স্বর্গ থেকে পতন : যেভাবে দুর্ভাগ্যের শিকার হয়েছিল পারমা

স্বর্গ থেকে পতন : যেভাবে দুর্ভাগ্যের শিকার হয়েছিল পারমা
গত কয়েকবছরে ক্লাবটায় খেলে গেছেন জিয়ানলুইজি বুফন, ফ্যাবিও ক্যানাভারো, লিলিয়ান থুরাম, হার্নান ক্রেসপো, হুয়ান সেবাস্তিয়েন ভেরন, আরিয়েল ওর্তেগা, তাফারেল, হাকান সুকুর, হিদেতোশি নাকাতা, ফস্টিনো অ্যাসপ্রিয়া, আদ্রিয়ানো, আলবার্তো জিলার্দিনো, আদ্রিয়ান মুটু, জিউসেপ্পে রসি, সেবাস্তিয়েন জিওভিঙ্কো, আন্তোনিও কাসানো – এদের মত খেলোয়াড়। কোচিং করিয়ে গেছেন কার্লো অ্যানচেলত্তি, রবার্তো ডোনাডুনির মত মহারথী। ইতালিয়ান সিরি আ যারা নিয়মিত অনুসরণ করেন তারা আরও জানবেন হালের পাওলো ক্যানাভারো, জোনাথান বিয়াবিয়ানি, ড্যানিয়েলে বনেরা, আন্তোনিও কানদ্রেভা, লুকা আন্তোনেল্লি, গ্যাব্রিয়েল পালেত্তা – এসব খেলোয়াড়দের স্টারডমের শুরুটাও এই ক্লাবেই।
 
বলছি পারমা এর কথা। ইতালিয়ান সিরি আ এর এক অন্যতম সফল ক্লাবের কথা। ১৯৯২ তে কোপা ইতালিয়া, ১৯৯৩ তে কাপ উইনার্স কাপ, ১৯৯৪ তে ইউরোপীয়ান সুপার কাপ, ১৯৯৫ ও ১৯৯৯ তে ইউয়েফা কাপজয়ী পারমা – যা এখন বলতে গেলে প্রায় ধ্বংসের মুখে। অপরিশোধিত দেনা, কর, ও বকেয়া, বারংবার মালিকানা পরিবর্তন – সবকিছু মিলিয়ে দেউলিয়া হতে বসেছে ইতালির এই ঐতিহ্যবাহী ক্লাবটি।
অর্থসংকট এতটাই বেড়েছে যে ইতালি কর্তৃপক্ষ পারমার টিমবাসটাও কব্জা করেছে। ২০১৪ সালের জুলাই থেকে একটাও খেলোয়াড়ের বেতন-ভাতা পরিশোধ করা হয়নি। কিছুদিন আগে অর্থাভাবে উদিনেসের সাথে লিগ ম্যাচটাও খেলতে পারেনি পারমা – কারণ মাঠে স্টুয়ার্ড ও সিকিউরিটি স্টাফকে দেওয়ার মত অর্থটুকুও ব্যাঙ্কে নেই! যুবদলের কোচ কিংবদন্তী আর্জেন্টাইন স্ট্রাইকার হার্নান ক্রেসপো আর বলেছেন, বৈদ্যুতিক বিল, পরিচ্ছন্নতাকর্মী এদেরকে দেওয়ার জন্যেও টাকাপয়সা নেই তাদের। মানসিক চাপ, দুশ্চিন্তা ইত্যাদির ফলে জেরবার হয়ে ক্লাবের ডিরেক্টর স্পোর্টস পিয়েত্রো লিওনার্দি হয়ে পড়েছেন শয্যাশায়ী! মোট দেনার পরিমাণ বেড়ে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৪৫ মিলিয়ন পাউন্ডের মত! খেলোয়াড়দেরকে বলা হয়েছে নিজেদের কাপড়চোপড় নিজেদের পরিষ্কার করার জন্য! ক্লাবের দরজায় ঝুলছে ‘ডাকাতির কারণে বন্ধ’ লেখা বিশাল এক ব্যানার। ক্লাব ছেড়েছেন আন্তোনিও কাসানোর মত খেলোয়াড়, জানুয়ারীতে এসেই এর মধ্যেই ক্লাবের অবস্থা দেখে ব্রাজিলের গ্রেমিওতে পাড়ি জমিয়েছেন অ্যাটলেটিকো থেকে আসা ক্রিস্টিয়ান রড্রিগেজ।
 
পারমা এর টাকাপয়সা নিয়ে এরকম লুকোচুরি কিন্তু আজকের ইতিহাস না। বলতে গেলে এই শতাব্দীর শুরু থেকেই, ২০০০ থেকেই পারমা এর টাকাপয়সা নিয়ে এরকম অস্বচ্ছতা ছিলই। তখন পারমা এর মালিকানা ছিল নামীদামী ডেইরি কোম্পানি পারমালেতের হাতে, যাদের বেশ কিছু ব্যবসায়িক বিনিয়োগে যথেষ্ট ক্ষতি হয়। পারমালেতের প্রতিষ্ঠাতা ক্যালিস্তো তানজি কোম্পানির ক্ষয়ক্ষতি লুকানোর জন্য ব্যাঙ্কের হিসাবের যথেষ্ট গরমিল করেন তখন যা পরে ধরা খেয়ে ইউরোপের ইতিহাসের সবচে বড় কেলেঙ্কারী হিসেবে ইতিহাসের পাতায় জ্বলজ্বল করছে।
ফ্যাবিও ক্যানাভারো
২০০৭ সালে পারমা এর মালিকানা আসে টমাসো ঘিরার্দি’র হাতে। মালিকানা বদলের দেড়বছর পর টানা ১৮ মৌসুম শীর্ষ বিভাগে থাকার পর অবনমন ঘটে ক্লাবটির, যদিও পরের মৌসুমেই তারা ফিরে আসে আবার। কিন্তু ২০১২ সালের পর থেকেই মালিক ঘিরার্দি’র আচরণে একটু পরিবর্তন লক্ষ্য করেন অধিনায়ক আলেসসান্দ্রো লুকারেল্লি। তিনি বলেন, “ক্লাব আমাদের বেতন এক্কেবারে দলবদলের শেষদিনে পরিশোধ করত, যেটা ছিল একরকম সন্দেহজনক।”
 
ঘিরার্দি বোধহয় বুঝতে পেরেছিলেন ক্লাবের ক্রমবর্ধমান দেনা মেটানোর সামর্থ্য নেই তার, তাই গেল ডিসেম্বরে পারমা কে বিক্রি করে দেন রেজার্ট তাচির কাছে। তাচি সুন্দরমত ক্লাবটাকে ফেব্রুয়ারিতে এক ইউরোর বিনিময়ে বর্তমান মালিক জিয়ামপিয়েত্রো মানেন্তির কাছে বেচে দেন। জ্বি, ভুল দেখেননি, মাত্র এক ইউরোই বটে!
 
মানেন্তি শুরু থেকেই খেলোয়াড়দেরকে বেতন পরিশোধ করার আশ্বাস দেন, সবাইকে ব্যাঙ্কের ডকুমেন্টস (!) দেখান এটা বিশ্বাস করানোর জন্য যে হ্যাঁ, খেলো তোমরা, টাকা আছে। কিন্তু লুকারেল্লির মতে টাকার পরিমাণটা এতই বেশী ছিল যে তাদের কাছে এটা একরকম অবিশ্বাস্যই ঠেকেছিল।
 
যাহোক, পরে জারিজুরি ফাঁস হয়েছে সবারই, যার ফলাফল আজকে পারমা এর এই দুরবস্থা।
 
তবে আশার আলো আছে, একেবারেই যে নেই তা না। ইতালিয়ান সিরি আ এর ক্লাবগুলো মৌসুমটা শেষ করার জন্য সবাই মিলে পারমাকে ৩.৭ মিলিয়ন পাউন্ড মত ধার দেওয়ার একটা সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে।

স্বর্গ থেকে পতন : যেভাবে দুর্ভাগ্যের শিকার হয়েছিল পারমা

প্রশ্ন আসতে পারে পারমার আজকের এই অবস্থার জন্য দায়ী কে। অবশ্যই ও অতি অবশ্যই সবার আগে যার নাম আসবে সে হল ক্লাবের সাবেক মালিক টমাসো ঘিরার্দি, যিনি মোটামুটি ক্লাবের দুরবস্থার কহা সেই ২০১২ তেই আঁচ করতে পেরে আস্তে করে সরে পড়েছেন। এবং বর্তমান মালিক জিয়ামপিয়েত্রো মানেন্তি। মালিকানা নিয়ে এসব দু-নম্বরির পাশাপাশি আরেকটা যে জিনিস পারমার আজকের এই দুরবস্থার জন্য দায়ী তা হল ক্লাবের ট্রান্সফার পলিসি। এখন প্রায় ২২১ জন খেলোয়াড় বিভিন্নভাবে পারমার সাথে যুক্ত। না, ভুল দেখেননি, ২২১ জনই। তাদের কেউ এখন মূল দলে খেলেন, কেউইবা রিজার্ভ দলে, কেউ আবার অন্য ক্লাবের সাথে যুগ্মমালিকানা চুক্তিতে আছেন, কেউ ধারে খেলতে গেছেন অন্য ক্লাবে – মোটমাট সংখ্যাটা কিন্তু ২২১ই। ইতালির বিভিন্ন অঞ্চল থেকে প্রতিভা খুঁজে বের করে মোটামুটি লাভে অন্যান্য ক্লাবের কাছে বেচে দেওয়া – পারমার উপার্জনের অন্যতম প্রধান পন্থা ছিল এটি। বলাই বাহুল্য – এই পন্থা পারমাকে দুরবস্থা থেকে মুক্তি দিতে পারেনি মোটেও।
 
সিরি আ’র ক্লাবগুলোর ৩.৭ মিলিয়ন পাউন্ডের ধারে হয়ত মৌসুমটা কোনভাবে শেষ করতে পারবে পারমা, কিন্তু নব্বইয়ের সেই সোনালী দিনগুলো আর কি ফেরত আনতে পারবে তারা?
বি.দ্র. লেখাটি বছর তিনেক আগের লেখা। পারমা সেবার সিরি আ থেকে সিরি ডি তে নেমে যায়। টানা তিন বছর তিন প্রোমোশন পেয়ে পারমা সামনের মৌসুম থেকে আবারও খেলবে সিরি আ তে। এই উপলক্ষ্যে আবারও পোস্ট করা হল, কেন পারমা এতদিন সিরি আ তে ছিল না, সেই উপাখ্যান!

কমেন্টস

কমেন্টস

One thought on “স্বর্গ থেকে পতন : যেভাবে দুর্ভাগ্যের শিকার হয়েছিল পারমা

মন্তব্য করুন

3 × 4 =