লিভারপুল মিডফিল্ডে সাম্বার ছন্দ : ফাবিনহো

লিভারপুল মিডফিল্ডে সাম্বার ছন্দ : ফাবিনহো

খবরটাকে বিনা মেঘে বজ্রপাত বললে ভুল হবেনা। তবে অবশ্যই ভালো অর্থে, শুভ অর্থে, অন্তত লিভারপুল সমর্থকদের জন্য তো বটেই! বহুদিন ধরেই ক্লাবের মিডফিল্ডে খেলার মত মিডফিল্ডারের সংখ্যা অনেক কম ছিল। যে ক্লাব মোটামুটি চার-পাঁচটা প্রতিযোগিতায় এখন নিয়মিত খেলে, সেই ক্লাবের মিডফিল্ডে খেলার জন্য মানসম্পন্ন বেশ কয়েকটা মিডফিল্ডার থাকা উচিত। কিন্তু লিভারপুল নিয়মিত সেই জর্ডান হেন্ডারসন, জেইমস মিলনার, এমরে চ্যান ও জর্জিনিও ভাইনাল্ডামের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকত মিডফিল্ডের ব্যাপারে, সাথে অ্যালেক্স অক্সলেড চেম্বারলাইন। বেঞ্চের অবস্থা ছিল করুণ। তার উপরে গত মৌসুম থেকেই বিষয়টা মোটামুটি নিশ্চিত যে ক্লাবে থাকছেন না জার্মান মিডফিল্ডার এমরে চ্যান, লিভারপুলের সাথে চুক্তি না বাড়িয়ে ফ্রি ট্রান্সফারে চলে যাচ্ছেন ইতালিয়ান চ্যাম্পিয়ন জুভেন্টাসে। ফলে লিভারপুলের মিডফিল্ডার দরকার ছিল অনেক, সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার। উল্ভারহ্যাম্পটনের রুবেন নেভেস, নাপোলির জর্জিনিও – সবার নাম বাতাসে ভাসলেও শেষ পর্যন্ত হঠাৎ আজকে জানা গেল তাদের কেউই নন, লিভারপুলের নতুন মিডফিল্ডার হয়ে আসছেন ব্রাজিলিয়ান সাম্বা বয় – ফাবিনহো!

২৪ বছর বয়সী ব্রাজিলিয়ান এই মিডফিল্ডার পর্তুগিজ ক্লাব রিও অ্যাভে তে ক্যারিয়ার শুরু করলেও মাঝে খেলে গেছেন রিয়াল মাদ্রিদে। রিয়াল মাদ্রিদের তারকায় ভরা মিডফিল্ডে ফাবিনহো এর মত তরুণ প্রতিভা জায়গা না পেয়ে চলে আসেন ফরাসী ক্লাব মোনাকোতে। সেখানেই মূলত পাদপ্রদীপের আলোয় চলে আসেন তিনি। ২০১৩ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত এই ৫ বছরে ২২৫ ম্যাচ খেলে সেন্ট্রাল মিডফিল্ড থেকে গোল করেছেন ২২টি। চমকপ্রদ বিষয় হল, এখন পুরোদস্তুর সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার হয়ে গেলেও ক্যারিয়ার কিন্তু তিনি শুরু করেছিলেন রাইটব্যাক হিসেবে। পরে মোনাকো তে এসে সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার হয়ে যান, পিএসজিকে হটিয়ে দুর্বার মোনাকোর অংশ হয়ে জিতে নেন লিগ শিরোপা, গত মৌসুমে ওঠেন চ্যাম্পিয়নস লিগের সেমিফাইনালেও। 

লিভারপুল মিডফিল্ডে সাম্বার ছন্দ : ফাবিনহো

সব্যসাচী এই খেলোয়াড় সেন্ট্রাল মিডফিল্ড, ডিফেন্সিভ মিডফিল্ড, রাইটব্যাক, রাইট মিডফিল্ড সকল পজিশনেই খেলতে পারেন বেশ ভালোভাবে, অর্থাৎ কোচ ইউর্গেন ক্লপ বেশ ভালোভাবেই তাকে যেকোন ফর্মেশনের সাথে মানিয়ে নিতে পারবেন। ২০১৭/১৮ মৌসুমে মোনাকোর হয়ে সবচেয়ে বেশী সফল পাস (১,৯৮০), সবচেয়ে বেশী সফল ট্যাকল (১১২) ও সবচেয়ে বেশী এরিয়াল ডুয়েল বা বাতাসে ভেসে আসা বল সফলভাবে আয়ত্বে আনার (৯৯) রেকর্ডটা ফরাসী লিগে তারই। ৬ ফুট ২ ইঞ্চি উচ্চতা হবার কারণে বাতাসে ভেসে আসা বল সামলাতে সমস্যা হয়না তাঁর। ছোট ছোট পাসে খেলে অভ্যস্ত ফাবিনহো সাধারণত অতটা মেরে-ধরে খেলতে পছন্দ করেন না। সাধারণ ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডারদের তুলনায় বেশ গতিশীলও বটে। ক্লপের হাই-টেম্পো মিডফিল্ডে একাধিক কাজ করতে পারা (ট্যাকলিং, পাসিং) এরকম একটা মিডফিল্ডারই চাচ্ছিল লিভারপুল। যেহেতু এমরে চ্যান চলে যাচ্ছেন, ফাবিনহো কে মূলত তার জায়গাতেই আনা হচ্ছে। এবং মোনাকোর খেলা যে ভালোভাবে দেখেছেন, সে বলতে পারবেন, এখন এমরে চ্যানের থেকেও ভালো মিডফিল্ডার রয়েছে লিভারপুলের হাতে! যেহেতু র‍্যাসেনবলস্পোর্ত লাইপজিগ থেকে সামনেই নাবি কেইটা আসছেন লিভারপুলে, লিভারপুলের মিডফিল্ডে কেইটার আগ্রাসী খেলার স্টাইলের সাথে যায় এমন একজন ধীরস্থির মিডফিল্ডের ছন্দ ঠিক রাখা খেলোয়াড়ের দরকার ছিল, আর সে কাজটা ফাবিনহো এতদিন মোনাকোর হয়ে খুব ভালোভাবেই করে এসেছেন। সঠিকভাবে পাস দিয়ে খেলার ছন্দ নিয়ন্ত্রণ করার পাশাপাশি ফাবিনহোর আরেকটা বড় গুণ হচ্ছে বিপদে মাথা ঠান্ডা রেখে দলকে বিপদমুক্ত করা। বিপজ্জনক জায়গায় প্রইপক্ষ বল নিয়ে চলে আসলেও সফল ইন্টারসেপশানের বলকে নিজের নিয়ন্ত্রণে এনে মাথা গরম না করে ড্রিবল করে বলকে ডিফেন্সের জটলা থেকে বের করে আনতে পারেন তিনি। পজিশন সেন্স মারাত্মক, সঠিক সময় সঠিক জায়গায় থেকে আদর্শ ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডারের মত বল কেড়ে নিতে পারেন তিনি প্রতিপক্ষের পা থেকে, কোন ধরণের অযাচিত ট্যাকল করা ছাড়াই। রাইটব্যাক হিসেবে ফাবিনহো বেশ আক্রমণাত্মক। ক্রমাগত উপরে নিচে ওঠানামা করে আক্রমণ-রক্ষণ উভয় জায়গায়ই সামাল দিতে পারেন তিনি। রাইটব্যাক হিসেবে ফাবিনহোর ফুটবলীয় মান এতটাই ভালো ছিল যে, মোনাকো কোচ ভাবলেন যে ছেলের ট্যাকটিক্যাল জ্ঞান এত বেশী, তাকে রাইটব্যাকে না খেলিয়ে স্কোয়াডে আরেকটু গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া যুক্তিযুক্ত। কিন্তু সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার হিসেবে আরেকটু হিসেবি তিনি, বল পাওয়া মাত্রই কাছের মিডফিল্ডারকে যেভাবে করে হোক বল না দিয়ে, কোন সতীর্থকে বল দিয়ে আক্রমণের গতি একই রকম থাকবে, এটাই মূল লক্ষ্য তাঁর।

সেন্টারব্যাকের মত উচ্চতা, ফুলব্যাকের মত পজিশনিং সেন্স ও নিখুঁত বল কেড়ে নেওয়ার ক্ষমতা, আর সাথে আদর্শ মিডফিল্ডারের মত আক্রমণ গড়ে দেওয়ার গুণ – মোটামুটি এই হলেন ফাবিনহো। সামনের মৌসুম থেকে লিভারপুল আরও ভয়ংকর হচ্ছে, এ কথা বলাই যায়!

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

18 − eleven =