ফাবিও ক্যানাভারো : স্ট্রাইকারদের যুগে ব্যালন ডি’অর জয়ী এক ডিফেন্ডার

ফাবিও ক্যানাভারো : স্ট্রাইকারদের যুগে ব্যালন ডি'অর জয়ী এক ডিফেন্ডার

” If Rio Ferdinand is worth £120,000 a week, He is worth a hundred million a day.”

Eamon Dunphy নামের আইরিশ মিডফিল্ডারটি জানতেন নিজের ডিবক্সের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ন্যাড়া মাথার সেই মানুষটির নিজের দলের ডিফেন্সকে অভেদ্য করে তোলার ক্ষমতার কথা।

“I have never felt that he is short when I play with him, because he can jump higher than anybody else. He is always good at heading. It doesn’t make any sense talking about him like that.”

Alessandro Nesta প্রত্যক্ষদর্শী হয়েছেন খর্বকার ওই মানুষটির পেশীশক্তির কাছে মাঠকাঁপানো সব স্ট্রাইকারদের অসহায়ত্বের দৃশ্যের।

“He has that unmistakable presence as a leader and in my impression, is exactly like that tough and cool – headed defense he shows on the pitch.”

Iker Casillas অনুভব করেছেন যুদ্ধময়দানের প্রধান সেনাপতির মত নিজেদের ডিবক্স টাকে আগলে রেখে নিজের দলের আর দশটি সৈনিক কে নেতৃত্ব দেয়ার তার সেই অনন্যসাধারণ ক্ষমতা।

১৯৭৩। সেপ্টেম্বর ২৩। ততদিনে ইয়োম কপ্পুর যুদ্ধের উত্তাপ লেগে গেছে বেশ ভাল ভাবেই। ১৯৬৭ সালের শোচনীয় পরাজয় এর পালটা জবাব দিতে প্রতিশোধের হিংস্র জিঘাংসা নিয়ে সিরিয়া-মিসর ইসরায়েল বাহিনীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে এক অবিশ্বাস্য ক্ষিপ্রতায়। আর অসহায় মানুষগুলো প্রহর গুনছে আর ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনায় রত হয়েছে এই যুদ্ধের দামামা থেকে নিজেকে রক্ষা করার। ইউরোপেরই অন্য প্রান্তে তখন সাজ সাজ রব। জার্মানি। আর কিছুদিন পরই সেখানে যে বসতে যাচ্ছে ফুটবল ইতিহাসের প্রথম বিশ্বকাপের আসর। ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ারের ইতিহাসকে বরণ করে নেয়ার অপেক্ষায় তখন সমগ্র পশ্চিম জার্মান বাসী। একই সাথে নিজ দেশের আভিজাত্যের ঝান্ডা উচিয়ে ধরার এক অনবদ্য প্রচেষ্টা। অর্থাৎ ইউরোপের দুটি প্রান্ত তখন উত্তাপ ছড়াচ্ছে সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি আঙ্গিক দিয়ে।

সেই জার্মানীরই পার্শ্ববর্তী দেশ ইতালি। যেখানকার মাটিতে পদচারণা ঘটেছে ইতিহাসের বহু মহারথীর। জুলিয়াস সিজারের দেশ ইতালি, মার্কো পোলোর দেশ ইতালি, মাইকেলেঞ্জোর দেশ ইতালি, লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির দেশ ইতালি, গ্যালিলিওর দেশ ইতালি। পিজ্জা আর পাস্তার শহর ইতালি,কৃষ্টি আর সংস্কৃতির ধারক ও বাহক ইতালি, ফেরারির তীর্থস্থান ইতালি, বাইসাইকেলিং এর শহর ইতালি।

সেই ইতালির নাপোলি শহরের এক নিম্নবিত্ত পরিবারে যেন ঈশ্বর প্রদত্ত সমগ্র ইতালি জাতির উপহার স্বরুপ জন্ম লাভ করল এক ছোট্ট শিশু। বাবা মা নাম রাখলেন ফ্যাবিও ক্যানাভারো। বাবা ব্যাংকের কেরানি, মা জীবিকা নির্বাহ করতেন লোকের বাড়ি কাজ করে। দারিদ্রের কষাঘাত খুবই কাছ থেকে লক্ষ্য করেছেন ক্যানাভারো। বড় বোন রেনেতার বিবাহ কার্য সম্পন্ন হয় মাত্র ১৫ বছর বয়সে। তার কিছুদিন পরই আরেক শিশুর জন্ম। পরিবারের এতগুলো সদস্যের ভরণপোষণের খরচ জোগাতে রীতিমত নাজেহাল ক্যানাভারো পরিবার। সেখানকারই এক আঞ্চলিক ফুটবল ক্লাব ব্যাগ্নোলি। বালক ক্যানাভারো এর ফুটবলের হাতে খড়ির গল্পটা সেখানেই। আর দিন বদলের গল্পেরও শুরু সেখান থেকেই।

ব্যাগ্নোলিতে নিজের জাত চেনাতে সময় নেননি ক্যানাভারো। খুব কম সময়েই নজরে পড়লেন নাপোলির স্কাউট টিমের। চোখে তার হাজার স্বপ্ন, বুকের ভেতর লালন করা এক গভীর আশা। এ সমগ্র ফুটবল বিশ্বকে যেন কিছু করে দেখাতে চায় সে, যেন এ সমগ্র বিশ্বের মানুষের কাছে কোন এক বার্তা পৌছিয়ে দিতে চায় সে, যেন সমগ্র ইতালি জাতির উৎসবের কারণ হতে চায় সে। এমন হাজার গোপন স্বপ্নের পসরা সাজিয়ে নাপোলির একাডেমি তে আসেন ক্যানাভারো। নাহ, প্রথমেই যুব দলের ঠিকানা মেলেনি। সর্বপ্রথম ঠিকানা মেলে ক্লাবের বলবয় হিসেবে। কিন্তু তাতেও যেন দুঃখ নেই ক্যানাভারোর। ম্যারাডোনার জাদু যে তার দেখার সুযোগ হল খুব কাছ থেকে। যখন যা ইচ্ছে, বল পায়ে তখনই যেন তাই করে দেখাচ্ছেন মানুষটি। এমন ফুটবল সুধা পান করার সুযোগ থাকলে কারোর আবার দুঃখ থাকে নাকি। তো সৌভাগ্যক্রমেই হোক আর দুর্ভাগ্যক্রমেই হোক একদিন ট্রেনিং সেশনে আসল ম্যারাডোনাদের সাথে খেলার সুযোগ। সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার পজিশনে দাঁড় করানো হল ক্যানাভারোকে। ট্রেনিং সেশন চলছে। প্রচন্ড ক্ষিপ্রগতিতে বল টানছেন ম্যারাডোনা। যেন প্রলয় সৃষ্টি করে ফেলবেন। প্রায় চার পাঁচজন কে কাটিয়ে ফেলেছেন। কেউ ঠেকাতে পারেনি। সামনেই দাঁড়িয়ে ক্যানাভারো। ডিবক্সের কাছাকাছি চলে এসেছেন। ক্যানাভারোর মুখোমুখি ম্যারাডোনা। দৌড়ে এসে ভয়ংকর ট্যাকলিং অসাধারণ দক্ষতায় ম্যারাডোনার পা থেকে বল কেড়ে নিলেন ক্যানাভারো। মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন ম্যারাডোনা। রত্ন চিনতে ভুল হয়নি ম্যারাডোনার। উঠে এসে নিজে থেকেই ক্যানাভারো কে জিজ্ঞাসা করলেন -“কোন পজিশনে খেলতে পছন্দ কর?” ক্যানাভারো উত্তর দিল “সেন্ট্রাল ডিফেন্স”। ম্যারাডোনার অনুরোধেই বল বয় থেকে নাপোলির ইয়ুথ টিমে সুযোগ মিলল ক্যানাভারোর। শুরু হল বিশ্বকে নাড়া দেয়ার গল্পের।

 

আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার

অনুর্ধ্ব-২১ দল

আলেসসান্দ্রো নেস্তা আর ফাবিও ক্যানাভারো। ইতালিবাসী অনুর্ধ্ব ২১ দলেই দেখল এক ভয়ংকর সেন্ট্রাল ডিফেন্স জুটি। মালদিনির অধীনের এই ভয়ংকর দলটি তোয়াক্কা করল না কোন ইউরোপিয়ান পরাশক্তিকেই। অনুর্ধ্ব-২১ ইউরো আসরের শিরোপা লুফে নিল পরপর ১৯৯৪, ১৯৯৬ দুবার। জাতীয় দলের পরশপাথরের ছোঁয়া পেতে আর দেরী হল না। ২২ জানুয়ারী, ১৯৯৭ তে নর্দান আইল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম জাতীয় দলের জার্সি গায়ে মাঠে নামেন তিনি। খুব কম সময়েই নিজের স্থানটাকে পাকাপোক্ত করে নেন তিনি। সে বছরই সুযোগ পেলেন বিশ্বকাপ বাছাই পর্বে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে মাঠে নামার।

ইউরোপিয়ান ফুটবলে তখন ডেনিস বার্গক্যাম্প, জিনেদিন জিদান আর মাইকেল ওয়েন দের দাপট। তো সেই ওয়েন কে আটকানোর অস্ত্র হিসেবে প্রথম একাদশে এক অনভিজ্ঞ ২৪ বছরের বালক ক্যানাভারো কে বেছে নেয়ায় খুব করে এক গাল হেসেছিল ওয়েম্বলির দর্শকরা।

ম্যাচ শুরু হল। হায়,কিন্তু কোথায় সেই ইংলিশ রাজপুত্র মাইকেল ওয়েন। তাকে যেন ডিফেন্সের রীতিমত বন্দি করে রেখেছে সেই ২৪ বছরের বালকটি। দুর্দান্ত স্ট্যামিনা, গতি আর ভয়ংকর ট্যাকলিং এর সামনে পাত্তাই পাচ্ছে না ইংরেজরা। বরঞ্চ নিয়তির নির্মম পরিহাসে উলটো ইংরেজদের জালে ৫১ মিনিটে জালে বল জড়িয়ে ওয়েম্বলির মাঠ থেকে বিজয় ছিনিয়ে আনল ইতালিয়ানরা। আর বিশ্ববাসীও শুনতে পেল ক্যানাভারো নামক সৈন্যের আগমনী বার্তা।

বিশ্বকাপ ১৯৯৮

ফ্রান্স। বসল ১৬ তম ফুটবল যুদ্ধের আসর। আসরের পরিধি তখন আরো বড়। ৩২ টি টিম লড়াই করে আলাদা আলাদা ৮ টি গ্রুপে ভাগ হয়ে। অ্যালেসসান্দ্রো নেস্তা, পাওলো মালদিনি, ফাবিও ক্যানাভারো আর আলেসসান্দ্রো কোস্তাকুর্তার অভিজ্ঞতা আর তারুণ্যের অভূতপূর্ব সংমিশ্রণে গড়া একটি দল।

ইতালি, চিলি, অস্ট্রিয়া আর ক্যামেরুনের সমন্বয়ে গড়া গ্রুপ ‘বি’ তে নিশ্চিত ফেবারিট ইতালি। ৭ পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়ে ২য় রাউন্ডে উঠলেও ইতালির এই ঐতিহ্যবাহী ডিফেন্সে খুব বেশি সন্তুষ্ট হতে পারল না কোচ সিজার মালদিনি। ৩ ম্যাচে হজম করতে হল ৩ গোল। নেস্তা, ক্যানাভারো দুজনের স্থানই পড়ল হুমকির মুখে।

২য় রাউন্ডে নরওয়ের বিপক্ষে কোচ ভরসা রাখলেন ফ্যাবিও ক্যানাভারো র ওপর। ভরসার প্রতিদানটা অসাধারণ ভাবেই দিলেন ক্যানাভারো। পুরো ম্যাচেই বাক্সবন্দি করে রাখলেন নরওয়ের আক্রমণভাগ। দুর্দান্ত ডাইভ, প্রেসিং, ট্যাকলিং, স্ট্যামিনা আর অবিশ্বাস্য হেডিং দক্ষতার সামনে রীতিমত অসহায় নরওয়ের ফরওয়ার্ড লাইন। ১৮ মিনিটে করা ভিয়েরির গোলে নরওয়েকে নূন্যতম ব্যবধানে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠল ইতালি।

প্রতিপক্ষ স্বাগতিক ফ্রান্স।

জিদান আর থিয়েরী অঁরির জুটিতে ফার্স্ট রাউন্ডে ডেনমার্ক, আফ্রিকা আর সৌদি আরবের সাথে রীতিমত ছেলে খেলা করেছে ফ্রান্স।গ্রুপ পর্বেই অঁরি পেয়েছেন ৩ গোল। যদিও জিদান নামক বিস্ময়টি তখনও পুরোপুরি বিস্ফোরিত হয়নি। সেই জিদান-অঁরির যুগলবন্দির সামনে ইতালি।

ম্যাচ শুরু হল। কিন্তু এবারও অঁরি-জিদান যুগলের সামনে প্রাচীর হয়ে দাঁড়ালেন ক্যানাভারো। তাঁর নিখুত মার্কিং বলই আসতে দিচ্ছে না অঁরির পায়ে। কিন্তু নাহ, বেশিক্ষণ পারা গেল না। বল দখলের লড়াইয়ে স্টেফানে গুইভার্চের দ্বারা মাথায় আঘাত পেয়ে মাঠ ছাড়তে হল ক্যানাভারো কে। অতিরিক্ত সময় শেষেও ম্যাচ ০-০। পেনাল্টি ভাগ্য। নিয়তি স্বাগতিকদের পক্ষে। পেনাল্টিতে ৪-৩ গোলের পরাজয়ে রিক্ত হস্তে বিদায় ইতালির। ফাইনালে জিদান ম্যাজিকে রোনাল্ডোর ব্রাজিল কে দর্শক করে চ্যাম্পিয়ন স্বাগতিক ফ্রান্স।

ইউরো ২০০০

বেলজিয়াম আর নেদারল্যান্ড যৌথ ভাবে স্বাগতিক সেবার। ইতালি দল তখন দিনো জফের অধীনে। তার পছন্দের ফর্মেশন ৩-৫-২। ক্যানাভারো-নেস্তা-ইউলিয়ানো ত্রয়ীর সমন্বয়ে গঠিত এক মজবুত রক্ষণ। ইতালির গ্রুপে তুর্কি, স্বাগতিক বেলজিয়াম আর সুইডেন। ৩ ম্যাচে নয় পয়েন্ট নিয়ে আর মাত্র দু’গোল হজম করে অসাধারণ রক্ষণ নৈপুণ্য দেখিয়ে কোয়ার্টারে উঠল ইতালি। কোয়ার্টারে প্রতিপক্ষ রোমানিয়া। আবারো ডিফেন্সের সেই ত্রয়ীর সামনে অসহায় রোমানিয়ার দুর্দান্ত আক্রমণভাগ। গোলমুখেই শট নেয়ার সুযোগ পাচ্ছে না রোমানিয়া। পুরো ম্যাচ জুড়ে এক অসাধারণ আধিপত্য দেখিয়ে ২-০ গোলের জয় নিয়ে সেমিতে ইতালি।

ফাবিও ক্যানাভারো : স্ট্রাইকারদের যুগে ব্যালন ডি'অর জয়ী এক ডিফেন্ডার
পারমার দিনগুলি

সেমি ফাইনালে প্রতিপক্ষ টুনার্মেন্ট জুড়ে প্রতিপক্ষকে আমাশয় বাধিয়ে দেয়া স্বাগতিক নেদারল্যান্ড। ডেনিশ বার্গক্যাম্প সেই সময়ের অবিসাংবাদিত শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী। তার সামনে বেহুলা লক্ষীন্দরের প্রাচীর গড়ে তুললেও যেন ঠিকই সেই প্রাচীর ধসিয়ে দিয়ে বের হয়ে যাবেন তিনি। কিন্তু বাস্তবে বেহুলা লক্ষীন্দর প্রাচীর ভাঙা সম্ভব হলেও সে টুর্নামেন্টে ক্যানাভারো আর নেস্তা মিলে যে প্রাচীর গড়ে তুলেছেন সেটি ভেদ করা সম্ভব হল না। রক্ষণভাগের সেই দুই অতন্দ্র প্রহরীর কাছে বার্গক্যাম্প যেন এক অসহায় সৈনিক। ৯০ মিনিট ধরে ডাচ দের গড়ে তোলা একের পর এক ঝাঁঝালো আক্রমন তাই বার বারই ব্যর্থ। অতিরিক্ত সময়ের খেলাও শেষ। ০-০। আবার পেনাল্টি ভাগ্য। তবে এবার ভাগ্য বিধাতা ইতালির পক্ষে। পেনাল্টিতে স্বাগতিক দের ৩-১ গোলে হতাশ করে ফাইনালে ইতালি।

ফাইনাল। আবার বাধা ফ্রান্স। যেখানে পরিষ্কার ফেভারিট ক্যানাভারোর ইতালি। ক্যানাভারো-নেস্তা জুটি পুরো টুর্নামেন্টে হজম করেছে মাত্র দু’গোল। আর ফরোয়ার্ডে রয়েছে বুলডোজার ফ্র্যান্সেসকো টট্টি। ফ্রান্সের রয়েছে ভিয়েরা-অঁরি-জিদানের নিয়ে গড়া সবচাইতে ভয়ংকর মিডফিল্ড। ম্যাচ শুরু হল। সেই পূর্বে অনুমিত ফলাফল। এই ভয়ংকর মিডফিল্ডের ভয়াবহতা রীতিমত তুচ্ছজ্ঞান করছেন ক্যানাভারো আর নেস্তা। আক্রমণ যতই ক্ষুরধার হোক ক্যানাভারো আর নেস্তার সামনে এসে সকল ক্ষুরধারতা ম্লান। ৪৫ মিনিট শেষ।স্কোরশীট ০-০। ৫২ মিনিট। টট্টির পাস থেকে দেলভেচ্চিও এর এক নিখুঁত ফিনিশিং। ইতালী ১-০ ফ্রান্স। বল পজিশন ইতালী ৬৪%-৩৬% ফ্রান্স। এরপরই শুরু হল তান্ডব। ফরাসীদের আক্রমণের তান্ডব। কখনো জিদানের ভয়ংকর ড্রিবলিং, কখনো অঁরির বাঁদিক থেকে মাইনাস কখনো টিম স্পিডের এক অনন্যসাধারণ বহিঃপ্রকাশে রীতিমত ঝড় উঠছে ইতালির ডিবক্সে। কিন্তু সকল ঝড় একসাথে সামাল দিয়ে যাচ্ছেন দুই বীর ক্যানাভারো আর নেস্তা। ৯০ মিনিটের খেলা শেষ। অতিরিক্ত সময় ৩ মিনিট। খেলা শেষ হতে আর মাত্র কয়েক সেকেন্ড বাকি। বা দিক দিয়ে শেষবারের মত আক্রমন শানিয়েছে ফ্রান্স। ভিয়েরার গড়িয়ে দেয়া একটি বল ডিবক্সের ভেতর অসাধারণ ভাবে ডাইভ করে পা ছুইয়ে জালে জড়ালেন সিলভান উইলটর্ড। গোল!

১-১

ম্যাচ গড়াল অতিরিক্ত সময়ে। ভাগ্য বিধাতা তখন সম্পূর্ণ রুপে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। ১০৩ মিনিটে রবার্ট পিরেসের ক্রস থেকে আবার ইতালির জালে বল জড়ালেন ডেভিড ত্রেজেগে। পুরো টুর্নামেন্টে দু’গোল খাওয়া ইতালি মাত্র ১৩ মিনিটে খেয়ে বসল দু’গোল। নেস্তা আর ক্যানাভারোর প্রাচীর ধসিয়ে দিয়ে ইতালির কাছ থেকে শিরোপা কেড়ে ফ্রান্সের জয়োৎসব। সেদিন ম্যাচ শেষে প্রচণ্ড কেঁদেছিলেন ক্যানাভারো। সংকল্প নিয়েছিলেন দেশকে কিছু না দিয়ে ফুটবল থেকে অবসর নেবেন না তিনি। পুরো টুর্নামেন্ট জুড়ে অসাধারণ পারফর্ম্যান্স দেখিয়ে সেবার টুর্নামেন্ট এর সেরা একাদশে স্থান পান ক্যানাভারো।

বিশ্বকাপ ২০০২

প্রথম বারের মত এশিয়ার স্বাদগন্ধের ছোঁয়া পেল বিশ্বকাপ। আয়োজক জাপান-কোরিয়া। হিরোহিতোর দেশ জাপান। চপস্টিকের শহর জাপান। নুডুলসের শহর জাপান। মার্সাল আর্টের শহর জাপান। সেই জাপান আর পার্শ্ববর্তী দেশ কোরিয়া সেবার সারা বিশ্বকে দেখাল এশিয়ার রুপ, রস, সংস্কৃতি, কৃষ্টি আর ঐতিহ্য। সেটি ছিল ব্রাজিলের বিশ্বকাপ, রোনাল্ডোর বিশ্বকাপ, অলিভার কানের বিশ্বকাপ। আরো সূক্ষভাবে বললে অঘটনের বিশ্বকাপ। পর্তুগাল, ফ্রান্স কিংবা আর্জেন্টিনার প্রথম রাউন্ড থেকে বিদায়, নক আউট রাউন্ডে ইতালিকে হারিয়ে দক্ষিণ কোরিয়ার কোয়ার্টারে ওঠা, সেনেগালের আর তুরস্কের চমক। কি ঘটেনি সেই বিশ্বকাপে? ৪ পয়েন্ট নিয়ে সেবার খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে ২য় রাউন্ডে গেলেও মার্কো মাতেরাজ্জির নিম্নমানের পারফর্ম্যান্স, ক্যানাভারোর দুই হলুদ কার্ড দেখে নিষেধাজ্ঞায় পড়া আর নেস্তার ইঞ্জুরি ২য় রাউন্ডেই থামিয়ে দেয় ইতালীর বিশ্বকাপ মিশন। এক্সট্রা সময়ে ইতালীর জালে বল জড়িয়ে সমগ্র বিশ্বকে তাক লাগিয়ে কোয়ার্টারে যায় কোরিয়া। পুরো টুনার্মেন্টে ১৮ গোল করে চ্যাম্পিয়ন হয় ব্রাজিল।

ফাবিও ক্যানাভারো : স্ট্রাইকারদের যুগে ব্যালন ডি'অর জয়ী এক ডিফেন্ডার
তখন তিনি ইন্টার মিলানে

ইউরো ২০০৪

মালদিনি যুগ শেষ। তখন ফ্যাবিও ক্যানাভারো যুগ। যদিও তার কাছে নেতৃত্ব তুলে দেয়ার পর কিছুটা সমালোচনা হয়েছিল কিন্তু ইউরো কোয়ালিফাইং রাউন্ড থেকে সফলতার সাথে ইতালি কে উত্তরণ করিয়ে সকল সমালোচক কে বুড়ো আঙুল দেখাল ক্যানাভারো। কিন্তু না, মূল পর্বে সফলতা আর সাথী হল না। বুলগেরিয়ার সাথে ২-১ গোলের জয় পরের রাউন্ডে নিয়ে যেতে পারল না তাদের।সুইডেন আর ডেনমার্কের সাথে হোঁচট প্রথম রাউন্ডেই সেবার ইউরো মিশন শেষ করে দিল তাদের। সবাই কে চমক দেখিয়ে স্বাগতিক পর্তুগাল এর হৃদয় ভেঙে সেবার চ্যাম্পিয়ন হল গ্রীস।

ফাবিও ক্যানাভারো : স্ট্রাইকারদের যুগে ব্যালন ডি'অর জয়ী এক ডিফেন্ডার
জুভেন্টাসে নিজেকে খুঁজে পাওয়া

বিশ্বকাপ ২০০৬

সময় টা মোটেও ভাল যাচ্ছে না ইতালির। দুঃস্বপ্নের বিশ্বকাপ ২০০২ এর রেষ কাটতে না কাটতেই ২০০৪ এ ইউরোর প্রথম রাউন্ড থেকে বিদায়। এরপর খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে বিশ্বকাপে আসা। মার্সেলো লিপ্পির অধীনে দল। ক্যাপ্টেন ফ্যাবিও ক্যানাভারো। সেবার বিশ্বকাপের আয়োজক বেকেনবাওয়ারের দেশ জার্মানী। হিটলারের দেশ জার্মানী। কাল মার্কস এর দেশ জার্মানী। একনায়ক তন্ত্র আর সমাজতন্ত্রের পটভূমি জার্মানী। লুইস ফিগো,ডেকো, রোনালদো নিয়ে গড়া পর্তুগাল সেবার শিরোপার জোর দাবিদার। রাউল,ইনিয়েস্তা,জাভি,তরেস কে নিয়ে গড়া স্পেন ও ছিল তারকাখচিত।

রিকুয়েলমে, ক্রেসপো, তেভেজ, স্যাভিওলা, জানেত্তি, আয়ালা আর তরুণ মেসি কে নিয়ে গড়া আর্জেন্টিনাও সেবার এসেছিল সিংহের বেশে। রোনালদিনহো, কাকা, রোনাল্ডো, আদ্রিয়ানো কে নিয়ে গড়া ব্রাজিলও শিরোপা ধরে রাখতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। ফ্রান্সের জিদান-অঁরি যুগলে নতুন করে যোগ হয়েছে গতিরাজ ফ্র্যাঙ্ক রিবেরি।

ক্লোসা, শোয়েনস্টাইগার, লাম, পোডালস্কিকে নিয়ে গড়া বুলডোজার জার্মানী তো ছিলই। সেখানে ইতালি তে আর কে আছে? সেটি যে তখন বুড়োদের দল।

ক্যানাভারোর বয়স তখন প্রায় ৩৩। নেস্তাও বয়সের ভারে আক্রান্ত। মালদিনি ফুটবল কে বিদায় জানিয়েছেন আগেই। টট্টির ছন্দপতন ঘটতে শুরু করেছে। তার ওপর বিশ্বকাপেও এসেছে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। বিশ্বকাপের আগে কেউই পাত্তা দেয় নি ইতালির এই টিমটাকে।বাজল যুদ্ধের দামামা। ঘানা,চেক প্রজাতন্ত্র আর ইউএসএ কে নিয়ে গ্রুপ ই তে ইতালি। সেন্ট্রাল ডিফেন্সে সেই প্রাচীন যুগল। নেস্তা-ক্যানাভারো। আবার সেই তুখোড় ডিফেন্স। ২০০২ বিশ্বকাপের পাপের প্রায়শ্চিত্ত টা যে এবার করতেই হবে। গ্রুপ পর্বে ২৭০ মিনিটে ইটালি হজম করল মাত্র এক গোল। সেটিও ইউএসএ এর সাথে এক আত্মঘাতী গোল। তবে গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে এসেই বাঁধল বিপত্তি। আবার ইঞ্জুরি নিয়ে মাঠ ছাড়ল নেস্তা। আবারও এক রকম ক্যানাভারোকে একাই সামলাতে হবে ইতালির ডিফেন্স। তার সবচাইতে সহযোগী টিকে পাবেন না তিনি। ৩ ম্যাচে ৭ পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপ পর্ব উত্তরণ করল ইতালী। রক্ষণভাগে নিজেকে রীতিমত অপ্রতিরোধ্য করে তুললেন ক্যানাভারো।

ফাবিও ক্যানাভারো : স্ট্রাইকারদের যুগে ব্যালন ডি'অর জয়ী এক ডিফেন্ডার
মাদ্রিদে

২য় রাউন্ড। প্রতিপক্ষ পুচকে দল অস্ট্রেলিয়া। কিন্তু সেই পুচকে দলের বিপক্ষেই রীতিমত গোলের জন্য হাপিত্যেশ করতে হল ইতালিকে। ৯০ মিনিট ধরে একাই নিজেদের রক্ষণভাগ পাহারা দিয়ে গেলেন ফ্যাব। ৯৪ মিনিটে পেনাল্টি থেকে টট্টির একমাত্র গোলে কোয়ার্টার ফাইনালে গেল ইতালি।

কোয়ার্টার ভাগ্য টা সুপ্রসন্নই ছিল। কোয়ার্টারের সবচাইতে দুর্বল দল ইউক্রেন কে নিজেদের প্রতিপক্ষ হিসেবে পেল তারা। সেবার নিজেদের আক্রমণভাগের ক্ষুরধারতা দেখাল তারা। ইউক্রেন কে রক্ষণভাগের দিকে ভীড়তেই দিল না । ক্যানাভারোর অসাধারণ নেতৃত্বে ইউক্রেনকে নিয়ে রীতিমত ছেলে খেলা করল ইতালি। লুকা টনির জোড়া গোল আর জামব্রোত্তার এক গোলে ইউক্রেনকে ৩-০ গোলে ঊড়িয়ে দিয়ে সেমি ফাইনালে পদার্পন। আর মাত্র ১৮০ মিনিটের ব্যবধান।

সেমিফাইনাল। প্রতিপক্ষ জার্মানী। জাতিগত ভাবেই যাদের কখনোই হারতে শেখানো হয়নি। প্রায় ১৬ বছর হাতে ধরা হয়নি শিরোপাটি। ইতালির রক্তেও তো কম ক্ষুধা মিশে নেই। সেই ১৯৮২ তে পাওলো রসি সর্বশেষ সেই অমৃত সুধার স্বাদ নিয়েছেন। তারপর আর সুযোগ হয়নি। মিডিয়া তো বলছে, স্রেফ ঊড়ে যাবে ইতালি। জার্মান এর এই এটাকিং স্পীডি ফুটবলের সামনে দাড়াতেই পারবে না এই ইঞ্জুরি জর্জরিত বুড়োদের দলটি। যুদ্ধ শুরু হল। প্রতিপক্ষের রক্ষণ দেয়ালে কাউন্টার অ্যাটাকের ঝড় তুলতে থাকল শোয়েনি-লাম-পোডালস্কি-বালাক রা। কিন্তু ক্যানাভারোর সামনে সকল আক্রমণ পরাস্ত। কখনো অবিশ্বাস্য হেডে বল ক্লিয়ার করছেন,কখনো প্রতিপক্ষকে ভয়ংকর ট্যাকল করে নাস্তানাবুদ করছেন, কখনো দৌড়ে গিয়ে মিডফিল্ড থেকেই বল কেড়ে নিচ্ছেন, ক্লোসা আর পোডালস্কি কে কড়া ভাবে মার্কিং করছেন, বিষাক্ত পাস গুলোকে জানপ্রাণ দিয়ে নিজের কাছে লুফে নিচ্ছেন। এভাবেই চলল। প্রায় ১১৯ মিনিট।সবাই মানসিক ভাবে পেনাল্টির জন্য প্রস্তুত। একটি গোলের জন্য মরিয়া জার্মানী প্রায় সবাই ইতালীর ডিবক্সের সামনে। হঠাত করেই ফাঁকাতে বল পেয়ে গেলেন ইতালি লেফটব্যাক ফাবিও গ্রোসো। লেমানের পা এর ফাক দিয়ে বল জালে। ১২০ মিনিটে আবারও একই ভুলের খেসারত দিল জার্মানি। ক্যানাভারো কতৃক নিজেদের ডিফেন্স হতে ক্লিয়ার করা বল টি কে জার্মান ডিবক্সের সামনে ফাঁকায় পেয়ে গেল আলেসসান্দ্রো দেল পিয়েরো। আবারও গোল। ২-০! ডর্টমুন্ডের ৬৫০০০ দর্শক কে কান্নায় ভাসিয়ে ফাইনালে ইতালি। বিদায় স্বাগতিক জার্মানী। ম্যান অব দ্যা ম্যাচ ক্যানাভারো।

ফাইনাল। আবার সেই ফ্রান্স। পরপর দুবার হৃদয়ে রক্তক্ষরণ ঘটিয়েছে যে ফ্রান্স। আবার সেই অঁরি, জিদান। সাথে আছে দিয়েরা, ফ্রাংক রিবেরী। তবে এবার আর এরকম দুর্ধর্ষ ফরোয়ার্ড আটকানোর জন্য তার সাথে নেই নেস্তা। ইতালির কোন ফরোয়ার্ডের ফর্মেই ধারাবাহিকতা নেই। ফাইনালের আগে সুস্পস্ট ভাবেই ফেভারিট ফ্রান্স। খেলা শুরু হল। বিতর্কিত পেনাল্টি থেকে প্রথম বারেই স্করশীটে নাম তুলল ফ্রান্স। জিদানের শট বারে আঘাত করে গোললাইন ক্রস করেছিল কিনা সেটি আজও এক অমীমাংসিত রহস্য। তবে বেশিক্ষণ ধরে রাখা গেল না লীড। কিছুক্ষণ পরেই পিরলোর বাকানো কর্নারে মাথা ছুইয়ে স্কোরশীটে নাম তুলল ইতালীর মাতেরাজ্জি।২০ মিনিটের মধ্যেই স্কোর ১-১। প্রচন্ড চাপ কাজ করছে ক্যানাভারোর মধ্যে। ডিফেন্স সামলানোর চাপ আবার সামনে থেকে নেতৃত্ব প্রদানের চাপ। মাতেরাজ্জি কে সাথে নিয়ে জিদান, অঁরি, রিবেরি কে আটকানোর কাজ ভালভাবেই করে যাচ্ছেন তিনি। আর গোলবারের নিচে ভরসার আরেক নাম বুফন তো আছেই। ৩৫ মিনিটে লুকা টনির শট বারে লেগে ফিরে আসা কিংবা ৫৩ মিনিটে নিশ্চিত পেনাল্টি থেকে বঞ্চিত হওয়ায় উভয়কেই একবার করে হতাশ হতে হয়। ৯০ মিনিটের খেলা শেষ। ১-১।

অতিরিক্ত সময়ের ২০ মিনিট শেষ। মাঠে প্রচন্ড উত্তেজনা। মাতেরাজ্জি আর জিদানের কথা কাটাকাটি তুমুল পর্যায়ে। এক পর্যায়ে হঠাত করেই মাতেরজ্জির বুকে মাথা দিয়ে গুতা দিল জিদান। মাটিতে লুটিয়ে পড়ল মাতেরজ্জি।

লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়লেন মাঠের শ্রেষ্ঠ সৈনিক জিদান।

১২০ মিনিটের খেলা শেষ। ক্যানাভারোর অসাধারণ পারফর্ম্যান্সে অচল ফরাসি ফরোয়ার্ড লাইন। ফলাফল সেই ১-১। পেনাল্টি শুট আউট। এবার কিন্তু ভাগ্যদেবতা ইতালির পক্ষে। ইতালি ৫-৩ ফ্রান্স। ১৯৯৮ আর ২০০০ এর এক অসাধারণ প্রতিশোধ। সেই ভাঙাচুরা দল টি নিয়েই অসাধারণ নেতৃত্বে ইতালীয় ফুটবলের ঝান্ডা উচিয়ে ধরেন ক্যানাভারো। রসির পর দু-যুগের বিশ্বকাপ খরা কাটিয়ে আবার লাভ করেন অমরত্বের ছোঁয়া। নিজেকে সর্বকালের সেরা ডিফেন্ডার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পথে আরও এক ধাপ এগিয়ে গেলেন ক্যানাভারো। ২০০৬ বিশ্বকাপে পুরো ৬৯০ মিনিট ধরেই তিনি মাঠে থেকে ইতালিকে নেতৃত্ব দিয়ে গেছেন। ফার্স্ট রাউন্ড থেকে ফাইনাল পর্যন্ত তিনি কোন কার্ড দেখেননি। ফিফা কতৃক নির্বাচিত World Cup Xi তেও জায়গা পান তিনি। তার বিশ্বকাপ পারফর্ম সম্পর্কে ম্যারাডোনা বলেন,

“He is the best defender in World Cup Football history”.

ফাবিও ক্যানাভারো : স্ট্রাইকারদের যুগে ব্যালন ডি'অর জয়ী এক ডিফেন্ডার
অমরত্ব

ফাইনালের অসাধারণ পারফর্ম্যান্স এর জন্য তিনি উপাধি পান ” The wall of Berlin “সে বছর জেতেন ইউরোপিয়ান ব্যালন ডি অর, ফিফা প্লেয়ার অফ দ্য ইয়ার। বেকেনবাওয়ার আর ম্যাথিয়াস স্যামারের পর তিনিই একমাত্র ডিফেন্ডার হয়ে ব্যালান ডি অর জয়ের এ বিরল কীর্তি দেখাতে পেরেছেন।

ইউরো ২০০৮ টা ট্রেনিং সেশনেই শেষ হয়ে গিয়েছিল ক্যানাভারোর। লিগামেন্টের আঘাতে ইউরো শুরু আগেই দেশে ফিরতে হয় তাকে। কনফেডারেশন কাপ ২০০৯ তে মালদিনির ইতালির হয়ে খেলা ১২৬ ম্যাচের রেকর্ড ভেঙে তিনি গড়েন ১২৭ ম্যাচ খেলার এক বিরল রেকর্ড। কিন্তু এই রেকর্ডের আনন্দ ম্লান হয়ে গেল কনফেডারেশন কাপ মিশন ব্যর্থ হওয়ার পর। প্রথম রাউন্ড থেকেই ছিটকে পড়তে হল তাদের। ব্রাজিলের কাছে ৩-০ তে বিধ্বস্ত। এরপর মিসরের কাছেও হোঁচট। সেই একই ব্যর্থতা বিশ্বকাপ ২০১০ এও। অনুজ্জল ক্যানাভারো। হারিয়ে গেছে সেই ক্ষুরধার নেতৃত্ব। ম্রিয়মান ইতালি। নিউজিল্যান্ড আর প্যারাগুয়ের সাথে ড্র। দুর্বল স্লোভাকিয়ার কাছে হার। বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দের বিশ্বকাপ প্রথম রাউন্ডেই শেষ। বুঝতে পারলেন তার সময় শেষ। বিশ্বকাপ শেষেই আন্তর্জাতিক ফুটবল কে বিদায় জানালেন ক্যানাভারো।

ক্লাব ক্যারিয়ার

কখোনো সিরি আ আবার কখোনো লা লীগা। প্রোফেশনাল ক্যারিয়ার টা শুরু হয় নাপোলি তে।কিন্তু ১৯৯৫ তে নগদ অর্থ সংকটে পানামার কাছে ক্যানাভারো কে বেচে দিতে বাধ্য হয় নাপোলি। ক্যারিয়ারের অন্যতম সোনালী দিনগুলোর সাক্ষী পারমা। কাটিয়েছেন প্রায় ৮ টি মৌসুম (১৯৯৫-০২)।১৯৯৯ সালে তিনি পারমার হয়ে যেতেন উয়েফা কাপ,ইতালিয়ান কাপ।পরবর্তী বছরেই ক্লাবের হয়ে জেতেন ইতালিয়ান সুপার কাপ।পারমার জার্সি গায়ে তিনি ম্যাচ খেলেন ২৫০ টি ম্যাচ।

 

২০০২-০৩ মৌসুমে ২৩ মিলিয়ন পাউন্ডে ইন্টারে আসেন ক্যানাভারো। ইন্টারের জার্সি গায়ে তিনি খেলেন প্রায় ৫০ টি ম্যাচ। ২০০৪ মৌসুমে জুভেন্টাসে ট্রান্সফার হয়ে আসেনন তিনি।২০০৪-০৫ ও ২০০৫-০৬ মৌসুমে জুভেন্টাসের হয়ে জেতেন সিরি আ।২০০৬ সালে তিনি ইতালিয়ান প্লেয়ার অফ দ্যা ইয়ার নির্বাচিত হন।সেখানেই গড়ে ওঠে বুফন আর ক্যানাভারোর এক ভয়ংকর জুটি।

২০০৬ তে তার পদার্পন ঘটে লা লীগায়। ৭ মিলিয়ন পাউন্ডে ট্রান্সফার হয়ে আসেন রিয়াল মাদ্রিদে। ২০০৬-০৭,০৭-০৮ সিজনে মাদ্রিদের হয়ে জেতেন লালীগা। তাকে বলা হল রিয়াল মাদ্রিদ ইতিহাসের অন্যতম সেরা ডিফেন্স সাইনিং।

 

তাকে বর্ণনা করতে যেয়ে ডিয়েরা বলেন-

 

” I can’t choose just one! Real Madrid only has great

players. Raul, David Beckham, Ruud van Nistelrooy ,

Ronaldo… The one that impressed me the most after

having actually played together is Cannavaro. He’s

sturdy and lithe and his attitude when he faces a match is

exceptional too. I think he’s the best center-back in the

world.”

 

তিনি যেদিন বিদায় নেন, বার্নাব্যুর লাখ দর্শক দাঁড়িয়ে সম্মান জানান তাকে।

 

২০০৯-১০ সিজনে আবারো জুভেন্টাসে ফিরে আসলেও তার সেই রক্ষণ শক্তি তে ভাঙ্গন ধরায় ক্লাব তার ওপর ভরসা হারিয়ে ফেলে।সেটিই ছিল সিরি আ তে তার শেষ মৌসুম। নিজেও বুঝতে পারেন তার অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ এর কথা। তাই নিজেও কখনো অনুরোধ করেননি চুক্তিতে মেয়াদ বাড়ানোর কথা। তাছাড়া ক্লাবের সাথেও সম্পর্কে ফাটল ধরে। নাপোলিও তাকে নেয়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেলে।তার ক্যারিয়ারের শেষ দিন গুলো কাটে আল-আহলি নামক সৌদি ক্লাবে।

আমার আজ বেকেনবাওয়ারকে না দেখতে পাওয়ার আক্ষেপ নেই, বারেসিকে না দেখারও আক্ষেপ নেই।আমি ফ্যাবিও ক্যানাভারো কে দেখেছি।

শুভ ৪৫ তম জন্মদিন ফুটবল ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ ডিফেন্ডার!

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

four × two =