দ্য কিউরিয়াস কেইস অফ ড্যানিয়েল স্টারিজ

২০১২-১৩ মৌসুমের শীতকালীন দলবদলের সময়েই চেলসি থেকে ১২ মিলিয়ন পাউন্ডের বিনিময়ে লিভারপুলে নাম লিখিয়েছিলেন ইংলিশ স্ট্রাইকার ড্যানিয়েল স্টারিজ। ফরোয়ার্ড লাইনে লুইস সুয়ারেজের বোঝা কমানোর জন্যই তৎকালীন ম্যানেজার ব্রেন্ডান রজার্স স্টারিজকে এনেছিলেন লিভারপুলে। কোচের আস্থার প্রতিদানও স্টারিজ দিয়েছিলেন সাথে সাথেই। সেই অর্ধ-মৌসুমে ১৬ ম্যাচে ১১ গোল করে জানান দিয়েছিলেন এতদিন চেলসি বা ম্যানচেস্টার সিটি তাঁর উপর ভরসা না করে একরকম ভুলই করেছিল। এরপর গোলের পর গোল করে লিভারপুলের মেইন স্ট্রাইকার হিসাবে স্টারিজ প্রতিষ্ঠিত করেছেন নিজেকে।

স্টারিজের গোল উদযাপন এখন আর দেখা যায়না নিয়মিত

কিন্তু আততায়ী ইনজুরির সাথে স্টারিজের সখ্যতা ত আজকের নয়। যেই মৌসুমে লুইস সুয়ারেজ লিভারপুল ছাড়লেন, মেইন স্ট্রাইকারের ব্যাটনটা সুয়ারেজের কাছ থেকে স্টারিজের বুঝে নেওয়ার কথা ছিল তখনই। কিন্তু একের পর এক ইনজুরি সেটা হতে দিল কই?

বেশ কয়েক মৌসুম আগেও লিভারপুল বলতে মানুষ দুই-একজনের দলই বুঝত। জেরার্ড-টরেস, কিংবা জেরার্ড-সুয়ারেজ, জেরার্ডের অবসর ও সুয়ারেজ টরেসের বিদায়ের পর ইনজুরি থেকে যখনই মুক্তি পেয়েছেন সেই “ত্রাণকর্তা” এর ভূমিকা স্টারিজও পালন করেছেন মাঝে মাঝে। কিন্তু দৃশ্যপট বদলাতে শুরু করে ব্রেন্ডান রজার্সের সময়ের শেষ থেকে শুরু করে জার্মান কোচ ইয়ুর্গেন ক্লপ আসা পর্যন্ত। এখন কোন এক নির্দিষ্ট পারফর্মারের দল লিভারপুল নয়। আছেন দুই ব্রাজিলিয়ান অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার ফিলিপ ক্যুটিনিও ও রবার্টো ফার্মিনিও (যিনি কিনা স্ট্রাইকার হিসেবেও খেলতে পারে, খেলছেন), আছেন সেনেগালিজ উইঙ্গার সাদিও মানে। মিডফিল্ডে আছে জর্ডান হেন্ডারসনের সদর্প উপস্থিতি, নিজের যোগ্যতাবলেই যিনি কিনা জেরার্ডের কাছ থেকে অধিনায়কত্বের দায়িত্বটা বুঝে নিয়েছেন , আর ডিফেন্সে আছেন প্রিমিয়ার লিগের বহু বছরের পোড় খাওয়া সৈনিক জেইমস মিলনার ও নির্ভরতার প্রতীক ন্যাথানিয়েল ক্লাইন।

এখন বিষয়টা যেটা হয়েছে, আগে কিছুদিন যেরকম জয়ের জন্য লিভারপুল শুধু স্টারিজের ঝলকের আশায় বসে থাকত, এখন সেটা হচ্ছে না। ফলে স্টারিজও স্কোয়াডে নিজেকে একরকম ভিন্ন ভূমিকায় আবিষ্কার করছেন, সুস্থ থাকলেই যে স্ট্রাইকারের মূল একাদশে খেলাটা নিশ্চিতই ছিল, সেই স্টারিজ আর নিজেকে আর দশটা স্কোয়াড প্লেয়ার হিসেবেই নিজেকে খুঁজে পাচ্ছেন। ইয়ুর্গেন ক্লপের লিভারপুল এখন আর স্টারিজ-নির্ভর নয়।

এবং এতে স্টারিজ সবচেয়ে বেশী দোষ দিতে পারেন তাঁর ভাগ্য ও ইনজুরিকে, একের পর এক ইনজুরিতে পড়ে তাঁর ক্যারিয়ারটাই এখন পড়েছে হুমকির মুখে। ডি-বক্সে দ্রুত ও চতুর মুভমেন্টের জন্য যে স্টারিজ ছিলেন বিধ্বংসী, এখন সেই স্টারিজের দ্রুততা কমেছে আশঙ্কাজনক হারে। স্কাই স্পোর্টসের একটা গবেষণায় বের হয়ে এসেছে গত চার বছরে স্টারিজের গতি কমেছে বৈ বাড়েনি। এই চার বছরে স্টারিজের গড় গতিবেগ হল –

২০১৩-১৪ মৌসুম : ৩২.৪ কি.মি/ঘন্টা

২০১৪-১৫ মৌসুম : ৩০.৫ কি.মি/ঘন্টা

২০১৫-১৬ মৌসুম : ২৯.৫ কি.মি/ঘন্টা

২০১৬-১৭ মৌসুম : ২৮.৫ কি.মি/ঘন্টা

ইনজুরিমুক্ত হয়ে থাকতে পারলে স্টারিজের সেই প্রতিভা ছিল ইংল্যান্ডের ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম স্ট্রাইকার হবার

অর্থাৎ যে স্টারিজ আগে লিভারপুলের অন্যতম দ্রুততম খেলোয়াড় ছিলেন, আজ সেই স্টারিজই দলের অন্যতম ধীরগতির খেলোয়াড়, এবং এটার কারণ শুধুমাত্রই তাঁর একের পর এক ইনজুরি। ফর্ম ও গতির এহেন অধঃপতনের কারণে স্বাভাবিকভাবেই মূল একাদশে স্টারিজ আর অবিচ্ছেদ্য কেউ নন, তাঁর জায়গায় মূল স্ট্রাইকার হিসেবে ব্রাজিলিয়ান রবার্টো ফার্মিনিও কিংবা বেলজিয়ান ডিভক অরিগিকেই বেশী পছন্দ ইয়ুর্গেন ক্লপের। আর ক্লপের কোচিংয়ের মূল মন্ত্রই হচ্ছে প্রেসিং। সেই প্রেসিং করার জন্য স্ট্রাইকার হিসেবে যে খেলবেন তাঁর সতীর্থদের সাথে লিঙ্ক-আপ করে খেলার যোগ্যতাটা থাকা লাগে অনেক বেশী। যেই ক্ষমতাটা স্টারিজের আগে থাকলেও এখন ফর্ম ও গতিহীনতার কারণে অনেকটাই হারিয়ে গেছে, এখন টিপিক্যাল টার্গেটম্যানের মত স্টারিজের সামনে বল বানিয়ে দেওয়া লাগে গোল করার জন্য। সমস্যা আছে এখানেও। ফর্মহীনতার কারণে একটা স্ট্রাইকারকে গোলস্কোরিং পজিশানে সবসময় ঘুরঘুর করার যে প্রবণতাটা থাকা উচিত সেটা স্টারিজের একরকম নাই হয়ে গেছে। যে বিষয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন ইয়ান রাশ ও জেইমি ক্যারাঘারের মত লিভারপুল কিংবদন্তীরা। এভাবে আর কিছুদিন চলতে থাকলে হয়তোবা সামনের গ্রীষ্মকালীন দলবদলের বাজারেই  লিভারপুল ছাড়তে হবে ড্যানিয়েল স্টারিজকে।

আশার কথা হল, এতকিছুর পরেও স্টারিজের বয়স এখনো মাত্র ২৭। বারবার ইনজুরির ছোবল থেকে মুক্ত হতে পারলে এখনো তাই তাঁর সামনে সুযোগ আছে অবারিত নিজেকে মেলে ধরার।

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

8 + sixteen =