তিন নম্বরের গোলকধাঁধা

ক্রিকেট জিনিসটা ব্যাটিং – বোলিং – ফিল্ডিং এই তিনের সমন্বয়। আবার বোলার হিসেবে টানা তিন বলে তিনটা উইকেট তুলে নিয়ে হ্যাটট্রিক করাটাও বেশ কৃতিত্বের। কারণ ক্রিকেট ইতিহাসে এর তালিকাটাও যে বেশ সংক্ষিপ্ত। এভাবে তিন সংখ্যাটা ক্রিকেটের সাথে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িত। আবার ধরুন না ব্যাটিং অর্ডারের কথাই; বেশির ভাগ দলের ক্ষেত্রে তাদের সবচেয়ে সেরা ব্যাটসম্যানদের তিনেই নামাতে দেখা যায়। ভারতের বিরাট কোহলি, পাকিস্তানের বাবর আজম কিংবা ইংল্যান্ডের জো রুটের কথাই ধরুন না – এরা সবাই তার নিজ নিজ দলের ব্যাটিং এর মূল স্তম্ভ। সবার পজিশন ব্যাটিং লাইনআপের তিন নম্বরেই। কারণ, লক্ষ্যটা থাকে ইনিংসের শুরুতে কোন ধাক্কা আসলে অন্তত যাতে প্রাথমিকভাবে ইনিংস মেরামতের কাজটা ঠিকমতো করা যায়। এতেই বোধ করি বোঝা যায় ক্রিকেটে ঐ পজিশনে ভালো একটা ব্যাটসম্যান দাড় করানোটা সত্যিকার অর্থে কতটা জরুরী।

কোন এক মুনি বলেছিলেন, “অন্যের দুর্বলতা নিয়ে নাক গলানোর চেয়ে নিজের শক্তিমত্তার দিকগুলোকে শান দিয়ে নেওয়াটাই বুদ্ধিমত্তার কাজ।” তবে এ তথ্য-প্রযুক্তির বিপ্লবের যুগে ক্রিকেটের সাথে এই বেদবাক্য কতটা যায় তাও প্রশ্নের বিষয় বটে। ভিডিও বিশ্লেষণ করে প্রতিপক্ষের ব্যাটসম্যান – বোলারদের দক্ষতা কাটাছেঁড়া করাটা এখন নেহাত নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। অতটা যুক্তিতর্কে না জড়িয়ে এবার নিজেদের ব্যাটিং দক্ষতাটাই দৃষ্টিগোচর করা যাক।

মুশির স্লগ সুইপ, সাকিবের লেট কাট কিংবা গুপ্তহন্তাকর মাহমুদুল্লাহর আলস্য সুন্দর কাভার ড্রাইভ – দিনের পর দিন এগুলোই যেন আমাদের ব্যাটিং এর সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপন হয়ে আছে। ঘুরিয়ে – ফিরিয়ে এদের সবাইকেই ব্যাটিং অর্ডারের তিনে – চারে বাজিয়ে দেখা হয়েছে। কিন্তু এই গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় থিতু হতে পারে নি (আদৌ দেওয়া হয় নি!) কেউ। দীর্ঘতর ভার্সানের এই পজিশনের সন্দেহাতীতভাবে সবচেয়ে সেরা খেলোয়াড় মমিনুলকেও এই জায়গায় খেলিয়ে দাবিটা এদেশের ক্রীড়া সাংবাদিকদের অনেক দিনের। কিন্তু তা না করে উল্টো সৌম্য, সাব্বিরদেরও খেলিয়ে দেখা হল।

টেকনিক্যালি দলের সবচেয়ে সেরা ব্যাটসম্যান মুশফিক কিংবা সাম্প্রতিক অতীতে সাকিবের তিন নাম্বারে ভালো খেলা সত্ত্বেও ঐ পজিশান নিয়ে টিম ম্যানেজমেন্টের কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ। ১৬ তম সদস্য হিসেবে দলে আসা মমিনুলের কপালেও দৈবভাবে জুটে যেতে পারে তিনে ব্যাটিং করার সুযোগ।

যেখানে বাকি দলগুলো টপ অর্ডারটা মোটামুটি ঠিক বাকি জায়গাগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালায় সে জায়গায় আমরা এখনও তিন নাম্বারে খেলানোর জন্য ব্যাটসম্যানের সন্ধানে আছি। দ্বিপাক্ষিক সিরিজগুলোকে বাকিরা প্রস্তুতির সুযোগ হিসেবে নেয়। আর ঐ জায়গায় ভালো করে গেলেও মেজর টুর্নামেন্ট গুলোতে গিয়ে চালাই দৈবচক্রে সবাইকে দেখার বিরক্তিকর এক খেলা। তামিমের সঙ্গীর অভাবটা এদেশের ক্রিকেটের অনেক পুরোনো স্লোগান। তবে তিন নাম্বারে কাউকে থিতু করতে না পারাটাও (কিংবা যারা আছে তাদের সঠিকভাবে ব্যবহার না করা) আমাদের অনেক বড় দুর্বলতা। ফিফা বিশ্বকাপটা শেষ হয়ে গেলেও তা বেলজিয়ামের বরাত দিয়ে রেখে গেছে “গোল্ডেন জেনারেশান” কিংবা “স্বর্ণালি প্রজন্মের” একটা ধারণা। সাকিব – তামিম – মুশি – মাহমুদুল্লাহ – মাশরাফি এই পঞ্চপাণ্ডবের সমর্থনে দিন বদলের গান শোনানো দলটাও আমদের সোনালি প্রজন্মেরই স্মারক বহন করে। তবে তিন নম্বরে কাউকে থিতু হতে না দেওয়াটা আদৌ কতটা সাফল্যমণ্ডিত করবে এই সোনালি প্রজন্মের পথচলাটা তা আসলেই প্রশ্নের বিষয়। তা না হলে ভুলের খেসারত দিতে দিতে এ দলটাও ট্রফিশুণ্যই থেকে যাবে ফ্লাওয়ার ভ্রাতৃদ্বয়ের সময়কার সেই জিম্বাবুয়ে দলের মতো।

::: নওশাদ আইয়ুব :::

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

19 − 9 =