পেপ গার্দিওলা প্রজেক্ট : ম্যানচেস্টার সিটিতে ফ্যাবিয়ান ডেলফের পুনর্জন্ম

পেপ গার্দিওলা প্রজেক্ট : ম্যানচেস্টার সিটিতে ফ্যাবিয়ান ডেলফের পুনর্জন্ম

বার্সেলোনা ও বায়ার্ন মিউনিখ – ম্যানচেস্টার সিটির কোচ হবার আগে পেপ গার্দিওলা যে দুটো দলের ম্যানেজার ছিলেন, সে দুটো দলেরই কিছু খেলোয়াড়ের খেলোয়াড়ি সামর্থ্যের উন্নয়ন ঘটিয়েছেন তিনি ভীষণভাবে। বার্সেলোনায় যেরকম ফলস নাইনের পুনরুদ্ভাবন করে লিওনেল মেসিকে দেখিয়েছিলেন বিশ্বসেরা হবার রাস্তা, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের ফ্লপ সেন্টারব্যাক থেকে জেরার্ড পিকেকে বানিয়েছিলেন বিশ্বের অন্যতম সেরা সেন্টারব্যাক। লা মাসিয়ার একজন সাধারণ ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার থেকে গার্দিওলার অধীনেই সার্জিও বুসকেটস হয়ে ওঠেন বিশ্বের ইতিহাসেরই অন্যতম সমীহ জাগানিয়া সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার – যার কারণে ক্লাব ছাড়তে হয় ইয়ায়া ট্যুরের মত সেন্ট্রাল মিডফিল্ডারকে, স্পেন দলে যার কারণে জায়গা হারান মার্কোস সেনা। বার্সেলোনা থেকে থিয়াগো আলকানতারাকে যে শিক্ষাটা দেওয়া শুরু করেছিলেন তিনি, তাঁর পূর্ণতা প্রদান করেন বায়ার্নের কোচ হয়েই আলকানতারাকে বার্সা থেকে বায়ার্নে নিয়ে এসে ; সেই সুফল বায়ার্ন এখনো পাচ্ছে, আলকানতারা তাদের মূল একাদশের এখন অবিচ্ছেদ্য একটা অংশ।

বায়ার্নে এসে জোশুয়া কিমিখকে কোচিং করিয়ে এমন বানিয়ে দিয়েছেন, প্রায় প্রত্যেকেই এখন ধরেই নিয়েছেন কিংবদন্তী ফিলিপ লামের উত্তরসূরি হতে চলেছেন এই কিমিখ।

এভাবে প্রত্যেক দলে কোন না কোন খেলোয়াড়ের সামর্থ্যের উত্তরোত্তর উন্নতি ঘটিয়েছেন, ঘটিয়ে চলেছেন পেপ গার্দিওলা। সেসব খেলোয়াড়দের খেলা দেখলেই মনে হয় “প্রজেক্ট পেপ গার্দিওলা” এর সার্থক রূপায়ণ।

ম্যানচেস্টার সিটিতেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। রাহিম স্টার্লিং, লেরয় সানে, গ্যাব্রিয়েল জেসুস তো আছেনই, সাথে সারপ্রাইজ প্যাকেজ হিসেবে এমন একটা খেলোয়াড়কে চুপিসারে এই মৌসুমে সিটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় হিসেবে বানিয়ে দিচ্ছেন, সিটিতে যার গুরুত্ব এই মৌসুমের আগে কেউ বোঝেনই নি একরকম।

তিনি ইংলিশ মিডফিল্ডার ফ্যাবিয়ান ডেলফ। মিডফিল্ডার হলেও এই মৌসুমের খেলা দেখে কেউ যদি বলেন ডেলফ একজন পুরোদস্তুর লেফটব্যাক, আকাশ থেকে পড়বেন না যেন!

এটাই হয়েছে আসলে, আজকের আগে যে খেলোয়াড়টা একটা সাদামাটা ইংলিশ বক্স-টু-বক্স মিডফিল্ডার ছিলেন, যাকে মূলত সিটিতে অ্যাস্টন ভিলা থেকে দু’বছর আগে আনাই হয়েছিল স্কোয়াডে ইংলিশ খেলোয়াড়দের কোটা পূরণ করার নিমিত্তে, সেই বেঞ্চে বসে থাকা খেলোয়াড়টাকেই আজ পেপ গার্দিওলা লিগের অন্যতম সেরা লেফটব্যাক বানিয়ে দিয়েছেন বলতে গেলে।

কিভাবে?

পেপ গার্দিওলা বিশ্বাস করেন, মিডফিল্ডাররাই একটা দলের প্রাণভোমরা। আর সে মিডফিল্ডার যদি বুদ্ধিমান হন, তাহলে তাঁর পক্ষে মাঠের যেকোন পজিশনেই খেলা সম্ভব। যে কারণে প্রচুর খেলোয়াড়কে নিজের স্বাভাবিক পজিশন থেকে সরিয়ে ভিন্ন ভিন্ন পজিশনে খেলিয়েছেন গার্দিওলা, দলের স্বার্থের জন্য। জাভি মার্টিনেজের মত একজন ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার গার্দিওলার বায়ার্নে হয়ে গিয়েছিলেন সেন্টারব্যাক। ভ্যালেন্সিয়ার লেফটব্যাক হুয়ান বার্নাতকে দলে এনে সেন্টারব্যাক, লেফট উইঙ্গার, লেফট উইংব্যাক, লেফট মিডফিল্ডার, লেফটব্যাক সকল পজিশনেই খেলিয়েছিলেন। জোশুয়া কিমিখকে রাইটব্যাক থেকে শুরু করে সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার, সেন্টারব্যাক সকল পজিশনেই খেলিয়েছেন।

তাই এই মৌসুমেই মোনাকো থেকে ম্যানচেস্টার সিটিতে আসা লেফটব্যাক বেঞ্জামিন মেন্ডি যখন ইনজুরিতে পড়ে প্রায় ছয়মাসের জন্য মাঠের বাইরে চলে গেলেন, দলে ব্যাকআপ লেফটব্যাকের অনুপস্থিতির জন্য সকলে সিটি ও গার্দিওলার সমালোচনা করলেও পেপ গার্দিওলা জানতেন তাঁর পরিকল্পনা সম্পর্কে। ওদিকে ফ্যাবিয়ান ডেলফও জানতেন প্রতিভা ও তারকায় ভরা ম্যানচেস্টার সিটির মিডফিল্ডে তাঁর স্থান নেই।

পেপ গার্দিওলা প্রজেক্ট : ম্যানচেস্টার সিটিতে ফ্যাবিয়ান ডেলফের পুনর্জন্ম

যেখানে বেঞ্জামিন মেন্ডি লেফটব্যাক হলেও উপরে উঠে গিয়ে আক্রমণে যোগ দেওয়ার ব্যাপারে বেশী আগ্রহী ছিলেন, সেখানে ফ্যাবিয়ান ডেলফ আরও সতর্ক পন্থা অবলম্বন করলেন। নিকোলাস ওটামেন্ডির পাশে থেকেই উপরে লেফট উইঙ্গার (লেরয় সানে বা রাহিম স্টার্লিং) আর ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার ফার্নান্দিনিওর সাথে সমন্বয় করে ফ্যাবিয়ান ডেলফ ম্যানচেস্টার সিটির রক্ষণভাগকে প্রদান করলেন আরেকটু স্থিতি, উপরে বেশী উঠে না গিয়ে সিটির পাসিং গেইমটা আরেকটু শক্তিশালী করলেন ডিফেন্স থেকে ; যেটা গার্দিওলার অন্যতম পছন্দের একটা কাজ – রক্ষণভাগ থেকে খেলা গড়ে তোলা। ছোট ছোট পাস প্রদানে সক্ষমতা আর স্বাভাবিকভাবে বক্স-টু-বক্স সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার হবার কারণে দৌড়াতে পারার সক্ষমতা ম্যানচেস্টার সিটির লেফটব্যাক পজিশানে নিয়ে আসলো স্থিতি।

সিটির ৪-১-৪-১/৪-১-২-৩ ফর্মেশানটা প্রায় সময়েই আক্রমণের ক্ষেত্রে ২-৩-২-৩ আর রক্ষণের ক্ষেত্রে ৫-৪-১ হয়ে যায়। উভয় ক্ষেত্রেই ডেলফের সমন্বয় করতে পারার ক্ষমতাটা অনেক কাজে লাগে।

পেপ গার্দিওলা প্রজেক্ট : ম্যানচেস্টার সিটিতে ফ্যাবিয়ান ডেলফের পুনর্জন্ম
সিটির মূল ফর্মেশান

রক্ষণ করার সময় দুই লেফটব্যাক ডেলফ আর ওয়াকার আরেকটু কোণার দিকে সরিয়ে গিয়ে ওটামেন্ডি ও স্টোনসের মধ্যে কিছু জায়গার সৃষ্টি করেন, যার মধ্যে ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার ফার্নান্দিনিও অবস্থান করে ফর্মেশনটাকে ৫-৪-১ এ পরিণত করেন।

পেপ গার্দিওলা প্রজেক্ট : ম্যানচেস্টার সিটিতে ফ্যাবিয়ান ডেলফের পুনর্জন্ম
রক্ষণে সিটির গঠন

আক্রমণের সময়ে উপরে একজন স্ট্রাইকারের (অ্যাগুয়েরো বা গ্যাব্রিয়েল জেসুস) দুইপাশে দুই উইঙ্গার (সানে, স্টার্লিং ও বার্নার্ডো সিলভার মধ্যে যেকোন দুইজন) উঠে যান। ঠিক নিচেই দুজন অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার ডেভিড সিলভা আর কেভিন ডে ব্রুইনিয়ার অবস্থান, যার নিচে থাকেন ফার্নান্দিনিও। ফার্নান্দিনিওর দুপাশে নিচ থেকে উঠে এসে দুই ফুলব্যাক উঠে এসে ফর্মেশানটাকে ২-৩-২-৩ এর মত করে তোলেন।

পেপ গার্দিওলা প্রজেক্ট : ম্যানচেস্টার সিটিতে ফ্যাবিয়ান ডেলফের পুনর্জন্ম
আক্রমণে সিটির অবস্থান

উভয় ক্ষেত্রেই নিচে থেকে ফাবিয়ান ডেলফ উপরে লেরয় সানে, পাশে নিকোলাস ওটামেন্ডি ও একটু উপরে থাকা ফার্নান্দিনিওর সাথে দুটো আলাদা আলাদা পাস দেওয়ার জন্য ত্রিভুজ গঠন করেন (passing triangle), যে passing triangle এর ধারণাটা গার্দিওলার স্টাইলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আর লেফট উইঙ্গার (লেরয় সানে) এর অবস্থানের উপর নির্ভর করে ডেলফ কি উপরে উঠবেন নাকি উঠবেন না।

যদিও ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের সাথে ডেলফের পজিশানগত একটা ভুলের কারণে গোল হজম করেছিল সিটি, কিন্তু সেটা ছাড়া মোটামুটি এই মৌসুমে লেফটব্যাক পজিশনে ডেলফের পারফরম্যান্স দেখে মনে হচ্ছে নিজেকে নতুন করে গড়ে তুলেছেন তিনি। চেলসি আর লেস্টার সিটির সাথে ম্যাচ দুটোই দেখুন। দুটো ম্যাচেই ট্যাকল ইন্টারসেপ্ট করার দিকে তাঁর অবস্থান ছিল উপরের দিকে, আর সফল পাস দেওয়ার উচ্চহার তো ছিলই! এক লেস্টারের সাথে ছয়টা ট্যাকল আর পাঁচটা ইন্টারসেপশান করেছেন তিনি, আর সাথে সফল পাস দেওয়ার হার? ৯৫.২% !

এই জানুয়ারিতে তাই আরেকটা লেফটব্যাক কেনার জন্য পেপ গার্দিওলা যদি টাকা খরচ নাও করতে চান, অবাক হবেন না যেন!

কমেন্টস

কমেন্টস

One thought on “পেপ গার্দিওলা প্রজেক্ট : ম্যানচেস্টার সিটিতে ফ্যাবিয়ান ডেলফের পুনর্জন্ম

মন্তব্য করুন

4 × 5 =