ফাইনালে অনুপ্রবেশকারীরা নিছক ফুটবল-ভক্ত ছিলেন না!

ফাইনালে অনুপ্রবেশকারীরা নিছক ফুটবল-ভক্ত ছিলেন না!

গতকাল বিশ্বকাপ ফাইনাল চলাকালীন সময় মাঠের মধ্যে তিনজন মেয়ে আর একজন ছেলে ঢুকে গিয়েছিল। মনে আছে তো বিষয়টা? সবাই ভেবেছিল তারা বোধহয় মডরিচ, রাকিতিচ, এমবাপ্পে কিংবা পগবাদের ভক্ত – প্রিয় তারকাকে একটিবার ছোঁয়ার জন্য যারা নিরাপত্তা বেষ্টনী পেরিয়ে মাঠে ঢুকে গিয়েছিল। এক মেয়ে তো কিলিয়ান এমবাপ্পের সাথে হাই ফাইভও দিয়েছিল! ভক্তের নিছক পাগলামির আরেকটা উপাখ্যান হিসেবে সবাই ধরে নিয়েছিল ব্যাপারটিকে। আবার তাদের গায়ে যেহেতু রাশিয়ান পুলিশের পোশাক ছিল, সবাই মোটামুটি ভেবেই নিয়েছিল ওরা রাশিয়ান পুলিশেরই কয়েকজন সদস্য যারা পেশাদারিত্বের খোলসে আটকে না থাকতে পেরে নিজেদের ভেতরকার ফুটবল ভক্তটাকে বের করে নিয়ে এসেছিল। কিন্তু এটা যে নিছক প্রিয় তারকাকে কাছে পাওয়ার পাগলামি নয়, বরং এর পেছনে যে লুকিয়ে আছে মস্তবড় একটা প্রতিবাদের পরিকল্পনা, এ কথাটা আমরা কতজন জানতাম?

গতকাল বিশ্বকাপ ফাইনালে এরকমই এক অভিনব প্রতিবাদের সাক্ষী হয়েছি আমি, আপনি সহ সারা বিশ্বের বিশ্বকাপ ফাইনাল সরাসরি দেখা প্রায় সকল দর্শক-ফুটবলমোদী। তাও আবার মাঠে উপস্থিত ছিলেন স্বয়ং রাশিয়ান প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন!

খেলা চলাকালীন বায়ান্ন মিনিটে সারা বিশ্বের বিলিয়ন বিলিয়ন মানুষ দেখে রাশিয়ান পুলিশের তিনজন মেয়ে আর একজন ছেলে মাঠে প্রবেশ করে এদিক ওদিক দৌড়াদৌড়ি শুরু করেছে। কয়েক মিনিটের জন্য বন্ধ হয়ে যায় বিশ্বের সবচাইতে বড় খেলার আয়োজন।

কিন্তু কারা এই “”রাশিয়ান পুলিশ।”? যারা পুতিনের সামনেই এমন অভাবনীয় ঘটনা ঘটালো কাল? এর পেছনে লুকিয়ে আছে চমকপ্রদ এক কাহিনী।

মাঠে অনুপ্রবেশকারী এরা সবাই রাশিয়ান প্রতিবাদকারী গ্রুপ ‘পুসি রায়োট’ নামক গ্রুপের সদস্য। জ্বি, নামটা ঠিকই শুনেছেন, Pussy Riot বা পুসি রায়োট। পুলিশের পোশাক গায়ে রাশিয়ান নিরাপত্তার বেড়া ডিঙ্গিয়ে তারা প্রতিবাদ করেছে রাশিয়ান সরকার এবং ভ্লাদিমির পুতিনের অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে।

এই অভাবনীয় কাণ্ড ঘটানোর পেছনে তাদের লক্ষ্য ছিল তাদের কিছু দাবির বাস্তবায়ন। তাদের মূল দাবী ছিল পাঁচটি –

  • অন্যায়ভাবে গ্রেপ্তারকৃত সব রাজনৈতিক নেতাদের মুক্তি দিতে হবে
  • সোশ্যাল মিডিয়ায় সামান্য পুতিনবিরোধী কিছুতে ‘লাইক’ দেওয়ার অপরাধে কাউকে জেলে ঢুকানো যাবে না
  • রাজনৈতিক মিছিল থেকে অনৈতিক ভাবে কোন মানুষকে আটক করা যাবে না
  • রাশিয়ায় পুতিনের একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোকে রাজনীতি করবার সুযোগ প্রদান করতে হবে
  • মিথ্যা ও সাজানো মামলায় কোন নিরপরাধীকে জেলে ঢুকানো যাবে না

ফিফা বিশ্বকাপকে বলা হয়, ‘গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’। টিভি ও অনলাইনের এই যুগে এইবারের বিশ্বকাপ বিশ্বের লক্ষ লক্ষ মানুষ প্রত্যক্ষ করেছে। এইবারের বিশ্বকাপকে বলা হচ্ছে ইতিহাসের অন্যতম সফল বিশ্বকাপ। দর্শকের দিক থেকেও, প্রতিদ্বন্দ্বিতার দিক থেকেও, চমকের দিক থেকেও।

এই বিশ্বকাপের বিশাল মঞ্চকেই Pussy Riot বেছে নিয়েছে বিশ্বমঞ্চে নিজেদের দাবি প্রকাশ করার মঞ্চ হিসেবে। ‘পুশি রায়ট’ বিশ্বকাপের এই সার্বজনীন হবার সদ্ব্যবহার করেছে কেবল। তাদের পুলিশ আটক করে থানায় নিয়ে গেছে। গ্যালারিতে বসে আছে পুতিন, তার ঠিক সামনে, রাশিয়ান গোয়েন্দা ও কূটনীতিক সংস্থার সমস্ত শাস্তির কথা মাথায় রেখেও এই চারজন গতকাল তাদের দেশে একটি স্বাধীন রাজনৈতিক পরিবেশ সৃষ্টির জন্য মাঠে নেমে এসেছিল। পুতিনের আগ্রাসনের বিপক্ষে সবাই যেন প্রতিবাদ করতে পারে, মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে, এটাই ছিল তাদের উদ্দেশ্য।

ভয়ংকর অন্যায়ের বিরুদ্ধে কাউকে না কাউকে তো প্রতিবাদে নেমে আসতেই হয়। কালকে যেমন নেমে এসেছিল Pussy Riot!

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

18 − four =