দ্যা রোয়ার অফ দ্যা থান্ডার

 

ষাটের দশক । তখনকার ইতালিতে স্ট্রাইকারদের গড় উচ্চতা ছিল মাত্র ৫ ফুট ৭ ইন্চি , অন্যান্য দেশের তুলনায় বেশ বেঁটেই বলা চলে । ১৯৬৪-৬৫ মৌসুমের শুরুতে সিরি বি থেকে সিরি আ তে উঠে আসা ক্যালিয়ারির হয়ে মাঠে নামেন প্রায় ৬ ফুট উচ্চতার সুঠাম দেহী একজন স্ট্রাইকার । মাঠে নেমেই যেন সবাইকে নিজের খেলার মোহতে জড়িয়ে ফেললেন তিনি । এদিক সেদিক আস্তে আস্তে দৌড়ে চিত্‍কার করে দলকে পরিচালনা করছিলেন , যদিও তিনি কাপ্তান ছিলেন না । প্রতিপক্ষের রক্ষণের খেলোয়াড়েরা ভাবলেন , এই স্ট্রাইকার তো অলস , যাক আজ বোধ্হয় একটু ছুটি পাওয়া গেলো । কিন্তু বল পায়ে পেলেই ঐ খেলোড়টি বিদ্যুতের গতিতে দৌড়ানো শুরু করতেন । এতো দ্রুত যে ডিফেন্ডার রা সামনে থেকে দৌড় শুরু করেও তাঁর কাছে যেতে পারতেন না । তাঁর পায়ে যেন বল আঠার মত লেগে থাকতো । এতো বড় সড় শরীর নিয়ে দৌড়ানোর ক্ষমতাই শুধু নয় , গোল করার ও সমান ক্ষমতা ছিল তাঁর । বিদ্যুত গতির দৌড়ের জন্য তাঁর নাম ই হয়ে গেলো ” রোআর অফ দা থান্ডার ” ।

লুইজি রিভা । ইতালিতে আদর করে ডাকা হয় জিজি রিভা নামে । দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মাঝেই ১৯৪৪ সালের ৭ নভেম্বর ইতালির লেগুইনো তে জন্মগ্রহণ করেন তিনি । কৃষক পরিবারের সন্তান রিভার ফুটবলের প্রতি ছিল ভয়ানক আগ্রহ । তাঁর এই আগ্রহ দেখেই তাঁর বাবা তাঁকে নিয়ে যান স্থানীয় ক্লাব লেগানো তে । প্রথম ট্রায়ালেই একেবারে মূল একাদশে ঢুকে যান রিভা । বয়স তখন কেবল ১৬ থেকে ১৭ তে পড়েছে । লেগানোর হয়ে সিরি সি তে এক মৌসুম খেলার পরই সিরি বি এর ক্লাব ক্যালিয়ারির স্কাউটদের নজরে পড়ে যান রিভা । অসাধারণ বল কন্ট্রোল , দুই পায়েই শুট করার ক্ষমতা , ক্লিনিকাল ফিনিশিং , সাথে অতিরিক্ত উচ্চতা , শক্তি , ভীষণ জোড়ে দৌড়াবার আর ফ্রী কিকে গোল করার ক্ষমতা । সময় নষ্ট না করে ১৯৬২ সালের দল বদলের মৌসুমের শুরুতেই তাঁকে দলে ভেড়ায় ক্যালিয়ারি । সিরি বি তে ঐ মৌসুমে মোট ২৩ ম্যাচে ৯ গোল করেন , দলকে সিরি আ তে উঠিয়ে আনতে রাখেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ।

১৯৬৪-৬৫ সালের সিরি আ তে ৩২ বার মাঠে নেমে ৯টি গোল করেন । পরের মৌসুমে ৩৪ ম্যাচে ১১ গোল । ১৯৬৬ বিশ্বকাপের আগেই পর্তুগালের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচে খেলতে যেয়ে বাম পা ভেঙ্গে ফেলেন তিনি । বিশ্বকাপটাও খেলা হয়নি সেবার । পরের মৌসুমে ফিরে ২৩ ম্যাচে ১৮ গোল করে সিরি আ এর সর্বোচ্চ গোলদাতা হন রিভা । পরের মৌসুমে ও ইন্জুরির কারণে বেশি খেলতে পারেননি তিনি , ২৬ ম্যাচ খেলে করেন ১৩ গোল ।

১৯৬৮-৬৯ মৌসুমে সম্পূর্ণ সুস্থ রিভা ২৯ ম্যাচে করেন ২১ টি গোল , দ্বিতীয়বারের মতো জিতে নেন সিরি আ এর সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরস্কার । ১৯৬৮ সালের ইউরো ফাইনালে তাঁর জয়সূচক গোলেই ইতালি ইউরো চ্যাম্পিয়ন হয় ।

ইতালির হয়েও ছিলেন সমভাবে উজ্জ্বল
ইতালির হয়েও ছিলেন সমভাবে উজ্জ্বল

১৯৬৯-৭০ মৌসুমে টানা দ্বিতীয় ও তৃতীয়বারের মতো সিরি আর সর্বোচ্চ গোলদাতা হন রিভা । ঐ মৌসুমেই ক্যালিয়ারি তাদের ইতিহাসের একমাত্র স্কুডেট্টোটি জেতে । ১৯৭০ বিশ্বকাপের পুরোটা সময় ধরেই ছিলেন উজ্জ্বল । ঐ বিশ্বকাপের আগে জাতীয় দলের হয়ে করেছিলেন ১৬ ম্যাচে ১৯ গোল ! ! ‘৭০ বিশ্বকাপে ইতালির সর্বোচ্চ গোলদাতাও ছিলেন রিভা । সেমিফাইনালে “ম্যাচ অফ দা সেঞ্চুরি” খ্যাত জার্মানীর সাথে ঐ ম্যাচের ইতালির জয়সূচক গোলটিও করেছিলেন রিভা । কিন্তু ফাইনালে পেলের ব্রাজিলের কাছে হেরে যায় ইতালি । বিশ্বকাপের পর অস্ট্রিয়ার সাথে প্রীতি ম্যাচ খেলতে যেয়ে আবার পা ভেঙ্গে বসেন রিভা । এই ইন্জুরি ই তাঁকে আর ঘুরে দাঁড়াতে দেয় নি ।

য়ুভেন্তাসের মত ক্লাবের প্রলোভনেও ক্যালিয়ারি ছাড়েননি জিজি রিভা
য়ুভেন্তাসের মত ক্লাবের প্রলোভনেও ক্যালিয়ারি ছাড়েননি জিজি রিভা

১৯৭৩ সিরি আ মৌসুমের শুরুতেই ২৯ বছর বয়সী রিভাকে দলে ভেড়াতে প্রস্তাব দেয় য়ুভেন্তাস । কিন্তু সে প্রস্তাব নাকচ করে দিয়ে ক্যালিয়ারি তেই থেকে যান রিভা । ১৯৭৪ বিশ্বকাপে খুব একটা ভালো খেলেন নি , বারবার ইন্জুরি আক্রান্ত হয়ে মাঠের বাইরে ছিটকে যাওয়া রিভার ফর্মটাও ছিল পড়তির দিকে । ১৯৭৬ সালে মিলানের সাথে খেলার সময় ডান উরুর টেন্ডন ছিঁড়ে ফেলেন রিভা । এই ইন্জুরি ই তাঁকে ছিটকে দেয় ফুটবল থেকে । ১৯৭৮ সালে সকল প্রকার ফুটবল থেকে অবসর নিয়ে নেন রিভা ।

310x0_1415176167977_rainews_20141105085540312

১৬ বছরের ফুটবলীয় ক্যারিয়ারের ১৫ বছর ই ক্যালিয়ারির হয়ে খেলেছেন রিভা । ক্যালিয়ারির পক্ষে ৩১৫ ম্যাচে করেছেন ১৬৪ টি গোল , একদমই তারকাবিহীন একটি ক্লাবের হয়ে জিতেছেন একটি স্কুডেট্টো , নিজে জিতেছেন তিনটি সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরস্কার । দেশের হয়েও তিনি ছিলেন সমান উজ্জ্বল । একটি ইউরো জয় ও একবার বিশ্বকাপে রানার্সআপ হবার যোগ্যতা অর্জন করেন , জাতীয় দলের হয়ে মাত্র ৪২ ম্যাচ খেলে করেছেন ৩৫ টি গোল । তিনি এখনো ইতালির হয়ে সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা । তাঁর অবসরের পর তাঁর সম্মানে ক্যালিয়ারি তাঁদের ১১ নাম্বার জার্সিটি চিরতরে উঠিয়ে রেখেছে ।

 

আজ এই মহান কিংবদন্তীর জন্মদিন। শুভ জন্মদিন, জিজি!

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

five − three =