ফাইনালে বাংলাদেশ : সাকিব এর আচরণের পরিপ্রেক্ষিতে দুটো কথা

ফাইনালে বাংলাদেশ : সাকিব এর আচরণের পরিপ্রেক্ষিতে দুটো কথা

শ্রীলঙ্কানরা যে ভাষায় কথা বলে, ঐ ভাষায় ‘নিদাহাস’ শব্দের অর্থ বলে স্বাধীনতা। টুর্নামেন্ট শুরুর সময় শুনেছিলাম এই কথাটা। নিজেদের স্বাধীনতা দিবস উদযাপন করার জন্যই বলে শ্রীলঙ্কানদের নিজেদের মাটিতে এই ত্রিদেশীয় টি২০ সিরিজের আয়োজন করা। কিন্তু কপাল খারাপ হলে যা হয়, নিজেদের স্বাধীনতার দিবস উদযাপনের জন্য নিজেদের দেশের মাটিতে আয়োজন করা এই টুর্নামেন্টের ফাইনালে তারা বাদে বাকী দুই দল ভারত আর বাংলাদেশই ফাইনালে উঠে গেল। অর্থাৎ নিজেদের দেশে স্বাধীনতা উদযাপনের টুর্নামেন্টের ফাইনালে লঙ্কানরা নিজেরাই দর্শক। তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নাটকীয় এক জয়ে শ্রীলঙ্কাকে হারিয়ে ফাইনালের টিকিট কেটেছে বাংলাদেশ। আগামী ১৮ মার্চ ভারতের বিপক্ষে ফাইনালে লড়বে তারা।

অঘোষিত এই সেমিফাইনালে একটা আদর্শ টি২০ ম্যাচের যত মশলা দরকার, তার সবটুকুই ছিল। শ্রীলঙ্কার দেওয়া ১৬০ রানের টার্গেট মোটামুটি ১২ ওভার পর্যন্ত তামিম আর মুশফিক ক্রিজে থাকার কারণে বেশ অতিক্রমযোগ্য বলেই মনে হচ্ছিল। বাধ সাধল শ্রীলঙ্কার বোলাররা। নিয়মিত টপটপ করে এর পরেই পড়ে গেল তামিম, মুশফিক, সৌম্য, মিরাজ – এদের উইকেটগুলো। তবুও এক প্রান্ত আগলে রেখেছিলেন আমাদের ডার্ক নাইট মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ। ২ ওভারে ২৩ এর পর শেষ ওভারে ১২ রান দরকার তখন বাংলাদেশের। আর আসল নাটক শুরু হল তখনই।

ইনিংসের শেষ ওভারে বল করতে এলেন শ্রীলঙ্কান সিমার ইসুরু উদানা। ক্রিকেট খেলা বেশী দেখা হয়না আমার, কিন্তু তার পরেও যখনই টিভি খুলে এই কৃশকায় লোকের খেলা চোখে পড়েছে, ভদ্রলোকের খেলা দেখে মনে হয়েছে ওয়াইড হোক বা নো বল হোক, হাজার হাজার দিতে রাজী তিনি ডেথ ওভারগুলোতে, শুধুমাত্র উদ্যত ব্যাটসম্যানের মার কম খাওয়ার জন্য। এবারও তার ব্যত্যয় ঘটলোনা। পর পর দুটি বাউন্সার দিলেন তিনি। আশ্চর্যজনকভাবে একটিও ওয়াইড দিলেন না শ্রীলঙ্কান আম্পায়ার! আর টি২০ এর আইনমতে এক ওভারে একটার বেশী কাঁধ-ছাড়ানো বাউন্সার দেওয়া যায়না, পর পর দুটো বাউন্সার ত অনেক দূরের কথা! একটার বেশী কাঁধের উপরে বাউন্সার দিলে পরের বাউন্সারকে নো বল হিসেবে ধরা হয়। এর মধ্যে দ্বিতীয় বলটায় রান আউট হয়ে গেলেন মোস্তাফিজুর রহমান, যে দ্বিতীয় বলটা প্রথম বলের চেয়ে অপেক্ষেকৃত বেশী উঁচুতে উঠেছিল কাঁধ থেকে। এর মধ্যেই হঠাৎ মাঠের পাশে নেমে এলেন সাকিব আল হাসান। সাবস্টিটিউট খেলোয়াড় নূরুল হাসান সোহানকে বোধকরি পাঠানো হল মাঠে আম্পায়ারকে বলার জন্য যে পরপর দুটো বাউন্সার দেওয়ার পরেও নো বল কেন দেওয়া হচ্ছেনা! বিষয়টা পছন্দ হলনা লঙ্কান অলরাউন্ডার থিসারা পেরেরার, তিনি সোহানকে কিছু একটা স্লেজ করলেন বোধকরি, মাথায় রক্ত চড়ে গেল সোহানের! একটু পরেই মাঠে জড়ো হলেন আরও কজন। মাঠে মাহমুদউল্লাহ উত্তেজিত কণ্ঠে কথা বলছেন আম্পায়ারদের সঙ্গে। মাঠ থেকে এর মধ্যে ব্যাটসম্যানদের চলে আসার ইঙ্গিত দিচ্ছেন সাকিব। কী হচ্ছে মাঠে?

ফাইনালে বাংলাদেশ : সাকিব এর আচরণের পরিপ্রেক্ষিতে দুটো কথা

সব মিলিয়ে হযবরল অবস্থা। ৪ বলে ১২ রান দরকার, এমন অবস্থায় কি তবে ম্যাচ থেমে যাবে? শেষ ওভারে আম্পায়ারের এমন সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক চলতে পারে, কিন্তু বাংলাদেশ কি আসলেই মাঠে ছেড়ে উঠে আসার ঘটনা ঘটাবে? তাহলে যে ডিসকোয়ালিফাইড হবে বাংলাদেশ। এই বিতর্ক গড়াবে আরও বহু দূর। শ্রীলঙ্কা-বাংলাদেশের ক্রিকেটীয় সম্পর্কেও দাগ থেকে যেত সন্দেহ নেই।

কিন্তু মাথা ঠান্ডা করল দল। ম্যানেজার খালেদ মাহমুদ ব্যাট করতে পাঠালেন মাহমুদউল্লাহকে। সাকিবকে ঠেলেঠুলে ড্রেসিংরুমে পাঠানো হলো। আউট হয়ে সাইডলাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন সাকিব। পায়ের প্যাড পর্যন্ত খোলেননি। সব মিলিয়ে পরিস্থিতি ভীষণ উত্তপ্ত।

বাংলাদেশের সৌভাগ্য, এ সময়ে উইকেটে ছিলেন বাংলাদেশের ক্রিকেটের সবচেয়ে ঠান্ডা মাথার মানুষটা। মাহমুদউল্লাহ বোঝালেন তাঁর মাথা আসলেই কত ঠান্ডা। চার, দুই এবং…ছক্কা! এক বল বাকি রেখেই বাংলাদেশের জয়।

ফাইনালে বাংলাদেশ : সাকিব এর আচরণের পরিপ্রেক্ষিতে দুটো কথা

ঝামেলাটা সৃষ্টি করেছেন শ্রীলঙ্কান আম্পায়ারই। লেগ আম্পায়ার দ্বিতীয় বাউন্সারকে নো-বল দেখিয়েছিলেন কিন্তু মূল আম্পায়ার সেটা অগ্রাহ্য করেছেন। ওই সময়ে একটি বাড়তি রান, বাড়তি বল ও ফ্রি হিটের মূল্য যে অপরিসীম। রিপ্লেতেও দেখা দ্বিতীয় বলটি প্রথম বাউন্সারেরও ওপর দিয়ে গিয়েছে। যে কারণে ক্ষিপ্ত অধিনায়ক সাকিব আল হাসান ন্যায্যভাবেই দলকে মাঠে থেকে উঠিয়ে আনতে চেয়েছিলেন।

টুইটারে বা সোশ্যাল মিডিয়াতে ম্যাচ শেষ হবার পর থেকেই বিশেষত নিদাহাস কাপের বাকী দুই দেশ ভারত ও শ্রীলঙ্কার অনেক ব্যবহারকারী স্পোর্টসম্যানশিপের পাঠশালা খুলে বসেছেন দেখলাম। সাকিব ভালো করেননি, খেলার স্পিরিট নষ্ট করে দিয়েছেন ইত্যাদি ইত্যাদি। মনে হচ্ছে নিজেদের ন্যায্য নো-বল আদায় করার জন্য উচ্চকণ্ঠ হয়ে বিশাল এক ভুলই করে ফেলেছেন সাকিব! কিন্তু আসলেই সাকিবের আচরণে কি ভুল ছিল? তার আগে আমাকে বলুন, এরকম একটা ম্যাচে নো-বল নিয়ে বিশ্বমানের (!) আম্পায়ারদের কাছ থেকে এরকম শিক্ষানবিশদের মত দোনমনায় ভোগাটা কতটুকু গ্রহণযোগ্য?

আর ভালো কথা, কথায় কথায় সাকিবের দোষ খোঁজা মানুষজন এই ঘটনার আগে ইতিহাস থেকে একটু শিক্ষা নিয়ে আসলে ভালো হয়।

অর্জুনা রানাতুঙ্গাকে চেনেন? শ্রীলঙ্কার ইতিহাসের সর্বসেরা অধিনায়ক, যার হাত ধরে বিশ্বকাপ ঘরে এনেছিল লঙ্কানরা।  দলের খেলোয়াড়দের এক সুতোয় গাঁথতে রানাতুঙ্গা ছিলেন অতুলনীয়। বিপদে-আপদে, যেকোনো সমস্যায় সতীর্থদের কাঁধে থাকত রানাতুঙ্গার বিশ্বস্ত হাত। সবচেয়ে বড় উদাহরণ, মুত্তিয়া মুরালিধরন। ১৯৯৯ সালের জানুয়ারিতে অ্যাডিলেডে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আম্পায়ার রস এমারসন যখন মুরালিকে বারবার ‘নো’ ডাকছিলেন, প্রতিবাদে গোটা দল নিয়ে মাঠ থেকেই বেরিয়ে গিয়েছিলেন রানাতুঙ্গা। তাতে আম্পায়াররা যারপরনাই ভয় পেয়ে যাওয়ায় রানাতুঙ্গা দল নিয়ে আবারো মাঠে ফিরলেও, অধিনায়ক হিসেবে মেসেজটা কিন্তু ঠিকই দিয়েছিলেন তিনি। মুরালি কি আদৌ চাকার নাকি চাকার নন, সে প্রশ্নে ক্রিকেট বিশ্ব এখনো দুইভাগে বিভক্ত। তাও রানাতুঙ্গা নিজের খেলোয়াড়ের সম্মান, নিজের দলের সম্মানকে বিসর্জন দিয়ে চুপ করে বসে থাকেননি। আজকে যেসব শ্রীলঙ্কানরা সাকিবকে টুইটারে ধুয়ে দিচ্ছেন, নিজেদের ইতিহাস এত তাড়াতাড়ি ভুলে গেলেন? মুরালিকে তো তাও অর্ধেক বিশ্ব এখনো চাকার হিসেবেই মানে, আর আজকে তো লেগ আম্পায়ার ইসুরু উদানার দ্বিতীয় বলটাকে নো-ই ডেকে ফেলেছিলেন!

ফাইনালে বাংলাদেশ : সাকিব এর আচরণের পরিপ্রেক্ষিতে দুটো কথা
ক্ষিপ্ত রানাতুঙ্গা

আরেকটা উদাহরণ দিই। বিষেণ সিং বেদীকে চেনেন? ভারতের ইতিহাসের অন্যতম সেরা অধিনায়ক তিনি। ১৯৭৮ সালের ৩ নভেম্বর, পাকিস্তানের বিপক্ষে তিন ম্যাচের সিরিজের তৃতীয় ম্যাচ চলছে তখন, পাকিস্তানের মাঠেই। প্রথম দুই ম্যাচের মধ্যে ভারত আর পাকিস্তান একটি করে ম্যাচ জিতে সিরিজে সমতায় আছে। শেষ ম্যাচে প্রথমে ব্যাট করতে নেমে ৪০ ওভারে ২০৫ করে পাকিস্তান। পরে ব্যাট করতে নেমে ৩৭ ওভার শেষে মাত্র ২ উইকেট হারিয়ে ১৮৩ রান করে বিষেণ সিং বেদীর অধিনায়কত্বে খেলা ভারত। অর্থাৎ শেষ ৩ ওভারে বা ১৮ বলে জয়ের জন্য ২৩ রান লাগে ভারতে, জয় বলতে গেলে হাতের মুঠোতেই তাদের। ৩ ওভারের ২ ওভার বল করবেন সরফরাজ নাওয়াজ, বাকী এক ওভার করবেন ইমরান খান, পাকিস্তানি অধিনায়ক মুশতাক মোহাম্মদের পরিকল্পনা এমনটাই।

ওভারের প্রথম চারটা বলই অনেক উঁচুতে বাউন্সার দিলেন পেসার সরফরাজ নাওয়াজ। প্রথম বলটা যখন বাউন্সার দিলেন তখন ভারতীয়রা ভেবেছিল হয়ত আম্পায়ারের ভুল হয়েছে তাই নো-বল ডাকেননি। কিন্তু তারপরেও আরো তিনটা বল যখন বাউন্সার দিলেন সরফরাজ নাওয়াজ আর বলগুলোকে যখন নো-বল ডাকা হল না, ভারতীয় অধিনায়ক বিষেণ সিং বেদীর বুঝতে বাকী রইলোনা “ক্রিকেটের স্পিরিট”, “সুশীলতা” ইত্যাদির আড়ালে পাকিস্তানি আম্পায়ার যুগল কি চাচ্ছেন আসলে। সুন্দরমত ম্যাচ বয়কট করলেন অধিনায়ক বিষেণ সিং বেদী, ক্রিজে থাকা ব্যাটসম্যান-যুগল অংশুমান গায়কোয়াড় আর সুরিন্দর অমরনাথকে ডেকে আনলেন ড্রেসিং রুমে। আজকে যেসব ভারতীয়রা সাকিবকে টুইটারে ধুয়ে দিচ্ছেন, নিজেদের ইতিহাস এত তাড়াতাড়ি ভুলে গেলেন?

ফাইনালে বাংলাদেশ : সাকিব এর আচরণের পরিপ্রেক্ষিতে দুটো কথা
বিষেণ সিং বেদী (বামে), সরফরাজ নাওয়াজ (ডানে)

আজকে ম্যাচে সাকিব চুপ করে থাকলে হয়ত স্পিরিট অফ ক্রিকেটে তথাকথিত ‘দাগ’ লাগতোনা ঠিকই, কিন্তু এসব দোনমনায় থাকা সিদ্ধান্তগুলো আজকের পর থেকে আরো বেশী করে বাংলাদেশের বিপক্ষেই যেত। একে তো সাম্প্রতিক সময়ে পারফরম্যান্সের দিক দিয়ে এদেশে ক্রিকেটের উত্থান হলেও ক্রিকেটের মোড়লরা এখনো বাংলাদেশকে ‘মিনোজ’ ই ভাবে, আজকে সাকিব এই প্রতিবাদটা না করলে এরপর থেকে বাংলাদেশের ম্যাচগুলোতে ”বেনেফিট অফ ডাউট” যে সবসময় বাংলাদেশের প্রতিপক্ষরাই পেত, আম্পায়ারের ভুল সিদ্ধান্তের মাশুল যে শুধু বাংলাদেশকেই দিতে হত – সে ব্যাপারে কোন সন্দেহ আছে কি?

আমার তো নেই!

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

6 − two =