নবি স্টাইলস : ইংল্যান্ডের নিঃশব্দ কারিগর

আলফ র‍্যামজির ৬৬ বিশ্বকাপজয়ী দলের নায়ক কে ছিল? এই প্রশ্ন করলে শতকরা ৯০% মানুষ বলবে জিওফ হার্স্ট, রজার হান্ট,গর্ডন বাঙ্কস, ববি মুর, ববি চার্লটন এবং আপনি যদি নিপাট লিডস ইউনাইটেড সমর্থক হন তাইলে ববি চার্লটনের বড়ভাই জ্যাকি ‘বিগ জ্যাক’ চার্লটনের কথাও বলবেন। কিন্তু ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার নবি স্টাইলসের কথা কতজন বলবে? ৯০ শতাংশ মানুষ যদি হার্স্ট, হান্ট, বাঙ্কস, মুর, চার্লটন ভাইদের কথা বলে তাইলে বাকী ১০% এর মধ্যে তো নবি স্টাইলসও থাকবে, থাকার কথা। নাও থাকতে পারে, কারণ এটাই পরিসংখ্যান!

১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপের গ্রুপপর্বে  ইতালিকে ০-৩ গোলে হারিয়েছিল উত্তর কোরিয়া। এটাকে যদি চমক বলে মনে হয় তাহলে কোয়ার্টার ফাইনালে ৬৬ বিশ্বকাপের হট ফেভারিট ইউসেবিও, সিমোএসের পর্তুগালের বিপক্ষে খেলার শুরুতেই ৩-০ গোলে কোরিয়ার এগিয়ে থাকাকে কী বলবেন? যদিও  ইউসেবিওর এক হালি গোলে শেষ পর্যন্ত জয় হয় পর্তুগালেরই। দুর্দান্ত খেলেছিলেন ব্ল্যাক প্যানথার, দ্য কিং, ব্ল্যাক পার্লসহ হরেক রকম নামে ভূষিত হওয়া ইউসেবিও দ্যা সিলভা ফেরেইরা।

নবি স্টাইলস প্রসঙ্গেই ইতালি, উত্তর কোরিয়া,ইউসেবিও,পর্তুগালের কথা বলা। সেমিফাইনালে স্বাগতিক ইংল্যান্ডের প্রতিপক্ষ ইউসেবিওর পর্তুগাল। কোচ আলফ র‍্যামজি তার  রণকৌশল সাজালেন কীভাবে ইউসেবিও আটকানো যায়। এরকম রণকৌশল খুব একটা বিরল না। এভাবেই সাফল্যের দেখা পেয়েছেন অনেকেই। রণকৌশলের কথা বলতে গিয়ে মনে পড়ল ১৯৫৮ বিশ্বকাপ জয়ী ব্রাজিলিয়ান কোচ ভিসেন্তে ফিওলার কথা। গজন্দর এই কোচের মাঝমাঠের কারিগর ছিলেন পাস-মাস্টার দিদি। খেলা শুরু হবার আগে ফিওলা ড্রেসিংরুমেই দিদিকে বলতেন যেভাবেই খেলা শুরু হোক, প্রথম পাসটা যেন গারিঞ্চার কাছে যায়। তেমনি র‍্যামজির কথা ছিল যেভাবেই হোক ইউসেবিওকে আটকাও। দায়িত্ব এসে পড়ল নবি স্টাইলসের কাছে। পুরো ম্যাচ জুড়েই আঠালো পদার্থের মতোন ইউসেবিওর সাথে লেগে ছিল এই মিডফিল্ডার। শুধু তাই নয় ম্যাচের শেষের দিকে আন্তোনিও সিমোএস সুযোগ পেয়েছিলেন ১-২ পিছিয়ে থাকা পর্তুগালকে সমতায় ফেরাতে। কিন্তু সেসময়েও বাধা হয়ে দাঁড়ান স্টাইলস, কর্ণারের মাধ্যমে দলকে বাঁচান। অথচ ফাইনাল পর্যন্ত খেলাও হত না তার। গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে ফ্রান্সের বিরুদ্ধে হলুদ কার্ড দেখেন। কড়া-ট্যাকলের জন্যে পরিচত স্টাইলসের খেলায় বেজায় নারাজ এফএ। কোচ র‍্যামজিকে বলেওছিলেন যে পরবর্তী ম্যাচগুলাতে যাতে স্টাইলসকে বাদ দেয়া যায়। তার খেলায় এফএ অসন্তুষ্ট। তার মারমুখো প্রেসিং-ট্যাকলিং এ বিপদে পড়তে পারে দল। ফ্রান্সের বিপক্ষে নবি স্টাইলসের ভুল ট্যাকলে খাওয়া হলুদ কার্ডই তার জাতীয় দলের হয়ে একমাত্র কার্ড। যাইহোক কোচ আলফ র‍্যামজি স্টাইলসকে তো দল থেকে বাদ দিলেনই না উল্টো হুমকি দিলেন তার পছন্দমতো দল নিয়ে মাঠে নামতে না পারলে তখনই দলের দায়িত্ব ছেড়ে দিবেন। শেষ পর্যন্ত জয় কার হয়েছিল বলার অপেক্ষা রাখে না। দ্বিতীয় রাউন্ডে আক্রমণাত্মক অ্যাটাকিং আর্জেন্টাইন দলের বিপক্ষে স্টাইলসের পারফরম্যান্স পেয়েছে বিপুল প্রশংসা। কিছুটা নিয়ন্ত্রিত মেজাজে খেলেই অবদান রেখেছেন দলের জয়ে। ইংল্যান্ডও আস্তে আস্তে বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন বুনতে শুরু করলো।

আলফ র‍্যামজি চাইলেই ম্যাট বুসবিকে একটা ধন্যবাদ দিতে পারতেন। ফুলব্যাক হিসেবে খেলা “বুসবি বেবস” এর অন্যতম সদস্য নবি স্টাইলসকে তিনিই ডিফেন্সিভ মিডে খেলানো শুরু করেন। পরবর্তীতে বিশ্বকাপের মতো বড়ো আসরে র‍্যামজিকে চিন্তা করতে হয়নি ববি চার্লটনের সাথে মাঝমাঠের দায়িত্ব কাকে দিবেন। স্টাইলসের আরেকটা অতীব গুরুত্বপূর্ন এবং চমকপ্রদ পারফরম্যান্স হলো ১৯৬৮ সালে ইউরোপীয়ান কাপের ফাইনাল। প্রতিপক্ষ পর্তুগিজ দল বেনফিকা। আরেকটু স্পষ্ট করে বললে ইউসেবিওর বেনফিকার বিরুদ্ধে। এবারো জয় স্টাইলসের, ইউসেবিওর স্বাভাবিক খেলার যথেষ্ট ব্যাঘাত ঘটিয়ে ইউনাইটেডের জয় নিশ্চিত করেন তিনি।

জাতীয় দলের হয়ে একটিমাত্র গোল করেছেন নবি স্টাইলস। ১৯৬৬ সালে প্রীতি ম্যাচে পশ্চিম জার্মানির বিপক্ষে। মজার বিষয় হলো ওই ম্যাচে নয় নাম্বার জার্সি পড়ে খেলেছিলেন তিনি।

গোড়ালিতে পড়ে থাকা মোজা, মেকী দাঁত বের করে জুলে রিমে ট্রফি মাথার উপরে রেখে ওয়েম্বলিতে নাঁচছেন স্টাইলস। এমন দৃশ্য অনেক থ্রি-লায়নস ভক্তদের চোখে এখনো  শান্তির পরম উৎস হিসেবে কাজ করে।কিন্তু গল্পটা হতে পারতো সম্পূর্ণ বিপ্রতীপ, যদি আলফ র‍্যামজি শুনতেন এফএর কথা!

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

eight − 7 =