টমাস টুখেলের কথা – ১

ফুটবলকে নতুন নতুন ধ্যানধারণা, নতুন পরিকল্পনা, নতুন খেলোয়াড়-ম্যানেজার ; বরাবরই দিয়ে আসছে বরুশিয়া ডর্টমুন্ড। অটো রেহাগেল থেকে শুরু করে হোর্স্ট কপেল, ওটমার হিটজফেল্ড, নেভিও স্কালা, ম্যাথিয়াস স্যামার, বার্ট ভ্যান মারউইক এবং সর্বশেষ ইয়ুর্গেন ক্লপ – ফুটবলকে ডর্টমুন্ড এরকম নতুন নতুন কোচের মোড়কে উপহার দিয়েছে অনেক। বুন্দেসলিগায় বায়ার্ন মিউনিখের আপাত অনন্তকালব্যাপী একচ্ছত্র আধিপত্য খর্ব করার বর্তমানে যেসব দল আছে, তাদের লিস্টিতে বরুশিয়া ডর্টমুন্ডের স্থান সবার উপরে। এইত কিছুদিন আগেই টানা দুইবার বুন্দেসলিগা, দুইবার সুপারকাপ ও একবার জার্মান কাপ জিতে বায়ার্নকে ক্ষণকালের জন্য সিংহাসনচ্যুত করেছিল তারাই। পরে যদিও আবার বায়ার্ন মিউনিখ ফিরে এসেছে দোর্দণ্ড প্রতাপে, তাতে ফুটবল-রোমান্টিকদের কাছে ডর্টমুন্ডের আবেদন বিন্দুমাত্রও কমেনি। তৎকালীন কোচ ইয়ুর্গেন ক্লপ ছিলেন (এবং আছেন) ফুটবল রোমান্টিকদের রাত জেগে ডর্টমুন্ড-দর্শনের অন্যতম কারণ। অথচ এই ক্লপ যখন ডর্টমুন্ডে আসলেন কয়জনই বা তাঁকে চিনত!

676f7d8a534f0153f082509fb73a0a3b_crop_north

ক্লপ ডর্টমুন্ড ছেড়ে চলে যাওয়ার পর সবাই যখন বিভিন্ন ডাকসাইটে কোচের নাম নিচ্ছিল ডর্টমুন্ডে ক্লপের জায়গা নেওয়ার জন্য, তখন ডর্টমুন্ড হাঁটল ডর্টমুন্ডের পথে, কোচ করে আনলো “কোথাকার কোন” টমাস টুখেল কে!

d307fdbba491543dcc14bf8834db1021

কে এই টমাস টুখেল যাকে বায়ার্নের কাছে হারানো সাম্রাজ্যর দায়িত্ব দিয়ে বসলো ডর্টমুন্ড? দেখে নেওয়ার চেষ্টা করব একটু!

 

ক্রনিক কার্টিলেইজ ইনজুরির কারণে মাত্র ২৫ বছর বয়সেই খেলা ছেড়ে দেওয়া ডিফেন্ডার টমাস টুখেল অগসবুর্গের মত ক্লাবে খেললেও কখনো বুন্দেসলিগায় খেলায় স্বাদ পাননি, তৃতীয়-চতুর্থ বিভাগেই কেটেছে খেলোয়াড়ি জীবন। পরে ম্যানেজেরিয়াল ক্যারিয়ার গড়ার লক্ষ্যে কাজ শুরু করেন তিনি, অগসবুর্গ-স্টুটগার্টের যুবদল ঘুরে প্রধান কোচ হন বুন্দেসলিগা ক্লাব মেইঞ্জের, ২০০৯ সালে। তখন বুন্দেসলিগায় সদ্য উন্নীত মেইঞ্জ টুখেলের তত্ত্বাবধানে প্রথম বছর পঞ্চম ও পরের বছর সপ্তম স্থানে লিগ শেষ করে, সদ্য উন্নীত একটা দলের জন্য যেটা অনেক বড় ব্যাপার। ২০১৪ সালে চুক্তি শেষ হবার আগেই মেইঞ্জ ছেড়ে যান টুখেল, কিছুদিনের বিশ্রাম নেন। পরে এবার ডর্টমুন্ড থেকে ইয়ুর্গেন ক্লপ চলে গেলে ডর্টমুন্ড কোচ করে নিয়ে আসে তাঁকে।

টশেলের অধীনে লাইমলাইটে আসা শুরলা এখন বিশ্বজয়ী
টুখেলের অধীনে লাইমলাইটে আসা শুরলা এখন বিশ্বজয়ী

পাঁচ বছর মেইঞ্জের মূল কোচ ছিলেন টুখেল, জিততে পারেননি কিছুই। কিন্তু তাও ডর্টমুন্ডের মত ক্লাবের তাঁর প্রতি এত আগ্রহের কারণ কি ছিল? শুধু ডর্টমুন্ড না, একইসাথে তাঁর ব্যাপারে আগ্রহী ছিল ইংলিশ প্রিমিয়ার লীগের ক্লাব নিউক্যাসল ইউনাইটেডেরও। কিছু ত ছিলই তাঁর মধ্যে, সেটা বোঝা যায় তাঁর কোচিং ক্যারিয়ার আরেকটু ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করলে। ২০০৫ সালে স্টুটগার্টের অনূর্ধ্ব ১৯ দলকে বুন্দেসলিগা জেতান তিনি, যে দলে ছিলেন এখনকার স্যামি খেদিরা, সেবাস্তিয়ান রুডি, অ্যান্দ্রেয়াস বেক, অ্যাডাম শালাইয়ের মত তারকারা। বলা যেতে পারে তাঁদের তারকা হবার প্রথম পাঠ এই টুখেলের হাত ধরেই। এমনকি মেইঞ্জের যে দলটা বুন্দেসলিগায় উন্নীত হয়েই পঞ্চম হয়েছিল, সে দলেও তিনি যত্ন করে বড় করেছিলেন আন্দ্রে শুরলা, অ্যাডাম শালাই, লুইস হল্টবি, ইয়ান কিরশফের মত ভবিষ্যতের তারকাদের। এখন এসব শালাই, শুরলা, হল্টবি, কিরশফ, খেদিরা নিয়মিত বুন্দেসলিগা সহ বিশ্বফুটবল কাঁপায়! টাশেলের অন্য ছাত্ররা যেমন – লোরিস কারিউস, ইয়োহাননেস গেইস, এরিক ম্যাক্সিম চুপো-মোতিং ; এরাও আছেন বিশ্বসেরা হবার দৌড়ে।

 

তাই বলা যেতে পারে যে তরুণ ফুটবলার পরিচর্যা করার জন্য বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কোচ যদি থেকে থাকেন, তিনি টমাস টুখেল। যেটা কিনা ডর্টমুন্ডেরও মূলমন্ত্র। আপনি লক্ষ্য করলে দেখবেন ডর্টমুন্ড কিন্তু শত্রু বায়ার্ন মিউনিখ, রিয়াল মাদ্রিদ, ম্যানচেস্টার সিটি, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, চেলসি, প্যারিস সেইন্ট জার্মেই এদের মত বস্তা বস্তা টাকা ঢেলে খেলোয়াড় কেনে না, যুব ফুটবলার পরিচর্যা করতেই আগ্রহী বেশী তারা। টুখেলের পূর্বসূরি ইয়ুর্গেন ক্লপের মধ্যেও সে স্বভাবটা ছিল। রোমান ভাইডেনফেলার-লুকাস পিশচেক-নেভেন সুবোটিচ-ম্যাটস হামেলস-মার্সেল শ্মেলতজারের ডিফেন্সের বজ্রআঁটুনি, নুরি সাহিন-সভেন বেন্ডারদের মত মিডফিল্ডারদের অখ্যাত থেকে বিখ্যাত হয়ে ওঠা, প্যারাগুইয়ান লুকাস ব্যারিওসের সুপারস্টার হয়ে ওঠা, মারিও গোতসা’র বিশ্বসেরা হওয়া, কিংবা ট্রান্সফার মার্কেটে পাকা জহুরির পরিচয় দিয়ে সেরেজো ওসাকা-নুর্নবার্গ-লেচ পোজনান-বরুশিয়া মনশেনগ্ল্যাডবাখের মত অখ্যাত সব ক্লাব থেকে ক্লাব থেকে যথাক্রমে শিনজি কাগাওয়া-ইলকায় গুন্ডোগান-রবার্ট লেওয়ান্ডোউস্কি-মার্কো রয়েস কে নামমাত্র মূল্যে খুঁজে বের করে নিয়ে আসা – এ ক’বছরে সবদিকে ক্লপের সাফল্যের কথা বলে শেষ করা যাবেনা। এবং এসব একটা খেলোয়াড়ও কাঁড়ি কাঁড়ি টাকার বিনিময়ে আসেনি, ক্লপ নিজেই পরিচর্যা করে করেছেন তাঁদের বিশ্বসেরা।

 

সে পথেই হাঁটছেন এখন টুখেল। এই দলবদলের মৌসুমে এই পর্যন্ত বরুশিয়া ডর্টমুন্ডের ট্রান্সফার অ্যাক্টিভিটির দিকেই নজর দিন একটু, গত মৌসুমে ভুলের পর ভুল করে যাওয়া বহুদিনের গোলরক্ষক রোমান ভাইডেনফেলারকে এসেই পরিবর্তন করেছেন ফ্রাইবুর্গের তরুণ গোলরক্ষক রোমান বার্কি কে দিয়ে। নিয়ে এসেছেন ১৮৬০ মিউনিখের অখ্যাত মিডফিল্ডার জুলিয়ান ভাইগেল কে, আর বুন্দেসলিগার বহু বছরের পরীক্ষিত সেনানী গঞ্জালো কাস্ত্রোও লেভারকুসেন ছেড়ে চলে এসেছেন ডর্টমুন্ডে। ট্রান্সফার মার্কেটে কোন বড় নাম নিয়ে টানাটানি নেই, শুধুমাত্র নিজের দর্শনের সাথে মানানসই কার্যকরী কিছু খেলোয়াড়কেই নামমাত্র মূল্যে এই পর্যন্ত এনেছেন টুখেল। বুন্দেসলিগা মৌসুমের প্রথম ম্যাচেই ৪-০ গোলে বরুশিয়া মনশেনগ্ল্যাডবাখকে হারিয়ে এরইমধ্যে টুখেল দেখিয়েছেন তাঁর ঝলক…. (চলবে)

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

13 − 11 =