“পোয়েটিক” পায়েত

মাথা গরম, মেজাজ খিটমিটে থাকার কারণে সতীর্থদের সাথে ঝামেলা লেগে থাকত হামেশাই। সেইন্ট এতিয়েঁ তে থাকার সময় তৎকালীন সতীর্থ ফরাসী মিডফিল্ডার ব্লেইজ মাতুইদির সাথে মাঠেই জড়িয়ে পড়েছিলেন মারামারিতে, অলিম্পিক মার্শেইতে থাকার সময় একটা ফ্রি-কিক কে নেবেন তাঁর জন্য তর্কাতর্কি করেছিলেন আরেক ফরাসী মিডফিল্ডার ম্যাথিউ ভালবুয়েনার সাথে, মাঠেই। রগচটা, উদাসীন, দায়িত্ব নিতে অনীহা – চূড়ান্ত প্রতিভাবান হলে কি হবে, এসব নেতিবাচক কারণে এত বছর বোধকরি কিছু করতে পারেননি তিনি।

জাতীয় দলে আগে যে কয়জন কোচ ছিলেন মোটামুটি এই বছর গত ৬-৭ এ, সবাই মোটামুটি এই শৃঙ্খলাজনিত কারণেই দলে তাঁকে নিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন না। এই তালিকায় ছিলেন বর্তমান কোচ দিদিয়ের দেশমও। কিন্তু মেজাজ খারাপ হলে কি হবে? সেইন্ট এতিয়েঁ, লিল, অলিম্পিক মার্শেই ও সর্বশেষ গত মৌসুমে ওয়েস্টহ্যামের হয়ে তাঁর দুর্দান্ত পারফরম্যান্স দিদিয়ের দেশমকে বাধ্য করলো ফ্রান্স দলে তাঁকে নেওয়ার জন্য। ২৯ বছর বয়সী এই “লেইট ব্লুমার” ফরাসী মিডফিল্ডারই এখন পগবা, গ্রিজম্যানের জায়গায় ফ্রান্সের মূল কাণ্ডারি। ইউরোর প্রথম দুই ম্যাচে চোখ ধাঁধানো পারফরম্যান্সের পর নিয়মিত যার সাথে তুলনা হচ্ছে জিদান-প্লাতিনির।

dimitripayet0104

বলা হচ্ছে দিমিত্রি পায়েতের কথা।

রোমানিয়ার বিপক্ষে প্রথম ম্যাচটার কথাই ধরা যাক। স্বাগতিক হবার সুবাদে এবার এমনিতেই এবার ইউরো জয়ের পাল্লা ফ্রান্সের দিকেই একটু বেশী হেলে আছে। কিন্তু রোমানিয়া সেসব কাগুজে কথায় মানবে কেন? অলিভিয়ের জিরুর গোলের পর তাই পেনাল্টিতে রোমানিয়ান স্ট্রাইকার বোগদান স্ট্যানচু গোল দিয়ে প্রায় স্বাগতিকদের স্বপ্নের মত শুরুতে পানি ঢেলেই দিচ্ছিলেন। তাঁর সাথে ইউরো বাছাইপর্বে সবচাইতে কম গোল খাওয়া রোমানিয়ার বজ্র-আঁটুনি ডিফেন্স ত ছিলই।

দৃশ্যপটে আগমন পায়েতের। ডি-বক্সের একটু বাইরে ম্যাচ শেষ হবার ঠিক আগমুহূর্তে পেয়ে গেলেন বলটা। রোমানিয়ান হলুদ দেওয়ালে একটু ফাঁক চোখে পড়ল বোধকরি, বাম পায়ের দূরপাল্লার বাকানো দুর্দান্ত এক শটে কোণ অঘটন ঘটতে দিলেন না, ম্যাচ জিতিয়েই টানেলে ফিরলেন পায়েত। ভালো কথা, জিরুর গোলে অ্যাসিস্টটাও কিন্তু পায়েতেরই ছিল!

দ্বিতীয় ম্যাচ, প্রতিপক্ষ আলবেনিয়া। প্রথম ম্যাচে চিরশত্রু সুইজারল্যান্ডের কাছে হেরে আলবেনিয়ানরা তখন কোণঠাসা বাঘ। আতোয়াঁ গ্রিজম্যানের এক গোলে পিছিয়ে থাকা আলবেনিয়ানরা ম্যাচের শেষে যেকোন মুহূর্তে শোধ করে দিতে পারে গোল।

আবারো দৃশ্যপটে পায়েতের আগমন। ৯৬ মিনিটে দলের দ্বিতীয় গোলটি করে একরকম আলবেনিয়ার সকল আশা-ভরসাতে পানি ঢেলে দিলেন তিনি। হলেন টানা দ্বিতীয় ম্যাচে ম্যান অফ দ্য ম্যাচ। এর মধ্যেই দুই ম্যাচে দুই গোল, এক অ্যাসিস্ট, চৌদ্দটা গোল করার সুযোগ আর গোটা তিরিশেক সফল ক্রস করে এই ইউরোর আপাতত প্রথম নায়ক চোখ বন্ধ করেই বলা যেতে পারে ওয়েস্টহ্যামের এই উইঙ্গারকে। ১৯৮৪ ইউরোর মিশেল প্লাতিনি কিংবা ১৯৯৮ বিশ্বকাপের পূর্বসূরি জিনেদিন জিদানের মত যিনি আন্তর্জাতিক এই ফুটবলীয় মিলনমেলাকেই পাখির চোখ করেছেন নিজের আগমনীবার্তা বিশ্বের কাছে ভালোভাবে পৌঁছে দেওয়ার জন্য।

hi-res-d946204037e88f11cdb27687e20b25c7_crop_north

ইতোমধ্যে রিয়াল মাদ্রিদ, চেলসি ও ম্যানচেস্টার সিটির মত হেভিওয়েট দলগুলা পায়েতকে দলে নেওয়ার পাঁয়তারা শুরু করে দিয়েছে বলে শোনা যাচ্ছে। ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ যারা অনুসরণ করেন, তারা বলতে পারবেন, পায়েতের এই উত্থান কিন্তু একদিনের গল্প না। বহু আগে থেকেই ফরাসী লিগের নিয়মিত পারফর্মার এই পায়েতকে প্যারিস সেইন্ট জার্মেই, চেলসি বা লিভারপুলের মত ক্লাব চোখে চোখে রেখেছিল সেই ২০১১ সাল থেকেই। কিন্তু আসল সময়ে দাঁওটা মেরের বসে স্ল্যাভেন বিলিচের ওয়েস্টহ্যামই। তাঁদের ১০.৭ মিলিয়নের অফারটা অলিম্পিক মার্শেইয়ের মত অর্থাভাবে থাকা ক্লাবের জন্য ফিরিয়ে দেওয়া কঠিনই ছিল। যেটার ফসল এখন পাচ্ছে হ্যামার্সরা, পরবর্তী মৌসুম থেকে নতুন অলিম্পিক স্টেডিয়ামে খেলানোর জন্য আগে থেকেই একটা সুপারস্টার পেয়ে গেছে তারা, যদি এই ইউরোর পর পায়েতকে ধরে সিটি, মাদ্রিদ বা চেলসির মত রাঘব-বোয়াল কোন ক্লাব টান না দেয় আরকি!

 

ডেড-বল স্পেশালিস্ট
ডেড-বল স্পেশালিস্ট

মার্শেইয়ের সাবেক আর্জেন্টাইন কোচ মার্সেলো বিয়েলসাকে গুরু মানা এই পায়েত নিজেই স্বীকার করেছেন, আজকের এই অবস্থানে আসার পেছনে পাগলাটে বিয়েলসার ভূমিকাই সবচাইতে বেশী। এমনিতে দুই রাগী মানুষ কখনই একসাথে টিকতে না পারলেও, কিভাবে কিভাবে পায়েত আর বিয়েলসার যেন জমে গিয়েছিল। ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে ওয়াইড মিডফিল্ডার হিসেবে খেলা পায়েতের কার্যকারিতা যে সেন্ট্রাল অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার হিসেবেই সবচাইতে বেশী, সেটা সর্বপ্রথম বুঝতে পেরেছিলেন এই মার্সেলো বিয়েলসাই। এবং এখন যেটা বুঝছেন ফরাসী কোচ দিদিয়ের দেশম। রোমানিয়ার সাথে প্রথম ম্যাচে ওয়াইড মিডফিল্ডার হিসেবে শুরু করা পায়েতকে ম্যাচের অর্ধেকের পর দেশম যখন মাঝে নিয়ে আসলেন, ফ্রান্সের আক্রমণের ধারটাও যেন বেড়ে গেল সাথে সাথেই। আলবেনিয়ার বিপক্ষেও পায়েত খেলেছেন মাঝেই।

আজের পায়েত হবার পিছে বিয়েলসার অবদানই সবচেয়ে বেশী
আজের পায়েত হবার পিছে বিয়েলসার অবদানই সবচেয়ে বেশী

গত এক বছরে ক্লাব বা দেশের হয়ে মোট ১৬টা গোলের মধ্যে ৬টাই ডেড-বল সিচুয়েশান থেকে করেছেন পায়েত, ফ্রি-কিক থেকে। তাই গত এক বছরে বিশ্বসেরা ফ্রি-কিক স্পেশালিস্টের তালিকায় ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো, লিওনেল মেসি, মিরালেম পিয়ানিচ, হাকান কাহনাগলুর সাথে পায়েতের নামটাও নেওয়া যায় অনায়াসেই।

এখন এই ইউরোর পর মেসি-রোনালদো বা পিয়ানিচদের মত কোন অধিক নামী ক্লাবে কি পায়েতের স্থান হবে? দেখা যাক!

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

14 + 13 =