প্রিয় বিল লরি’র জন্য অপেক্ষা!

প্রিয় বিল লরি'র জন্য অপেক্ষা!

প্রতিটি অস্ট্রেলিয়ান সামার শেষে একটি ভয় পেয়ে বসত, “তার কণ্ঠ আবার শুনবে পাব তো!”

এভাবে ভাবা কিংবা বলা, ঠিক নয় জানি। কিন্তু সত্যিটা হলো, নিষ্ঠুর ভাবনাটা আসতই। তার যে বয়স, আরেকটি গ্রীষ্মে যদি তাকে না পাওয়া যায়!

ভয়টা এখনও সত্যি হয়নি, স্বস্তির ব্যাপার। কিন্তু ভয়ের কারণ যেটি ছিল, সেটি ঠিকই সত্যি হয়ে মনটা ভরিয়ে দিয়েছে বিষাদে। ধারাভাষ্য কক্ষ থেকে ওই কণ্ঠ আর শোনা যাবে না। আর শোনা হবে না, “ওহহহহ… ইটস অল হ্যাপেনিং”…. কিংবা, “দ্যাটস আ রিপার…!”

তিনি, রিচি বেনো, টনি গ্রেগ, ইয়ান চ্যাপেলরা চ্যানেল নাইনের প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন। ধারাভাষ্য কক্ষের স্বর্গ ছেড়ে বেনো-গ্রেগ আগেই পাড়ি জমিয়েছিলেন অনন্ত অম্বরে। এই তিনি আছেন মর্ত্যেই। তবে ছাড়লেন চার দশকের চারণ ভুমি, প্রিয় ধারাভাষ্য কক্ষ।

অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটের সম্প্রচার স্বত্বের বড় পালাবদল হয়ে গেছে। ৪০ বছরে ক্রিকেট সম্প্রচারকে প্রতিনিয়ত নতুন উচ্চতায় তুলে নেওয়া চ্যানেল নাইন এবার অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটের স্বত্ব পায়নি। রেকর্ড ১.১৮২ বিলিয়ন অস্ট্রেলিয়ান ডলারে আগামী ছয় বছরের স্বত্ব কিনেছে সেভেন নেটওয়ার্কস ও ফক্স স্পোর্টস।

নতুন সম্প্রচার প্রতিষ্ঠাও তাকে প্রস্তাব দিয়েছিল চুক্তির। তিনি তো কিংবদন্তি, অমূল্য ব্র্যান্ড, ধারাভাষ্য কক্ষের সৌন্দর্য আর আভিজাত্য। কিন্তু তিনি তো চ্যানেল নাইনের প্রতীকও! নাইনের প্রতি ভালোবাসা থেকে নতুন চুক্তি করেননি। আরও একবার শ্রদ্ধা পেয়েছেন। কিন্তু হৃদয়ে হাহাকাকারও যে জাগালেন!

রিচি বেনো আমার কাছে ধারাভাষ্যের শেষ কথা। তবে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসার জায়গা জুড়ে মনে হয় এই তিনিই। একটা জায়গায় দুজনের মিলও আছে। ক্রিকেট ক্যারিয়ারেও ছিলেন দারুণ সফল। কিন্তু মাইক্রোফোন হাতে এতটা উজ্জ্বল ছিলেন যে সফল ক্রিকেটার পরিচয়টাও কখনও কখনও ম্লান হয়ে গিয়েছিল!

৬২ টেস্টে ১৩ সেঞ্চুরি। ৪৭.১৫ গড়ে ৫ হাজার ২৩৪ রান। ২৫ টেস্টে নেতৃত্ব। ৭টি অ্যঅশেজ সেঞ্চুরি। হল-গ্রিফিথ-সোবার্স-গিবসদের ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ৬৯ ব্যাটিং গড়। হার না মানা মানসিকতা। চোয়ালবদ্ধ প্রতিজ্ঞায় উইকেট আঁকড়ে রাখা সামর্থ্য। ইংলিশ সাংবাদিক ইয়ান উলড্রিজ তার ব্যাটিং দেখে লিখেছিলেন, “প্যাড পরা লাশ।” ব্যাট হাতে এমন “নির্জিব” একজনই দারুণ প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছিলেন মাইক্রোফোন হাতে। ২২ গজের সাফল্য আর পরিচয়টা যেমন অনেকটা আড়াল করে দিয়েছিল ধারাভাষ্যকক্ষের সাফল্য।

কণ্ঠটাই তার বড় এক সম্পদ। ‘হাস্কি’ বলব, না কি? জানি না। বর্ণনার ভাষা পাই না। তবে অদ্ভূত সম্মোহনী শক্তি সেই কণ্ঠের। রসবোধ দারুণ। প্রকাশ সহজ-সাবলীল। খুব কঠিন ক্রিকেটীয় বিশ্লেষণ করতেন কম সময়ই। বলতেন, “টিভির সামনে বসে থাকা ৭০ ভাগ দর্শকই ক্রিকেট গভীর ভাবে বোঝে না। তাদের জন্য ক্রিকেট সহজ করে তুলতে চাই।” তা তিনি পারতেন বটে! ভাষা আর কণ্ঠের জাদুতে সাধারণ শব্দগুলোকেও করে তুলতেন অসাধারণ। তিনি বলতেন, “অল ইনস্টিংক্ট”, সবই তাৎক্ষনিক!

“ইটস অল হ্যাপেনিং”-তিনটি শব্দ প্রবল জনপ্রিয় একটি ক্রিকেটীয় টার্ম হয়ে গেল তার কণ্ঠের জাদুতেই। কত শত বার শুনেছি এক জীবনে! তার কণ্ঠে তবু প্রতিবারই এটি পেত নতুন প্রাণ। “হি’জ গট হিম”, সাধারণ-ক্লিশে এই লাইনও তার কণ্ঠে হয়ে উঠত মুগ্ধতা জাগানিয়া সুরের ঝংকার। শব্দগুলোর দ্যোতনা অদ্ভূত রোমাঞ্চ জাগাত শরীরে, মনে…

আর অমন রোমাঞ্চ জাগবে না…!

নিজের ও স্ত্রীর শারীরিক অবস্থা মিলিয়ে গত কয়েক বছর ধরে এমনিতেই বক্সিং ডে টেস্ট ও নিউ ইয়ার টেস্টের বাইরে ধারাভাষ্য বলতে গেলে দিতেনই না। চ্যানেল নাইন তাকে সেই স্বাধীনতা দিয়েছিল। চার দশকের সঙ্গীর প্রতি ভালোবাসা অটুট বলেই সম্পর্ক ছিন্ন করছেন না। চ্যানেল নাইনের হয়েই টুকটাক কাজ করবেন টেনিস ম্যাচে। কিন্তু ক্রিকেটের অস্ট্রেলিয়ার সামারগুলো হারাবে রঙ, হারাবে আবেদন। অন্তত, আমার কাছে। নতুন চ্যানেলে হয়ত নতুন উচ্চতায় উঠবে টিভি সম্প্রচার, ধারাভাষ্যে। তবু নিশ্চিত জানি, একটি শূন্যতা ঠিকই অনুভব করব…

তবু আশায় বাঁধি বুক। প্রিয় কবুতরগুলোর সঙ্গে তার ক্রিকেট বিহীন সময়ও কাটবে আনন্দময়। ছয় বছর পর আবার সম্প্রচার স্বত্ব লড়াইয়ে জিতবে চ্যানেল নাইন। ৮৭ বছর বয়সে টাইয়ের নট ঠিক করতে করতে মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে ২২ গজে পাগলাটে কিছু দেখে আবার বলবেন, “ইটস অল হ্যাপেনিং হিয়ার অ্যাট দা এমসিজি…”

অপেক্ষায় থাকলাম, প্রিয় বিল লরি…!

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

eighteen + four =