তোমরা আমাদের ক্ষমা করো

বাসার টিভিটা আব্বু আম্মুর রুমে। বাংলাদেশের খেলার দিন আমরা দুই ভাই ছোট চাচা আয়োজন করে দখল করে বসি আব্বু আম্মুর বিছানাটা। দিনের বেলা খেলা হলে আম্মু বিরক্ত হন সিরিয়াল দেখায় ডিস্টার্ব হয় বলে। আর রাতের বেলায় খেলা হলে আমারই মায়া লাগে। আব্বু আম্মুর দুজনেরই চোখে মুখে ঘুম চলে আসে সারাদিনের অচিন্তনীয় খাটুনিতে রাত দশটা না বাজতেই। আজও চান্দিমাল-জয়সুরিয়ার জুটিটা জমে উঠার পর আব্বু আম্মুর ঘন ঘন হাই তোলা দেখে খারাপই লাগলো। উনাদের ঘুমুতে দিয়ে চলে আসলাম দুই ভাই আমাদের রুমে, ছোট চাচা গেলেন ঘুমুতে। কিছুক্ষণ ইউটিউবে ঘুরাঘুরি করার পর কি মনে করে হোম্পেইজে ঢুকতেই মাথা খারাপ হয়ে গেলো! বাংলাদেশ ম্যাচ নিজেদের মুঠোয় নিয়ে ফেলেছে এর ভেতরে!! আমার মনে হলো- পাগল টাগল হয়ে যাবো নাকি!!
.
আগেও এরকম হতো। শুরুতেই এক দুইটা উইকেট পড়ে গেলোও খুব বিশাল কোন টার্গেট না থাকলে ধীরে ধীরে কিভাবে কিভাবে যেন ম্যাচটা বের হয়ে যেত হাতের মুঠো থেকে। বোলারদের ধার কমে যেত, দুই একটা ক্যাচ মিস হলে ফিল্ডারদের শরীরে চলে আসতো গা ছাড়া ভাব। মিথ্যে বলবো না- এরকম স্মৃতি মাথায় নিয়েই এই ম্যাচটা নিয়ে খুব আশাবাদী ছিলাম না, মনে হচ্ছিলো দু একটা বড়ো পার্টনারশিপেই ম্যাচ শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু মাশরাফির ক্যাপ্টেনসিতে এই বাংলাদেশ দলটা আমার মত সাপোর্টাদেরও চমকে দিতে পারে। মুস্তাফিজ, তাস্কিন আর আলামিনের মত নিউ জেনারেশনের পেসাররা দুনিয়ার প্রথম সারির পেস এটাকের মত রানের গতি কমিয়ে ফেলতে পারে। ইন্ডিয়ার সাথে এক ওভারে মার খাওয়াতেই “ম্যাজিকাল ক্যারিয়ারের শেষ” দেখে ফেলা মুস্তাফিজ আরেকবার প্রমাণ করলো- না, সে হঠাৎ ধুমকেতুর মত জ্বলে উঠে তারপর আবার ক্ষয়ে যাওয়া কোন তারা না, সে পিউর ক্লাস নিয়েই টিকে থাকতে সেরা হতে এসেছে। জঘন্যতম গালিগালাজ করে লিটারেলি অনলাইন ছাড়া করা সাকিবের উন্মাদ উদাযপনটা দেখেছেন দ্বিতীয় উইকেট পাওয়ার পর? অথচ আমরাই বলি সাকিবের বেশি ভাব হইসে তাই আর তার খেলাতে মনযোগ নাই! খেলা শেষে পুরষ্কার বিতরনীতে সেরা ক্যাচের জন্য পাওয়া $2500 টাকার চেকটা হাতে সৌম্যের হাসিটা দেখে লজ্জা লাগে, ক্যাচ ছাড়ার জন্য খুব বেশিক্ষণ হয় নাই, থাকি কিক মেরে দল থেকে বের করে দেবার জন্য পোস্ট লিখেছিলাম অনেকেই। টানা দুই ম্যাচে স্লগ ওভারে দলের রান বাড়ালো মাহমুদুল্লাহ, বল হাতে নিলেই পাচ্ছেন ব্রেকথ্রু! অথচ আমরাই ভায়রা ভাই কোঠায় চান্স পায় বলে ট্রল করি উনাকে, কি জন্যে দলে রাখা হয়- এসব প্রশ্ন করি!
.
নিজের ইনজুরির ঝুঁকি তুচ্ছ করে সৌম্যের সেই উড়ন্ত অবিশ্বাস্য ক্যাচটা, নীরবে ম্যাচের পর ম্যাচের দলের জয়ে অবদান রেখে যাওয়া মাহমুদুল্লার ডেডিকেশন আর উকেট পাওয়ার পর সাকিবের সেই সব কিছু ভেংগেচুড়ে ফেলা ক্রুদ্ধ সেলিব্রেশন আরেকবার প্রমাণ করে দিলো- দলের জন্য তাদের নিবেদনটা কখনই কম ছিলো না, থাকে না বরং আমরাই পৃথিবীর একমাত্র জাত হিসেবে নিজেরা নিজেদের হিরোদের অকথ্য অপমাণ করি কোন একদিন তারা ব্যার্থ হলেই!
.
ওয়েল ডান টাইগার্স। তোমাদের আজকের এই অবিশ্বাস্য কামব্যাকের গল্প, জয়ের স্মৃতিটা হয়তো আমরা ভুলে যাবো কালই, দুর্ভাগ্যজনক ব্যার্থতাতেই আবার গালাগালি শুরু হয়ে যাবে কোনদিন একবারও ক্রিকেট বল হাতে না নেওয়া আমাদের কী-বোর্ড থেকেই। তোমরা আমাদের ক্ষমা করো, আমাদের মত অদ্ভুত সাপোর্টাদের ভুল প্রমাণ করো বার বার জয়ের তীব্র হুংকারে!

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

seventeen − 3 =