দিনো জফ – বুড়ো হাড়ের ভেলকি

দিনো জফ - বুড়ো হাড়ের ভেলকি
১৯৮২ সাল। বিশ্বকাপের বছর। আবারো ম্যাচ পাতানো স্ক্যান্ডালে জর্জরিত ইতালিয়ান ফুটবল। এদিকে বিশ্বকাপ ও চলে এসেছে। দলের অবস্থাও খুব একটা সন্তোষজনক না। দলের অধিনায়কত্ব দেয়া হল দলের গোলকীপার এবং সবচেয়ে বুড়ো খেলোয়াড়টিকে। ঐ বুড়োর অধিনায়কত্বেই ৪৪ বছর পর বিশ্বকাপ জিতে বাড়ি ফিরল ইতালি।
 
১৯৪২ সাল। ইতালির ভেনেজিয়া শহরের ছোট্ট গ্রাম, মারিয়ানো দেল ফ্রুইতি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অস্থিরতার মাঝেই এই গ্রামে জন্ম ঐ বুড়োর। বয়স যখন ১৪ তখন ট্রায়াল দেন ইন্টার এবং য়ুভেন্তাসে। কিন্তু গোলকীপার অনুযায়ী যে উচ্চতাটা একটু বেশিই কম । সুযোগ হল না কোথাও। পরের ৫ বছরে প্রায় ৩৩ সেন্টিমিটার বেড়ে যোগ দিলেন উদিনেসে তে। কিন্তু ঐ উচ্চতাটাই ঐ মৌসুমে তাঁর অ্যাপিয়ারেন্স ৪ টিতে সীমাবদ্ধ করে ফেলে।
 
এতক্ষণে নিশ্চয়ই বুঝে গিয়েছেন কার কথা বলছি। ঐ বুড়ো গোল কীপার এর নাম ছিল দিনো জফ। তাঁকে মানা হয় বিংশ শতাব্দীর সেরা তিন গোল কীপারের একজন। মাত্র ৬ ফুট ১ ইঞ্চি লম্বা ছিলেন , যেটা গোলকিপার অনুযায়ী একটু কমই। কিন্তু বিদ্যুত গতির রিফ্লেক্স , পজিশনিং, রিঅ্যাকশন আর বল গ্রিপ করার অসাধারণ ক্ষমতায় ঐ উচ্চতার অভাব কখনোই বুঝতে দেননি দিনো জফ।
দিনো জফ - বুড়ো হাড়ের ভেলকি
১৯৬৩ তে উদিনেসে থেকে মন্টোভায় যোগ দেন দিনো জফ। মন্টোভায় পাঁচ মৌসুম কাটিয়ে ১৯৬৮ তে আসেন নাপোলিতে। ঐ বছরই ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপে অভিষেক হয় দিনো জফ এর। ইতালি টুর্নামেন্ট জিতে নেয় , জফ ৪ টি ম্যাচে খেলেন , যার ২ টিতে ক্লিন শীট রাখেন। ১৯৭০ এ ফর্মের কিছু ঘাটতি এবং ইন্জুরিতে বাদ পড়েন বিশ্বকাপ স্কোয়াড থেকে।
১৯৭২ সালে ৩০ তম জন্মদিনে নিজের স্বপ্নের ক্লাব য়ুভেন্তাসে যোগ দেন। শুরু করেন তাঁর ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় অধ্যায়। য়ুভেন্তাসের হয়ে ৩৩০ ম্যাচ খেলে ১২৩ টি তেই ক্লিন শিট রাখেন দিনো জফ , যা একজন বুড়ো কীপারের জন্য অসাধারণ ছিল বৈকি। য়ুভেন্তাসে থাকা অবস্থায় ১৯৮২ সালের বিশ্বকাপে এনজো বিয়ারজোতের ইতালিকে অধিনায়কত্ব করান দিনো জফ। বয়সটা তখন ৪০ বছর ৪ মাস! ঐ টুর্নামেন্টে তাঁর অসাধারণ অধিনায়কত্ব আর গোলবারের নিচের দক্ষতায় বিশ্বকাপ জিতে নেয় ইতালি। ঐ টুর্নামেন্টে সেরা গোলকীপারের পুরষ্কারটাও বাগিয়ে নেন। ঐ বছরে জাতীয় দল থেকে এবং পরের বছর ক্লাব ক্যারিয়ারের ইতি টানেন এই কিংবদন্তী গোলরক্ষক।
 
দিন জফ এর সবচেয়ে বড় গুণ ছিল অনেক চাপেও মাথা ঠাণ্ডা রেখে কীপিং করা। কিছুটা চুপচাপ সদা হাস্যোজ্জ্বল দিনো জফ মাঠে সদা প্রতিপক্ষের প্রশংসায় থাকতেন পঞ্চমুখ। খুবই নম্র স্বভাবের জন্য দিনো জফ ছিলেন সর্বত্র প্রশংসিত।
 
পুরো ক্লাব ক্যারিয়ারে ৬৪২ ম্যাচ খেলে ২৮৭ টি ক্লিন শিট রেখেছেন
জফ। এসময় জিতেছেন ৬ টি সিরি আ , ২ টি কোপা ইতালিয়া এবং একটি উয়েফা কাপ। সিরি আ তে তাঁর করা সবচেয়ে বেশি ম্যাচ ৫৭০ ম্যাচ খেলার রেকর্ডটি প্রায় ২০ বছর অক্ষুণ্ন ছিল। পরবর্তী তে ল্যাজিয়োর মার্কো বালোত্তা এবং মিলানের পাওলো মালদিনি তাঁর রেকর্ড ভাঙেন। জাতীয় দলের হয়েও ছিলেন সমান উজ্জ্বল। ১১২ ম্যাচ খেলেছেন , এসময় জিতেছেন একটি ইউরো এবং একটি বিশ্বকাপ। সবচেয়ে বেশি বয়সে বিশ্বকাপ জিতার রেকর্ডটি এখনো জফের দখলে। এখন পর্যন্ত কাপ্তান গোলকীপার হিসেবে যে তিনজন বিশ্বকাপ জিতেছেন , তাঁদের মধ্যে দ্বিতীয় জফ। আন্তর্জাতিক ম্যাচে সবচেয়ে বেশি সময় গোল না খেয়ে থাকার রেকর্ডটিও জফের। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৪ সালের মাঝে পুরো ১১৪২ মিনিট গোল না খেয়ে থাকেন জফ। পরবর্তীতে হাইতির মানো সানোনের এক অসাধারণ ভলিতে এই ব্যাপ্তির সমাপ্তি ঘটে।
দিনো জফ - বুড়ো হাড়ের ভেলকি
খেলোয়াড়ি জীবনের মতো কোচিং জীবনে অতোটা সফল না হলেও একেবারে খারাপ ও ছিলেন না। য়ুভেন্তাসের হয়ে একটি কোপা ইতালিয়া এবং একটি উয়েফা কাপ জিতেন। ২০০০ সালের ইউরোতে রানার্স আপ করান ইতালিকে । তাঁর অ্যাটাকিং ধাঁচের খেলানোর ধরণের জন্য ইতালিতে তিনি বেশ সমালোচিত ছিলেন। ২০০৫ সালে ফিওরেন্টিনাকে রেলিগেশন থেকে বাঁচানোর পর কোচিং থেকে অবসর গ্রহণ করেন দিনো জফ।
 
শুভ ৭৬ তম জন্মদিন, বিংশ শতাব্দীর অন্যতম সেরা গোলকীপারকে।

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

two × 2 =