ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ফিন্যান্স ফুটবল দল : ফিরে পাবে হারানো গৌরব?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ফিন্যান্স ফুটবল দল : ফিরে পাবে হারানো গৌরব?

শিক্ষাদান ও ফলাফলের দিক দিয়ে অসাধারণত্বের প্রেক্ষিতে ফিন্যান্স বিভাগকে অনায়াসেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিভাগ বলা যেতে পারে। ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের অধীনে এই ফিনান্স বিভাগ যুগ যুগ ধরে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রেখেছে যোগ্যতর বিভাগ হিসেবেই। প্রতিবছর দেশে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা দেওয়া লাখ লাখ ছাত্রছাত্রীর এক বিশাল অংশের স্বপ্ন থাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই বিভাগে পড়ার জন্য। শুধুই কি উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে ফিন্যান্স বিভাগের অসাধারণত্ব লুকিয়ে আছে? অবশ্যই নয়। ক্রীড়াক্ষেত্রেও এই বিভাগের নৈপুণ্যের কাহিনী বেশ বলার মত। গত কয়েক বছরে একটু ফর্মহীনতায় থাকলেও, এককালে এই ফিন্যান্স বিভাগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রীড়াঙ্গনের অন্যতম সফল বিভাগ ছিল, পরাশক্তি বললেও খুব বেশী বলা হবেনা। বিশেষত ফুটবলের ক্ষেত্রে। আন্তঃবিভাগীয় ফুটবলে এই বিভাগ সাম্প্রতিককালে কোন শিরোপা না জিতলেও হাতছোঁয়া দূরত্বে শিরোপাটা রেখে আসার বেদনায় পুড়েছে তারা বেশ ক’বার। আন্তর্জাতিক ফুটবলে এখনকার হল্যান্ড বা সেই প্রাগৈতিহাসিককালের হাঙ্গেরীর মত? হয়তোবা! সেকালের হাঙ্গেরি বা একালের হল্যান্ড যেমন শিরোপা না জিতলেও বিশ্ব ফুটবলকে দিয়েছে পুসকাস, ক্রুইফ, নিসকেন্স, মিশেলস, ককসিস, কুবালার মত হাজারো রত্ন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুটবলাঙ্গনও কি সেরকম ফিন্যান্স থেকে প্লাবন, সিমন, রাজন, নাসির, ইমরান, ওমর, ওবায়দুর, রুবেল, সন্তু, ইকবাল, শুভ, রেজা, তড়িৎ, আজগর, রাজিন, মুরাদদের মত কুশলী খেলোয়াড়দের পায়নি? বিশ্ববিদ্যালয়-শ্রেষ্ঠত্বের শিরোপা না পেলেও নিজেদের বিভাগকে এরা ভাসিয়েছে অনেক আনন্দের সাগরে, অনেকবার। ২০১০ সালের টুর্নামেন্টে নাট্যকলা বিভাগের বিপক্ষে সেই মহাকাব্যিক সেমিফাইনালের কথা কে ভুলতে পারে? ১১ রাউন্ডের ম্যারাথন পেনাল্টি শুটআউট শেষে সেবার বিজয়ীর বেশে ঘরে ফিরেছিল এই ফিন্যান্স!

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ফিন্যান্স ফুটবল দল : ফিরে পাবে হারানো গৌরব?
ফিন্যান্সের সেই বিখ্যাত দল

আশি ও নব্বইয়ের দশকে আন্তঃবিভাগীয় ক্রিকেট (১৯৮৩, ১৯৯১, ১৯৯২, ১৯৯৩) ও ফুটবলে চ্যাম্পিয়ন হওয়া ফিন্যান্স দল ফুটবলে ২০১০ সালের টুর্নামেন্টে রানার্সআপ হয়েছিল একবার, সাম্প্রতিককালের মধ্যে। এ ছাড়াও ফিন্যান্স ফুটবল টিম এরপর সেমিফাইনালে উঠেছিল ২০১৩ সালের টুর্নামেন্টে। এই দুই আসর ছাড়া ফিনান্স ফুটবল দল সর্বোচ্চ উঠেছিল তৃতীয় রাউন্ড পর্যন্ত, গত দুই আসরেই ফিন্যান্স বিভাগ তৃতীয় রাউন্ড পর্যন্ত যেতে পেরেছিল। সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিষয় যেটা, গত দুই বছরে পেনাল্টি শুটআউট ভাগ্যেই পরাজয় মেনেছে এই ফিন্যান্স দল। এই বছরের চলমান আন্তঃবিভাগীয় ফুটবল প্রতিযোগিতায় আজ মাঠে নামছে ফিন্যান্স ফুটবল টিম। পুরনো দিনের মত ফুটবলে নিজের বিভাগের সেই স্বর্ণালী সময় ফিরে আনার আশা এই দলের খেলোয়াড়দের সবার চোখেমুখে লেগে থাকলেও বাস্তবতা বলে, শিরোপা জয়ের আশা করাটা এখনই বেশ কঠিন একটা কাজ। তাই আপাতত লক্ষ্য, নিজেদের ফুটবলের হারানো ঐতিহ্য ও ঘরানা যতটুকু সম্ভব পুনরুদ্ধার করা যায়, সেটা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আন্তঃবিভাগীয় ফুটবল টুর্নামেন্টের প্রথম রাউন্ডে আজ ফিন্যান্সের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট বিভাগ।

প্রথম ম্যাচের আগে ফিন্যান্স বিভাগের ফুটবল দলের কি অবস্থা? আসুন দেখে নেওয়া যাক।

১৯ তম ব্যাচের মোহাম্মদ নাঈম একই সাথে এই দলের খেলোয়াড় ও ম্যানেজার। দলের গোলরক্ষক হিসেবে থাকবেন যথারীতি সারোয়ার হাবীব প্রিন্স। ফিন্যান্সের ইতিহাসের অন্যতম সেরা গোলরক্ষক কে সে নিয়ে বিতর্ক হলে প্রিন্সের অবস্থান তাতে বেশ উপরের দিকেই থাকবে, পুরো ক্যারিয়ারে ফিন্যান্স দলের হয়ে এখনো একটাও গোল হজম করেননি যে তিনি! গত বছর মার্কেটিং বিভাগের বিপক্ষে এক ফ্রি-কিকে তাঁর দুর্দান্ত সেভ গোলরক্ষক হিসেবে তাঁর অসাধারণ মানটাকেই সবার সামনে উপস্থাপন করে যেন। এবারও তাই গোলবার আগলানোর দায়িত্ব তাঁর উপরেই বর্তেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ফিন্যান্স ফুটবল দল : ফিরে পাবে হারানো গৌরব?
সারওয়ার হাবীব প্রিন্স

খুব সম্ভবত এই দলের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হল তারুণ্যের প্রাধান্য। তারুণ্যপ্রধান এই দলের রক্ষণভাগের সবচেয়ে বড় ও নির্ভরযোগ্য নাম অধিনায়ক আদনান আল রাহীন। ডিফেন্সের যেকোন জায়গায় (রাইটব্যাক, সেন্টারব্যাক, লেফটব্যাক) খেলতে পটু এই কুশলী ডিফেন্ডার খেলতে পারেন মিডফিল্ডেও। সতীর্থ ও দলের সাবেক খেলোয়াড়-ম্যানেজারদের কাছ থেকে ‘ডিপার্টমেন্টের মালদিনি’ নামটা তো এমনি এমনি পাননি! এবারও দলের রক্ষণভাগকে নেতৃত্ব দেবেন ১৯তম ব্যাচের এই নেতা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ফিন্যান্স ফুটবল দল : ফিরে পাবে হারানো গৌরব?
আদনান আল রাহীন – ডিপার্টমেন্টের মালদিনি?

আদনান ছাড়াও এই দলের মূল একাদশের নির্ভরযোগ্য ও অভিজ্ঞ ডিফেন্ডার রয়েছেন অর্নক ইমন ও সুদেব চাকমা। জগন্নাথ হল ফুটবল দলের রক্ষণভাগের অবিচ্ছেদ্য অংশ সুদেব নিজের ডিপার্টমেন্টের দলের রক্ষণের অন্যতম নেতাও বটে। অনেকের মতে পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম সেরা সেন্টারব্যাকও এই সুদেব। ওদিকে প্রথাগত “নো-ননসেন্স” ডিফেন্ডিং এর অন্যতম উদাহরণ অর্নক ইমন, ইমনের কঠোর মার্কিং এড়িয়ে আর শারীরিক শক্তিকে পরাস্ত করে বাতাসে ভেসে আসা বলগুলো বা মিডফিল্ড থেকে আসা থ্রু বলগুলো দখল করবেন, এ সাধ্য কার?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ফিন্যান্স ফুটবল দল : ফিরে পাবে হারানো গৌরব?
সুদেব চাকমা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ফিন্যান্স ফুটবল দল : ফিরে পাবে হারানো গৌরব?
অর্নক ইমন

আদনান, ইমন আর সুদেব ছাড়াও দলের রক্ষণভাগের অন্যান্য নির্ভরযোগ্য নাম – তন্ময় দেবনাথ। যেকোন মুহূর্তে মাঠে নেমে দলের রক্ষণভাগকে আরেকটু নিশ্ছিদ্র করতে তাঁর জুড়ি নেই। ড্রেসিংরুমে তরুণ খেলোয়াড়দের কাছে নিজের অভিজ্ঞতার ঝাঁপি খুলে দেওয়ার জন্য আদনানদের মত তিনিও আছেন। রাইটব্যাকে থাকা কাওসারও শারীরিক শক্তির প্রদর্শনী দেখিয়ে “আগে রক্ষণ, পরে আক্রমণ” এই নীতিতেই বিশ্বাসী। তাছাড়াও নতুন ব্যাচগুলোর তরুণ খেলোয়াড়দের মধ্যে ২৪তম ব্যাচের রাজু ও আশরাফের অভিষেক হয়ে যেতে পারে এই টুর্নামেটেই। ২২ তম ব্যাচের আকাশ আবার রক্ষণভাগ ছাড়াও দলের প্রয়োজনে যেকোন পজিশনেই খেলতে সক্ষম।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ফিন্যান্স ফুটবল দল : ফিরে পাবে হারানো গৌরব?
তন্ময় দেবনাথ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ফিন্যান্স ফুটবল দল : ফিরে পাবে হারানো গৌরব?
কাওসার

মিডফিল্ডেও যথারীতি তারুণ্যের জয়গান। দলের সেন্ট্রাল মিডফিল্ডে খেলার জন্য রয়েছেন ২২তম ব্যাচের মারুফ, ২৪ তম ব্যাচের আতেফ। ওদিকে সেন্ট্রাল মিডফিল্ডে খেলার পাশাপাশি আক্রমণাত্মক মিডফিল্ডার হিসেবেও খেলতে পারেন ২২তম ব্যাচের সাদাত সিয়াম ও ২৩ তম ব্যাচের আলী মামুন। এই কয়জনের মধ্যে তুলনামূলকভাবে একটু রক্ষণাত্মক মিডফিল্ডার হিসেবে খেলেন আতেফ আর মারুফ। দল দখলে রেখে পিছন থেকে খেলা গড়ে দেওয়ার ভূমিকায় বেশ কার্যকরী দুজনই।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ফিন্যান্স ফুটবল দল : ফিরে পাবে হারানো গৌরব?
আলী মামুন
২২ ব্যাচের তিন রত্ন – কামরুল, ওমর ফারুক ও মারুফ
মিডফিল্ডার মারুফ হাসান শুভ

আক্রমণভাগের মোটামুটি সবগুলো খেলোয়াড়দের একটা সাধারণ বৈশিষ্ট্য আছে, সবাই মোটামুটি একাধিক পজিশনে খেলতে স্বচ্ছন্দ। সাদাত সিয়ামের কথাই ধরুন। কি সেন্ট্রাল মিডফিল্ড, কি অ্যাটাকিং মিডফিল্ড – সবদিকেই একইভাবে খেলতে পটু তিনি। আবার দুর্দান্ত ফিনিশিংয়ের কারণে মাঝে মাঝে সেন্টার ফরোয়ার্ড হিসেবেও খেলতে দেখা যায় তাঁকে!

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ফিন্যান্স ফুটবল দল : ফিরে পাবে হারানো গৌরব?

দলে লেফট উইঙ্গার হিসেবে রয়েছেন দুর্দান্ত গতিশীল উইঙ্গার ২২ তম ব্যাচের ওমর ফারুক। দলের প্রয়োজনে এই ওমর ফারুক আবার খেলতে পারেন স্ট্রাইকার/সেন্টার ফরোয়ার্ড হিসেবেও। ২২তম ব্যাচের মোহাম্মদ কামরুল ইসলাম আবার আক্রমণাত্মক মিডফিল্ডে দলের অন্যতম ভরসা। দুর্দান্ত ড্রিবলিং করার কারণে দলের রাইট উইংয়ে আরেকজন জায়গা করে নিতে পারেন, ২৪তম ব্যাচের তরিকুল তাজিম। তাজিম আবার দলের প্রয়োজনে সেন্টার ফরোয়ার্ড হিসেবেও খেলতে পারবেন। ওদিকে ২৩তম ব্যাচের রিয়াদও আছেন রাইট উইঙ্গার হিসেবে। ২২ তম ব্যাচের আসিফও দলের অন্যতম সব্যসাচী খেলোয়াড়, খেলতে পারেন যেকোন পজিশনে!

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ফিন্যান্স ফুটবল দল : ফিরে পাবে হারানো গৌরব?
ওমর ফারুক
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ফিন্যান্স ফুটবল দল : ফিরে পাবে হারানো গৌরব?
সাদাত সিয়াম
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ফিন্যান্স ফুটবল দল : ফিরে পাবে হারানো গৌরব?
মোহাম্মদ কামরুল ইসলাম
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ফিন্যান্স ফুটবল দল : ফিরে পাবে হারানো গৌরব?
রিয়াদ

দলের খেলোয়াড়-ম্যানেজার, ১৯তম ব্যাচের মোহাম্মদ নাঈম নিজে খেলেন সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার হিসেবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ফিন্যান্স ফুটবল দল : ফিরে পাবে হারানো গৌরব?
মোহাম্মদ নাঈম

মূলত এই কয়জন খেলোয়াড় নিয়েই নিজেদের ডিপার্টমেন্টের সুনাম রক্ষার লড়াইয়ে আজ মাঠে নামছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগ। আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট বিভাগের বিপক্ষে জয় দিয়ে এবারের অভিযাত্রা শুরু করতে পারবে তো তারা?

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

11 − four =