দ্য ডিভাইন পনিটেইল

রবার্তো ব্যাজিও - সেই ডিভাইন পনিটেইলের কথা

আপনি একজন পাঁড় ইতালিয়ান ফুটবলের ভক্ত হয়ে থাকলে জিনিসটা আপনাকে পীড়া দিতে বাধ্য। আপনার প্রিয় দলের ইতিহাসের তর্কযোগ্যভাবে অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফুটবলার সম্বন্ধে যখন আলোচনা করা হয়, সেটা যে জায়গাতেই হোক না কেন, আলোচনার মুখ্য বিষয় হয়ে থাকে হয় সেই ফুটবলারের হেয়ারস্টাইল, নতুবা ক্যালিফোর্নিয়ার পাসাদেনার সেই বিখ্যাত বিশ্বকাপ ফাইনালের পেনাল্টি মিস। নচ্ছার গুগলেও সার্চ করে শান্তি নেই, তার নাম লিখলেই গুগল সাজেশানে সবার আগে হয় তার ১৯৯৪ বিশ্বকাপের সেই পেনাল্টি মিস দেখাবে, নতুবা তার হেয়ারস্টাইল – এইসব দেখাবে। অনেকটা ফরাসী কিংবদন্তী জিনেদিন জিদানের মত। ২০০৬ বিশ্বকাপে বলতে গেলে একাই ফ্রান্সকে ফাইনাল পর্যন্ত টেনে নিয়ে যাবার পরেও সেই বিশ্বকাপে জিদানের ক্যারিশমা সম্বন্ধে সবাই যতটা না উদাসীন আর মৌন, ফাইনালে ইতালিয়ান ডিফেন্ডার মার্কো মাতেরাজ্জির বুকে দেওয়া জিদানের ঢুঁস-কাণ্ড সম্বন্ধে সবাই তত বেশী মুখর ২০০৬ এর পর থেকে।

এখানেই দেখুন না, কোথায় ইতালিয়ান ফুটবলের রাজপুত্রের ক্যারিয়ারের স্বর্ণোজ্জ্বল মুহূর্তগুলো নিয়ে আলোকপাত করব, তা না, সেই পেনাল্টি মিস দিয়েই শুরু করতে হল আলোচনা।

সেই পেনাল্টি মিসের পর…

কিন্তু কেন? রবার্টো ব্যাজিওর ক্যারিয়ারের হাইলাইট কি শুধুই সেই পেনাল্টি মিস? কিংবা তৎকালীন তরুণ জেনারেশানকে নতুন স্টাইল-স্টেইটমেন্ট শেখানো পনিটেইল চুলের কাটটা? অবশ্যই না। অতি অবশ্যই না। চিরবৈরী চার-চারটা ইতালিয়ান ক্লাবে খেলার পরেও যে খেলোয়াড় এই চারটা ক্লাবের একটা ক্লাবের সমর্থকদের কাছেও বিন্দুমাত্রও ঘৃণার পাত্র নন – তিনি অবশ্যই বিশেষ কিছু, এবং অতি অবশ্যম্ভাবী ভাবেই তার ক্যারিয়ারের হাইলাইট এই দুটো জিনিস হতে পারেনা।

জিনেদিন জিদানের ক্যারিয়ারের ঘটনার সাথে তুলনা করে লেখাটা শুরু করেছিলাম, কেননা কেবলমাত্র জিদানই হয়তোবা ব্যাজিওর দুঃখটা কিছুটা হলেও বুঝতে পারবেন। কিংবা ম্যারাডোনা – আর্জেন্টাইন ফুটবল কিংবদন্তী। আগের বাক্যতে লক্ষ্য করুন, বলেছি ‘হয়তোবা’। কেননা জিদান হোক কিংবা ম্যারাডোনা, তাদের দুঃখের প্রলেপটা দেওয়ার জন্য হলেও একটি করে বিশ্বকাপ জিতেছিলেন। আনন্দে মাতিয়েছিলেন জাতিকে। কিন্তু ব্যাজিওর কপালে কি সেই সুখ জুটেছে?

পনিটেইল উন্মাদনা – সে ত ব্যাজিওরই সৃষ্টি!

১৯৮৬ সালে ম্যারাডোনা বলতে গেলে একাই টেনে নিয়ে গিয়ে আর্জেন্টিনাকে ভাসিয়েছিলেন বিশ্বকাপ জয়ের আনন্দে। ১৯৯০ সালে হাতছোঁয়া দূরত্বে থেকেও টানা দ্বিতীয়বারের মত জিততে পারেননি ফুটবলের সবচেয়ে শাশ্বত পুরষ্কারটিকে। আর ১৯৯৪ বিশ্বকাপে ত ডোপপাপের কালিমায় নিমজ্জিত হয়ে নিষিদ্ধই হলেন। তা যাই হোক না কেন, ম্যারাডোনার লেগ্যাসি ইতিহাসের পাতায় রচিত হয়ে গিয়েছিল কিন্তু সেই ১৯৮৬ বিশ্বকাপেই, পরে যত যাই হোক না কেন। একইরকম ভাবে, ২০০৬ বিশ্বকাপে বলতে গেলে একাই ফ্রান্সকে বিশ্বকাপ ফাইনাল পর্যন্ত টেনে নিয়ে গিয়েও সেই ঢুঁস-কাণ্ডের কারণে ফাইনাল না জিততে পারলেও, জিনেদিন ইয়াজিদ জিদানের লিগ্যাসি ফুটবলের ইতিহাসে রচিত হয়ে গিয়েছিল কিন্তু সেই আটানব্বইতেই, নিজদেশে আয়োজিত বিশ্বকাপের ফাইনালে জোড়া গোল করে বিশ্বকাপ জেতার মাধ্যমে।

কিন্তু ব্যাজিও? সারাজীবন জাতীয় দল হোক কিংবা ক্লাব, কোচদের চক্ষুশূল হয়ে থাকা এই ঐশ্বরিক প্রতিভার অ্যাটাকিং মিডফিল্ডারটা তিন-তিনটা বিশ্বকাপ খেলেও বিশ্বকাপ জিততে পারলেন না নিজের দেশের হয়ে, এমন একটা ব্যথা, যার সম্বন্ধে ইয়োহান ক্রুইফ থেকে ইউসেবিও, জিকো-সক্রেটিস থেকে বাতিস্তুতা – সবাই-ই পরিচিত। ১৯৯৪ বিশ্বকাপে বলতে গেলে ধুঁকতে থাকা ইতালিয়ান দলটাকে নিজের কাঁধে একাই টেনে নিয়ে গেলেন ফাইনালে, পুরো টুর্নামেন্ট দলকে টেনে শেষে ক্লান্ত হয়ে গেলেন ফাইনালে। এতটাই ক্লান্ত যে পরে শিরোপা-নির্ধারণী পেনাল্টিটা নেওয়ার সময় প্রয়োজনের চেয়ে একটু বেশীই জোরে লাথি দিয়ে ফেললেন বলটাকে। আর তাতেই ব্রাজিলিয়ান গোলরক্ষক তাফারেলের গোলপোস্টকে বহু নিচে রেখে লাখো ইতালিয়ানের বিশ্বকাপ স্বপ্নকে সাথে নিয়েই উড়ে গেল বলটা…

“আমি জানতাম আমাকে কি করতে হবে। আমার মনঃসংযোগেরও কোন কমতি ছিল না। কিন্তু হয়ত আমি পেনাল্টিটা নেওয়ার সময় একটু বেশীই ক্লান্ত ছিলাম, এজন্য হয়ত বলটাকে একটু বেশী জোরে লাথি দিয়ে ফেলেছিলাম… তবুও, পেনাল্টি মিস তারাই করে, হাজারো দর্শকের সামনে ঐরকম নখ-কামড়ানো মুহূর্তগুলোতে পেনাল্টি নেওয়ার হিম্মত যাদের আছে…”

…সরল কিন্তু সাহসী স্বীকারোক্তি ব্যাজিওর।

কোথাও কারোর যদি প্রতিভা আসলেই থেকে থাকে, যত আড়ালেই থাকুক না সে, প্রতিভার বিচ্ছুরণে বিশ্ব তাকে খুঁজে নেবেই। ব্যাজিওর কাহিনীটাও অনেকটা এরকমই ছিল। জন্মস্থান ক্যালদোনিওর একই নামের ক্লাবে মাত্র ৯ বছর বয়সে ক্যারিয়ার শুরু করা ব্যাজিওর নামের পাশে প্রথম ২৬ ম্যাচেই হিসাব দেখালো ৪৫ গোল আর ২০ অ্যাসিস্টের, তাও মাত্র ১১ বছর বয়সেই, দুই বছরের মধ্যেই। এর মধ্যে এক ম্যাচে ছয়-ছয়টা গোলও ছিল। এহেন প্রতিভা দেখে তাকে নিজের ক্লাবের হয়ে খেলানোর সিদ্ধান্তটা অনেক বড় বোকামি হবে, ভাবলেন তৎকালীন সিরি সি তে খেলা ইতালিয়ান ক্লাব ভিসেঞ্জার স্কাউট আন্তোনিও মোরা। যেই ভাবা সেই কাজ, ৩০০ পাউন্ডের বিনিময়ে ক্যালদোনিও থেকে ভিসেঞ্জায় আসলেন ব্যাজিও, ১৩ বছর বয়সে। ক্যালদোনিওর হয়ে ১১০ ম্যাচে ১২০ গোল করা ব্যাজিও শুরু করলেন ভিসেঞ্জা-অভিযান, ১৫ বছর বয়সে সেখানেই পেশাদার ক্যারিয়ার শুরু করলেন তিনি।

ভিসেনজায় খেলার সময় ব্যাজিও

পেশাদার ক্যারিয়ার শুরু করার সাথে সাথেই নিজের চিরদিনের স্বপ্নকে আস্তে আস্তে বাস্তব করতে শুরু করলেন ব্যাজিও – নিজের আইডল ”সাদা পেলে” জিকোকে অনুকরণ করার স্বপ্ন। ভিসেঞ্জার হয়ে তিন বছরে ৩৬ ম্যাচ খেলে ১৩ গোল করে সেই ১৭-১৮ বছর বয়সেই ইতালিয়ান ফুটবলে তোলপাড় লাগিয়ে দিলেন তিনি, ইতালির মানুষজন বুঝলো যে দেশের মানুষের স্বপ্নের ভার বহন করার জন্য আসছে একজন।

তখন ইতোমধ্যে ইতালিয়ান দ্বিতীয় বিভাগে উঠে আসা ভিসেঞ্জায় ব্যাজিওর উত্থান নজর এড়ায়নি সিরি আ এর জায়ান্ট ক্লাব জুভেন্টাস কিংবা ফিওরেন্টিনারও। দুই ক্লাবই তরুণ ব্যাজিওকে পাওয়ার জন্য উঠেপড়ে লাগলো। সিরি বি থেকে জুভেন্টাসের হয়ে নাম লেখানো যখন মোটামুটি নিশ্চিতই বলা চলে, তখনই বাধ সাধলো জুভেন্টাসেরই চিরবৈরী ক্লাব – “লা ভাইওলা” নামে খ্যাত ফিওরেন্টিনা। একেবারে শেষ মুহূর্তে ১.৫ মিলিয়ন পাউন্ডের একটা প্রস্তাব রাখলো তারা ভিসেঞ্জার কর্তাব্যক্তিদের টেবিলে। ব্যাজিও-ও জুভেন্টাসে যেতে যেতে হয়ে গেলেন ফিওরেন্টিনার। জুভেন্টাস এহেন প্রত্যাখানের প্রতিশোধ অবশ্যই তোলে বছর পাঁচেক পর – সে আলোচনায় একটু পরে আসছি।

ফিওরেন্টিনার হয়ে মাঠ মাতানোর সময়

এখনকার মুদ্রাস্ফীতির বাজারে ১.৫ মিলিয়ন পাউন্ড ট্রান্সফার ফি অনেক কম বলে মনে হতে পারে আপনার। বিশেষত এখন যেখানে অ্যান্দ্রোস টাউনসেন্ডের মত উইঙ্গাররাও ১৩ মিলিয়ন পাউন্ডের বিনিময়ে ক্লাব বদল করছেন, ৪৯ মিলিয়ন পাউন্ডে লিভারপুল থেকে ম্যানচেস্টার সিটিতে যাচ্ছেন রাহিম স্টার্লিংরা। কিন্তু সেই ১.৫ মিলিয়ন পাউন্ডের মাহাত্ম্য বোঝা যাবে যদি আপনি এই জিনিসটা মাথায় রাখেন – মাত্র এক বছর আগেই ৬.৯ মিলিয়ন পাউন্ডের ট্রান্সফার ফি তে বার্সেলোনা থেকে নাপোলিতে যোগ দিয়েছিলেন আর্জেন্টাইন ফুটবল-ঈশ্বর ডিয়েগো আরমান্ডো ম্যারাডোনা, আর সেই ৬.৯ মিলিয়ন পাউন্ডই ছিল তৎকালীন আমলের বিশ্বরেকর্ড ট্রান্সফার ফি – এখন যেরকম পল পগবার জুভেন্টাস থেকে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে আসার বিশ্বরেকর্ড ট্রান্সফার ফি টা ৮৯ মিলিয়ন পাউন্ডের। যেখানে বিশ্বরেকর্ডই ৬.৯ মিলিয়ন পাউন্ডের, সেখানে ১.৫ মিলিয়ন পাউন্ডকে অত খাটো করেও দেখার কিন্তু অবকাশ নেই। আরো মাথায় রাখুন, ব্যাজিও তখন মাত্র সিরি বি মাতাচ্ছেন, সিরি আ তে তখনো তিনি আনকোরা। একটা সিরি বি তে খেলা অ্যাটাকিং মিডফিল্ডারের প্রতিভা ও ক্ষমতা সম্বন্ধে কতটা নিঃসন্দেহ হলে তখন ইতালির জায়ান্ট একটা ক্লাব এরকম একটা ট্রান্সফার ফি দিতে রাজী হয়?

কিন্তু ফিওরেন্টিনায় তাঁর ক্যারিয়ার শুরু হতে না হতেই ডান হাঁটুর ক্যারিয়ার-নাশী এক ইনজুরিতে পড়লেন ব্যাজিও। ফিওরেন্টিনায় যাবার চুক্তি হবার ঠিক দুই-তিন দিন আগে। ডাক্তাররা বলেই দিলেন, বেঁচে থাকতে চাইলে ফুটবল খেলার আশা ছেড়ে দাও। মাত্র ১৮ বছর বয়সের প্রতিভাবান স্বপ্নচারী একটা তরুণ, কিরকম লাগতে পারে তাঁর এই কথাটা শুনে? তাও তখন, যখন আক্ষরিক অর্থেই তাঁর ক্যারিয়ারের উত্থান মাত্র শুরু হয়েছে?

ফিওরেন্টিনা চাইলেই চুক্তিটা বাতিল করতে পারত। মোটামুটি একটা বিশাল অংকের ট্রান্সফার ফি দিয়ে খোঁড়া একটা খেলোয়াড় কে আনতে চাইবে দলে? কিন্তু ফিওরেন্টিনা চুক্তির মর্যাদা রাখলো। ব্যাজিওকে ফ্রান্সে পাঠিয়ে উন্নত সার্জারির ব্যবস্থা করলো তারা।

১৮ বছর বয়সী এক কিশোরের ডান হাঁটুতে চলল চিকিৎসার নামে দুঃসহ এক যন্ত্রণা। ব্যাজিওর হাঁটুতে যে সার্জারি করা হল, সে সময়ে সেই সার্জারি অনেক বেশী ঝুঁকিপূর্ণ ছিল, হাঁটুর মধ্য দিয়ে ড্রিল করে সবকয়টা বিচ্ছিন্ন লিগামেন্ট ঠিকভাবে পুনঃস্থাপন করা হল ২২০ টা অভ্যন্তরীণ সেলাইয়ের মাধ্যমে। দুটো মৌসুম মাঠের বাইরে থাকলেন ব্যাজিও, তাঁর শারীরিক-মানসিক সবদিক দিয়েই আসলো পরিবর্তন। মনের শান্তির খোঁজে রোমান ক্যাথোলিক ছেড়ে নিজেকে সঁপে দিলেন গৌতম বুদ্ধের ছায়াতলে। যেকোন সাধারণ মানুষ এই অবস্থায় খেলা-টেলা ছেড়ে দিয়ে অন্য কিছু শুরু করে দিতেন। ব্যাজিও নিজেও পরে স্বীকার করেছিলেন…

“যদি একেবারে ব্যথাহীন অবস্থাতেই শুধুমাত্র আমি খেলতে নামতাম, তাহলে হয়তোবা বছরে দুটি কি তিনটি ম্যাচ খেলা হত আমার…”

কিন্তু ব্যাজিও ত সাধারণ কেউ নন। ফুটবলের প্রতি তাঁর অবিনাশী ভালোবাসা আস্তে আস্তে আবার তাঁকে মাঠের পথে নিয়ে আসা শুরু করে। যে ইনজুরিতে তাঁর ক্যারিয়ারই শেষ হয়ে যাওয়ার কথা, সেই ইনজুরি থেকে ফিরে আসলেও পুরো ক্যারিয়ারে আর একটিবারের জন্যেও পুরোপুরি সুস্থ হননি ব্যাজিও। তো যাই হোক, সেই ইনজুরির সময়ে আরেকটা জিনিসও হয়েছিল, আর তা হল ফিওরেন্টিনার সাথে ব্যাজিওর একটা অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল, যে ঋণের দায় থেকে ব্যাজিও আস্তে আস্তে নিজেকে মুক্ত করা শুরু করেন ফিওরেন্টিনায় যোগ দেওয়ার ঠিক দুই মৌসুম পর থেকে। ডিয়েগো ম্যারাডোনার নাপোলির বিপক্ষে দুর্দান্ত এক ফ্রি-কিকে গোল করে ফিওরেন্টিনায় নিজের গোলের খাতা খোলেন তিনি। আক্ষরিক অর্থেই ফিওরেন্টিনায় শুরু হয় ব্যাজিও-যুগের।

ম্যারাডোনার সাথে ব্যাজিও

সামনের বছর তিনেক “লা ভাইওলা” সমর্থকেরা মাঠে শুধু আসতে থাকলেন আর মন্ত্রমুগ্ধের মত দেখতে থাকলেন পাঁচ ফুট আট ইঞ্চির এক ফরোয়ার্ডের কেরামতি। বিভিন্ন কোণ থেকে, বিভিন্ন পজিশান থেকে, বিভিন্ন ভাবে – সেটা দূরপাল্লার শটে হোক, কিংবা কারিকুরি দেখিয়ে হোক, কিংবা গোলরক্ষক ও ডিফেন্ডারদের বোকা বানিয়ে হোক, প্রতি দুই ম্যাচে অন্তত একটা – এই অনুপাতে ফিওরেন্টিনায় চলতে থাকলো ব্যাজিও-ম্যাজিক। তখন ম্যারাডোনা ও ব্যাজিও – উভয়ের সাথেই খেলার সৌভাগ্য হয়েছিল ফিওরেন্টিনায় খেলা আর্জেন্টাইন মিডফিল্ডার মিগুয়েল মন্তুরির, যার মতে সেই সময়ে ব্যাজিও ছিলেন ম্যারাডোনার থেকেও বেশী কার্যকরী, সিরি আ এর শ্রেষ্ঠ নাম্বার টেন। এতেই বোঝা যায় ব্যাজিও কি ছিলেন।

সিরি আ তে ব্যাজিও স্বমহিমায় ভাস্বর হলেও, ফিওরেন্টিনার অবস্থা লিগে কিন্তু তেমন সুবিধার কিছু ছিল না তখন। লিগ টেবিলের নিচের দিকে ওঠানামা করত তারা, আর এই সুবিধাটাই নিল চিরবৈরী জুভেন্টাস। পাঁচ বছর আগে প্রত্যাখ্যাত হবার প্রতিশোধ সুদে-আসলে নেওয়ার সুযোগ আসলো তুরিনের বুড়িদের সামনে। ১৯৯০ সালে ঋণে ঋণে জর্জরিত ফিওরেন্টিনার সামনে বিশ্বরেকর্ড ৮ মিলিয়ন পাউন্ডের প্রস্তাব রাখলো জুভরা। জুভেন্টাস তখন এসি মিলানের কাছ থেকে ইতালির শ্রেষ্ঠ ক্লাবের মুকুট ফিরে পেতে মরিয়া। মিলানে তখন খুলিত-রাইকার্ড-বাস্তেন ত্রয়ীর স্বর্ণযুগ, ইন্টার মিলান মাতাচ্ছেন লোথার ম্যাথাউস আর ইয়ুর্গেন ক্লিন্সম্যানের মত তারকারা, নাপোলির সিংহাসনে ম্যারাডোনার আধিপত্য, সাথে আছেন ব্রাজিলিয়ান জাদুকর কারেকা, এএস রোমায় গোলের পর গোল করে যাচ্ছেন জার্মান সুপারস্টার রুডি ফলার আর মিডফিল্ডে আছেন সিনিসা মিহায়লোভিচ, এমনকি লাজিও-ও নিয়ে এসেছে তৎকালীন ইংলিশ ফুটবলের রাজপুত্র পল গ্যাসকোয়েনকে, তারকাখ্যাতির দিক দিয়ে বলতে গেলে তাই জুভেন্টাসই একটু পিছিয়ে ছিল। তার উপর ১৯৮৭ সালে ক্লাব ছেড়েছিলেন সুপারস্টার মিশেল প্লাতিনি, তাই তাঁর অভাব পূরণেরও একটা ব্যাপার ছিল। তাই শেষমেশ ব্যাজিওর দিকে হাত বাড়ানো। ফিওরেন্টিনার প্রেসিডেন্ট ও বোর্ডের সামনে সেই প্রস্তাব মুখ বুঝে মেনে নেওয়া ছাড়া সেরকম কোন উপায়ই ছিল না, এমনই ছিল ক্লাবের অবস্থা। ব্যাজিওর নিজেরও চিরশত্রু দলে যোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে ছিল অনীহা। পরে উপায়ান্তর না দেখে জুভেন্টাসেই যোগ দিতে হয় ইতালি ফুটবলের তখনকার সবচেয়ে বড় সুপারস্টারকে।

এরপর শুরু হল অভাবনীয় এক ঘটনা। ফিওরেন্টিনার সমর্থকেরা এই ট্রান্সফারের প্রতিবাদে দলে দলে সব ফ্লোরেন্সের রাস্তায় নেমে আসলো, শুরু হল বিক্ষোভ, পারলে ফিওরেন্টিনার প্রেসিডেন্টকে হেডকোয়ার্টার থেকে বেরই হতে দেবেনা ক্ষুব্ধ সমর্থকেরা। টানা তিন দিন সেই বিক্ষোভ চলে, পুলিশ-সমর্থক ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়াতে আহত হয় প্রায় পঞ্চাশ জনের মত ফিওরেন্টিনা সমর্থক। পরে রবার্টো ব্যাজিও স্বীকার করতে বাধ্য হন, “আমাকে দল পরিবর্তন করতে বাধ্য করা হয়েছিল।”

প্রথমে ব্যাজিওকে আপন করে নেয়নি জুভ সমর্থকেরা

এদিকে জুভেন্টাসের সমর্থকেরাও যে ব্যাজিওকে পেয়ে আকাশের চাঁদ হাতে পাওয়ার মত শুরু করেছিলেন, তাও কিন্তু ছিল না। এটার পিছনে কারণ ছিল ব্যাজিওর প্রচ্ছন্ন ফিওরেন্টিনা-প্রীতি। জুভেন্টাসে যোগ দেওয়ার পর যে প্রেস কনফারেন্সে ব্যাজিওকে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয় সেখানে জুভেন্টাসের স্কার্ফ পরতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন তিনি। ফলে জুভেন্টাসের কিছু সমর্থকের কাছেও আক্রমণের শিকার হতে হয় ব্যাজিওকে। সবচেয়ে বড় ঘটনাটা ঘটে লিগে ফিওরেন্টিনার সাথে জুভেন্টাসের একটা ম্যাচে। পেনাল্টি পায় জুভেন্টাস, পেনাল্টি-স্পেশালিস্ট হিসেবে যথারীতি ব্যাজিওর ঘাড়ে পড়ে সেই পেনাল্টি নেওয়ার দায়িত্ব। কিন্তু মাঠের মধ্যেই নিজের সাবেক ক্লাবের বিরুদ্ধে পেনাল্টি নিতে অস্বীকৃতি জানান ব্যাজিও, বাহানা দেন এই বলে যে ফিওরেন্টিনার গোলরক্ষক জিয়ানমাত্তেও ম্যারেজ্জিনি তাঁকে অনেক ভালোভাবে চেনেন, তিনি কোথায় কিভাবে পেনাল্টি কিক নেবেন তা মারেজ্জিনির জানা, তাই তিনি কিক নিতে চান নি। ব্যাজিওর বদলে পেনাল্টি কিক নেন ডিফেন্ডার লুইজি ডে অ্যাগোস্টিনি। কিন্তু বিধি বাম, অ্যাগোস্টিনি সেই পেনাল্টি মিস করেন, কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা হিসেবে আসে সেই ম্যাচে চিরশত্রুদের কাছে জুভেন্টাসের ১-০ গোলের পরাজয়। তার উপর সে ম্যাচে ব্যাজিওকে যখন সাবস্টিটিউট করা হয়, তার দিকে ছুঁড়ে দেওয়া একটা ফিওরেন্টিনার স্কার্ফ কুড়িয়ে নিজের কাছে রেখে দেন ব্যাজিও। এই কীর্তি দেখে ফিওরেন্টিনার সমর্থকেরা যতটা না সন্তুষ্ট হয়েছিল, সেরকমই রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে গিয়েছিল জুভেন্টাস সমর্থকেরা। ব্যাজিও নিজেও স্বীকার করেছিলেন, “মনের ভেতরে আমি সবসময় ফিওরেন্টিনার বেগুনি রঙ ধারণ করি!”

সেই সাবস্টিটিউশানের পর, ফিওরেন্টিনার স্কার্ফ হাতে

ফলে প্রথমে প্রথমে ব্যাজিওকে একদমই মেনে নেয়নি জুভেন্টাসের সমর্থকেরা। কিন্তু আস্তে আস্তে নিজের প্রতিভার ঝলকানিতে জুভেন্টাস সমর্থকদের মানভঞ্জন করেন তিনি। জুভেন্টাসের একটা করে সিরি আ, কোপা ইতালিয়া আর ইউয়েফা কাপের শিরোপা জয়ের পাশাপাশি নিজেও জিতে নেন ফিফা বর্ষসেরা আর ব্যালন ডি’অরের খেতাব। জুভেন্টাস সমর্থকদের কাছে ব্যাজিও তখন নয়নের মণি, তাঁরা বুঝে গিয়েছিলেন কোচ জিওভান্নি ত্রাপাত্তোনি ব্যাজিওকে ঘিরেই দল সাজাচ্ছেন।

এতকিছুর মধ্যেও ব্যাজিওর ইনজুরি সমস্যাটা কিন্তু ছিলই। জুভেন্টাসের হয়ে ইউয়েফা কাপ জেতার পরের মৌসুমেই ইনজুরির কারণে অনেক কম মাঠে নামা হয় তাঁর। আর এর মধ্যে কোচিংয়েও আসে পরিবর্তন, ত্রাপাত্তোনির জায়গায় জুভেন্টাসের কোচ হয়ে আসেন মার্সেলো লিপ্পি, যে লিপ্পির হাত ধরে ২০০৬ বিশ্বকাপটা আসে ইতালিতে। শুরু হয় ব্যাজিওর জীবনে লিপ্পির সাথে ব্যাক্তিগত রোষানলের এক অধ্যায়।

ব্যাজিও তখন সবার সেরা

লিপ্পি প্রথম থেকেই চেয়েছিলেন তাঁর জুভেন্টাস আর যাই হোক না কেন ব্যাজিও-নির্ভর হবে না, কোন এক খেলোয়াড়ের উপর নির্ভর করে থাকবেনা তাঁর দল। প্রথাগত ৪-৪-২ ফর্মেশান থেকে বের হয়ে আউটসাইড ফরোয়ার্ড/উইঙ্গার নির্ভর ৪-৩-৩ ফর্মেশানে জুভেন্টাসকে খেলানো শুরু করেন লিপ্পি। ইনজুরি জর্জর ব্যাজিওর মাঠের বাইরে থাকাটা লিপ্পির জন্য আশীর্বাদ হয়েই আসলো তাই। তিনি ব্যাজিওর জায়গায় অ্যালেসসান্দ্রো দেল পিয়েরো নামের এক তরুণ ফরোয়ার্ডকে খেলানো শুরু করলেন। সাথে সামনের তিনজন ফরোয়ার্ডের বাকী দুইজন হলেন ফ্যাব্রিজিও রাভানেল্লি আর জিয়ানলুকা ভিয়ালি। ও ভালো কথা, এটা ছিল ১৯৯৪ বিশ্বকাপের ঠিক পরের মৌসুম। ফলে ফাইনালে ইতালির হয়ে পেনাল্টি মিসের যন্ত্রণাতে ত বটেই, সাথে সাথে ইনজুরি আর লিপ্পির রোষানলে পড়ে এই দুই যন্ত্রণাতেও দগ্ধ হতে থাকলেন ব্যাজিও। মৌসুম শেষে লিগ ও কাপের ডাবল জিতলো জুভেন্টাস, আর হল ইউয়েফা কাপের ফাইনালিস্ট। লিগ কাপজয়ের ডাবল মেডেল পেলেন ব্যাজিও ঠিকই, কিন্তু শিরোপা জয়ে ব্যাজিওর বিশেষ কোন ভূমিকা ছিল না। কারণ ঐ যে, ইনজুরি! ততদিনে অ্যালেসসান্দ্রো দেল পিয়েরো নিজের আগমনীবার্তা বিশ্বকে জানান দিয়ে দিয়েছেন। ফলে জুভেন্টাসের কর্তাব্যক্তিদেরকেও লিপ্পির বোঝানো সহজ হয়ে গেল যে ব্যাজিওকে ছাড়াও জুভ চলতে পারে, তাঁকে বেচে দিয়ে বরং কিছু অর্থ ক্লাবে আসলে ঋণের দায় থেকে একটু মুক্তি পাওয়া যায়। লিপ্পির এহেন রোষানলে পড়ে ফলে পরের মৌসুমে ব্যাজিওর স্থান হয় এসি মিলানে। যে সমর্থকেরা কয়েকবছর আগেও ব্যাজিওর বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিল, তারাই আবার কয়েকবছর পর জুভেন্টাসের হেডকোয়ার্টার ঘিরে ব্যাজিওকে বেচার প্রতিবাদে বিক্ষোভ করতে লাগলো, ঠিক যেমন কয়েকবছর আগে ফিওরেন্টিনার সমর্থকেরা করেছিল! দেজাভুঁ!

ব্যাজিওর সাথে লিপ্পির সম্পর্কটা কখনই এরকম সুখময় ছিল না

এসি মিলানে গিয়ে পড়লেন উরুগুইয়ান কোচ অস্কার তাবারেজের হাতে, যিনি নিজে নান্দনিক ফুটবলের তেমন ভক্ত ছিলেন না। ফলে এখানেও ব্যাজিও নিয়মিত সেরকম খেলতে পারলেন না। তাবারেজ এই বিষয়ে বলেছিলেন, “ফুটবলে কবিদের জায়গা নেই” – ইঙ্গিতটা যে ব্যাজিওর উদ্দেশ্যেই ছিল, তা আর বলার অপেক্ষা রাখেনা বৈকি! তবে তাবারেজ নিজেও বেশীদিন মিলানে টিকতে পারলেন না, তাঁর জায়গায় মিলান আবার নিয়ে এল তাদের কিংবদন্তী কোচ আরিগো সাচ্চিকে। বলে রাখা ভালো, ১৯৯৪ তে ইতালির কোচ কিন্তু এই সাচ্চিই ছিলেন, আর সাচ্চির সাথেও ব্যাজিওর সম্পর্ক তেমন সুবিধার ছিল না!

মিলানে লাইবেরিয়ান স্ট্রাইকার জর্জ উইয়াহের সাথে বেশ ভালোই একটা পার্টনারশিপ গড়ে উঠেছিল ব্যাজিওর

কোচদের সাথে এই ভালো, এই খারাপ সম্পর্ক নিয়েও মিলানে আরেকটা স্কুডেট্টো জেতেন ব্যাজিও, মিলানে তাঁর একমাত্র সাফল্য। ৯৭ তে মিলান ছাড়েন তিনি। তাঁকে পাওয়ার জন্য বিদেশের বিভিন্ন ক্লাব, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড কিংবা বার্সেলোনা আগ্রহী হলেও ১৯৯৮ বিশ্বকাপের দলে থাকতে হবে এই আশা নিয়ে ব্যাজিও সিদ্ধান্ত নেন ইতালিতে থেকে যাওয়ার। পারমার ম্যানেজার কার্লো অ্যানচেলত্তি তাঁকে নিতে গিয়েও পরে নেননি, ভেবেছিলেন তাঁর সিস্টেমে ব্যাজিও খাপ খাওয়াতে পারবেন না নিজেকে। ফলে সবাইকে অবাক করে দিয়ে সিরি আ এর রেলিগেশান ফাইটার বোলোনিয়া তে যোগ দেন তিনি।

বোলোনিয়ায় নিজেকে ফিরে পান ব্যাজিও

এখানেই নিজেকে যেন আবার ফিরে পান ব্যাজিও। কোন ধরণের কোচের সাথে রেষারেষি নেই, কোন ধরণের ট্যাকটিক্যাল বাধা-বিপত্তি নেই, অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার হিসেবে মুক্ত বিহঙ্গের মত মাঠে নিজের ইচ্ছামত খেলার স্বাধীনতা দেওয়া হল ব্যাজিওকে। এটার ফলও পেল বোলোনিয়া হাতেনাতে। ক্যারিয়ারের সেরা মৌসুম কাটালেন ব্যাজিও বোলোনিয়ার হয়ে, ৩০ ম্যাচে করলেন ২২ গোল। ফলে ইতালির বিশ্বকাপ দলেও জায়গা হল তাঁর। এখানেও কথা আছে। অ্যালেসসান্দ্রো দেল পিয়েরোর জন্য ইতালির দলে একই পজিশানে আর অন্য প্লেয়ার রাখতে চাননি কোচ সিজার মালদিনি (পাওলো মালদিনির বাবা), কিন্তু এমনই দুর্ধর্ষ ছিল ব্যাজিওর ফর্ম যে তাঁকে নিতে বাধ্য হয়েছিলেন মালদিনি। সে বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনালেই বাদ পড়ে যেতে হয় ইতালিকে, পেনাল্টি শুটআউটে ফ্রান্সের কাছে হেরে।

বিশ্বকাপের পর ব্যাজিও আরেকটা বড় দলে শেষবারের মত সুযোগ নিয়ে দেখতে চান, এবার ইন্টার মিলানের হয়ে। ইনজুরির যন্ত্রণা ছিলই, তা সত্বেও প্রেসিডেন্ট মাসিমো মোরাত্তি ভরসা রাখেন ব্যাজিওর উপর। তখন বিশ্বের শ্রেষ্ঠতম স্ট্রাইকার রোনালদোকেও বার্সা থেকে বিশ্বরেকর্ড ট্রান্সফার ফি তে নিয়ে এসেছিল ইন্টার মিলান, ইন্টারে রোনালদো-ব্যাজিও দ্বৈরথ দেখার স্বপ্ন নিয়েই ব্যাজিওকেও বোলোনিয়া থেকে নিয়ে আসেন মোরাত্তি। কিন্তু ব্যাজিও-রোনালদো দুইজনেরই বারবার ইনজুরি হবার জন্য আর নিয়মিত ম্যানেজারের পরিবর্তন হবার জন্য মোরাত্তির স্বপ্ন সেরকম বাস্তবতার মুখ কখনই দেখেনি। ইন্টারে ব্যাজিও বেশ কয়েকজন ম্যানেজারের অধীনেই খেলেছিলেন, যেমন – রয় হজসন, লুইজি সিমোনি ও মির্সেয়া লুসেচকু। কেউই ইন্টারকে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য এনে না দেওয়ায় ইন্টার ম্যানেজার করে নিয়ে আসে মার্সেলো লিপ্পিকে, জুভেন্টাস থেকে।

রোনালদো-ব্যাজিও পার্টনারশিপটা সফল হয়নি ইন্টারে

জি হ্যাঁ, সেই লিপ্পি!

পাঁচ মৌসুম জুভেন্টাসে কাটানোর পর, এই সময়ের মধ্যে তিন-তিনটা স্কুডেট্টো, একটা কোপা ইতালিয়া, দুটো সুপারকোপা ইতালিয়ানা, একবার ইউয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগ (এবং দুইবার রানার্সআপ), একবার করে ইউরোপিয়ান সুপারকাপ ও ইন্টারকন্টিনেন্টাল কাপ জেতার পর লিপ্পি ভেবেছিলেন জুভেন্টাসকে তাঁর আর দেওয়ার কিছু নেই। তাই মাসিমো মোরাত্তি যখন তাঁকে ইন্টারে আসার প্রস্তাব দিলেন, লুফে নিলেন সাথে সাথেই। লিপ্পি আসার পর ব্যাজিওর সাথে তাঁর সাদা পতাকা বৈঠকের মত একটা বৈঠক হয়, যেখানে লিপ্পি ব্যাজিওকে কথা দেন যে ইন্টারের মূল একাদশে লিপ্পি অবশ্যই থাকবেন। কিন্তু কিসের কি? লিপ্পি ইন্টারের ম্যানেজার হয়ে আসার পরেই প্রথমে যে কাজটা করেন সেটা হল, লাজিও থেকে আরেক ইতালিয়ান সুপারস্টার স্ট্রাইকার ক্রিস্টিয়ান ভিয়েরিকে দলে নিয়ে আসেন। এই ভিয়েরিকে নিজের অমতে জুভেন্টাস থেকে বিক্রি করে দিতে হয়ে হয়েছিল লিপ্পিকে, ম্যানেজমেন্টের চাপে, অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদের কাছে। যেটা কিনা লিপ্পির জুভেন্টাস ছাড়ার অন্যতম একটা কারণ ছিল। আর এখন লিপ্পি তাই অন্য ক্লাবে যোগ দিয়েই নিজের প্রিয় শিষ্যকে যেকোন মূল্যের বিনিময়েই নিয়ে আসলেন ইন্টারে। ফলে ইন্টারের আক্রমণভাগে বসলো তারার মেলা। রোনালদো-ব্যাজিও ত ছিলেনই, সাথে যুক্ত হলেন ভিয়েরি। উরুগুইয়ান সুপারস্টার আলভারো রেকোবাকে নিয়ে আসা হল, যিনি কিনা মাত্রই গত মৌসুমে ভেনেজিয়াকে একরকম নিজের চেষ্টাতেই রেলিগেশানের খড়্গ থেকে বাঁচিয়ে এসেছেন। আছেন চিলিয়ান সুপারস্টার স্ট্রাইকার ইভান জামোরানোও, রিয়াল মাদ্রিদ ও সেভিয়ার হয়ে গোলের বন্যা বইয়ে দেওয়ার পরে ইন্টারের হয়েও যিনি বেশ ভালোই খেলছিলেন। লিপ্পি ব্যাজিওকে কথা দিয়েছিলেন সামনে দুই স্ট্রাইকার হিসেবে খেলবেন রোনালদো-ভিয়েরি, আর তাঁর ঠিক পেছনের জায়গাটাতেই খেলবেন ব্যাজিও, “নাম্বার টেন” বা অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার হিসেবে।

ইন্টারে ব্যাজিও

কিন্তু ব্যাজিওর প্রতি লিপ্পির অনীহার কারণেই হোক, আর ব্যাজিওর ইনজুরির কারণেই হোক, সেই কথা লিপ্পি রাখেননি। উলটো ব্যাজিওকে বলেছিলেন তাঁর হয়ে ড্রেসিংরুমে গোয়েন্দাগিরি করতে। ড্রেসিংরুমে কোন খেলোয়াড় কোচের নামে কি কি বলে, লিপ্পি সেটা জানতে চেয়েছিলেন ব্যাজিওর কাছে। স্বভাবতই এরকম কাজ করতে, সতীর্থদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করতে ব্যাজিও রাজী হননি। ফলে ব্যাজিওর প্রতি আরো ক্রুদ্ধ হয়ে যান লিপ্পি। ব্যাজিওর প্রতি লিপ্পির অপছন্দের মাত্রাটা অবসেশানের পর্যায়ে গিয়ে ঠেকে। ব্যাজিওকে লিপ্পি এতটাই সহ্য করতে পারতেন না যে একদিন ট্রেনিংয়ে ৪০-গজের একটা বিশাল পাস দিয়ে ক্রিস্টিয়ান ভিয়েরিকে দিয়ে গোল করান ব্যাজিও, অসাধারণ পাস থেকে মুগ্ধ ভিয়েরি আরেক সতীর্থ রাইটব্যাক ক্রিস্টিয়ান পানুচ্চিকে নিয়ে খেলার মধ্যেই হাততালি দিয়ে অভিনন্দন জানাতে যান ব্যাজিওকে – আর সেই দৃশ্য দেখেই ক্ষোভে ফেটে পড়েন লিপ্পি…

“ভিয়েরি! পানুচ্চি! কি শুরু করেছ তোমরা? আমরা এখানে কেউই একে অন্যকে অভিনন্দন জানাতে আসিনি, সবাই এখানে সবার কাজ করতে এসেছি। তাঁর পাস দেওয়া কাজ সে পাস দিয়েছে এতে এত অভিনন্দন জানানোর কি আছে? এখানে কেউ কাউকে হাততালি দেওয়ার জন্য আসেনি, আর একই নিয়ম ব্যাজিওর ক্ষেত্রেও খাটে!”

কোচের এই রূপ দেখে স্তব্ধ হয়ে গেলেন ভিয়েরি, পানুচ্চি, এবং অবশ্যই – ব্যাজিও। পরে ইন্টার ডিফেন্ডার ইভান কর্দোবা স্বীকারও করেছিলেন ব্যাজিওর কাছে…

“তুমি ত ট্রেনিংয়ে আমাদের সেরা খেলোয়াড়, তাও কেন প্রতি সপ্তাহে তুমি খেলার সুযোগ পাওনা সেটা আমার বোধের বাইরে!”

ব্যাজিওর প্রতি লিপ্পির বিরাগ বোঝা যায় আরেকটা ঘটনার মাধ্যমে। ইন্টারের ক্যাফেটেরিয়ার একদিন নিজের সালাদে অতিরিক্ত পেপেরোনি চেয়েছিলেন ব্যাজিও। পরের দিন একই ওয়েইট্রেসের কাছে পেপেরোনি চাইলে সেই ওয়েইট্রেস দিতে অস্বীকৃতি জানান এই বলে যে, ব্যাজিও যদি অতিরিক্ত খাবার চান সেক্ষেত্রে তাঁকে ক্লাবের মেডিক্যাল ডিরেক্টরের কাছে পরামর্শ নিয়ে তারপর নিতে হবে। পরে মেডিক্যাল ডিরেক্টরের কাছে ব্যাজিও জানতে পারেন যে এরপর থেকে তিনি যা খেতে চাইবেন তাঁর জন্য লিপ্পির কাছ থেকে তাঁর অনুমতি নেওয়া লাগবে। বোঝাই যায় এর পিছনে কলকাঠি নেড়েছেন কে!

এই পরিস্থিতিতে ইন্টার প্রেসিডেন্ট মাসিমো মোরাত্তি ব্যাজিওর চুক্তির মেয়াদ বাড়াতে চাইলেন। একদিন তাঁরা নৈশভোজে দেখাও করলেন এই বিষয়ে আলোচনা করার জন্য। ব্যাজিও স্পষ্ট ভাষায় বলে দিলেন – ক্লাবে হয় লিপ্পি থাকেন, নয় তিনি। মোরাত্তি কথা দিলেন, চ্যাম্পিয়নস লিগ প্লে-অফে পারমার বিপক্ষে ম্যাচে যদি ইন্টার হেরে যায়, তাহলে লিপ্পিকে ছাঁটাই করা হবে। কিন্তু ভাগ্যের কি পরিহাস, সেই ম্যাচটি ৩-১ গোলে জেতে ইন্টার, আর জোড়া গোল করেন… রবার্টো ব্যাজিও! একরকম নিজেই পারমাকে হারিয়ে দিয়ে চ্যাম্পিয়নস লিগে ইন্টারকে জায়গা করিয়ে দেন ব্যাজিও। অথচ ম্যাচটি ব্যাজিওর খেলার কথাই ছিল না যথারীতি। রোনালদো, ভিয়েরি সবাই ইনজুরিতে পড়ার কারণেই একাদশে জায়গা পেয়েছিলেন ব্যাজিও, লিপ্পির চূড়ান্ত অনিচ্ছাসত্ত্বেও। পরে দুই০দুইটা ভুবনভোলানো গোল করে, পারমার গোলরক্ষক জিয়ানলুইজি বুফনকে পাড়ার গোলরক্ষক বানিয়ে দিয়ে ইন্টারকে চ্যাম্পিয়নস লিগে জায়গা করিয়ে দিয়েই সদর্পে মাথা উঁচু করে ক্লাব ছাড়েন ব্যাজিও। পরে ক্যারিয়ারের শেষ চার বছর তাঁর কাটে আরেক ইতালিয়ান ক্লাব ব্রেসিয়ায়।

ক্যারিয়ারের শেষ ক্লাব ব্রেসিয়ায়

পুরো ক্যারিয়ারজুড়েই বিভিন্ন কোচের সাথেই এরকম সাপে-নেউলে সম্পর্ক ছিল ব্যাজিওর। মার্সেলো লিপ্পি থেকে শুরু করে অস্কার তাবারেজ, ফ্যাবিও ক্যাপেলো, অ্যাজেগলিও ভিচিনি, সিজার মালদিনি, আরিগো সাচ্চি – কারোর সাথেই ঠিকভাবে চলতে পারেননি ব্যাজিও। এর পেছনে বেশ কিছু কারণ হতে পারে – ইতালিয়ান আলট্রা ডিফেন্সিভ ট্যাকটিকসের জমানায় ব্যাজিও ছিলেন অতি-আধুনিক আক্রমণাত্মক এক খেলোয়াড়, যেটা কিনা সাচ্চি কিংবা তাবারেজের মত ডিফেন্সিভ কোচদের পছন্দ নয়। কিংবা কারণটা হয়তোবা ছিল শুধুমাত্রই ইনজুরি-কেন্দ্রিক, নিয়মিত ইনজুরিতে পড়া একজন স্ট্রাইকারের ট্যালেন্টের পেছনে বাজী ধরার সাহস পাননি ভিচিনি, মালদিনি বা ক্যাপেলোর মত ম্যানেজাররা, কিংবা হয়তোবা কারণটা ছিল শুধুই অহংবোধের, লিপ্পির সাথে গোটা ক্যারিয়ারজুড়েই যা ছিল ব্যাজিওর। কিংবা ব্যাজিওর কথা মানলে কারণটা ছিল একটাই, ব্যাজিও তাদের থেকে অনেক বড় সুপারস্টার ছিলেন তাই তাঁরা ব্যাজিওর সুপারস্টারডমকে সহ্য করতে পারতেন না!

যাই হোক না কেন, টট্টি বা দেল পিয়েরোদের আগে ইতালির ফুটবলে নব্বইয়ের দশকে এরকম সুপারস্টার আর আসেননি। জুভেন্টাস কিংবদন্তী মিশেল প্লাতিনির মতে ব্যাজিও ঠিক নাম্বার নাইন বা প্রথাগত স্ট্রাইকারও যেরকম ছিলেন না, আবার একেবারে নাম্বার টেন বা ট্রেকোয়ার্টিস্টাও ছিলেন না। তিনি ছিলেন এই দুইয়ের মাঝামাঝি, দুটো কাজই তিনি করতে পারতেন সমানতালে, গোল করা ও করানো। তাই প্লাতিনি তাঁর পজিশানের নাম দিয়েছিলেন “নাইন অ্যান্ড হাফ” মানে সাড়ে নয়!

ইতালিতে আজ এই ট্রেকোয়ার্টিস্টাদের বড়ই অভাব। স্টেফান এল শারাউই, এডার, সিমোনে জাজা, চিরো ইমোবিলে, মানোলো গ্যাবিয়াডিনি, লরেঞ্জো ইনসিনিয়ে, গ্রাজিয়ানো পেলে, অ্যান্দ্রেয়া বেলোত্তি – এরা কি পারবেন সেই ব্যাজিওদের মত আপন আলোয় উদ্ভাসিত হতে? সময়ই বলে দেবে!

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

twenty − one =