তাহির-মুগ্ধতা

ইমরান তাহিরের স্ট্যামিনার একটা পরীক্ষা হয়ে গেল বুধবার রাতে, ওয়ার্নার পার্কে!

তার উইকেট উদযাপন মনে করিয়ে দেয় ফুটবলের গোল স্কোরারকে। প্রতিটি উইকেটই তার কাছে উৎসবের উপলক্ষ। দুই হাত দু দিকে উঁচিয়ে খ্যাপাটে দৌড়ে ছুটে বেড়ান মাঠের নানা প্রান্তে। স্ট্যামিনার চূড়ান্ত পরীক্ষা দিয়ে গত রাতে তাকে এই শারীরিক কসরতে মেতে উঠতে হলো বারবার। নির্দিষ্ট করে বললে সাতবার!

একটি রেকর্ড হাতছানি দিচ্ছে, জানতেন না তাহির। ম্যাচের আগে দেশ থেকে ফোন করে তার স্ত্রী জানালেন, রেকর্ডটি একার করে নিতে এই ম্যাচে দুটি উইকেট পেতেই হবে। তাহিরের ঘাড়ে যেহেতু একটিই মাথা, বউয়ের কথা না শুনে উপায় ছিল না। দুটি উইকেট নিয়ে রেকর্ড গড়েছেন। সেই রেকর্ড উদযাপন করেছেন আরও ৫ উইকেট নিয়ে, আরেকটি রেকর্ড গড়ে!

(মনগড়া কথা নয়, ম্যাচ শেষে প্রেজেন্টেশনে স্বয়ং তাহির বলেছেন বউয়ের এই কথা)

ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে এই ম্যাচে দ্বিতীয় উইকেট নিয়ে তাহির ছুঁয়েছেন একশ ওয়ানডে উইকেট। দক্ষিণ আফ্রিকার একজন স্পিনারের জন্য একশ উইকেট পাওয়াই বিশাল ব্যাপার। কতটা বিশাল, ধারণা নিতে পারেন একটি তথ্য থেকে। একশ ওয়ানডে উইকেট পাওয়া প্রথম দক্ষিণ আফ্রিকান স্পিনার তাহিরই!

আগের সর্বোচ্চ ছিল নিকি বোয়ের ৯৫ উইকেট। দক্ষিণ আফ্রিকার ষষ্ঠ সফলতম ওয়ানডে স্পিনার জেপি দুমিনি (৫৬), দশম সফলতম গ্রায়েম স্মিথ (১৮ উইকেট)। বুঝুন তাহলে প্রোটিয়া স্পিনারদের অবস্থা!

একশ উইকেট তাহিরের আজ-কাল বা পরশু, হয়ে যেতোই। তবে স্ত্রী তাকে মনে করিয়ে দিয়েছিলেন ‘দ্রুততম’ একশর কথা। ৫৮ ম্যাচে একশ উইকেট নিয়ে প্রোটিয়া বোলারদের মধ্যে উইকেটের দ্রুততম সেঞ্চুরিয়ান তাহির। মর্নে মর্কেল নিয়েছিলেন ৫৯ ম্যাচে।

সব মিলিয়ে তাহির চতুর্থ দ্রুততম। ৫৩ ম্যাচে একশ ছুঁয়েছিলেন সাকলায়েন মুশতাক, ৫৪ ম্যাচে শেন বন্ড, ৫৫ ম্যাচে ব্রেট লি। আপাতত ৪৮ ম্যাচে ৯৫ উইকেট নিয়ে সবাইকে ছাড়ানোর অপেক্ষায় মিচেল স্টার্ক।

রেকর্ড গড়া শততম উইকেটের পর তাহির নিয়েছেন আরও ৫ উইকেট। ৯ ওভারে ৪৫ রানে ৭ উইকেট। এই প্রথম ৭ উইকেট পেলেন দক্ষিণ আফ্রিকার কোনো বোলার। বাংলাদেশের বিপক্ষে কাগিসো রাবাদার ১৬ রানে ৬ উইকেট ছিল আগের সেরা।

৩৭ বছর ৮০ দিন, সবচেয়ে বেশি বয়সে ৭ উইকেট নেওয়ার কীর্তিও গড়লেন তাহির। আফ্রিদি ১২ রানে ৭ উইকেট নিয়েছিলেন ৩৩ বছর ১৩৫ দিন বয়সে। (তবে রেকর্ডটির আসল হকদার আফ্রিদিই, সত্যিকারের বয়স তখনই নিশ্চিত ছিল ৩৭-৩৮!)

এতসব অর্জন, অথচ ভাবুন, বয়স ৩০ পেরিয়েও আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কেবলই ছিল তাহিরের কাছে স্বপ্ন। ৩২ ছুঁইছুঁই বয়সে অভিষেক। হাল না ছাড়া, হার না মানা তাহির আজ দেশের ইতিহাসর সেরা ও সফলতম লিমিটেড ওভার স্পিনার!

সবচেয়ে ভালো লাগে, আধুনিক লিমিটেড ওভার স্পিনারদের মত ফ্ল্যাট স্পিনার নন তাহির। ধ্রপদি ঘরানার অ্যাটকিং স্পিনার। প্রথাগত লেগস্পিনটা দারুণ, টার্ন ভালো। গুগলিটা অসাধরণ। কাদির-মুশতাকের মত লিজেন্ডারি না হলেও খুব শার্প গুগলি, মন ভরিয়ে দেয়।

পাকিস্তানী তাহির দক্ষিণ আফ্রিকার হয়ে খেলার যোগ্যতা অর্জনের পর সবচেয়ে রোমাঞ্চিত ছিলেন সেই সময়ের অধিনায়ক গ্রায়েম স্মিথ। বলছিলেন, ‘একজন অ্যাটাকিং লেগ স্পিনারকে টেস্টে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য তার সইছে না তার”। বিস্ময়করভাবে টেস্টে সুবিধা করতে পারেননি তাহির। তার চেয়েও বিস্ময়রকর ভাবে দারুণ ফোর্স হয়ে উঠেছেন লিমিটেড ওভারে।

হোক বয়স ৩৭, চলতে থাকুক তবু তাহির-মুগ্ধতা। তার বোলিং, উইকেট নেওয়া আর উইকেট উদযাপন, সবকিছু দেখাই দারুণ আনন্দময়!

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

10 − four =