনজুরিতে পড়ায় ২০০১ সালের আগে রোমার হয়ে মাঠে নামতে পারেননি এমারসন, ফলে সে জায়গাটায় খেলে গেছেন ক্রিস্টিয়ান জানেত্তি, এবং খেলেছেন যথেষ্ট ভালো।

ক্রিস্টিয়ানো জানেত্তি
ক্রিস্টিয়ানো জানেত্তি

 

দামিয়ানো টমাসি
দামিয়ানো টমাসি

টমাসি-এমারসন-জানেত্তির কেউই সেরকম ক্রিয়েটর বা প্লেমেকার ছিলেন না, কিংবা বলা যেতে পারে তাঁদের প্লেমেকিং এর দিকে অত মনোযোগ দিতেও হয়নি, তাঁরা নিশ্চিন্তে আদর্শ হোল্ডিং মিডের কাজ করে গেছেন। কারণ সামনে ছিলেন ফ্র্যানসেসকো টট্টির মত একজন বিশ্বসেরা প্লেমেকার/স্ট্রাইকার। ওদিকে তাই টট্টিও রক্ষণের দায়িত্ব ভুলে গিয়ে সামনে খেলা দুই স্ট্রাইকারের সাথে অনবরত লিঙ্ক আপ করতে পেরেছেন।

এমারসন
এমারসন

টট্টিকে আটকানোর সামর্থ্য তখন সিরি আ তে সেরকম কোন হোল্ডিং মিডফিল্ডারেরই ছিল না। এর পেছনে টট্টির অসাধারণ সামর্থ্য ত ছিলই, আবার আরেকটা কারণ বিপক্ষ দল ৪-৪-২ তে খেললে তাঁদের ডিফেন্স লাইন ও সেন্ট্রাল দুই মিডফিল্ডারের মাঝে ছিল টট্টির বিচরণ। ফলে দেখা যেত মাত্র একটা হোল্ডিং মিডেরই দায়িত্ব পড়ত টট্টিকে আটকাবার, যেটা ফাঁকি দেওয়া টট্টির জন্য সেরকম কোন ব্যাপার ছিল না।

roma-scudetto

আর মিডফিল্ডাররা টট্টিকে আটকাতে ব্যস্ত হয়ে পড়লে ওদিকে পেছনে খালি জায়গা পেয়ে যেতেন টমাসি আর জানেত্তি। ফলে বল ডিস্ট্রিবিউশানের কাজটাও করতেন তখন তাঁরা। বল ডিস্ট্রিবিউট করতে গিয়ে বিপক্ষ দলের দুই ওয়াইড মিডফিল্ডার ফাঁকা জায়গা পেয়ে গেলেও সেটা সামলানোর জন্য সদা তৎপর থাকতেন দুই উইংব্যাক কাফু-ক্যান্ডেলা। কাফু ত কাফুই, তাকে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার কিছু নেই, তবে সাধারন মানের এক লেফটব্যাক থেকে কাফুর সাথে সমানে পাল্লা দেওয়ার মত উইংব্যাক হয়ে উঠেছিলেন সেই মৌসুমে ভিনসেন্ট ক্যান্ডেলা।

ভিনসেন্ট ক্যান্দেলা
ভিনসেন্ট ক্যান্দেলা

25017_343067357303_4070111_n

টট্টির সামনে দুই স্ট্রাইকারের একজন ছিলেন বিশ্বখ্যাত গোলস্কোরার গ্যাব্রিয়েল ওমর বাতিস্তুতা। ম্যারাডোনা পরবর্তী ও লিওনেল মেসি আসার পূর্বে আর্জেন্টিনার ইতিহাসের অবিসংবাদিত শ্রেষ্ঠ খেলোয়াড় মানা হয় যাকে। বাতিস্তুতার পার্টনার হিসেবে ক্যাপেলো প্রথমে পছন্দ করেছিলেন মার্কো দেলভেচ্চিওকে। দেলভেচ্চিও সেরকম গোল করতে পারতেন না, এখনকার পিটার ক্রাউচের মত লম্বা ঢ্যাংঢেঙ্গে এই স্ট্রাইকার কিন্তু আবার টিম প্লে তে দারুণ ভূমিকা রাখতেন, স্ট্রাইকে বাতিস্তুতার জন্য ফ্রি জায়গা করে দিতেন, ডিফেন্ডারদের ব্যস্ত রাখতেন, ফলে ঐদিকে গোল করে যেতেন বাতিস্তুতা। এখন ড্যানি ওয়েলবেকের মত স্ট্রাইকাররা যে কাজটা করে থাকেন আরকি।

মার্কো দেলভেচ্চিও
মার্কো দেলভেচ্চিও

কিন্তু ক্যাপেলো বেশীদিন এই ট্যাকটিক্সে যেতে পারেননি – তাঁর কারণ ছিল ভিনসেনজো মন্টেলা। দেল্ভেচ্চিওর পরিবর্ত হিসেবে মন্টেলাকে যখনই নামানো হত, নিয়মিত গোল করতেন তিনি। ফলে ক্যাপেলো বেশীদিন মন্টেলাকে বেঞ্চে বসিয়ে রাখতে পারেননি, ফলে সৃষ্টি হয় বিখ্যাত বাতিস্তুতা-টট্টি-মন্টেলা ত্রিমুখী আক্রমণের। মন্টেলার জন্য মূল একাদশ থেকে জায়গা ছেড়ে দিতে হয় দেলভেচ্চিওকে। এই সামান্য ট্যাকটিকাল পরিবর্তনের ফলও পেয়েছিলেন ক্যাপেলো হাতেনাতে। সেই মৌসুমে বাতিস্তুতা-টট্টি-মন্টেলা এই ত্রিরত্ন গোল করেছিলেন মোট ৪৭ টি, যার মধ্যে ২০ টি ছিল বাতিস্তুতার, ১৪ টি মন্টেলার আর ১৩ টি টট্টির।

ক্যাপেলোর ত্রিরত্ন : টট্টি-মন্টেলা-বাতিস্তুতা
ক্যাপেলোর ত্রিরত্ন : টট্টি-মন্টেলা-বাতিস্তুতা
সুপারসাব থেকে মূল একাদশের অবিচ্ছেদ্য অংশ - ভিনসেঞ্জো মন্টেলা
সুপারসাব থেকে মূল একাদশের অবিচ্ছেদ্য অংশ – ভিনসেঞ্জো মন্টেলা
রোমার ফর্মেশান
রোমার ফর্মেশান

মাত্র ২৪ বছর বয়সেই রোমার অধিনায়ক হয়ে সেই সময়ে রোমাকে সিরি আ জেতানোয় অনন্যসাধারণ ভূমিকা ছিল টট্টির। পুরো মৌসুমে মাত্র তিনটে ম্যাচ হারলেও তাই জুভেন্টাস ও লাজিওকে টেক্কা দিয়ে সিরি আ’র গৌরব এসেছিল রোমার ঘরে!

01-02_672-458_resize

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

4 + 13 =