দ্যা গ্র্যান্ড ক্যাপ্টেন

যাকে নিয়ে লিখছি ,  তিনি  হতে পারতেন নির্দ্বিধায় সর্বকালের সেরা মিডফিল্ডার । মাত্র ১২ বছরের ফুটবল ক্যারিয়ার  , তার মাঝে আবার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বাগড়া । মোটামুটিভাবে ৯ বছর খেলেছেন । কোন বিশ্বকাপও খেলতে পারেননি,ইতালির হয়ে মাত্র ১২ টি ম্যাচ খেলেছেন । তবুও তাঁকে ইতালির অন্যতম সর্বকালের সেরা খেলোয়াড় বলা হয় ।

খেলোয়ড়টির নাম ভ্যালেন্তিনো মাজ্জোলা । ইতালির মিলানের একটি ছোট্ট গ্রাম কাসানো ডি আদাতে ১৯১৯ সালে জন্মগ্রহণ করেন এই ক্ষণজন্মা ফুটবলার । জীবনের প্রধান সময়টুকুই খেলেছেন তোরিনোর হয়ে । ফুটবলের প্রথম    “ পার্ফেক্ট মিডফিল্ডার “ও বলা হয় তাঁকে । গোল করার এবং করানোর ক্ষমতা যেমন ছিল  , তেমনি ছিল ট্যাকল করাও ডিফেন্স করার অসাধারণ ক্ষমতা ।

মাত্র ১৮ বছর বয়সে স্থানীয় ক্লাব আলফারোমিও এর ডাক পান । মাত্র একবছর খেলার পরই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ উপলক্ষে ভেনেজিয়া নেভি ফ্লীট এ ডাক পান । সেখানেই ভেনেজিয়া ফুটবলক্লাবে প্রথম ট্রায়াল দেবার সুযোগ পান । ফুটবল খেলার জন্যে সবার বুট থাকলেও তাঁর কোন বুট ছিলোনা । ট্রায়াল দেবার সময় কোচ  যখন  বুটের  কথা  জিজ্ঞেস  করেন  ,  তখন মাজ্জোলার কাট ছাঁট জবাব   ,  “ দলে সুযোগ পেতে আমার বুট পড়ে খেলার প্রয়োজন নেই। ” ভেনেজিয়ার হয়ে তিন মৌসুম খেলে যোগ দেন তোরিনোতে । এ দল বদলের বিষয়ে রয়েছে এক মজার ঘটনা । ভেনেজিয়ার হয়ে অসাধারণ খেলতে থাকা মাজ্জোলাকে নিজেদের দলে ভেড়াতে মৌখিক কথাবার্তা সম্পন্ন করে রেখেছিল য়ুভেন্তুস । কিন্তু তৎকালীন তোরিনো ম্যানেজার প্রায় ২ লক্ষ লিঁরা এবং ২ জন খেলোয়াড়ের বিনিময়ে ঐ মৌসুম শেষ হবার আগেই মাজ্জোলাকে কিনে নেন । মাজ্জোলার দল বদলের এই খবর ঐ মৌসুম শেষ হবার আগেই ফাঁস হয়ে যায় । ভেনেজিয়ার ঐ মৌসুমের শেষ খেলাটি ছিল তোরিনোর বিপক্ষেই , নিজেদের মাঠে । খেলার শুরু থেকেই ভেনেজিয়ার সমর্থকরা মাজ্জোলাকে  “সেলআউট”  বলে খ্যাপানো করা শুরু করে । ঘটনার অবনতি ঘটে যখন মাজ্জোলার ভুলে তোরিনো ১ গোলে এগিয়ে যায় । প্রথমার্ধ এভাবেই শেষ হয় । দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই প্রচণ্ডভাবে রেগে থাকা মাজ্জোলা দর্শকদের উদ্দেশ্যে মধ্যাঙ্গুলি প্রদর্শন করে খেলা শুরু করেন । এবং দ্বিতীয়ার্ধে করা তাঁর হ্যাট্রিকেই ভেনেজিয়া ম্যাচটি ৩-১ গোলে জিতে নেয় ।

পরের মৌসুমে তোরিনোতে যোগ দিয়েই পেয়ে যান অধিনায়কত্ব । তাঁর অসাধারণ ব্যাক্তিত্বপূর্ণ অধিনায়কত্বেই তোরিনো তাদের ইতিহাসের স্বর্ণশিখরে আরোহণ করে । তাঁর ব্যাক্তিত্বপূর্ণ উপস্থিতিই একটা খেলা জিতাতে যথেষ্ট ছিলো । মাজ্জোলা সব সময়ই ফুলহাতা জার্সি পড়তেন । যখন কোন খেলায় তার দল খারাপ খেলতো  ,  তিনি হাতা গুটিয়ে হাফহাতা করে সতীর্থদের জানান দিতেন যে তাদের খেলা মাজ্জোলার পছন্দ হচ্ছে না । তাঁর ব্যাক্তিত্বপূর্ণ ক্যাপ্টেন্সি সম্পর্কে তাঁর সতীর্থ মারিয়ো রিগামন্তি বলেছিলেন  ,  “আমরা ১০ জন মিলে দলের অর্ধেক দায়িত্ব পালন করি ,  আর মাজ্জোলা একাই বাকি দায়িত্ব পালন করেন ।

ইতালি টিমে তাঁর সাথে তৎকালীন মিলান অধিনায়ক ইজিও লয়িক এর পার্টনারশিপটা দারুণ ছিলো । এই দুজন কে একসাথে  “মেজ্জিয়লা”  নামে ডাকা হতো । এই বন্ধুত্বের সমাপ্তি ঘটে ১৯৪৯ সালের  “সুপার গা এয়ার ডিসাস্টার”  এর মাধ্যমে  , যাতে তোরিনোর প্রথম একাদশের ৯ জন খেলোয়াড়ের সাথে তোরিনোর ফ্যানদের পরম শ্রদ্ধার , সম্মানের মাজ্জোলা মারা যান মাত্র ৩০ বছর বয়সে ।

তোরিনোর হয়ে ৭ বছরের ক্যারিয়ারে ২০৪ ম্যাচে ১১৮ গোল এবং মোট ৫টি স্কুডেট্টো জিতেছেন এই মিডফিল্ডার  ( পুরো ক্যারিয়ারে ২৬৫ ম্যাচ খেলে করেছেন ১৩০ গোল  , ইতালির পক্ষে ১২ ম্যাচে ৪ গোল   ) । খেলাধুলার বাইরে , পারিবারিক জীবনে ২ সন্তানের বাবা ছিলেন । তাঁর বড় ছেলে সান্দ্রোকে একটু আলাদাভাবেই ভালোবাসতেন । তাই ডিভোর্স হয়ে যাবার পর ও  ছেলেকে নিজের কাছে এনেছিলেন । অসুস্থতা এবং ছেলের আবদার উপেক্ষা করে দেশের হয়ে খেলতে গিয়ে ছিলেন হাঙ্গেরীর বিপক্ষে । কিন্তু আদরের ছেলের কাছে আর ফেরা হয়নি ।

তোরিনোর সমর্থকরা তাঁর স্মরণে তাঁকে  “দ্যা গ্র্যান্ড ক্যাপ্টেন”  উপাধি দেয় । এখনো তোরিনোর ফ্যানদের কান্না ভরা দীর্ঘশ্বাসে ভেসে আসে ফুটবলের প্রথম “পারফেক্ট মিডফিল্ডার” ভ্যালেন্তিনো মাজ্জোলার নাম ।

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

three × 4 =