ধন্যবাদ মাশরাফি!

11025655_753861568054519_4903112125705899193_nআমি খেলা দেখা শুরু করেছিলাম যখন, বাংলাদেশের ক্রিকেটে তখন দুঃসময় চলছে। ২০০২ সাল চলছে তখন। জিম্বাবুয়ে, এমনকি কেনিয়াও তখন আমাদের কাছে প্রবল পরাক্রমশালী দল। হিতেশ মোদি, তন্ময় মিশ্রা, ওবুইয়া ব্রাদার্সরাও আমাদের কাছে লিজেন্ডারি খেলোয়াড় বলে অনুভূত হতেন। আর আমরা একের পর এক ম্যাচ হারতাম।

২০০৩ বিশ্বকাপে একটা ম্যাচ জেতার কথা ভেবে বিমানে উঠেছিল বাংলাদেশ দল, দুর্ভাগ্যজনকভাবে কানাডার বিপক্ষে সেই ম্যাচটাও জঘন্যভাবে হেরে দেশে ফিরতে হয়েছিল বাংলাদেশকে। টানা পাঁচ বছর জয়শূন্য অবস্থায় অবস্থায় কাটাতে হয়েছে বাংলাদেশকে। প্রতিটা ম্যাচে এই আশা নিয়ে খেলা দেখতে বসতাম,”হয়তো এই ম্যাচে হবে, হয়তো জিতবো এবার!”

হতো না। বাংলাদেশ একে একে সব ম্যাচ হারছিল, সব! বাংলাদেশকে পুরো বিশ্ব ‘মিনোজ’ নামে ডাকতে শুরু করলো। কিন্তু জবাব যেন আর দেওয়া হচ্ছিল না!

এমন এক সময়ে খেলা দেখা শুরু করেছিলাম আমি। বয়স আমার তখন আর কত ছিল? বড়জোর ৭-৮ বছর! ক্রিকেট তখন কতটুকু বুঝতাম, তা কে জানে! তবে এতটুকু বুঝতাম, এই খেলাটাকে ভালোবেসে ফেলেছি। এটাও বুঝতাম, এটাই আমাদের দল, আমাদের প্রতিনিধিত্বকারী জাতীয় ক্রিকেট দল। অতএব, আশা হারালে চলবে না। তাই ম্যাচ হারতাম, আবার পরের ম্যাচে আশা নিয়ে বসতাম টিভির সামনে।

ওই সময়েই শুনেছিলাম, একটা ফাস্ট বোলার নাকি আছে বাংলাদেশের, অনেক জোরে বোলিং করতে পারে। বাংলাদেশে ফাস্ট বোলার? আসলেই?

কিছুদিন পর আবিষ্কার করলাম, ছেলেটা আমাদেরই জেলার! নাম মাশরাফি! আগে শুধু বিস্মিত হয়েছিলাম, এখন আমার বিস্ময়ে মুখ হা হয়ে গেল।

কিন্তু দিন যদি সব সুখেই কাটবে, তবে আর মাশরাফি কেন? দুম করে পড়ে গেলেন ইনজুরিতে, প্রথমবারের মত শুনলাম একটা শব্দ, ‘হ্যামস্ট্রিং’। কিচ্ছু না বুঝতে পেরে নিজেই মনে মনে আওড়াতাম, এইটা আবার কি জিনিস?

অনেকদিন পর ইনজুরি থেকে ফিরলেন তিনি, নির্বাচকেরা বললেন,”মাশরাফি তো অটো চয়েস!” আমি বুঝতে শিখলাম, শুধু জোরে বোলিংটাই পারেন না, ‘ঠিকঠাক লাইন-লেংথে বোলিং’টাও তিনি ভালোই পারেন!

তার বোলিং প্রতিভার প্রথম স্ফুরণ দেখেছিলাম বাংলাদেশের কেনিয়া সফরে, মাশরাফি ২১ রানে ৬ উইকেট নিয়ে একাই ধ্বসিয়ে দিয়েছিলেন কেনিয়ার ব্যাটিং লাইনআপ। আর আমিও তার বোলিং অ্যাকশনের প্রেমে পড়ে গেলাম। আজ অব্দি বোলিং করি তাকে দেখে কপি করা অ্যাকশনেই!

এরপর ইংল্যান্ডের বিপক্ষে নাসের হুসেইনদের কাঁপিয়ে দেওয়া সেই স্পেলটাও দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল। পরদিন ‘প্রথম আলো’তে যখন পড়েছিলাম নাসের হুসেইন প্রশংসা করেছেন মাশরাফির, বুকের এক পাশে ঢিপঢিপ শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম। গর্বের ব্যাপার ছিল সেটা, খুব বেশি গর্ব!

ততদিনে আমি বিশ্বাস করতে শুরু করে দিয়েছি নিজেদের দলের উপর। প্রথম ওভারে মাশরাফি যখন বল হাতে নেন, ওভারটা ভালো হলেই মনে হয়, “নাহ! আজকে হতে পারে একটা কিছু। নাহ! আজকে হবেই!” ততদিনে আমরা জিততে শিখেছি, আমরা বিশ্বাস করতে শিখেছি যে আমরা জিততেও পারি।

আচ্ছা, মাঝে কি একটা কিছু বাদ পড়লো? হ্যা, অলরাউন্ডার মাশরাফি! আমার মনে আছে ভারতের সাথে টানা দুটো টেস্টে নয় নাম্বারে নেমে অসাধারণ দুটো ফিফটি। সিরিজ শেষে রাহুল দ্রাবিড় বলেছিলেন,”আমাদের যদি মাশরাফির মত একজন অলরাউন্ডার থাকতো!”

বড় গর্বের ছিল সেই মুহুর্তগুলো, অনেক বড় গর্বের জায়গা ছিল এই সময়গুলো। প্রতিনিয়ত ভাগ্য তাকে ছিটকে ফেলেছে, আবার ফিরে এসেছেন প্রবল পরাক্রমে। প্রতিবার তিনি ফিরে এসেছেন সত্যিকারের যোদ্ধার মত, আগের চেয়েও ভয়ংকর রূপে ফিরে এসেছেন। ইনজুরি তার থেকে কেড়ে নিয়েছে গতি, কিন্তু কেড়ে নিতে পারেনি তার লড়াকু মানসিকতা। আমাদের প্রজন্মটা বেড়ে উঠেছে এই মাশরাফিকে বোলিং করতে দেখে, তাকে আইডল মেনে। আর তাই এখনকার প্রতিটা পেসারের একজন কমন আইডলের নাম, মাশরাফি!

এই মাশরাফিই একদিন আমাদের শিখিয়েছিলেন, বিশ্বের বাঘা বাঘা সব ব্যাটসম্যানদেরও আমাদের দেশের পেসাররা নাকানিচুবানি খাওয়াতে পারে। এই মাশরাফিই একদিন দেখিয়েছিলেন, এই দেশেরই কেউ একজন এক বছরে ৪৬টা উইকেটও নিতে পারে। এই মাশরাফিই আমাদের দেখিয়েছেন, আমাদের স্পিননির্ভর দলটা রাতারাতি পেস কোয়াড্রেট নিয়ে ওডিআইতে নামার ক্ষমতা রাখে। তিনিই আমাদের শিখিয়েছেন, আমাদের দলটাই একদিন অপরাজেয় এক শক্তি হিসেবে বিশ্ব ক্রিকেটে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।

তিনি আমাদের স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছেন। তার ইন্ধনেই এখন আমরা এমন স্বপ্ন দেখি, যা মাত্র পাঁচ কি ছয় বছর আগেও দেখার সাহস পাইনি। আমরা এখন বড় একটা স্বপ্ন দেখতে পারি, বিশ্ব ক্রিকেটে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারি। খেলোয়াড় মাশরাফি বিন মর্তুজার সবচেয়ে বড় অর্জন সম্ভবত এটাই, স্বপ্নলোভী বাংলাদেশকে স্বপ্ন দেখতে শেখানো!

ধন্যবাদ মাশরাফি! সমগ্র বাংলাদেশকে আপনার হাঁটুর দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখেছি, আপনাকে নিঃস্বার্থভাবে নিজেকে বিলিয়ে দিতে দেখেছি। এইবার আমাদের কিছু দেওয়ার পালা! আপনি দেখতে পাচ্ছেন কি আমার পোস্ট? দেখতে পাচ্ছেন আমাদের পাগলামি? সবই তো শেখা আপনার থেকে! কারণ, দিনশেষে আল্টিমেট ‘পাগলা’ তো একজনই! একজন মাশরাফি বিন মর্তুজা।

 

 

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

9 − three =