তিমুইয়ে বাকায়োকো : এখনই হতাশ হবার কিছু নেই চেলসির

তিমুইয়ে বাকায়োকো : এখনই হতাশ হবার কিছু নেই চেলসির

গত দুই-তিন মৌসুম ধরে ফরাসী ফুটবলে তরুণদের যে জোয়ার আসা শুরু হয়েছে, তাদের মধ্যে সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার তিমুইয়ে বাকায়োকো অন্যতম। গত মৌসুমে ফরাসী ক্লাব মোনাকোর হয়ে দুর্দান্ত এক মৌসুম কাটানোর পর (ফরাসী লিগে পিএসজির একাধিপত্য খর্ব করে লিগ ওয়ান জয়, চ্যাম্পিয়নস লিগের সেমিফাইনালে ওঠা) ইংলিশ পরাশক্তি চেলসির নজরে পড়ে যান তিনি। ফলাফল – এই গ্রীষ্মকালীন দলবদলের বাজারে মোটামুটি ৪০ মিলিয়ন পাউন্ডের বিনিময়ে মোনাকো থেকে চেলসিতে নাম লেখান বাকায়োকো

বাকায়োকোর প্রতিভা সম্পর্কে চেলসি কোচ আন্তোনিও কন্তে এতটাই নিঃসন্দেহ ছিলেন যে গত মৌসুমের লিগজয়ী কম্বিনেশন ভেঙ্গে লিগ জয়ের অন্যতম কারিগর সার্বিয়ান মিডফিল্ডার নেমানিয়া মাতিচকে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের কাছে বিক্রি করে দিতে এক মুহুর্তও অপেক্ষা করেননি তিনি। ৪০ মিলিয়ন পাউন্ডের বিনিময়ে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে যোগ দেন মাতিচমাতিচের জায়গাতেই বাকায়োকো চলে আসেন চেলসির মূল একাদশে।

চেলসি ভক্তদেরও তাই বাকায়োকোকে নিয়ে আশা ছিল আকাশছোঁয়া। গত মৌসুমে যে নেমানিয়া মাতিচ-এনগোলো কান্তে মিডফিল্ড জুটি তাদের লিগ এনে দিয়েছিল, তিমুইয়ে বাকায়োকো-এনগোলো কান্তে মিডফিল্ড জুটি সেটা ছাড়িয়ে চেলসিকে আরও নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবেন, এটাই প্রত্যাশা ছিল তাদের। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি, মৌসুমের অর্ধেক শেষ হয়ে গেলেও, সেরকম ভালো পারফরম্যান্স দেখাতে পারেননি বাকায়োকো। লিগের অর্ধেক শেষ হয়ে গেছে, লিগের প্রথমে থাকা ম্যানচেস্টার সিটির চেয়ে এখনই ১৪ পয়েন্ট পিছিয়ে থেকে পয়েন্ট তালিকার তৃতীয় অবস্থানে আছে চেলসি।

তবে তাই বলে এখনই কি বাকায়োকোকে নিয়ে হাল ছেড়ে দেওয়ার সময় চলে এসেছে? মনে হয় না।

তিমুইয়ে বাকায়োকো : এখনই হতাশ হবার কিছু নেই চেলসির
তিমুইয়ে বাকায়োকো

কোচ আন্তোনিও কান্তে কিংবা সতীর্থ মিডফিল্ডার এনগোলো কান্তে, দুজনই বারবার বলেছেন, বাকায়োকোকে সমর্থন দিতে। তারা ভুল কিছু বলেননি। কেন বলেননি? একটু ভেবে দেখা যাক।

প্রথমে বাকায়োকোর খেলার স্টাইল সম্পর্কে একটু আলোকপাত করি। অনেকেই বাকায়োকোর খেলার স্টাইলের সাথে ম্যানচেস্টার সিটির কিংবদন্তী আইভোরিয়ান মিডফিল্ডার ইয়ায়া ট্যুরের স্টাইলের তুলনা দেন। দুইজনই লম্বাচওড়া শক্তিশালী খেলোয়াড়, আদর্শ বক্স-টু-বক্স মিডফিল্ডার। আদর্শ বক্স-টু-বক্স মিডফিল্ডারের মত প্রতিপক্ষের পা থেকে ট্যাকল বা ইন্টারসেপ্ট করে বল কেড়ে নিতে পারেন তো বটেই, আবার নিজেই বল কেড়ে নিয়ে আক্রমণের সূচনা করতে পারেন তিনি। উপরে উঠে গিয়ে সময়মত প্রতিপক্ষের বক্সে ঢুকে গোল করাটাও তাঁর একটা অভ্যাস। গত মৌসুমে তাই ৩ গোল আর দুই গোলসহায়তা করলেও যে জিনিসটা সবচেয়ে বেশী চোখে পড়েছিল তা হল মিডফিল্ডে বাকায়োকোর এরকম অলরাউন্ডারের মত পারফরম্যান্স – অর্থাৎ সবকিছুই করতে পারতেন তিনি মিডফিল্ডে। এবার অর্ধেক মৌসুম শেষেই গত মৌসুমের মত তিন গোল করে ফেলেছেন, গোলসহায়তাও করেছেন গতবারের থেকে একটা বেশী, ইতোমধ্যে। কিন্তু গোল বা গোলসহায়তা করতে পারলেও বাকায়োকোর খেলা নিয়ে সমালোচনা হবার কারণ গত মৌসুমের মত অলরাউন্ড পারফরম্যান্স দিতে পারছেন না তিনি। নতুন দেশে নতুন ক্লাবে এসে একরকম আত্মবিশ্বাসহীনতায় ভুগছেন তিনি।

দেখে নেওয়া যাক এই মৌসুমে কোচ আন্তোনিও কান্তে দলকে কোন স্টাইলে খেলাচ্ছেন –

  • ৩-৪-৩ ফর্মেশান ; যেখানে সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার থাকেন দুইজন
  • ৩-৫-২ ফর্মেশান ; যেখানে সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার থাকেন তিনজন

৩-৪-৩ ফর্মেশানে এই মৌসুমে বাকায়োকোর ব্যর্থতা

প্রথমে ব্যাখ্যা করা যাক চেলসির ৩-৪-৩ ফর্মেশান ও এই ফর্মেশানে খেলা সেন্ট্রাল মিডফিল্ডারদের ভূমিকা, মূলত বাকায়োকোর ভূমিকাটা। চেলসির সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার এখন আছেন এনগোলো কান্তে, তিমুইয়ে বাকায়োকো, সেস ফ্যাব্রিগাস ও ড্যানি ড্রিঙ্কওয়াটার। আন্তোনিও কন্তের মূল পছন্দ এই ৩-৪-৩ ফর্মেশানটাই ; যে ফর্মেশানে দুইজন সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার লাগে। এই দুইজন সেন্ট্রাল মিডফিল্ডারের ক্ষেত্রে কন্তের মূল পছন্দ এই মৌসুমে তিমুইয়ে বাকায়োকো আর এনগোলো কান্তে। বাকায়োকোর সাথে কান্তে থাকলে বাকায়োকো খেলতে পারেন সবচাইতে ভালো। কারণ কান্তে অনেক আগে থেকেই প্রতিপক্ষ কোন দিন দিয়ে কিভাবে আক্রমণ করবে সেটা বুঝে যেতে পারেন, সে অনুযায়ী নিজেকে নিজেদের ডিফেন্সের সামনে স্থাপন করে দলের ডিফেন্সের প্রতিরক্ষা করেন, ফলে বাকায়োকোকে ডিফেন্সের ঢাল হিসেবে খেলার জন্য অত চিন্তা করতে হয়না, তাঁর হয়ে কাজটা কান্তেই করে দেন। ফলে বাকায়োকো নিজের সুবিধামত আক্রমণে উঠতে পারেন, প্রতিপক্ষের ডিবক্সে হানা দিতে পারেন। ৩-৪-৩ ফর্মেশানে মূল একজন স্ট্রাইকারের দুইপাশে দুই উইঙ্গার থাকেন বিধায় বাকায়োকোর উপরে “অবশ্যই আক্রমণে উঠতে হবে আমাকে” এই দায়িত্বটা থাকেনা।

তিমুইয়ে বাকায়োকো : এখনই হতাশ হবার কিছু নেই চেলসির
৩-৪-৩ ফর্মেশানে কান্তের সাথে বাকায়োকো

সমস্যা হয় যখন ৩-৪-৩ ফর্মেশানে কান্তে ইনজুরি বা অন্য কোন কারণে খেলতে পারেন না – তখন। তখন কান্তের অনুপস্থিতিতে দুইজন সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার হিসেবে খেলেন তিমুইয়ে বাকায়োকো, সেস ফ্যাব্রিগাস ও ড্যানি ড্রিঙ্কওয়াটারের মধ্যে যেকোন দুইজন। বাকায়োকোর সাথে যখন ফ্যাব্রিগাস খেলেন, তখন বাকায়োকোকেই কান্তের ভূমিকাটা পালন করতে হয়। অর্থাৎ আক্রমণের কথা একদম ভুলে গিয়ে দলের ডিফেন্সকে প্রতিরক্ষা করার কথা চিন্তা করতে হয় তাঁকে। আদর্শ ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডারের মত মাঝমাঠে ট্যাকল ইন্টারসেপ্ট (প্রতিপক্ষের পা থেকে বল কেড়ে নেওয়া) করে প্রতিপক্ষের আক্রমণ নস্যাৎ করা, আগে থেকে প্রতিপক্ষের আক্রমণের পরিকল্পনা বুঝে নিয়ে সে অনুযায়ী ডিফেন্সের সামনে নিজেকে স্থাপন করা – এসব কাজ করতে হয় তখন বাকায়োকোকে।

সত্যি বলতে কি, এ কাজটা করার জন্য বর্তমানে কান্তের থেকে ভালো ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার চেলসিতে কি, বিশ্বেই নেই কোন। আর বক্স-টু-বক্স মিডফিল্ডার হবার কারণে মাঝেমাঝেই আক্রমণে ওঠার প্রবণতা থাকে বাকায়োকোর, যেটা চেলসির ডিফেন্সের পক্ষে ক্ষতিকর। আর ওদিকে ফ্যাব্রিগাসের খেলার মধ্যে রক্ষণ-ইচ্ছা তো আরও নেই। ফ্যাব্রিগাস কান্তে বা বাকায়োকোর মত শক্তিশালীও নন যে আদর্শ ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডারের ভূমিকা পালন করবেন। ফ্যাব্রিগাসের খেলার স্টাইলই deep lying playmaker এর ; পাশে থাকা ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডারের কাছ থেকে বল নিয়ে নিজের দূরদৃষ্টি দিয়ে আক্রমণভাগে নিখুঁত পাস পাঠানোর কাজ করে এসেছেন তিনি সারাজীবন – রক্ষণ করার কথা চিন্তাও করেননি।

তিমুইয়ে বাকায়োকো : এখনই হতাশ হবার কিছু নেই চেলসির
৩-৪-৩ ফর্মেশানে ফ্যাব্রিগাস বা ড্রিঙ্কওয়াটারের সাথে বাকায়োকো

অর্থাৎ মিডফিল্ডে বাকায়োকো-ফ্যাব্রিগাস না থাকলে তিনজন সেন্টারব্যাকের সামনে পুরো ডিফেন্সটাকে আগলিয়ে রাখার মত কোন ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডারই থাকেন না। তখন দুইজন উইংব্যাককে (মার্কোস আলোনসো আর ভিক্টর মোসেস) প্রায়ই নেমে যেতে হয় মিডফিল্ডে ফ্যাব্রিগাস বা বাকায়োকোর ফেলে যাওয়া জায়গা কভার দেওয়ার জন্য। আলোনসো আর মোসেস এর মধ্যে আবার আলোনসো স্বভাবজাত ডিফেন্ডার (আলোনসো একজন লেফটব্যাক যিনি কন্তের ট্যাকটিকসে লেফট উইংব্যাক হিসেবে খেলেন) হবার কারণে তাকেই এই কভার দেওয়ার কাজটা করতে হয় বেশী – প্রতিপক্ষের আক্রমণের সময়ে ; কারণ ভিক্টর মোসেসের মধ্যে সেরকম রক্ষণ করার ধাতটা নেই, কারণ তিনি আসলে একজন রাইট উইঙ্গার যিনি কন্তের ফর্মেশানে রাইট উইংব্যাক হিসেবে খেলেন। আর পুরো চেলসি মূল একাদশে মার্কোস আলোনসো হল সবচেয়ে ভালো ক্রসার। আলোনসোকে রক্ষণ করতে বলা মানে আলোনসো তখন আক্রমণে উঠে স্ট্রাইকার মোরাতাকে ক্রস দিতে পারেন না, ফলে প্রিমিয়ার লিগের অন্যতম সেরা হেডার মোরাতা আলোনসোর কাছ থেকে হেড দিয়ে গোল করার জন্য বামদিক থেকে সেরকম নিখুঁত ক্রসও পাননা।

এসব সমস্যার কোনটাই হত না যদি বাকায়োকো আদর্শ ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডারের ভূমিকাটা পালন করতে পারতেন, অন্তত গত মৌসুমের মত আদর্শ বক্স-টু-বক্স মিডফিল্ডারের মত পারফর্ম করতে পারতেন। কিন্তু তিনি সেটা করতে পারছেন না। মিডফিল্ডে বাকায়োকোর সাথে ড্যানি ড্রিঙ্কওয়াটার খেললেও কমবেশী একই সমস্যা হয়।

৩-৫-২ ফর্মেশানে এই মৌসুমে বাকায়োকোর ব্যর্থতা

এই মৌসুমে অনেক ম্যাচেই দেখা গেছে উইঙ্গার ইডেন হ্যাজার্ডের সর্বাধিক উপযোগিতা পাওয়ার জন্য ৩-৪-৩ ফর্মেশান থেকে সরে এসে দলকে ৩-৫-২ ফর্মেশানে খেলাচ্ছেন কোচ আন্তোনিও কন্তে। উপরে দুইজন স্ট্রাইকার হিসেবে আলভারো মোরাতার সাথে খেলেছেন ইডেন হ্যাজার্ড। কিন্তু ইডেন হ্যাজার্ডের উপযোগিতা পেতে গিয়ে ঝামেলা হয়েছে সেন্ট্রাল মিডফিল্ডে – মূলত তিমুইয়ে বাকায়োকোর বেলায়।

৩-৫-২ ফর্মেশানে খেলা মানে চেলসিকে তিনজন সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার নিয়ে খেলতে হচ্ছে, মোরাতা আর হ্যাজার্ড দুইজনের স্ট্রাইকার হিসেবে খেলা মানে এই ফর্মেশানে চেলসি কোন উইঙ্গার পাচ্ছেনা। এই ফর্মেশানে তাই বাকায়োকোর সাথে সেন্ট্রাল মিডফিল্ডে কান্তে আর ফ্যাব্রিগাস খেললে বাকায়োকোর উপরে অতিরক্ত আক্রমণ করার ভারটা এসে পড়ে। কারণ উইঙ্গার নেই। ফলে “পেছনে কান্তে ডিফেন্স আগলে রাখছে, আমি যখন খুশি তখন আক্রমণে উঠতে পারবো” এই সুবিধাটা পাচ্ছেননা বাকায়োকো। তাঁকে তখন বাধ্যতামূলকভাবে আক্রমণে উঠতেই হবে। একটা বক্স-টু-বক্স মিডফিল্ডারের ক্ষেত্রে এটা সমস্যার কিছু নয়, কিন্তু ফর্মহীনতার কারণে ঠিক সময়ে আক্রমণে উঠে আক্রমণের কাজটা করতে পারছেন না বাকায়োকো, ফলে ভুগছে চেলসি।

তিমুইয়ে বাকায়োকো : এখনই হতাশ হবার কিছু নেই চেলসির
৩-৫-২ ফর্মেশানে বাকায়োকো

চেলসিতে এই মৌসুমে বাকায়োকোর সমস্যাগুলো মূলত এ দুটোই। তবুও চেলসি ভক্তদের হতাশ হবার কিছু নেই। এনগোলো কান্তের সাথে খেললে বাকায়োকো কিরকম অসাধারণ খেলেন সেটার প্রমাণ তিনি এর মধ্যেই দিয়েছেন, গত দুই-তিন ম্যাচ ধরে আবারও দিচ্ছেন। আর মোনাকোতেও বাকায়োকোর খাপ খাওয়াতে বেশ সময় লেগেছিল, তাই নতুন ক্লাবে তাড়াতাড়ি খাপ খাওয়ার ব্যর্থতা বাকায়োকোর আজকের নতুন কিছু নয়। সামনের মৌসুম থেকে তাই আসল বাকায়োকোকে দেখলে আশ্চর্য হবেন না যেন!

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

2 × 1 =