দুর্দান্ত নাপোলি : মরিজিও সাররির ট্যাকটিকস ও অন্যান্য

দুর্দান্ত নাপোলি মরিজিও সাররির ট্যাকটিকস ও অন্যান্য

গত কয়েক বছরে ইতালিয়ান সিরি আ সম্পর্কে আলোচনা হলেই যেসব বিষয়গুলো সবার চোখে পড়েছে সেটা হল জুভেন্টাসের একের পর এক শিরোপা জয়, আন্তোনিও কন্তের নিজেকে বিশ্বের অন্যতম সেরা একজন কোচ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা, এসি মিলান থেকে সিলভিও বার্লুসকোনির বিদায়, এসি মিলান ও ইন্টার মিলানে চাইনিজ মালিকানার সূচনা হওয়া, কতিপয় খেলোয়াড়ের নিজেকে বিশ্বমঞ্চে প্রতিষ্ঠিত করা যেমন – পাওলো ডিবালা, মাউরো ইকার্দি, আলেক্স সান্দ্রো, লরেঞ্জো ইনসিনিয়া, আলেসসিও রোমানিওলি, রাজ্জা নাইঙ্গোলান ইত্যাদি। গত ছয় বছর ধরে সিরি আ জিতছে জুভেন্টাস। এই ছয়বার রানার্সআপ হওয়া দলের মধ্যে তিনবার ছিল এএস রোমা, দুইবার ছিল নাপোলি, একবার ছিল এসি মিলান। গত ছয়বছরে নাপোলি তৃতীয় হয়েছে দুইবার। অর্থাৎ হিসেব করলে গত ছ’বছরে সিরি আ চ্যাম্পিয়ন একবারও না হলেও দুইবার তৃতীয় ও দুইবার দ্বিতীয় হয়েছে তারা।

অর্থাৎ তাদের উন্নতিটা হচ্ছে অনেক ধীরে ধীরে। আর্জেন্টাইন মহাতারকা ডিয়েগো ম্যারাডোনার আমলে দুইবার সিরি আ জেতা নাপোলি এই মৌসুমেও এখন পর্যন্ত আছে পয়েন্ট টেবিলের দ্বিতীয় অবস্থানে। শীর্ষে থাকা ইন্টার মিলানের চেয়ে এক ম্যাচ কম খেলা নাপোলি ইন্টারের থেকে পিছিয়ে আছে এক পয়েন্টে। অর্থাৎ নিজেদের পরের ম্যাচ জিতলেই পয়েন্ট টেবিলের শীর্ষস্থানে চলে যাবে তারা। আর যেহেতু এবার জুভেন্টাস এর মধ্যেই শীর্ষে থাকা ইন্টার মিলানের চেয়ে পাঁচ পয়েন্ট ও দ্বিতীয় স্থানে থাকা নাপোলির চেয়ে চার পয়েন্টে পিছিয়ে আছে, সেহেতু বলেই দেওয়া যায় এবার নাপোলির শিরোপা জেতার সম্ভাবনা অনেক বেশী।

কিন্তু নাপোলি দলটার দিকে তাকিয়ে দেখুন, সেরকম কোন অতি পরিচিত সুপারস্টার নেই কিন্তু দলে। দুই মৌসুম আগে তাও গঞ্জালো হিগুয়াইন ছিলেন, এখন তো সেটাও নেই। এক নজরে দেখে নেওয়া যাক নাপোলির গুরুত্বপূর্ণ ও নিয়মিত খেলোয়াড়দের –

  • গোলরক্ষক : পেপে রেইনা, রাফায়েল ক্যাবরাল
  • সেন্টারব্যাক : কালিদু কোলিবালি, রাউল আলবিওল, নিকোলা মাকসিমোভিচ, ভ্লাদ চিরিচেস, লরেঞ্জো টনেল্লি
  • রাইটব্যাক : এলসাইদ হিসাই, ক্রিস্টিয়ান মাগিও
  • লেফটব্যাক : মারিও রুই, ফাওজি গুলাম
  • সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার : মারেক হামশিক, অ্যালান, আমাদু দিয়াওয়ারা, জর্জিনিও, পিওতর জিয়েলিনস্কি, মার্কো রগ, ইম্যানুয়েলে জ্যাক্কেরিনি
  • উইঙ্গার/ইনসাইড ফরোয়ার্ড : লরেঞ্জো ইনসিনিয়া, হোসে ক্যায়েহন, অ্যাডাম উনাস
  • স্ট্রাইকার : ড্রাইস মার্টেন্স, আরকাদিউশ মিলিক

নাপোলির বর্তমান কোচ মরিজিও সাররিকে বর্তমানে সিরি আ এর অন্যতম সেরা ফুটবল-মস্তিষ্ক মনে করা হয়। আর এই সাররির অধীনেই নেপলসের এই ক্লাব সিরি আ তে সবচেয়ে আকর্ষণীয় আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলছে। প্রতি ম্যাচে গোল করছে অন্তত দুটো করে।

দুর্দান্ত নাপোলি : মরিজিও সাররির ট্যাকটিকস ও অন্যান্য
নাপোলির মূল ফর্মেশান

মরিজিও সাররির অধীনে নাপোলির ট্যাকটিকস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় তারা ৪-৩-৩ ফর্মেশানে খেলতে অধিক পছন্দ করে। এই ৪-৩-৩ ফর্মেশানে ফুলব্যাক দুইজনের মধ্যে যেকোন একজনকে যখন তখন উপরে ওঠার লাইসেন্সটা দিয়ে রেখেছেন সাররি। এই দুইজনের মধ্যে একজনটা হন মূলত লেফটব্যাক ফাওজি গুলাম। গোলরক্ষক পেপ রেইনা সাররির অধীনে নিজেকে বেশ ভালো একজন সুইপার কীপার হিসেবে গড়ে তুলেছেন, তাঁর পাসিং ক্ষমতার উন্নতি হয়েছে চোখে পড়ার মত। সামনে দুইজন সেন্টারব্যাকের জায়গায় মূলত থাকেন কালিদু কোলিবালি ও রাউল আলবিওল। দুইজনের মধ্যে আলবিওলের পাসিং ক্ষমতা বেশী হলেও কোলিবালির পাসিং ক্ষমতাও ফেলনা নয়, সাথে শারীরিক দক্ষতা, গতি ও শক্তির দিক দিয়ে কোলিবালি বেশী কার্যকর দুইজনের মধ্যে।

এই ফর্মেশানে প্রত্যেকটা খেলোয়াড় নিয়মিত অবস্থান পরিবর্তনের মধ্যে থাকেন। দুই ফুলব্যাক এলসাইদ হিসাই আর ফাওজি গুলাম রক্ষণের সাথে সাথে উপরে উঠে আক্রমণও করতে পারেন বেশ। উপরে নিচে নিয়মিত ওঠানামা করতে হয় তাঁদের, মূলত ফাওজি গুলামকে। ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার হিসেবে খেলা জর্জিনিও বা আমাদু দিয়াওয়ারার দায়িত্ব হল দুই সেন্টারব্যাকের মধ্যেকার জায়গায় নেমে চলে আসা। দুই সেন্টারব্যাকের মধ্যে থেকে অসাধারণ পাসিং স্কিল এর মাধ্যমে গোটা খেলার গতিপথ নির্ধারণ করার দায়িত্ব থাকে এই ব্রাজিলিয়ান মিডফিল্ডার জর্জিনিওর উপর, অনেকটা বার্সেলোনার সার্জিও বুসকেটসের মত। তিন সেন্ট্রাল মিডফিল্ডারের মধ্যে মারেক হামশিক তাঁর আক্রমণাত্মক মনোভাবের জন্য সিরি আ তে সমাদৃত। ফলে তিনি প্রায়ই তিন অ্যাটাকারের সাথে উঠে আক্রমণে যোগ দেন। উঠে প্রায়ই একমাত্র স্ট্রাইকার হিসেবে খেলা ড্রাইস মার্টেন্সের সহযোগী স্ট্রাইকার হিসেবে খেলা শুরু করেন তিনি। আরেক মিডফিল্ডার অ্যালানের ভূমিকাটা মূলত বক্স-টু-বক্স মিডফিল্ডারের।

দুর্দান্ত নাপোলি মরিজিও সাররির ট্যাকটিকস ও অন্যান্য
কোচ মরিজিও সাররি

উপরে থাকা তিনজন খেলোয়াড় হলেন লেফট উইঙ্গার লরেঞ্জো ইনসিনিয়া, রাইট উইঙ্গার হোসে ক্যায়েহন ও সেন্ট্রাল স্ট্রাইকার ড্রিয়েস মার্টেন্স। এই তিনজনের মধ্যে সবচেয়ে বেশী ট্যাকটিক্যাল দক্ষ খেলোয়াড় হলেন ইনসিনিয়া। লেফট উইঙ্গার হলেও মাঠের বামদিকে পড়ে থাকেন না তিনি, প্রায়ই ভিতরে চলে আসেন ডিবক্সের মাঝে, ফলে তাঁর ভূমিকাটাকে বলা যায় অনেকটা ইনসাইড ফরোয়ার্ডের। ভেতরে এসে হয় স্ট্রাইকার নাহয় একজন আদর্শ প্লেমেকার/নাম্বার টেন এর ভূইকা পালন করেন তিনি প্রতিপক্ষ সেন্টারব্যাকদের মধ্যের জায়গাগুলোর সদ্ব্যবহার করে। ওদিকে দুইবছর আগে জুভেন্টাসের কাছে দলের মূল স্ট্রাইকার গঞ্জালো হিগুয়াইনের চলে যাওয়া ও তাঁর পরিবর্তে দলে আসা স্ট্রাইকার আরকাদিউশ মিলিকের ইনজুরির কারণে নাপোলির মূল স্ট্রাইকার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়া স্ট্রাইকার ড্রিয়েস মার্টেন্স কিন্তু আদতে সেন্টার ফরোয়ার্ড নন, তিনি একজন উইঙ্গার, যিনি কিনা এখন স্ট্রাইকার হয়ে খেলছেন। ফলে মাঠের মধ্যে তাঁর মুভমেন্ট, পাসিং দক্ষতা, অন্যান্য খেলোয়াড়দের সাথে সমন্বয় করে খেলার ক্ষমতাটা অনেক বেশী। প্রায়ই ইনসিনিয়া আর মার্টেন্স নিজেদের মধ্যে পজিশান অদল-বদল করেন, বা দুইজনই পাশাপাশি স্ট্রাইকার হিসেবে খেলেন। ফলে বাম উইং জায়গাটা প্রায় ফাঁকা থাকে, যে জায়গাটাতেই উপরে উঠে চলে আসেন লেফটব্যাক ফাওজি গুলাম। অপরদিকে হোসে ক্যায়েহনের ভূমিকাটা অনেকটা প্রথাগত উইঙ্গার হবার কারণে তিনি ডান উইং ছেড়ে মাঝে চলে আসেন না, ফলে রাইটব্যাক এলসাইদ হিসাইও উঠে এসে আক্রমণ করেন না, হিসাইকে ডিফেন্সেই থাকতে হয়। যে কারণে গুলাম ও হিসাইয়ের মধ্যে গুলাম বেশী আক্রমণাত্মক ফুলব্যাক।

বল যখন প্রতিপক্ষের পায়ে থাকে, অর্থাৎ প্রতিপক্ষ যখন আক্রমণ করে – নাপোলি তখন চূড়ান্ত প্রেসিং এর সহায়তা নেয়। দুই উইংব্যাক গুলাম ও হিসাই নিচে নেমে আসেন, দুই সেন্টারব্যাক কোলিবালি ও আলবিওলের মধ্যে ফাঁক হয়ে যায় সর্বনিম্ন। দুই সেন্টারব্যাকের উপরে জর্জিনিও তো সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার হিসেবে থাকেনই, সাথে তাঁর পাশে অ্যালান ও যোগ দেন। লরেঞ্জো ইনসিনিয়া আর হোসে কায়েহনকে দুইপাশে রেখে মাঝে জর্জিনিও ও অ্যালানের একটু উপরে অবস্থান করেন মারেক হামশিক। আর স্ট্রাইকার মার্টেন্সও নিচে চলে আসেন। ফলে তাঁদের ফর্মেশানটা হয়ে যায় অনেকটা স্ট্রাইকারহীন ৪-৬-০ বা ৪-২-৩-১ এর মত। প্রত্যেকে প্রেস করতে থাকার ফলে হয় প্রতিপক্ষকে অধৈর্য হয়ে বলের দখল হারাতে হয়, নতুবা ব্যাকপাস করে খেলতে হয়।

দুর্দান্ত নাপোলি : মরিজিও সাররির ট্যাকটিকস ও অন্যান্য
ডিফেন্ড করার সময় নাপোলির গঠন

মূলত ডিফেন্স থেকেই নাপোলি আক্রমণ শুরু করে। একটু আগে যা বললাম, কোচ মরিজিও সাররির অধীনে অত্যন্ত ভালো একজন সুইপার কীপার হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলেছেন পেপে রেইনা। ফলে ডিবক্সের মধ্যের জায়গাটুকু ডিফেন্ড করার জন্য সেন্ট্রাল ডিফেন্ডারের সহায়তা সেরকম তাঁর লাগেনা বললেই চলে। তাঁর সামনের দুই সেন্টারব্যাক কোলিবালি ও আলবিওল আক্রমণের সময়ে নিজেদের মধ্যে দূরত্ব বাড়িয়ে দিয়ে প্রায় ফুলব্যাক হয়ে যান, মাঝের ঐ জায়গায় নেমে আসেন সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার জর্জিনিও, অনেকটা তৃতীয় সেন্টারব্যাক হিসেবে। এই পজিশানে থেকে তিনি অ্যান্দ্রেয়া পিরলো বা সার্জিও বুসকেটস এর ভূমিকার মত নিখুঁত পাসিং এর মাধ্যমে খেলার গতিপথ নির্ধারণ করতে সহায়তা করেন। জর্জিনিও না খেললে এই ভূমিকাটা হয় তরুণ ঘানাইয়ান মিডফিল্ডার আমাদু দিয়াওয়ারার। কোলিবালি আর আলবিওল প্রায় ফুলব্যাক হয়ে যাওয়ার কারণে আসল ফুলব্যাক যে দুজন আছেন, বামদিকে গুলাম আর ডানদিকে হিসাই, তারা উইংব্যাক হয়ে যান। দুইপাশে গুলাম আর হিসাইকে রেখে মাঝে হামশিক আর অ্যালান অবস্থান করেন। উপরে মার্টেন্সকে রেখে দুইপাশে ইনসিনিয়া আর ক্যায়েহন খেলতে থাকেন। ফলে আক্রমণে নাপোলির ফর্মেশান অনেকটা ৩-৪-৩ বা ৩-২-৫ হয়ে যায়। ইনসিনিয়া আর ক্যায়েহন (বিশেষত ইনসিনিয়া) ইনসাইড ফরোয়ার্ড হয়ে ডিবক্সের মাঝে বা নাম্বার ১০ হিসেবে মাঝে খেলতে থাকেন বিধায় ফাওজি গুলাম আরও উপরে ওঠার লাইসেন্সটা পেয়ে যান। নিচে রেইনা, কোলিবালি, আলবিওল, জর্জিনিও নিজেদের মধ্যে ত্রিভুজাকার ক্ষেত্র গঠন করে নিজেদের মধ্যে পাসিং করে করে আক্রমণ গঠন করেন, ফলে প্রতিপক্ষ স্ট্রাইকার তাঁদের মধ্যে এসে সেই পাসিং এ ব্যাঘাত ঘটাতে চেষ্টা করেন, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পারেন না। যার ফলে প্রতিপক্ষে ডিফেন্সের প্রথম লাইন অর্থাৎ স্ট্রাইকাররা নাপোলির খেলোয়াড়দের পা থেকে বল কেড়ে নিতে ব্যর্থ হন। এর ফলে প্রতিপক্ষ মিডফিল্ড আরও সামনে চলে আসে বল নেওয়ার জন্য, ফলে মারেক হামশিক মিডফিল্ডে জায়গা পেয়ে যান, যা তাকে আক্রমণ করতে সহায়তা করে।

দুর্দান্ত নাপোলি : মরিজিও সাররির ট্যাকটিকস ও অন্যান্য
আক্রমণ করার সময়ে নাপোলির ফর্মেশান

নাপোলির প্রত্যেকটা খেলোয়াড়ই নিজেদের দায়িত্বটা অত্যন্ত ভালোভাবে বোঝেন, যা নাপোলিকে একটা সফল দল হিসেবে গড়ে উঠতে সহায়তা করছে। এই ফর্মেশানে বা সিস্টেমের সবচেয়ে বড় সুবিধা হল এটা সাররির সবচেয়ে বেশী প্রতিভাধর চারজন খেলোয়াড়ের সর্ব্বোচ্চটা আদায় করতে সক্ষম হচ্ছে – লরেঞ্জো ইনসিনিয়া, ড্রাইস মার্টেন্স, মারেক হামশিক, জর্জিনিও। এখন দেখার বিষয় হল সাররির এই ট্যাকটিকস কি তাঁদের সিরি আ এর শিরোপা এনে দিতে পারে কি না!

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

six + eleven =