পেছনের কারিগর – ক্লদিও রানিয়েরি

নিপাট ভদ্রলোক। খুঁচিয়ে কিছু বলতে চাইলেও নিজে থেকে তেড়ে আসবেন না কখনই, নিজে থেকে আক্রমণ করা ত দূরে থাক। একহারা মুখে সর্বদা স্মিত একটা হাসি লেগে থাকা লোকটার পরিচয় বলতে এতদিন এটাই ছিল, অনেক ভালো কোচ, টিপিক্যাল ইতালিয়ান জেন্টলম্যান, যিনি কিনা সবসময় একটুর জন্য লিগ শিরোপা জিততে পারেন না।

সেই চেলসি থেকে শুরু, তারপর জুভেন্টাস, জুভেন্টাস থেকে রোমা, সর্বশেষ মোনাকো। একরকম ”প্রোমোশন স্পেশালিস্ট” এর তকমা পেয়ে যাওয়া এই লোক হাসিমুখেই চোখের সামনে দেখেছেন কখনো আর্সেনাল, কখনোবা ইন্টার মিলান, কখনওবা প্যারিস সেইন্ট জার্মেইকে শিরোপার উল্লাস করতে।

ranieri-cagliari
প্রোমোশন স্পেশালিস্ট বললাম এই কারণে, কি খেলোয়াড়ি জীবন বা ম্যানেজেরিয়াল জীবন, ভদ্রলোকের জীবনের একটা বিশাল অংশ কেটেছেই এরকম নিচু লিগ থেকে টিকে থেকে প্রোমোশান পেতে পেতে উঁচু লিগে উঠতে। খেলোয়াড়ি জীবনে কাতাঞ্জারো’র হয়ে দুইবার, কাতানিয়া আর পালেরমোর হয়ে একবার করে মোট চারবার নিচু লিগ থেকে সার্ভাইভ করতে করতে উঠেছেন সিরি আ তে। ম্যানেজেরিয়াল ক্যারিয়ারে সবার নজরে এসেছেনই ক্যালিয়ারির মত তৎকালীন তৃতীয় বিভাগে থাকা একটা দলকে পরপর তিন মৌসুমে তিনটা প্রোমোশান এনে সিরি আ তে তোলার জন্য।  ফিওরেন্টিনায় যখন যোগ দিলেন, প্রমোশান-কাব্য চলেছে সেখানেও। এমনকি ফ্রান্সের মোনাকোর নতুন দিনের শুরুটাও তাঁর হাত ধরেই, ২০১২-১৩ মৌসুমে ফ্রান্সের দ্বিতীয় বিভাগ থেকে তাঁর তত্ত্বাবধানেই লিগ ওয়ানে উঠেছে তারা। আর সর্বশেষ লেস্টার সিটি-গাথা ত ফুটবলপ্রেমিক মাত্রই সকলের জানা। আগের মৌসুমেই যেই ক্লাবটা লড়ছিলো রেলিগেশানের খড়্গে না পড়ার জন্য, তাঁর ছোঁয়ায় সেই ক্লাবই আমূল বদলে গিয়ে জিতে ফেলল প্রিমিয়ার লিগ শিরোপাই!

hi-res-30d22b311e197dd41068d73c2cfd82c3_crop_north
এতক্ষণে সবারই বুঝে যাওয়ার কথা কার কথা বলা হচ্ছে। তিনি ক্লদিও রানিয়েরি। ক্যারিয়ারের প্রায় পুরোটা সময় ধরেই নিজের দলের মূল একাদশ নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে পছন্দ করার কারণে “টিঙ্কারম্যান” নামে খ্যাত এই কোচ এতদিন জিতেছিলেন মোটামুটি বেশ অনেক শিরোপাই। কিন্তু লিগ শিরোপাটা থেকে গিয়েছিল অধরা। সেটা ক্যালিয়ারির হয়ে হোক, বা নাপোলি-জুভেন্টাসের হয়ে হোক, কিংবা ভ্যালেন্সিয়া-অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদের হয়ে হোক, অথবা ফিওরেন্টিনা-চেলসি-মোনাকো-ইন্টার মিলানের হয়ে হোক ; লীগ শিরোপা জয়ের আনন্দ এই শ্বেতশুভ্র কেশের মানুষের কালো ফ্রেমের চশমার ভেতরের বুদ্ধিদীপ্ত চোখজোড়ার মাঝে দেখা যায়নি কখনো। অবশেষে এই লেস্টারে এসে সেই আক্ষেপটা ঘোচালেন এমনভাবে, যে ইতিহাস নিশ্চিতভাবেই মানুষের মুখে মুখে ঘুরে ফিরবে বছরের পর বছর।

leicestercity-cropped_1888z12net6lp1bqd0yrf6vrxh

লেস্টারে যোগ দিয়েছিলেন একটা তিক্ত অভিজ্ঞতার পর। ২০১৪ সালে মোটে কয়েকমাস ২০০৪ ইউরোজয়ী গ্রিসের দায়িত্ব নেওয়ার পর নিজেদের মাটিতে পুঁচকে ফারো আইল্যান্ডের কাছে হেরে যাওয়ার ‘অপরাধে’ ছাঁটাই হতে হয় তাঁকে। লেস্টারে যোগ দেওয়া এই ঘটনার পরেই। ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে আগে তথাকথিত ‘ব্যর্থ’ রানিয়েরির এই লেস্টারে যোগদান অত ভালোভাবে দেখেননি কেউই। সরব হয়েছিলেন গ্যারি লিনেকারের মত ক্লাবের কিংবদন্তী খেলোয়াড়েরা। লিনেকার ত কিছুদিন আগেও জনসম্মখে ঘোষণা দিয়ে বসেছিলেন, লেস্টার যদি সত্যি সত্যি লিগ জিতেই বসে, তাহলে শুধুমাত্র একটা অন্তর্বাস পরেই “ম্যাচ অফ দ্য ডে” অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন! মৌসুমের শুরুতে যেই ক্লাবের প্রিমিয়ার লিগ জেতার ক্ষেত্রে বাজির দর ছিল ৫০০০/১ (মানে মৌসুমের শুরুতে আপনি লেস্টারের পক্ষে ১ টাকা বাজি ধরলে আজকে পেতেন ৫০০০ টাকা। কেউ ১ লাখ টাকা ধরলে সে আজকে পেত ৫০ কোটি টাকা), সেই ক্লাবের জন্য লিনেকারের এহেন বক্তব্য তখন কারোর কাছেই অবাস্তব ঠেকেনি। কিন্তু বিন্দু থেকে সিন্ধু রচনা করা যেই ম্যানেজারের অভ্যাস, নিজের জীবনের প্রথম লিগ শিরোপা জয়ের সুযোগটা তিনি আবার হেলায় হারাবেন কেন?

তবে আড়ালে-অগোচরে, বিভিন্ন সমালোচনার শূলে বিদ্ধ হয়ে, লাইমলাইটের আড়ালে থেকে নতুন ক্লাবের দায়িত্ব নেওয়া – রানিয়েরির ক্যারিয়ারে এটাই কিন্তু প্রথম নয়। জীবনে কখনো সুপারস্টার ম্যানেজারের তালিকায় ছিলেন না। বুকে হলফ করে বলেন ত, আপনি নিজে কি কখনো গার্দিওলা, মরিনহো, ফার্গুসন, অ্যানচেলত্তি – এই কাতারে রানিয়েরিকে ফেলেছেন বা ফেলতে পেরেছেন? উত্তর শতকরার মধ্যে ১০০ জনেরই হয়তবা হবে – না। এবং সেটাই হওয়াটা স্বাভাবিক। স্মিতহাস্য এই ম্যানেজার কখনই মিডিয়া ডার্লিং ছিলেন না, কখনই মরিনহোর মত মুখরোচক কোন খবরের জন্ম দেন নি। চেলসির সাবেক প্রধান নির্বাহী টেভর বির্চের মতে, এই ভালমানুষীই কাল হয়েছিল তাঁর চেলসিতে। প্রিমিয়ার লিগে দ্বিতীয় (যেবার আর্সেনাল অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হয়) এবং চ্যাম্পিয়নস লিগে সেমিফাইনাল পর্যন্ত গিয়েও তাই আব্রামোভিচের খড়্গের শিকার হতে হয় তাঁকে। সেবারের চ্যাম্পিয়নস লিগ জয়ী কোচকেই পরের মৌসুমে চেলসিতে নিয়ে আসেন রোমান আব্রামোভিচ – হোসে মরিনিও।

download

GettyImages-50841211

কিন্তু যে চ্যাম্পিয়নস লিগ সবসময়ই আব্রামোভিচের এত আরাধ্য বস্তু, যার জন্যই মূলত ইংলিশ লিগের একসময়কার মাঝসারির ক্লাব চেলসির প্রতি আব্রামোভিচের এত আগ্রহী হওয়া, যার জন্য রানিয়েরির পরেও চেলসি থেকে ছাঁটাই হতে হয়েছে অ্যানচেলত্তি, গ্রান্ট, ভিলাস-বোয়াস, স্কলারির মত আরও অনেক কোচকে, আব্রামোভিচ বা চেলসি সমর্থকেরা একবারের জন্যেও কি ভেবে দেখেছেন ২০০৩-০৪ মৌসুমে লিভারপুলকে পেছনে ফেলে লিগে চতুর্থ না হয়ে চেলসি যদি চ্যাম্পিয়নস লিগের কোয়ালিফাইং রাউন্ডে না যেতে পারত, গায়ে চ্যাম্পিয়নস লিগের ক্লাবের তকমাটা যদি তখন থেকে না লাগানো শুরু করত, আব্রামোভিচ কি আসতেন চেলসিকে কিনতে? সেটার কৃতিত্ব না দিলে রানিয়েরির প্রতি অবিচারই হবে।

আরও আশ্চর্যের ব্যাপার, সেই ২০০২-০৩ মৌসুমে, যখন কিনা চেলসি মাত্রই চ্যাম্পিয়নস লিগের বাতাস গায়ে লাগাতে শুরু করেছে, সেই মৌসুমে রানিয়েরি বলতে গেছে খেলোয়াড় কেনার পেছনে কোন খরচই করেননি! উলটো রবার্ট হাথ, কার্লটন কোল, সর্বোপরি জন টেরি, গ্লেন জনসন – এদের মত খেলোয়াড় গড়েই চেলসিকে নিয়ে গিয়েছিলেন আশ্চর্য উচ্চতায়। বলে রাখা ভালো, এই রবার্ট হাথ কিন্তু রানিয়েরির লেস্টারের হয়ে প্রিমিয়ার লিগ জয়ের অন্যতম সারথিও বটে!  সময়ের ফেরে একসময় চেলসি থেকে বিতাড়িত হওয়া সেই রানিয়েরির সামনের ম্যাচে লেস্টার সিটিকে নিয়ে যাচ্ছেন চেলসির মাঠে গার্ড অফ অনার নিতে – সুবিচার কতভাবেই না হয়, তাই না?

13270837-large

রানিয়েরি বরাবরই এরকম। টাকপয়সার ঝনঝনানির এই যুগে খেলোয়াড় গড়া কম, কেনা বেশী, এই তত্ত্বেই যেখানে ফুটবল বিশ্ব বুঁদ, সেখানে পুরো ক্যারিয়ার জুড়েই খেলোয়াড় বানানোর কাজ করে গেছেন রানিয়েরি নিরলসভাবে। মরিনহো প্রথম দফায় চেলসিতে এসে অতটা সাফল্য পেতেন না, যদি না আগে রানিয়েরি এসে মরিনহোর জন্য টেরি, ল্যাম্পার্ড, ম্যাকেলেলে, গালাস, ডাফ – এদের না নিয়ে যেতেন। এমনকি মরিনহো আসার পর যে দ্রগবা, রবেন এসেছেন, তাদেরকেও শেষবেলায় স্কাউটিং এই রানিয়েরিই করে দিয়ে গিয়েছিলেন, পরামর্শ দিয়ে গিয়েছিলেন তাঁদেরকে যেন চেলসির জন্য কেনা হয় – বলা বাহুল্য, তখন সুপারস্টার ছিলেননা কেউই!

ফিওরেন্টিনায় থাকতে গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতা ও রুই কস্টা, নাপোলিতে থাকতে জিয়ানফ্র্যাঙ্কো জোলা, ভ্যালেন্সিয়ায় থাকতে স্যান্টিয়াগো ক্যানিজারেস বা ক্লদিও লোপেজ, জুভেন্টাসে থাকতে আন্তোনিও নচেরিনো বা সেবাস্তিয়ান জিওভিঙ্কো – কত সুপারস্টার যে রানিয়েরি নিজ হাতে এভাবে গড়েছেন তার ইয়ত্তা নাই! আর এখন লেস্টারের সবাই ত সুপারস্টার – একেবারে অচ্ছুৎ থেকে সুপারস্টার!

রানিয়েরি যে সব খেলোয়াড়কেই সমান চোখে দেখেন, অখ্যাত খেলোয়াড়দেরও সমান গুরুত্ব দেন, এর প্রমাণ পাওয়া যায় রানিয়েরির কোচিং করা প্রথম ক্লাব ভিগর লামেজিয়ার তৎকালীন ১৬ বছর বয়সী খেলোয়াড় আন্তোনিও গাত্তের কথা থেকেই – “তিনি আমাকে ক্লাবের অন্যান্য বড় ও নামী খেলোয়াড়দের মতই আমার কথা শুনতেন, আমার কথার গুরুত্ব দিতেন, বলে রাখা ভালো, তখন আমাকে একটা অফিসিয়াল ম্যাচ খেলার জন্যেও আমার বাবা-মায়ের স্বাক্ষর করা সম্মতিপত্র আনতে হত কিন্তু!’

তবে মুদ্রার উল্টোপিঠও কিন্তু আছে। ক্লাবের আড়ালে পড়ে থাকা জুনিয়র অখ্যাত খেলোয়াড়দের যেভাবে ঘষেমেজে সুপারস্টার বানান রানিয়েরি, তাঁর পিছনে আরেকটা কারণ হতে পারে তিনি কখনই সুপারস্টার সেভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেননি। ভ্যালেন্সিয়ায় থাকতে আরিয়েল ওর্তেগা কিংবা রোমারিও – রানিয়েরির সাথে ভালো সম্পর্ক ছিল এই বলে দাবি করতে পারবেন না দুইজনের কেউই। জুভেন্টাসে থাকতে রেষারেষি হয়েছিল অ্যালেসান্দ্রো দেল পিয়েরোর সাথেও। চেলসিতে থাকার সময়কার একটা কাহিনী ত খুবই বিখ্যাত, এক খেলোয়াড় রানিয়েরির নির্দেশ অমান্য করে রাত জেগে হোটেলরুমে টিভি দেখছিলেন বলে রানিয়েরি নিজে তাঁর রুমে গিয়ে টিভি ভেঙ্গে দিয়ে এসেছিলেন! সবার আগে ডিসিপ্লিন, সে তুমি যেই হও না কেন!

del_piero_ranieri_juventus

ইন্টারে থাকার সময়টা ত আরও দুর্ভাগা। নিজের পছন্দের একটা খেলোয়াড়ও কিনতে পারলেন না ত বটেই, উলটো মৌসুম শেষে পত্রপাঠ বিদায় হতে হল। রানিয়েরির মত কোচ যদি কখনো ফার্গুসন বা ওয়েঙ্গার, নিদেনপক্ষে ডায়নামো কিয়েভের ভ্যালেরি লোবালোভস্কির মত এক ক্লাবে প্রচুর সময় পেতেন, তাহলে কি করতে পারতেন সেটা কি ভেবে দেখেছি কখনো আমরা?

আজ হোক কাল হোক, ফুটবলের এই একনিষ্ঠ সেবককে ফুটবল একটা লিগ শিরোপা দিয়ে সম্মানিত করবে, তাঁর নাম সবার মুখে মুখে ফিরবে – আজ হোক কাল হোক এটাই ত হওয়া উচিৎ ছিল, তাই না?

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

1 + 19 =