ফার্নান্দো টরেস : হঠাৎ ঝলসে উঠে নিভে যাওয়া এক ধূমকেতু

ফার্নান্দো টরেস : হঠাৎ ঝলসে উঠে নিভে যাওয়া এক ধূমকেতু

ফার্নান্দো টরেস এর ক্যারিয়ার নিয়ে আলোচনা করতে বসলে তাঁর ক্যারিয়ারে দুটো ভাগ দেখা যায় মূলত –

  • যখন তিনি সর্বজয়ী কোন দলের অংশ না হয়েও বিশ্বের সেরা স্ট্রাইকার ছিলেন
  • যখন তিনি কোন এক দিগ্বিজয়ী দলের শুধুমাত্র একটা অংশ ছিলেন

মেসি-রোনালদো জেনারেশনে এসে ফার্নান্দো টরেস এর স্তুতি গাওয়া শুরু করলে অনেক লোকজন হা-রে-রে-রে করে তেড়ে আসবে আমার দিকে, সেটা আমি জানি। আর সেটা করাটাই স্বাভাবিক। স্বপ্নালু চোখের সোনালীচুলো ছেলেটার প্রতিভার স্ফূরণ পৃথিবী যত তাড়াতাড়ি দেখেছিল, তার থেকেও তাড়াতাড়ি দেখেছে তার ঝরে পড়া, তার অনন্যসাধারণ থেকে গড়পড়তা মানের স্ট্রাইকার হয়ে যাওয়ার উপাখ্যান।

আরও দশটা ফুটবলারের বায়োগ্রাফী পড়লে আর কোন কিছু না হোক অন্তত একটা জিনিসে মিল পাবেন। সবাই-ই শৈশবে কোন না কোন ফুটবলারের খেলা দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে নিজেরা খেলা শুরু করেছিলেন। মেসির ক্ষেত্রে যেরকম পাবলো আইমার, জিয়ানলুইজি বুফনের ক্ষেত্রে যেরকম ক্যামেরুনিয়ান গোলরক্ষক থমাস এনকোনো, ডিয়েগো ম্যারাডোনার ক্ষেত্রে যেরকম রিভেলিনো, ফ্র্যানসেস্কো টট্টির ক্ষেত্রে যেরকম জিউসেপ্পে জিয়ান্নিনি – পাঁড় অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদ ভক্ত দাদার তিন নাতি-নাতনির একজন ফার্নান্দো টরেস এর শৈশবের অনুপ্রেরণার কাহিনী শুনলে বরং একটু অবাক হতে হবে আপনাকে। জাপানিজ ফুটবল বিষয়ক অ্যানিম “ক্যাপ্টেন সুবাসা” দেখে ফুটবল খেলার অনুপ্রেরণা পান তিনি! তবে প্রথমে বড়ভাই ইজরায়েলের মত গোলরক্ষকই হতে চেয়েছিলেন তিনি, ছোটবেলায় একদম নিজের বড়ভাইয়ের মতই দেখতে ছিলেন কি না – প্রথমে প্রায় সবকিছুতেই ভাইকে খুব অনুকরণ করা হত তাঁর। তো একদিন গোলরক্ষক হিসেবে খেলতে গিয়ে এক ফাউলের শিকার হয়ে কটা দাঁত ভেঙ্গে ফেললেন তিনি।

স্পেইন, লিভারপুল কিংবা অ্যাটলেটিকোর সমর্থকেরা সেই ফাউলকারী ছেলেকে একটা বিশাল ধন্যবাদ দিতেই পারে, সে ফাউল করেছিল দেখেই তো ফার্নান্দো টরেস রেগেমেগে গোলরক্ষক হওয়া বাদ দিয়ে স্ট্রাইকে খেলা শুরু করেন নিয়মিত!

ছোটবেলায় বাসার আশেপাশের অপেশাদার দল যেমন পার্ক ৮৪, মারিওস হল্যান্ড, রায়ো ১৩ এ গোলের বন্যা ছোটানোর পর তিনি নজরে আসেন স্বপ্নের ক্লাব অ্যাটলেটিকোর স্কাউটদের। সেখানেও গোলের ধারা বজায় রাখেন। ফলাফল? মাত্র ১৯ বছর বয়সে অধিনায়কত্বের আর্মব্যান্ড শোভা পেতে শুরু করে তার হাতে। রাউল গঞ্জালেস-পরবর্তী যুগের সেরা স্ট্রাইকার এর মধ্যেই স্পেইন পেয়ে গেছে – আশায় বুক বাঁধা শুরু করেন স্পেইন সমর্থকেরা। তরুণ স্ট্রাইকারের উত্থান নজর এড়ায়না ইউরোপীয়ান পরাশক্তিদের। ফার্নান্দো টরেস এর ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে রিয়াল মাদ্রিদ তাকে একবার চাইলেও টরেস একবাক্যে না করে দিয়েছিলেন তাদের – অ্যাটলেটি যে তাঁর মনের মধ্যে গাঁথা, কিভাবে তাদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে নগরপ্রতিদ্বন্দ্বীদের সাথে যোগ দেবেন?

ফার্নান্দো টরেস : হঠাৎ ঝলসে উঠে নিভে যাওয়া এক ধূমকেতু
অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদের ফার্নান্দো টরেস

ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের ক্লাব চেলসির মালিকানা তখন এক রাশিয়ান মাত্র কিনে নিয়েছেন। নাম তাঁর রোমান আব্রামোভিচ। এসেই আশপাশ থেকে ভালো ও প্রতিভাবান খেলোয়াড় নিয়ে দল সাজাতে শুরু করলেন তিনি। আরিয়ান রবেন, ড্যামিয়েন ডাফ, ওয়েইন ব্রিজ, পিটার চেক, ক্লদ ম্যাকেলেলে, গ্লেন জনসন, দিদিয়ের দ্রগবা – আরও কত তরুণ খেলোয়াড়ের সমারোহ হল চেলসিতে! তাও স্পেইনে আলো ছড়ানো ফার্নান্দো টরেস নামের একজন স্ট্রাইকার নজর এড়ালোনা ইংল্যান্ডে থাকা রোমান আব্রামোভিচের। সরাসরি ২৮ মিলিয়ন পাউন্ডের একটা প্রস্তাব করে বসলেন তিনি অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদ কর্তৃপক্ষের কাছে। এখনকার যুগে ২৮ মিলিয়ন পাউন্ড দিয়ে গড়পড়তা মানের খেলোয়াড় পাওয়া গেলেও সেই ২০০৩ সালে ২৮ মিলিয়ন মানে এখনকার ১০০ মিলিয়ন পাউন্ডের সমান ছিল, তা বলা যায়। এরকম বড় প্রস্তাবও অ্যাটলেটিকো কর্তৃপক্ষকে গলাতে পারলো না, তারা চাইলো আরও এক দুই মৌসুম পর তাদের ক্লাবের সবচাইতে বড় সম্পদটাকে বিক্রি করতে, যখন তাঁর দাম আরও বাড়বে। কিংবা কে জানে, হয়ত টরেস নিজেই এমন কোন ক্লাবে যেতে চাননি যার তৎকালীন ইতিহাস অ্যাটলেটিকোর থেকে ভালো কিছু ছিল না, তা তাদের টাকাপয়সা যতই থাকুক না কেন! সবমিলিয়ে সেবার ইংল্যান্ডে আসা হল না টরেসের। রোমান আব্রামোভিচও ভগ্ন মনোরথে ইন্টার মিলান থেকে আর্জেন্টাইন সুপারস্টার হার্নান ক্রেসপোকে নিয়ে চেলসির আক্রমণভাগ সাজালেন। কিন্তু সবাই আস্তে আস্তে বোঝা শুরু করলো বেশীদিন ফার্নান্দো টরেস অ্যাটলেটিকোতে থাকবেন না।

২০০৬ এ টরেসকে পাওয়ার জন্য রোমান আব্রামোভিচ আবারো চেষ্টা করলেন। ফলাফল সেই শূণ্য। আসলেন না টরেস। বরং পরের বছর চেলসির প্রিমিয়ার লিগ প্রতিদ্বন্দ্বী লিভারপুলে নাম লেখালেন এই স্প্যানিশ সেনসেশান!

ফার্নান্দো টরেস : হঠাৎ ঝলসে উঠে নিভে যাওয়া এক ধূমকেতু
রিয়াল-বধের নায়ক

হোসে মরিনহোর অধীনে টানা দুইবার প্রিমিয়ার লিগ জেতা চেলসিতে না এসে কেন লিভারপুলে এলেন ফার্নান্দো টরেস? যেখানে লিভারপুল লিগসহ বিভিন্ন ট্রফি জেতার জন্য বরাবরই চেলসির থেকে বেশী স্ট্রাগল করে? মূল কারণ ছিলেন বোধকরি ফার্নান্দো টরেস এর স্বদেশী রাফায়েল বেনিতেজ, ভদ্রলোক লিভারপুলের কোচ ছিলেন তখন, লিভারপুলের হয়ে ২০০৫ সালের চ্যাম্পিয়নস লিগ জিতে বরং রাফা বেনিতেজ নিজেও তখন বিশ্বের অন্যতম সেরা কোচের তালিকায় নিজের নাম লিখিয়ে ফেলেছেন। কিংবা হয়তো টরেস নিজেই কোন একটা দলের একমেবাদ্বিতীয়ম স্ট্রাইকার হতে চেয়েছিলেন, যেখানে চেলসিতে ইতোমধ্যেই দিদিয়ের দ্রগবা ছিলেন তাই হয়ত সেখানে আসতে চাননি। রাফায়েল বেনিতেজও স্বদেশী টরেসকে পাওয়ার জন্য একদম উঠেপড়ে লেগেছিলেন, এ কথা বলতেই হবে। ২০০৪ সালে ফরাসী ক্লাব অজেরি থেকে রেকর্ড ১৪ মিলিয়ন পাউন্ডের বিনিময়ে লিভারপুলে আসা ফরাসী স্ট্রাইকার জিব্রিল সিসে কখনই অজেরির ফর্ম লিভারপুলে দেখাতে পারেননি, ফলে নতুন মৌসুমে সিসে কে নিজের মূল স্ট্রাইকার হিসেবে রাখার ইচ্ছাও ছিল না বেনিতেজের। বেনিতেজ প্রথমে চাইলেন জিব্রিল সিসের সাথে কয়েক মিলিয়ন পাউন্ড যোগ করে ফার্নান্দো টরেস এর জন্য একটা প্রস্তাব পাঠালে অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদ সেটা অবশ্যই গ্রহণ করবে। বেনিতেজ ভুল ভাবেননি, কিন্তু বাধ সাধলেন সিসে, অ্যাটলেটিকোতে যাওয়ার ইচ্ছা ছিলনা তাঁর। সিসেকে রাজী করাতে না পেরে শেষমেশ লিভারপুলে থাকা আরেক স্বদেশী লুইস গার্সিয়াকে রাজী করানোর চেষ্টা করলেন বেনিতেজ। লিভারপুলে মোটামুটি সবসময়েই সেন্ট্রাল অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার হিসেবে খেলা লুইস গার্সিয়া নিজেও বুঝেছিলেন ক্লাবে আর বেশীদিন থাকতে পারবেন না তিনি। স্টিভেন জেরার্ড-জাবি আলোনসো রা তো ছিলেনই, দলে নতুন এসেছেন তখন হাভিয়ের ম্যাশচেরানো, ওদিকে মালিয়ান সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার মোহামেদ সিসোকোও চুক্তি নবায়ন করেছিলেন ক্লাবের সাথে। গ্রেমিও তরুণ ব্রাজিলিয়ান মিডফিল্ডার লুকাস লেইভাও তখন দলে। লুইস গার্সিয়া বোধকরি বুঝতে পেরেছিলেন ২৯ বছর বয়সে এই দলের মূল একাদশে থাকার সম্ভাবনা তাঁর আস্তে আস্তে কমে যাচ্ছে। নিজের ক্যারিয়ারটা নিজের দেশে শেষ করার আশায় অবশেষে গার্সিয়া অ্যাটলেটিকোতে যেতে রাজী হলেন। যদিও পত্রপত্রিকায় খবর বেরোল দুটো আলাদা আলাদা চুক্তিতে ফার্নান্দো টরেস আর লুইস গার্সিয়া ক্লাব বদল করছেন, আসলে কিন্তু তা ছিল না।

ওদিকে টরেসকে দলের মূল স্ট্রাইকার বানানোর জন্য ক্রেইগ বেলামি, জিব্রিল সিসে কে দল থেকে একরকম বেরই করে দিলেন বেনিতেজ, তাদের বিক্রিতে কিছু টাকা আসলো, যা ফার্নান্দো টরেসের ২৭ মিলিয়ন পাউন্ড ট্রান্সফার ফি এর রেশটাকে একটু হলেও কমাতে সাহায্য করল। নতুন দলের মূল স্ট্রাইকার হলেন ফার্নান্দো টরেস, তাঁর ব্যাকআপ হিসেবে প্রথম প্রথম দলে রাখা হল ইংলিশ স্ট্রাইকার পিটার ক্রাউচকে।

যাইহোক, সবসময় ইংলিশ ফুটবল সম্পর্কে একটা ধারণা আছে যে বাইরের লিগ থেকে খেলোয়াড়দের এ লীগে আসার পরে মানিয়ে নিতে বেশ কিছু সময় লাগে। কারণ অন্যান্য লিগের থেকে এ লিগ অনেক বেশী প্রতিযোগিতাপূর্ণ, অনেক বেশী দ্রুতগতির। যদিও যুগে যুগে মোহামেদ সালাহ, লুইস সুয়ারেজ, সার্জিও অ্যাগুয়েরো, দিদিয়ের দ্রগবার মত খেলোয়াড়েরা এই প্রচলিত ধারণাকে ভুল প্রমাণিত করেছেন। এই তালিকার আরেকটা উল্লেখযোগ্য নাম হল এই ফার্নান্দো টরেস। সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ইংল্যান্ডে তাঁর প্রথম মৌসুমে ৪৬ ম্যাচে ৩৩ গোল করলেন তিনি। নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করলেন বিশ্বের সেরা স্ট্রাইকার হিসেবে। যে ফার্নান্দো টরেস লিভারপুলে আসার আগে অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদের হয়ে কোন মৌসুমেই ২০ গোল করতে পারেননি, সেই টরেস প্রিমিয়ার লিগে এসেই একটা অনন্য রেকর্ড গড়লেন – বিদেশী হিসেবে ইংল্যান্ডে নিজের অভিষেক মৌসুমে সবচেয়ে বেশী গোল করার রেকর্ড! আর গোল করার এই যাত্রাটা শুরুই বা হয়েছিল কি অসাধারণভাবে! যে চেলসি বছরের পর বছর ধরে তাকে পাওয়ার জন্য পিছে লেগে ছিল, সেই চেলসির বিপক্ষেই নিজেদের মাঠ অ্যানফিল্ডে স্টিভেন জেরার্ডের এক দুর্দান্ত পাস ধরে ইজরায়েলি ডিফেন্ডার তাল বেন হাইমকে পরাস্ত করে তুখোড় গোলশিকারির মত দ্রুতগতিতে পিটার চেককে হারিয়ে বল জড়ালেন তিনি ; বলটা জালে জড়ানোর সাথে সাথেই থেমে গেল মূলত সেই প্রশ্নের গুঞ্জন, “ফার্নান্দো টরেস লিভারপুলে মানিয়ে নিতে পারবেন তো?”

ফার্নান্দো টরেস এর ট্রেডমার্কই ছিল এরকম। তুখোড় গতিতে মার্কারকে ছিটকে দেওয়া, মার্কার ডিফেন্ডারদের তটস্থ করে আক্রমণভাগে দৌড়াদৌড়ি করা, দরকার হলে একটু নিচে নেমে এসে স্টিভেন জেরার্ডের সাথে টেলিপ্যাথিক বোঝাপড়ায় বল নিয়ে এসে মুহূর্তের মধ্যে প্রতিপক্ষের জালে জড়িয়ে দেওয়া – এই ত! টানা দুই-তিন মৌসুম এই জেরার্ড-টরেস যুগলবন্দীর কোন জবাব ছিল না প্রিমিয়ার লিগের কোন ম্যানেজারের কাছে। যে যুগলবন্দী আটকাতে হিমশিম খেতেন নেমানিয়া ভিদিচের মত লিগসেরা সেন্টারব্যাকও! ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের এই সেন্টারব্যাক নিজেদের মাঠ ওল্ড ট্রাফোর্ডে টরেসকে আটকাতে না পেরে নিজে খেলেন লাল কার্ড, ওদিকে টরেস গোল করলেন দুটো, লিভারপুল জিতল ৪-১ গোলের ব্যবধানে – এই সুখস্মৃতি ভুলতে পারে সে সামর্থ্য কোন লিভারপুল সমর্থকের আছে?

কিংবা ঐ সপ্তাহেই চ্যাম্পিয়নস লিগের রাজা রিয়াল মাদ্রিদের মত দলকে নাকানিচুবানি খাইয়ে ৪-০ গোলে লিভারপুলের জয়, যার মূল অস্ত্রও ছিল সেই জেরার্ড-টরেস যুগলবন্দী, সেই স্মৃতিই বা কে ভুলতে পারে?

লিভারপুলের ঐ তিন বছর স্ট্রাইকারদের একরকম রাজাই ছিলেন এই ফার্নান্দো টরেস। হ্যাঁ, আপনি মেসি-রোনালদো’র প্রসঙ্গ টেনে এনে তর্ক করতে চাইলে করতে পারেন, কিন্তু তাঁর আগে বলুন সে সময়ে মেসি বা রোনালদো, কেউ কি প্রথাগত নাম্বার নাইন হিসেবে খেলতেন?

তিনবছর রাজার মত খেললেও, প্রচুর ইনজুরিতেও পড়েছিলেন তিনি। ইনজুরির কারণে বেঞ্চে বসে থাকার হতাশার সাথে যুক্ত হল লিভারপুলের হয়ে ট্রফি না জিততে পারার কষ্ট। শেষমেশ এই ট্রফি জেতার আকাঙ্ক্ষাতেই বিশ্বব্যাপী হাজারো লিভারপুল সমর্থকদের কাছে বিশ্বাসঘাতক হয়ে যোগ দিলেন চেলসিতে – হ্যাঁ সেই চেলসি ; টানা আট বছর চেষ্টা করার পর অবশেষে টরেসকে দলে ভেড়াতে পেরেছিল তারা সেবার! ৫০ মিলিয়ন পাউন্ডের ট্রান্সফার ফি টা সে সময়ে ইংলিশ লিগে সর্বোচ্চ ছিল।

আর্টিকেলটা শুরু করেছিলাম ফার্নান্দো টরেস এর ক্যারিয়ারের দুই ভাগের ব্যাপারে আলোকপাত করার মাধ্যমে। টরেসের ক্যারিয়ারের দ্বিতীয়ভাগের শুরু এখন।

ফার্নান্দো টরেস : হঠাৎ ঝলসে উঠে নিভে যাওয়া এক ধূমকেতু
হতাশা-কাব্যের শুরু

বিশ্বের সেরা স্ট্রাইকার হিসেবে রেকর্ড ট্রান্সফার ফি তে চেলসিতে গিয়ে যে গতিতে ফর্ম হারালেন, সে গতিতে হয়ত টরেসের নিজেরই উত্থান হয়নি। ভিন্ন দল, ভিন্ন ট্যাকটিকস, ভিন্ন সতীর্থ – সবার মাঝে টরেস নিজেকে হারিয়ে খুঁজতে থাকলেন। ল্যাম্পার্ড, দ্রগবাদের মধ্যে খুঁজতে থাকলেন সেই জেরার্ডকে – যে জেরার্ডের সাথে টেলিপ্যাথিক অশরীরী যোগাযোগ তাকে বিশ্বের সেরা স্ট্রাইকার হিসেবে তিলে তিলে গড়ে তুলেছিল। চেলসির ট্যাকটিকসের সাথে মানিয়ে উঠতে পারলেন না টরেস, সাথে ক্রমাগত ইনজুরির ছোবল তো ছিলই। অ্যানচেলত্তি, ভিয়াস-বোয়াস, ডি মাত্তেও – কেউই সেই ভীতিকর টরেসকে বের করে আনতে পারলেন না চেলসির জন্য। চেলসির ম্যানেজার হয়ে আসার পর সেই রাফায়েল বেনিতেজ কিছুটা পেরেছিলেন ; কিন্তু তা কিয়দংশই বলা চলে। লিভারপুল সমর্থকদের অভিশাপের কারণেই কি না, মাঠে হাস্যকর সব মিস করতে থাকলেন টরেস, ম্যাচের পর ম্যাচ মাঠে থেকেও যেন থাকতেন না তিনি, উধাও হয়ে রইতেন।

কি এক ললাটের লিখন – যেসব ট্রফির আশায় লিভারপুল ছেড়ে চেলসিতে নাম লিখিয়েছিলেন তিনি, প্রায় সব ট্রফির স্বাদই এই চেলসিতে এসে পেলেন তিনি। কিন্তু সেসব ট্রফি পাওয়ার পিছে যে তাঁর অনেক বড় হাত (পা) ছিল সেটা হয়ত তিনি নিজেও স্বীকার করবেন না। টরেসের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হয়ত এটাই!

আজীবন ওরকম ফর্মে থাকলে আজকে হয়ত নেইমার বা ইনিয়েস্তা/হ্যাজার্ড নয়, মেসি-রোনালদোর সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ হতেন এই টরেসই!

কাল এই ক্ষণজন্মা প্রতিভার জন্মদিন ছিল, লিভারপুল সমর্থক হিসেবে যাকে চূড়ান্ত ঘৃণা করার চেষ্টা করলেও শেষতক আর করা যায়না!

শুভ জন্মদিন ফার্নান্দো টরেস।

চেলসির বিপক্ষে প্রথম গোল থেকে শুরু করে উলভারহ্যাম্পটন ওয়ান্ডারার্সের সাথে শেষ গোল, কম্পিউটারে জমে থাকা এই ৮১ গোলের অগণিত ভিডিও, প্রায় সহস্র ছাড়িয়ে যাওয়া ওয়ালপেপারগুলো তোমার ক্লাস কে মিথ্যা প্রমাণিত করেনা! ধন্যবাদ ঐ তিনবছরের জন্য, যে সাড়ে তিনবছরে একটা টিনএজ ছেলের লিভারপুলের প্রতি ভালোবাসাকে পাগলামীর পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিলে! আবার সাড়ে তিন বছর পর কোন এক ৩১ জানুয়ারীর সন্ধ্যায় এইচএসসি পরীক্ষার্থী সেই টিনএজ ছেলেকেই শোকে প্রায় শয্যাশায়ী করে দিয়েছিলে! তুমি বিশ্বাসঘাতক কি না সে তর্কে যাবো না, ক্লাব ছাড়ার পর লিভারপুল নিয়ে যা বক্রোক্তি করেছিলে তার প্রতিদান পেয়ে গিয়েছো ইতোমধ্যে আশা করি, তোমার স্ত্রীর কথা সত্যি হলে নিজের লিভারপুলের হয়ে দেওয়া গোলগুলো দেখে কেঁদেছও, তাই আগে যেরকম একসময় তোমার উপর ঘৃণা-বিতৃষ্ণা জন্মে গিয়েছিল এখন আর তা হয় না! করুণা হয়! সহমর্মিতা জন্মায়!

আজকে ভুঁইফোঁড়ের মত সদা গজিয়ে ওঠা নব্য ফুটবল বিশেষজ্ঞরা বোঝেনা ফার্নান্দো টরেস এর ক্লাস কোন পর্যায়ের ছিল। তারা বুঝুক বা না বুঝুক, ফুটবলকে ধর্ম আর নিজেদের মাঠকে মন্দির হিসেবে মানা স্টাডিও ভিসেন্তে ক্যালদেরনে খেলা দেখা হাজারো লাখো সমর্থকদের শত আনন্দের মুহূর্ত এনে দেওয়া এই ফার্নান্দো টরেস তাদের কাছে একজন দেবতাই।

যেমনটা দেবতা ছিলেন তিনি অ্যানফিল্ড মন্দিরের আরও লক্ষাধিক সমর্থকদের কাছেও, শুধুমাত্র ক্লাব-বদলের একটা সিদ্ধান্তের কারণে স্বর্গ থেকে মর্ত্যে পড়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত অন্তত!

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

thirteen − twelve =