পাবলো এস্কোবার ও নার্কো ফুটবল – ২য় পর্ব

ফুটবলের মাঠ থেকে রাজনীতির মঞ্চ – এস্কোবারের প্রভাব মেদেলীনের সর্বত্র বিরাজমান। মেদেলীন কার্টেলের সোজা-সাপ্টা একটা নিয়ম ছিল,“ইউ ইদার পে পিপল অর কিল পিপল”।

এই জায়গায় কিঞ্চিৎ ব্যতিক্রম ছিলো পাবলো এস্কোবার। সমানতালে করে গেছেন দুইটিই। রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী র্লুইস কার্লোস গালান ছিলেন ড্রাগলর্ড এবং তাদের কর্মকান্ডের ঘোর বিরোধী। বিশেষ করে এস্কোবারের রেজিমের কঠোর সমালোচক। জন জায়রো ভেলাজকেজ কিংবা ‘পপাই’,যে কিনা এস্কোবারের নাম্বার ও্য়ান ভাড়াটে খুনি তার হাতেই লুইস কার্লোস গালানের মৃত্যু হয়।

এস্কোবারের আদেশে প্রায় ৩০০ মানুষ হত্যা করেছেন ভেলাজকেজ।যদিও শুধু গালানের হত্যার জন্যে তাকে অভিযুক্ত করা হয় এবং ২২ বছর কারাজীবন কাটান পপাই (ভেলাজকেজ এই নামেই বেশি পরিচিত ছিলো)। গালানের মৃত্যুর পরে তারই স্থলাভিষিক্ত হয়ে প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হয় সিজার গাভেরিয়া। তিনিও ছিলেন অ্যান্টি-এস্কোবার পন্থী। কলম্বিয়ার রাজধানী বোগোতা থেকে নির্বাচনী প্রচারনার জন্যে কালি শহরের উদ্দেশ্যে প্লেনে উঠবেন ঠিক এরই পূর্ব মুহূর্তে ড্রাগএনফোর্সমেন্ট অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (ডিইএ) এজেন্ট স্টিভ মারফির হস্তক্ষেপে গাভেরিয়া সেই সফর বাতিল করেন।মারফিকে বিশ্বাস করার জন্যেই সেদিন বেঁচে গিয়েছেন তিনি।এস্কোবারের আদেশে “আভিয়াঙ্কা ফ্লাইট ২০৩” বোমায় উড়ে যায়,যেটিতে করে তিনি যেতেন কালিতে। এই যাত্রায় বেঁচে গিয়ে পরবর্তীতে কলম্বিয়ার রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন সিজার গাভেরিয়া।

কার্টেলের বিরোধিতা করেছেন এমন কোনো ব্যক্তিই বিন্দুমাত্র ছাড় পাননি। কলম্বিয়ান ফুটবলকে নার্কোদের হাত থেকে মুক্ত করবেন বলে ক্যাম্পেইন শুরু করেছিলেন আইনমন্ত্রী রদ্রিগো লারা বনিলা।তাকেও ১৯৮৪ সালে তারই গাড়ীতে গুলি করে হত্যা করে এস্কোবারের কোনো এক ভৃত্য। সাউথ আমেরিকান দেশগুলোতে ফুটবল এক ধর্মের নাম। বারো দেশের একটিও পাওয়া যাবে না যেখানে ফুটবলারদের পূজো করা হয় না। কলম্বিয়াও এর ব্যতিক্রম নয়। এত হিংস্রতা,দুর্নীতির মাঝে ফুটবলই ছিলো কিছুটা আশার বানী। ১৯৮৯ সালে রেফারি আলভারো অর্তেগার ভুল সিদ্ধান্তে আমেরিকা দি কালি ইন্দিপেন্দিয়ান্তে মেদেলীনের বিরুদ্ধে ম্যাচে ড্র করে। ম্যাচ শেষ হবার পরে হত্যা করা হয় রেফারি অর্তেগাকে।কারণ এই ম্যাচেই জুয়াতে কালি কার্টেলের কিংদের হারাতে হয়েছিলো প্রচুর টাকা। এক বছর আগে আরমান্ডো পেরেজ নামে আরেক রেফারিকে অপহরণ করা হয়েছিল চব্বিশ ঘন্টার জন্যে এবং পরে অন্য অফিশিয়ালদের বলা হয়েছিল ভুল সিদ্ধান্ত দিলেই হতে হবে হত্যার শিকার।

পাবলো এস্কোবারসহ অন্যান্য ড্রাগলর্ডদের সবচেয়ে ভয়ের কারণ ছিলো এক্সট্রাডিশন ট্রিটি। তাদের আমেরিকার কাছে হস্তান্তর করবে কলম্বিয়া সরকার এটা কিছুতেই মেনে নিতে রাজী নন তারা। ফলাফল কলম্বিয়ার প্রত্যেকটি রাস্তায় বোমা বিস্ফোরন,গোলাগুলি একেবারে স্বাভাবিক ঘটনায় পরিনত হওয়া। একেবারে অলআউট অ্যাটাক শুরু করেন এস্কোবার। “লস এক্সট্রাডিটাবলস” নামে তারই বানানো প্রেশার গ্রুপ করে গেলেন সব হিংস্রাত্মক কর্ম। তাদের মটো ছিলো ‘আমেরিকায় জেলসেলে থাকার চেয়ে কলম্বিয়ায় কবরে থাকা ভালো’। সরকারের বিরুদ্ধে চলতে থাকলো যুদ্ধ এবং মৃত্যুর হার বাড়তে লাগলো প্লবগের মতোন করে। সিগারেটের বাটের মতোন মেদেলীন,কালি,পপাইনের রাস্তায় পড়ে থাকতো মানুষের লাশ। বাধ্য হয়ে ১৯৯১ সালে সংবিধান থেকে এক্সট্রাডিশন ট্রিটি বাতিল করে কলম্বিয়ান সরকার। কাকতালীয়ভাবে ওইদিনই এস্কোবার কর্তৃপক্ষের কাছে আত্মসমর্পন করে। যেহেতু এক্সট্রাডিশনের ভয় এখন আর নেই এস্কোবার নিজেই নিজের ব্যক্তিগত শ্রীঘর বানান। জেলখানা তো নয় যেটি ছিলো একেবারে একটি রাজপ্রাসাদ। এবং যথাযথভাবে নাম রাখেন “লা ক্যাথেড্রাল”। টেলিফোন,রেডিও,ফ্যাক্সসহ সকল ধরনের ব্যক্তিগত সুবিধাবহুল ছিলো এই ঝুঁটমুট কয়েদখানা। আর সবচেয়ে মজার বিষয় ছিলো এই কয়েদখানার প্রহরীরা সবাই এস্কোবারের নিজের বাছাই করা সৈন্য। নিজের অপরাধের রায়ের জন্যে অপেক্ষা করতে থাকার সময়েই ক্যাথেড্রাল বসে নিজের ব্যবসায়িক সব কর্মই সাধন করেছেন তিনি। আস্তে আস্তে ক্ষমতার জোর কমে আসতে লাগলো তার। যার কারণ ১৯৯২ এর জুলাইয়ে তাকে অন্য কারাগারে পাঠানো সিদ্ধান্ত নেয়া হলে তিনি ক্যাথেড্রাল থেকে পালিয়ে যান। ১৯৯৩ সালের ডিসেম্বর মাসে এস্কোবারকে ধরতে সমর্থ হয় পুলিশ। মেদেলীনের যে বাসায় তাকে সনাক্ত করা হয় সে বাসার জানালা দিয়ে পালানোর সময় পুলিশের গুলিতে মৃত্যুবরন করেন পাবলো এস্কোবার। এস্কোবারের মৃত্যুতে মেদেলীন কার্টেলের ইতি ঘটলেও অন্য কার্টেলদের প্রভাব কলম্বিয়ার রাজনীতি,অর্থনীতি এবং ফুটবলে ঠিকই বিরাজমান ছিলো।

এদিকে কার্লোস ভালদেরামা,ফ্রেডি রিঙ্কন,আন্দ্রেস এস্কোবার এবং ফ্রস্তিনো আসপ্রিলায় সাজানো কলম্বিয়ার গোল্ডেন জেনারেশন ছিল ফর্মের তুঙ্গে। দেশের বাজে পরিস্থিতির মধ্যেও তারা খেলেছিলেন জাঁকালো ফুটবল। তখনকার ফিফা র‍্যাংকিংয়ে কলম্বিয়া ছিলো চার নাম্বার পজিশনে। ১৯৯৪ এর বিশ্বকাপের প্রস্তুতিও চলছিলো তুমুলভাবে। বাছাইপর্বের শেষ ম্যাচে আর্জেন্টিনাকে হারিয়েছিলো ৫-০ গোলের বিশাল ব্যবধানে। রিঙ্কন এবং আস্প্রিলা দুইজনেই করেছিলো জোড়া গোল। আলফিও ‘কোকো’ বাসিলের অধীনস্ত আর্জেন্টিনার জন্যে যেটি ছিলো চরম অপমানজনক। কলম্বিয়ার ফুটবলাররা দেশকে উপহার দিয়েছিলো কিছু স্মরণীয় মুহূর্ত।

এস্কোবারের মৃত্যুর পরেও কলম্বিয়ায় তখন যাচ্ছিলো ভীষণ খারাপ সময়। ভালদেরামাদের এমন নজরকাড়া পারফর্ম্যান্স দেখে পেলে ইঙ্গিতও করেছিলেন ৯৪ এর আমেরিকা বিশ্বকাপ হয়তো জিতবে কলম্বিয়ানরা। জর্জ হাগীর রোমানিয়ার কাছে গ্রুপ পর্বের প্রথম ম্যাচেই কলম্বিয়ানরা হেরে বসে ১-৩ গোলে। কার্টেলের জুয়াড়ি লর্ডরাও প্রচুর টাকা খোয়ান। বিরাট এক মানসিক ধাক্কা খাওয়া দলটি পরের ম্যাচে স্বাগতিক আমেরিকার কাছেও হেরে যায় ১-২ গোলে।সাংবাদিক সিজার মাউরিসিও ভেলাজকেজের মতে প্রথম ম্যাচের হারার মানসিক ধাক্কা সামাল দিতে না পারাই কলম্বিয়ার কাল হয়ে দাঁড়ায়। এছাড়া “ডার্ক হ্যান্ড” এর প্রভাবেও চাপে ছিলো পুরো দল। এই ডার্ক হ্যান্ড বলতে কাদের বোঝানো হয়েছে সেটি না বললেও সবার বুঝে ফেলার কথা। এমনকি আমেরিকার সাথে দ্বিতীয় ম্যাচে যদি মিডফিল্ডার গ্যাব্রিয়েল বারবারাস গোমেজ খেলে তাইলে পুরো দলকে হত্যা করার হুমকিও দেয়া হয়। ফুটবলারদের হোটেলরুমের টিভিপর্দায় ভেসে উঠেছিলো এই কালসদৃশ বার্তা। কলম্বিয়ায় ফুটবল যে আলো ছড়াতে শুরু করেছিলো ড্রাগলর্ডদের প্রভাবে সেটি নিভে যাবার পথে হাটা শুরু করলো। যখন যেখানে খুশি সেখানেই প্রতিপত্তির নোংরা প্রদর্শন। কোচ মাতুরানা গোমেজকে দলকে বাদ দিলে জাতীয় দলের হয়ে আর না খেলার সিদ্ধান্ত নেন গোমেজ।বাছাইপর্বে দারুন খেলা কলম্বিয়া আর বিশ্বকাপের কলম্বিয়ার মধ্যে যেন আকাশ-পাতাল ব্যবধান।

এখানেই কলম্বিয়ানদের শোকে-স্মরণীয় বিশ্বকাপের শেষ হয়নি।এখনো যে নার্কো-ফুটবলের সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর ঘটনা বাকী।আমেরিকার সাথে গ্রুপপর্বের দ্বিতীয় ম্যাচে আত্মঘাতী গোল করে বসেন দলের অধিনায়ক এবং এস্কোবারেরই মিতা আন্দ্রেস এস্কোবার।যাকে সবাই ভালোবেসে ডাকতেন দ্যা জেন্টেলম্যান বলে। তারই দুর্ভাগ্যজনক আত্মঘাতী গোলে বিশ্বকাপ শেষ কলম্বিয়ানদের।নিয়মরক্ষার শেষ ম্যাচে সুইজারল্যান্ডকে ২-০ গোলে হারায় তারা।২৬ জুন বিশ্বকাপ শেষ করে দেশে ফিরে ফুটবলাররা। এরই ঠিক এক সপ্তাহ পরে নিজশহর মেদেলীনে একটি নৈশক্লাবের সামনে নিজ গাড়ীতেই আন্দ্রেস এস্কোবারকে গুলি করে হত্যা করা হয়।একদম কাছ থেকেই বারো বার তার শরীরে গুলি চালায় গুপ্তঘাতকরা। অসহায় ২৭ বছর বয়সী এস্কোবারকে গুলি করার সময় গোল গোল গোল বলে চিৎকারও করেছিলো তারা। সেই আত্মঘাতী গোলই হত্যার মূল কারণ। “হেনাও কার্টেল” এর “দ্যা গ্যালন ব্রাদার্স”কে আন্দ্রেস এস্কোবার হত্যার জন্যে দ্বায়ী করা হয়।সান্তিয়াগো এবং পেদ্রো ডেভিড গ্যালন ক্রাইমসিনে উপস্থিত থাকলেও তাদের বডিগার্ড হামবার্তো মুনোজকে অভিযুক্ত করা হয়।গ্যালন ব্রাদার্স নাকি কার্লোস কসটানোকে(কলম্বিয়ার অন্যতম আন্ডারওয়ার্ল্ড কিং) তিন মিলিয়ন মার্কিন ডলার দিয়েছিলেন। যে কিনা সঠিক দামে যেকোনো সমস্যার সমাধান করে দিতে পারেন।গ্যালন ব্রাদার্সকে এস্কোবার হত্যায় কখনোই অভিযুক্ত করা হয়নি।
পাবলো এস্কোবার বেঁচে থাকলে আন্দ্রেস এস্কোবারকে হত্যা করা হতো না কখনোই। একথা বলেছিলেন কলম্বিয়ান মিডফিল্ডার চিচো সারনা নিজেই। হয়তো হতো বা হতো না,সেই সত্য জানার সুযোগ কখনোই আসে নাই আসবেও না। পাবলো এস্কোবারের সময়ে ড্রাগকার্টেলগুলোতে অন্তত শৃঙ্খলা ছিলো,অসম্ভব ক্ষমতার অধিকারী এস্কোবারের সময়ে কলম্বিয়ায় কিছুটা হলেও এসেছিলো অর্থনৈতিক উন্নয়ন।

সাধু নাকি শয়তান;কেমন ছিলেন পাবলো এস্কোবার? এই বিষয়ে তর্ক চলে এখনো।

পাবলো এস্কোবারের ভাই রবার্তোর ভাষায় পাবলো এস্কোবার ছিলো একজন অসাধারণভাবে সাধারণ মানুষ;মেধাবী,দয়াবান,আবেগী এবং হিংস্র।

“He was a man of both poetry and guns,to many people he was a saint,to many people he was a monster”.

যাইহোক একটি জিনিস নিশ্চিত করে বলা যায় পাবলো এস্কোবার যে দৈত্য বানিয়েছিল সে নিজেও সেই দৈত্যের শিকার হয়েছে, সঙ্গী ছিলো আরেক এস্কোবার এবং সহস্র কলম্বিয়ান। নার্কো-ফুটবলের জন্ম পাবলোতে হলেও মৃত্যু দুই এস্কোবারে।

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

seventeen − 12 =