দ্য আল্টিমেট ক্রিশ্চিয়ানো শো

অতি সম্প্রতি নতুন এক স্বপ্নের কথা জানিয়েছিলেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো ।
স্বপ্ন প্লে-ষ্টেশন গোলের ।
প্রতিপক্ষের ১১ জনকে কাটিয়ে বল জালে জড়ানোর স্বপ্ন পূরণ শুধু রোনালদো নয়, বিশ্বের কোন ফুটবলারেরই হয়নি আজ অব্দি ।
চিতা গতির সাথে হরিণী ড্রিবলিংয়ের সেই রোনালদো তার সেরা সময়টা পেছনে ফেলে এসেছেন । তবে ৩১ বয়সী তথাকথিত বুড়িয়ে যাওয়া, ফুরিয়ে রোনালদো আজ আবারও দেখিয়ে দিলো বুড়ো সিংহ কে দুর্বলতা পেয়ে বসতে পারে- কিন্তু তাকে নয় ।
ঘরোয়া লীগে তার দল রিয়াল মাদ্রিদ শিরোপার দৌড়ে বলতে গেলে ছিটকেই পড়েছে ।
কিন্তু হাল ছাড়লে তো আর চলবেনা ।
দল ডুবন্ত থাকুক কিংবা থাকুক উড়ন্ত, দিতে হবে নিজের সেরাটা । যে সেরাটা দিতে সদা উন্মুখ পর্তুগীজ মহাতারকা । তবে সেরাটা দিতে রোনালদোর প্রতিপক্ষ শুধু প্রতিপক্ষই নয়, তালিকায় মিডিয়ার কালো দিকটিও আছে ।
অহেতুক খোঁচানো, বক্তব্যর অপব্যাখ্যা সব মিলিয়ে মিডিয়া যেন রোনালদোর দ্বাদশতম প্রতিপক্ষ । এইতো কয়েকদিন আগে ঘরের মাঠে নগর প্রতিদ্বন্দ্বীদের কাছে হারের পর এক মন্তব্যের অপব্যাখ্যার পসার সাজিয়ে বসে হলুদ মিডিয়া । পরে অবশ্য প্রকৃত ব্যাখাটি রোনালদোই দেন ।
ফুটবলটা দলীয় খেলা । আর সেখানে সেরা সতীর্থদেরই পাশে চায় প্রত্যেকে । রোনালদোও চেয়েছিল । কিন্তু গণমাধ্যম সেটি তার ঔদ্ধত্য, অহংবোধ বলে চালিয়ে দিলো অবলীলায় ।
তবে ‘Your hate makes me unstoppable’ উক্তির জনক রোনালদো যে সকল বাধাই আপন মহিমায় ডিঙ্গাবে তা খোদ সমালোচকদের জানা ।
পরের ম্যাচেই এক গোল ও এক এসিস্টে সমালোচনার জবাব দিয়েছিলেন । তবে ষোলকলা পূর্ণ করলেন অদ্য ঘরের মাঠে

জবাব দিতে আবারও বার্নাব্যুকে বেছে নেন ক্রিশ্চিয়ানো । প্রতিপক্ষ এই মৌসুমে চমক দেখানো দল সেল্টা ভিগো ।
ঘরের মাঠে আবারও ভাঙ্গাচোড়া দল নিয়ে মাঠে তার দল রিয়াল মাদ্রিদ । বেঞ্জেমা, বেল, মদ্রিচ, ক্রুসদের ছাড়া রিয়াল মাদ্রিদ কিছুটা শংকাগ্রস্থ থাকলেও রোনালদো যেন ছিলেন দৃঢ় প্রত্যেয়ী । প্রত্যেয়ী তাকে থাকতেই হত । আজ যে তায় জবাব দেওয়ার দিবস ।
আর জবাব দেওয়ার এই দিবসে অপেক্ষাকৃত ছোট তারকারা রোনালদোকে দিয়েছে যোগ্য সহচার্য ।
ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ শুরু থেকেই স্বাগতিকদের হাতে । অবশ্য প্রথম ভয়ংকর আঘাতটা সফরকারী সেল্টাই হানে । ১৩ মিনিটে আসপাসের হেড বারে লেগে ফেরত আসার পর ফিরতি শটটি অসম্ভব দৃঢ়তায় ফিরিয় দেন রিয়ালের কোষ্টারিকান গোলরক্ষক কেইলর নাভাস ।
এরপর ২০ মিনিটে প্রথম হানা আসে রোনালদোর কাছে থেকে । অবশ্য ক্রিসের বা পায়ের দুরবর্তী শটটি ঠেকিয়ে দেয় প্রতিপক্ষ গ্লাভসম্যান রুবেন ব্ল্যাংকো ।
এরই মিনিট দুয়েক পর স্বাগতিকদের আবারও হতাশ করেন রুবেন ।
ডি-বক্সের ভেতর থেকে ইস্কোর গোলমুখী শটটি অসামান্য চতুরতায় ফিরিয়ে দেন এই তরুন । এরপরও সফরকারীরা খুচরো গোটা কয়েক ফিরতি আক্রমণ করলেও পজেশনিং নিয়ে মাঠের নিয়ন্ত্রণ জিদান শিষ্যদের কাছেই ছিলো । মধ্যমাঠে রাজত্ব করলেও সেল্টা রক্ষণ প্রহরীদের দৃঢ়তায় মাদ্রিদ গোল বন্ধ্যাত্বয় ভূগছিলো । ৪০ মিনিটে কর্ণার থেকে উড়ে আসা বলটি ক্যাসিমিরো মাথায় লাগালেও শেষ পর্যন্ত রুবেন ও বারের কাছে তা পরাস্ত হয় । ঠিক এর মিনিট খানেক পর ফিরতি কর্ণারেই আসে রিয়ালের প্রথম সাফল্য ।
দলের গোল বন্ধ্যাত্ব ঘোঁচান রিয়ালের পুরোনো রক্ষণ প্রহরী পেপে দ্য ডেস্ট্রয়ার ।
কর্ণার থেকে গোলটির যোগানদাতা ছিলেন ইস্কো অ্যালার্কন ।
১-০ তে এগিয়ে থেকে প্রথমার্ধ বিরতিতে যায় রিয়াল মাদ্রিদ ।
প্রথমার্ধের মিনিট পাঁচেক পরই শুরু হয় ‘দ্য আল্টিমেট ক্রিশ্চিয়ানো শো’ ।
অধিনায়ক রামোসের বাড়িয়ে দেওয়া বলটি দু কদম ঘুরিয়ে দুর পাল্লার শটে লক্ষ্যভেদ করেন সিআর সেভেন ।
দুরন্ত গতির শটটি রুবেনকে করে আশ্চর্যন্বিত, বার্নাব্যুবাসীকে করে আন্দোলিত ।
গোলটিতে যখন জবাবের প্রশ্ন তখন উদযাপনও হলো মোক্ষম । সমালোচকদের উদ্দেশ্য ‘কান্ট হিয়ার’ ভঙ্গিমা অতঃপর নিজের ট্রেডমার্ক উদযাপন ।
সমালোচকদের পর স্বভাবসূলভ ফ্ল্যাইং কিসের মাধ্যমে ভক্তদের উদ্দেশ্যও জবাব ছোঁড়েন রোনালদো । যে জবাবে ছিল পাশে থাকার ধন্যবাদ জ্ঞাপন ।
২-০ এগিয়ে গিয়ে মাদ্রিদ আর ঠেসে ধরলো প্রতিপক্ষকে ।
চাঁপের মধ্যে নিজেদের ডি-বক্সের সামনে ফাউল করে বসে সেল্টার মিডফিল্ডার ।
স্বভাবসূলভ দু কদম পিছিয়ে এসে ফ্রি-কিকের প্রস্তুতি রোনালদোর ।
ওয়ান স্টেপ, টু স্টেপ, শট এ্যাণ্ড বুম ! রোনালদোর আরেকটি গোল, আরেকটি জবাব ।
রুবেন ব্ল্যাংকোর কিছুই করার ছিলোনা শুধু চেয়ে দেখা ছাড়া । রোনালদোর দিনে তার এমন রকেট গতির শট আটকানোর মত কেউ কি আছে ?
৩-০ এগিয়ে গিয়ে ম্যাচটি তখন সম্পূর্ণ রিয়াল মাদ্রিদের পকেটে ।
তবে ম্যাচ পকেটস্থ করেই ক্ষান্ত নন রোনালদোর মাদ্রিদ । তাদের যে আরও গোল চাই । মিনিট দুয়েক পর আবারও এ্যাঙ্গেল ফ্রি-কিক থেকে রোনালদোর গতিময় শট । তবে এবারের জয়ী রুবেন ব্ল্যান্কো । ডান দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ে রোনালদো তথা মাদ্রিদকে চরম হতাশ করেন এই যুবা গোলরক্ষক ।
রুবেনে উজ্জ্ববিত সেল্টা এবার চূড়ান্ত আঘাত হানে মাদ্রিদ জালে । ৬২ মিনিটে চমত্‍কার কাউন্টার এ্যাটাকে আসপাস জুনাকল পেছনে ফেলেন রামোস-পেপেদের । অতঃপর চতুর চিপে পরাস্ত করেন নাভাসকে ।
এই এক গোল পরিশোধ যেন আর কাল হয়ে দাঁড়ালো আসপাস, নোলিতোদের ।
মিনিট দুয়েক পর এবার রোনালদো আল্টিমেট শো পায় পূর্ণতা । ইস্কোর বাড়িয়ে দেওয়া পাস বিনা বাধায় জালে জড়িয়ে আরেকটি হ্যাট্রিক করেন হ্যাট্রিক বরপুত্র রোনালদো ।
৬৫ মিনিটে মাঠে নামেন ইনজুরি ফেরত গ্যারেথ বেল । প্রায় ৪৭ দিন পর মাঠে ফেরেন এই ওয়েলস তারকা ।
বেলের আগমণে তখন নতুন উদ্দ্যমে সফরকারীদের উপর ঝাঁপিড়ে পড়ে অল হোয়াইটরা ।
ফলাফল রোনালদোর শেষ পেরেক । বদলী খেলোয়ার জেসে রদ্রিগেজের কর্ণার ক্রস কে এবার মাথা দিয়ে শাসান ক্রিশ্চিয়ানো ।
ম্যাচে তার এই চতুর্থম গোল তাকে পৌছে দেয় তিনটি ব্যক্তিগত মাইলস্টোনে ।
তেলমো জারাকে পেছনে ফেলে রোনালদো এখন লা লীগার ২য় সর্বোচ্চ গোল সংগ্রাহক,
রিয়ালের হয়ে 250 তম গোল এবং এটি ইউরোপীয়ান শীর্ষ পাঁচ লীগের দ্রুততম । রিয়ালের তখন ব্যস্ততম সময় । ব্যস্ত একেকটি গোল উদযাপনে ।

রোনালদোকে গোল করিয়ে এবার নিজে গোল করলেন মাদ্রিদের ইয়ুথ প্রোডাক্ট জেসে ।
সর্পিল ভঙ্গিমায় বেঁকে জেসের চমত্‍কার ফিনিশে জিদান শিষ্যরা এগিয়ে ৬-১ এ ।
এরপরও থামেনি লস ব্ল্যান্কোসরা ।
সিআর সপ্তমের দিনে এবার ৭ম গোলটি আসে বেলের পা থেকে ।
গতিতে পরাস্ত অতঃপর বারে চুমু দিয়ে স্কোরলাইন তখন ৭-১ !
শেষ পর্যন্ত এই সমীকরণেই থামে স্বাগতিকরা । দুর্দান্ত এ জয়ে
সমালোচকদের জবাব এসেছে প্রতিটি বিভাগেই । ধ্বংসযজ্ঞে নেতৃত্ব দেওয়া রোনালদোর ইতিহাস গড়ার ম্যাচটি তার বুড়িয়ে যাওয়া জবাব দিলো । জবাব দিলো ফুরিয়ে যাবার । জবাব এসেছে ট্যাপ ইনের । জবাব এসেছে ফ্রি-কিকের । আসছে সপ্তাহে রোমা ক্ল্যাশে এই জয় আর জবাবটি যে রিয়াল-রোনালদোয় দারুন ভূমিকা রাখবে তা বলাই বাহুল্য ।

‪#‎Viva_cr7‬
‪#‎Hala_Madrid‬

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

3 × 5 =