ফাইট অভ দ্য সেঞ্চুরিঃ আলী-ফ্রেজিয়ার

721795-d65b89d2-06fd-11e4-ac31-28cbd3f83dd9

১৯৭১ সালে নিউ ইয়র্ক এর মেডিসিন স্কয়ারে ঘটে যাচ্ছি গত শতাব্দীর বড় বড় ঘটনাগুলো। তার একটার সাথে আমাদের বাঙ্গালীদের নাম জড়িয়ে আছে সেটা ভাবতে গর্ববোধ হয় এখনও। হ্যাঁ, ঐ ঘটনা ছিল কনসার্ট ফর বাংলাদেশের। কিন্তু সে প্রসঙ্গ থাক। আজকে লিখব ফাইট অভ দ্য সেঞ্চুরি নিয়ে। যে লড়াই হয়েছি অপরাজিত দুই ওয়ার্ল্ড হেভিওয়েট চ্যাম্পিয়ন এর মাঝে। উদ্দেশ্য ছিল দুই অপরাচিত চ্যাম্পিয়ন এর মাঝে কে সেরা সেটা যাচাই করা।

শুরুতে ফাইট অভ সেঞ্চুরির পিছনের ইতিহাসটা জেনে নেয়া যাক। অপরাজিত মোহাম্মদ আলী ১৯৬৪ সালে মিয়ামি সমুদ্র সৈকতে ‘সনি লিস্টন’ হারিয়ে প্রথমবার ওয়ার্ল্ড হেভিওয়েট চ্যাম্পিয়নশীপ জিতে নেয়। এবং ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত ৩১ টা লড়াইয়ের সবগুলোই জিতে নিয়ে তার টাইটেল ধরে রাখেন। কিন্তু ৬৭ সালে আর্মিতে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানানোর জন্য আলীর চ্যাম্পিয়নশীপ টাইটেল কেঁড়ে নেয়া হয় এবং তাকে ৩ বছরের জন্য রিং এ নিষিদ্ধ করা হয়।

এদিকে আলীর অনুপুস্থিতিতে জো ফ্রেজিয়ার ‘বুস্টার ম্যাথিস’ এবং ‘জিমি ইলিস’ কে নক আউট করার মাধ্যমে চ্যাম্পিয়নশীপ বেল্ট অর্জন করে নেয়। বক্সিং অথরিটি স্মোকিং জোকে ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়ন হিসেবে ঘোষণা দেয়। কিন্তু এটা আলী দ্য গ্রেটেস্ট মেনে নিবেন কেন? তিনি যে রিং এর রাজা! ২৫ টা নক আউট করা অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন। তিনি নিজেকে ‘পিপলস চ্যাম্পিয়ন’ বা ‘জনগনের চ্যাম্পিয়ন’ দাবী করতে থাকেন। ১৯৭১ সালে আলীর সাসপেনশনের শেষে আলী জো ফ্রেজিয়ারকে চ্যালেঞ্জ করে বসলেন। কিন্তু সমস্যা হয়ে গেল সময়! তিন বছর রিং এর বাইরে থাকা একজন বক্সারের জন্য অনেক বড় ধরনের ক্ষতিকারক বিষয়। কয়েকমাস মিয়ামি বিচের এক জিনমেশিয়ামে টানা প্রাকটিস করলেন আলী। দুটা টিউন আপ ম্যাচও খেললেন। কিন্তু ফ্রেজিয়ারের মত ইনফর্ম ফাইটারকে হারানোর জন্য তা ছিল অপ্রতুল। কিন্তু চ্যাম্পিয়নশীপ টাইটেল এর মূল্য ছিল আলীর কাছে এসবের চাইতে অনেক বেশি। তাই আলী তার চ্যালেঞ্জে ছিলেন অনড়।

৮ মার্চ, ১৯৭১ সালের আলী-ফ্রেজিয়ারের লড়াইটাকে বলা হয় গত শতাব্দীর আমেরিকার সবচেয়ে বড় ইভেন্ট। সেদিন মেডিসিন স্কয়ারে ২০,৪৫৫ জন মানুষ একত্রিত হয়েছিল শতাব্দীর সেরা লড়াই দেখার জন্য। রিং এর পাশের একটা সিটের জন্য গুনতে হয়েছিল ১৫০ ডলার করে! আর সারা পৃথিবী জুড়ে এই লড়াই দেখেছিল আরো ৩০০ মিলিয়ন মানুষ! এই লড়াইয়ের পুরুষ্কারও ছিল তখনকার সময়ে চোখ কপালে তোলার মত। পুরুষ্কার হিসেবে ঘোষণা করা হয়, লড়াইয়ের ফলাফল যাই হোক না কেন আলী-ফ্রেজিয়ার দুজনকেই ২.৫ মিলিয়ন ডলার করে দেয়া হবে!

৮ মার্চ রাতে টানটান উত্তেজনার মাঝে মেডিসিন স্কয়ারে শুরু হয় ফাইট অভ দ্য সেঞ্চুরি। প্রথম তিন রাউন্ডে আলী ডমিনেট করে ফ্রেজিয়ারকে। স্মোকিং জো আলীর পাঞ্চগুলোর কোন জবাবই খুঁজে পাচ্ছিলেন না। তবে প্রথম রাউন্ডের বেল পড়ার শুরু থেকে আলীর ফুটস্টেপের অসাড়তা দেখা যায়। যেটা হয়েছিল আলীর ৩ বছরেরে ইনিএক্টিভিটি থেকে। প্রথম ৩ রাউন্ড ডমিনেট করলেও তৃতীয় রাউন্ডের শেষের দিকে ফ্রেজিয়ার আলীর মুখে ভয়ানক এক হুক করে বসেন। আলী পিছিয়ে যেতে বাধ্য হন।

পরের রাউন্ড থেকে আস্তে আস্তে ডমিনেট করা শুরু করেন ফ্রেজিয়ার। আলীকে রিং একপাশে ঠেলে নিয়ে তার বিখ্যাত লেফট হুক গুলো দিয়ে বেশ কয়েকবার নাজেহাল করে ছেড়েছেন। ষষ্ঠ রাউন্ডের শুরুতে আলী ফ্রেজিয়ারকে একটা নক আউট করে কিন্তু ফ্রেজিয়ার সামলে নিয়ে এই রাউন্ডও ডমিনেট করে। ষষ্ঠ রাউন্ডের শেষে আলীর বডি ল্যাংগুয়েজে স্পষ্ট ক্লান্তির ছায়া দেখা দেয়। সপ্তম রাউন্ডেও তিনটা হালকা পাঞ্চ ছাড়া আর কিছুই করতে পারেন নি আলী দ্য গ্রেটেস্ট। এই রাউন্ডও ছেড়ে দেন আগের রাউন্ডের মত। অষ্টম রাউন্ডে আলী কিছুটা ফাইট ব্যাক করার চেষ্টা করেন। কিন্তু এবারও ডমিনেট করেন স্মোকিং জো।

পরিস্থিতি কিছুটা পরিবর্তন হয় নবম রাউন্ডে যখন আলী ফ্রেজিয়ারকে লেফট-রাইট কম্বিনেশনে অনেকগুলো পাঞ্চ দিয়ে ব্লক করে দেন। পুরা রাউন্ডটাই আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণে শেষ হয়। এই রাউন্ডে আলী জানান দেন, লড়াই এখনও শেষ হয় নি। এই পরিস্থিতি চলতে থাকে রাউন্ড ১০ পর্যন্ত। কিন্তু রাউন্ড-১১ এর ৯ সেকেন্ডের মাথায় ফ্রেজিয়ার আলীর মুখে তার বিখ্যাত সেই লেফট হুক বসিয়ে দেন। আলী আঘাত সামলাতে না পেরে পড়ে যান। এবং কয়েক সেকেন্ড ক্যানভাসে বসে ছিলেন। এরপর আবার উঠে দাঁড়ান। কিন্তু রাউন্ড ১১ এর ৪৯ সেকেন্ড বাকি থাকতে আলী কর্নারে আটকা পড়েন। এবং সে সুযোগ পেয়ে পর পর দুটা হুক করে বসলেন স্মোকিং জো। অনেকে ভেবেছিলেন এটাই হচ্ছে শেষ রাউন্ড। কিন্তু আলী বিস্ময়কর ভাবে ওই রকম দুটা ভয়ংকর হুক সামলে নিয়ে এই রাউন্ডও শেষ করলেন।

১২,১৩,১৪ রাউন্ডের খেলা চলতে থাকে মন্থর অবস্থায়। অনেক অবিশ্বাস্য কিছু ছাড়াই শেষ হয়েছে এই তিন রাউন্ড। রাউন্ড ১৫ এর শুরুতেই ফ্রেজিয়ার আলীর মুখে বসিয়ে দেন তার ভয়ংকর সেই লেফট কাট। শুরুতেই এমন আঘাত আলীকে এই রাউন্ডেও পিছিয়ে দেয়। আলী তখন এই রাউন্ড সারভাইভ করার চেষ্টা করতেছিল। ২:৩৪ সেকেন্ডের সময় ম্যাচে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে আলী। ফ্রেজিয়ারকে পাঞ্চিং রেঞ্জে পেয়ে আপারকাট করতে যান আলী। কিন্তু ক্লান্তি তার গতি কমিয়ে দিয়েছে প্রায় সবটুকুই। এই সুযোগ নিয়ে জো ফ্রেজিয়ার আরেকটা লেফট হুক বসিয়ে দিলেন আলীর মুখে। আলী কোন রকমে নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে ম্যাচ শেষ করেছিলেন বটে। কিন্তু ম্যাচ ততক্ষণে শেষ। রেফারি আর বিচারকদের স্কোরের ভিত্তিতে জয়ী হয় জো স্মোকিং ফ্রেজিয়ার। সেই সাথে পতন হয় অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন মোহাম্মদ আলী দ্য গ্রেটেস্ট এর। প্রথম পরাজয়ের স্বাধ পান তিনি। আর স্মোকিং জো-কে ঘোষণা করা হয় “আনডিস্পুটেড ওয়ার্ল্ড হেভিওয়েট চ্যাম্পিয়ন”!

আলী-ফ্রেজিয়ার এরপর আরো দুবার নিজেদের মুখোমুখি হয়েছিলেন। এবং আলী তার পরাজয়ের প্রতিশোধও নিয়েছিলেন। কিন্তু প্রথম হার তিনি কখনও মেনে নে নি। সব সময় এটাকে বলেছেন “সাদাদের সিদ্ধান্ত”!

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

twenty − 13 =