প্রসঙ্গঃ লাতিন আমেরিকান vs ইউরোপিয়ান ফুটবল – সৌন্দর্য্য, সম্ভাবনা এবং বাস্তবতা

রাফিউল সাব্বির –

 

ফুটবলে সৌন্দর্য্য মানেই লাতিন আমেরিকা। ড্রিবলিং, চোখ ধাধানো নৈপূণ্য এই সবগুলার জন্য শুধু লাতিন ফুটবল দেখাই যথেষ্ট ছিলো একসময়। ফুটবলের সর্বকালের সেরা কে, এই বিতর্কের দুই পার্টিসিপেন্টও লাতিন, ইউরোপিয়ান কেউ এইসব তর্কে অনেক সময় প্রথম পাচেও থাকে না। গত শতাব্দীর পেলে ম্যারাডোনা থেকে হালের মেসি নেইমার সুয়ারেজ এ্যাগুয়েরো; সবাইই লাতিন। লাতিনে ফুটবল প্রতিভার অভাব নাই, লাতিন ফুটবলটাই এমন, সৌন্দর্য্য এর ভাজে ভাজে। আবার আপনার এতো নৈপূণ্যের দরকার নাই? এ্যাটাক হবে, দরকার হলে প্রচন্ড পেসযুক্ত এ্যাটাক এবং সবশেষে গোল? গোলই শেষ কথা? আছে ইউরোপিয়ান ফুটবল। প্রতিটা দল ছকবেধে খেলতে পারে মেশিনের মতো; প্রতিটা এ্যাটাক হয় হিসাব করে, একক নৈপূণ্যের উপরে ভরসা করে না বরং টিম ক্যামিস্ট্রির উপর ভিত্তি করে। সেই লাতিন সৌন্দর্য্য হয়তো নাই এইখানে কিন্তু এই ফুটবলও অন্যরকম সুন্দর, গতিময়।

এখন আসি বাস্তবতায়। গত ২০ বছরে(১৯৯৫ থেকে) অনুষ্ঠিত ৫টা বিশ্বকাপে জয়ী লাতিন দল মাত্র একটা, ২০০২ এ ব্রাজিল; বাকি ৪ বিশ্বকাপের চ্যাম্পিয়ন ইউরোপের এবং মজার ব্যাপার হলো চারবার জিতছে চারটা দেশ- ফ্রান্স, ইতালি, স্পেন এবং জার্মানি। ২০০২’র ব্রাজিলের পরে ১২ বছর পর লাতিন দল হিসাবে ২০১৪ তে ফাইনাল খেলেছে আর্জেন্টিনা। মাঝের দুই বিশ্বকাপেই ছিলো অল-ইউরোপ ফাইনাল(স্পেন-নেদারল্যান্ড, ইতালি-ফ্রান্স)!! প্রশ্ন হলো লাতিন ফুটবলের এই হাল কেন?

২০০২ এর বিশ্বজয়ী ব্রাজিল দল
২০০২ এর বিশ্বজয়ী ব্রাজিল দল

প্রথমত লাতিন ফুটবলের কালচারটা ইউরোপের মতো না। এইখানে একটা প্লেয়ার বড় হয় বস্তিতে অথবা পাড়ায় খেলতে খেলতে, অসাধারণ নৈপূণ্য দিয়ে সে জায়গা করে নেয় ক্লাবে/জাতীয় দলে। অনেক ক্ষেত্রেই এই প্লেয়ারটা হয়তো শুরুর দিকে প্রথম ৫/৭ বছর একবারেই নিজে নিজে ফুটবল খেলে। কোনো কোচ নাই, গাইডেন্স নাই; শুধুমাত্র রক্তে ফুটবল আছে বলে খেলে এবং একসময় বিশ্বমঞ্চ আলোকিত করে। ইউরোপের সিস্টেম কিন্তু এমন না। ইউরোপ ধনী, এইখানকার ফূটবল অবকাঠামোও ধনী। ইউরোপে আছে পৃথিবীর সব বড় বড় ক্লাব, এদের স্কাউটরা সারাবছরই ঘুরে বেড়ায় ইউরোপসহ পুরা দুনিয়ায়, বেছে বেছে সিলেক্ট করে প্লেয়ারদের তারপরে নিয়ে আসে ক্লাবগুলাতে। যে প্লেয়ারটা ব্রাজিল/আর্জেন্টিনা/উরুগুয়ের একটা বস্তিতে খেলতে খেলতে বড় হয়ে একটা দেশী ক্লাবে গিয়ে সবার নজর কাড়ে ১৭/১৮ বছর বয়সে তার থেকে অনেক বেশি সুযোগ-সুবিধা পায় যে ছেলেটা ৫/৭ বছর বয়সে ইউরোপের কোনো ক্লাবের ইয়ুথ টিম/কোচিং সেন্টারে যেতে পারে। সে বড় হয় অনেক বেশি সূযোগ-সুবিধা এবং প্রোপার গাইডেন্স নিয়ে।

লাতিন আমেরিকার ফুটবল অবকাঠামো দূর্বল। কয়েকটা বড় ক্লাব প্রতি দেশে, এরাই দেশের সেরা প্লেয়ারগুলাকে বিশ্বমঞ্চে আনে। সেই অর্থে ইয়ুথ এ্যাকাডেমি নাই বললেই চলে, সেই কালচারটাও নাই লাতিনে। যে ব্যক্তিগত নৈপূণ্য দিয়ে নজর কাড়তে পারে, সে উঠে আসে; না হলে বাকি জীবন পার করে চায়ের দোকানে অথবা গ্যারেজে কাজ করে। ধনীরা লাতিন ফুটবলে টাকা ঢালে না তাই সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন কোচিং এ্যাকাডেমিও বলতে গেলে নাই যেটা ইউরোপে আছে। ইউরোপের সব বড় ক্লাবেরই ইয়ুথ এ্যাকাডেমি আছে, অনেকগুলা বিখ্যাত প্রাইভেট এ্যাকাডেমিও আছে যারা ক্লাবে ফুটবলার সরবরাহ করে(যেমন ইয়োহান ক্রুইফ এ্যাকাডেমি)! ক্লাবগুলাও চেষ্টা করে ইয়াং ট্যালেন্টগুলাকে বেছে আনার যেটা লাতিন আমেরিকাতে হয় না।

বার্সার সুবিখ্যাত লা মাসিয়া অ্যাকাডেমি
বার্সার সুবিখ্যাত লা মাসিয়া অ্যাকাডেমি

কথা হলো এতে সুবিধা কি হয়? এতে সবচেয়ে বড় সুবিধা যেটা হয় সেটা হলো দেশের অসাধারণ প্রতিভাবান ছেলেপেলেগুলা ছোট থেকে একসাথে থাকার, খেলার, বড় হওয়ার সুযোগ পায়; তাদের কেমিস্ট্রিটা গ্রো করে। উদাহরণ হিসাবে বলা যেতে পারে স্পেনের কথা। বার্সেলোনার লা মেসিয়া থেকেই স্পেনের ২০১০ বিশ্বকাপজয়ী দলে ছিলো ৮ জন প্লেয়ার। ১১ জনের মধ্যে ৮ জন খেলোয়াড় সেই ৫/৬ বছর বয়স থেকে একসাথে থাকছে, খেলছে, বড় হইছে; এদের ক্যামিস্ট্রিও স্বাভাবিকভাবেই সেইরকম। জার্মানিতেও সেইম অবস্থা। প্রতিটা ক্লাবেরই ফুটবল এ্যাকাডেমি আছে যারা ইয়ুথ ডেভেলপমেন্ট করে; প্রতি বছরই ভালো ভালো প্লেয়ার বের হয়(জার্মানির ইয়ুথ টিম ব্যাকআপটা দেখেন, অনেক বড় জাতীয় দলের চেয়েও ভালো ইয়ুথ টিম আছে জার্মানির এবং খেয়াল করে দেখেন এইসব ২০/২১/২২ বছর বয়সী প্লেয়ারদের সবাইকেই আপনি কমবেশি চেনেন যদি আপনি নিয়মিত ফুটবল দেখেন, ওদের ন্যাশনাল টিমের কথা বাদই দিলাম)! বার্লিনে ফুটবলের চর্চা কম ছিলো তাও ফুটবল এ্যাকডেমি দেখছি ৪টা যেখানে বার্লিনে সেই অর্থে হার্থা বার্লিন বাদে তেমন কোনো ক্লাবই নাই তাহলে মিউনিখ, ডর্টমুন্ড, ভর্লবুর্গ অথবা গ্লাসেনকির্চেন(শালকে ০৪ এই এলাকার ক্লাব)’র কথা চিন্তা করেন; একটা রাফ আইডিয়া পাবেন।

ফুটবলে যখন থেকে এ্যারাব আর রাশিয়ান মানি আসা শুরু হইছে, সবার প্রথমে ইউরোপের ক্লাবগুলা যেটা করছে তা হলো ইয়ূথ ডেভেলপমেন্টের জন্য ক্লাবে ক্লাবে ইয়ূথ এ্যাকাডেমি করা। জার্মানি লাস্ট বিশ্বকাপ জিতছিলো ১৯৯০ সালে পশ্চিম জার্মানি হিসাবে; তারপরে ৯১ সালে বার্লিন ওয়াল ভাঙ্গলো; দুই জার্মানি একত্রিত হলো এবং ওদের ফুটবলে সবচেয়ে বড় যে ব্যাপারটা হলো সেটা হলো বুন্দেসলিগার সব ক্লাব ইয়ুথ এ্যাকাডেমি করে ফেললো। ২৪ বছর পরে ২০১৪ সালে জার্মানি জিতলো পরের বিশ্বকাপটা; মাঝের এই ২৪ বছর আপাতদৃষ্টিতে তাদের কোনো অর্জন না দেখা গেলেও ২০১৪’র অর্জনটা হলো একটা ধারাবাহিক পরিশ্রমের ফলে, আগামী বিশ্বকাপও যে জার্মানি জিতবে না, আপনি কি গ্যারান্টি দিতে পারেন? জার্মানির ইয়ুথ ব্যাকআপ দেখলেই বুঝতে পারবেন এই ২৪ বছর শিরোপা না পাওয়ার ফলটা ওরা অন্যদিক থেকে কিভাবে আদায় করে নিছে। একই কথা ফ্রান্স, স্পেন, নেদারল্যান্ডসহ ইউরোপের অন্যদেশের জন্যও সত্য।

লাতিনদের ফুটবলটা রক্তে আছে, তারা ন্যাচারালি ইউরোপিয়ানদের চেয়ে ফুটবলে অনেক বেশি প্রতিভাবান। কিন্তু কম্পিটিশন আর টাকার এই যুগে লাতিনের সুন্দর ফুটবল অনেকটাই মলিন ইউরোপের ছকে বাধা দলগত ফুটবলের কাছে। লাতিন দলগুলার আরেকটা বড় সমস্যা হলো ব্যাক্তিপূজা, আমাদের সাবকন্টিনেন্টের মতো লাতিনেও ব্যাক্তিপূজার চর্চা অনেক বেশি। আজকে একটা ছেলে একটু ভালো খেললেই তাকে ‘নতুন পেলে’, ‘নতুন ম্যারাডোনা’, ‘নতুন মেসি’ বানায়ে দেয়া হয়। এই ‘নতুন’ অমক/তমক হতে গিয়েই ছেলেটা তার নিজস্বতা হারায়ে ফেলে এবং একটা সময় হারায়ে যায়(ব্রাজিলের পাতো বা আর্জেন্টিনার স্যাভিওলারা এখন কই কেউ জানেন? জানেন না কারণ তারা হারায়ে গেছে নতুন পেলে/ম্যারাডোনা হতে গিয়ে)! এমনকি ইউরোপেও কেউ ভালো খেললে তাকে নতুন অমক/তমক নামকরণ করা হয় লাতিন কোনো প্লেয়ারদের নামেই(যেমন সুইজারল্যান্ডের জারদান শাকিরিকে বলা হয় ‘আলপসের মেসি’)

যতোদিন না লাতিন দেশগুলা অবকাঠামোগতভাবে শক্তিশালী হবে ফুটবলে, নতুন প্লেয়ারদের পরিচর্চা করার জন্য এ্যাকাডেমি/ইয়ুথ ডেভেলপমেন্ট সিস্টেম চালু করবে ততোদিন লাতিন আমেরিকা থেকে শুধু মেসি/নেইমার/সুয়ারেজ/সানচেজ/কাভানি/ফ্যালকাও/রদ্রিগেজ/ভিদাল/এ্যাগুয়েরোরাই বের হবে; ব্রাজিল/আর্জেন্টিনা/উরুগুয়ে/চিলি/কলাম্বিয়া বের হবে না। লাতিনরা এক একটা প্লেয়ার বের করতেছে, দল না। এইখানেই সমস্যাটা। আর এই সমস্যা একদিনে ঠিক হবে না, জার্মানির মতো ২৪ বছরও লাগতে পারে; আবার ১০ বছরেও হতে পারে কিন্তু সময় লাগবেই। কোনো কাজে সময় দিলেই সেটা থেকে ভালো ফল পাওয়া যাবে।

ফুটবল কিন্তু এখন আর একক নৈপূণ্যের খেলা না বরং অনেক অনেক বেশি দলগত খেলা। অসাধারণ প্রতিভা না থাকলেও দলগত একতা এবং বৈচিত্র্য দিয়ে যে বিশ্বজয় করা যায় তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ কিন্তু ইউরোপিয়ান দলগুলাই

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

twenty − 1 =