তাসকিনরা ফিরবে একদিন

এইতো সেদিনের কথা ।

জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে বাংলাদেশ মাত্র একজন পেসার নাজমুলকে নিয়ে নামলো । নিজেদের শক্তিমত্ত্বার জায়গা স্পিনে রাজ্জাক, সাকিব, এনামুল, রিয়াদ, নাঈমরা ।

এইতো সেদিনের কথা । প্রতিপক্ষের ব্যাটিং পাওয়ার প্লে-তে বাংলাদেশ অধিনায়ক আব্দুর রাজ্জাক কে নিয়মিত ব্যবহার করছেন বাংলাদেশ অধিনায়ক ।

উইকেট পেতে মরিয়া হয়ে একের পর এক স্পিনার ব্যবহার করা হচ্ছে । ডেথ ওভারে দায়িত্ব তুলে দেওয়া হচ্ছে স্পিনার সাকিব আল হাসানের হাতে । এইতো সেদিনের কথা । বিশ্বকাপের ১৫ সদস্যর দলে ঠাঁই হলো মাত্র তিনজন পেসারের ।

অতিরিক্ত খরুচে হওয়ায় ফ্রন্ট লাইন পেসাররা তাদের কোটায় পূরণ করতে পারলেননা । পুষিয়ে দিয়ে গেল পার্ট টাইমার রিয়াদ, নাঈমরা ।

এদেশে ক্রিকেটের জন্মলগ্ন থেকেই বিশ্বমানের পেসার নিয়ে হাহাকার ।

ক্রিকেট প্রতিবেশী পাকিস্থান, শ্রীলংকা স্পিন স্বর্গভূমিও হয়েও যেখানে ভুরি ভুরি পেসারদের জন্ম দিচ্ছিলো সেখানে বাংলাদেশের চিত্র হতাশাজনকই ছিল ।

পেসার কিন্তু কম জন্মায়নি এদেশে । অনেকেই এসেছেন । চমক দেখিয়েছেন অতঃপর ঝিমিয়ে পড়ে বাদ গেছেন চিরতরে ।

হাসিবুল হাসান শান্ত তখন রীতিমত হার্টথ্রুব । সুদর্শন এই পেসার ভালই হইচই ফেলে দিলেন । কিন্তু সহসাই হারিয়ে গেলেন অন্ধকার জগতে । তার আর ফেরা হয়নি । চিটাগংয়ে তারিক আজিজ ছোট এক স্পেলে সাড়া জাগালেন । স্বপ্ন বোনা হলো তাকে নিয়েও । কিন্তু ছেলেটি হার মানলো ইনজুরির কাছে । একই চিত্র তাপষ বৈশ্যর বেলাতেও । শাহাদত হোসেন রাজিব এলেন । বাস্কেটবল ছেড়ে তার ক্রিকেট প্রেমে ফল পেলো বাংলাদেশ দল । টেস্টে নিয়মিত হয়ে গেলেন তিনি । ইংল্যাণ্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা, নিউজিল্যাণ্ড ব্যাটসম্যানদের বিপক্ষে সাফল্যও পেলেন । অতিরিক্ত খরুচে বিধায় অনিয়মিত হলেও শাহাদতের অধ্যায়টা দীর্ঘ ছিল ।

এক সময় তার প্রয়োজনও ফুরিয়ে এলো । ব্যাটসম্যানরা তাকে আরও বেশি পেয়ে বসছিলো । মাঝখানে নাজমুল হোসেন মোটামুটি সার্ভিস দিয়ে গেলেন । প্রতিশ্রুতিশীল সাজেদুল, ডলারদের সুযোগ দেওয়া হলো অভাবে পড়ে । শেষদিকে রবিউল ইসলাম টেস্টে কিছুটা আলোচনায় এলেন ।

আসা-যাওয়া, স্বপ্ন বোনা-স্বপ্নভঙ্গের মধ্যে দিয়ে চললো দেশীয় ক্রিকেটে পেসারদের বিবর্ন নাটিকা ।

মাঝখান থেকে টিকে গেলেন এক লড়াকু যুবক ।

মাশরাফি মূর্তজা !

তারিক আজিজ না ফিরলেও ঠিকই ফিরেছিল মাশরাফি । কিন্তু তাকে ছাড়েনি ইনজুরি নামক দানবটি ।

বারবার তাকে যেতে হয়েছে হাসপাতালের বিছানায় । দুরন্ত এই অশ্বকে বারবার ছুঁড়ি-কাঁচির নিচে পা খানা উত্‍সর্গ করতে হয়েছে । ইনজুরি সখ্যতায় মাশরাফির দীর্ঘ অনুপস্থিতিতে অনেক গুটি চালা হয়েছে । অনেক ঘোড়াকে মাঠে নামানো হয়েছে । কিন্তু নড়াইল এক্সপ্রেসের বিকল্প যেন ব্যাঘ্র দুগ্ধ ।

এরপর এক তিন জাতির সিরিজে রুবেল বলে এক ছেলে এলো । উফ কি গতি তার ।

১৪০ এ নিয়মিত গোলা ছুঁড়ে আলোচনায় এলেন শ্রীলংকার বিপক্ষে ।

অবশ্য অভিষেকেই তাকে হারতে ব্যাটসম্যান মুরালীধরনের কাছে । রুবেল এ ঋণ পরিশোধ করেছি নিউজিল্যাণ্ড সিরিজে মিলসকে বোল্ড করে ।

সমসাময়িক সময়ে শফিউল ইসলাম নামেও এক পেসার এলো । আয়ারল্যাণ্ডের বিপক্ষে দুর্দান্ত ডেথ ফিনিশিং জয়ে শফিউল তখন দলের স্ট্রাইক পেসার । তবে দীর্ঘদিন নিয়মিত/অনিয়মিত দোলাচলের মাঝে ছিটকে পড়তে হলো তাকেও ।

ততদিনে আলোচনায় আল-আমিন নামক এক পেসার । ইয়র্কার আর ব্লক হোলে ছেলেটি নজর কাড়লো সবার ।

এরপর রুবেলের ইনজুরিতে ডাক পড়লো তাসকিন নামক এক টিনএজারের ।

taskin

বয়স কম হলে কি হবে । উচ্চতা আর দৃঢ়তায় এক আদর্শ পেসারের প্রতিচ্ছবি যেন মায়াকাড়া চেহারার তাসকিন তাজিম ।

রুবেল-আলামিন-তাসকিন ।

অবিশ্বাস্যভাবে এক পেসত্রয়ী উপহার পেলো ক্রিকেট পাগল বাঙ্গালী জাতি । সাথে অভিভাবকের মত অগ্রে রইল দেশের পেস কিংবদন্তী মাশরাফি ।

সময় বদলালো চমত্‍কারভাবে ।

পেস বিপ্লবে সর্বশেষ যোগ হলো বিস্ময় তরুন মোস্তাফিজুর রহমান । শীর্ণকায় এই পেসারের অটারে রীতিমত অসহায় রোহিত, ডু প্লেসিসরা । রেকর্ড গড়ে অভিষেক হলো কাটার মাস্টারের ।

২০০৭ সালের ক্যারিবিয় বিশ্বকাপে রফিক-রাজ্জাক-সাকিব ত্রয়ী জানান দিচ্ছিলো এদেশীরা স্পিন দিয়েই নিজেদের সাফল্য পর্বত গড়বে । পরবর্তীতে সোহাগ গাজী, ইলিয়াস সানীরা এলো কিন্তু দিন এসেছিল পরিবর্তনের ।

গঠনকৃতি আর ভৌগলিক অবকাঠামোক বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে স্পিন ঘূর্ণির বদলে এলো এবার গতির জলোচ্ছ্বাস ।

ইতিহাস লিখিত হলো নতুন রুপে ।

বাংলাদেশ ঘরের মাঠেই নামলো চার পেসার নিয়ে !

কি অবিশ্বাস্য !

কি অবিস্বরণীয় !

দৃশপট তখন পেসারদের মুঠোয় । এখন আর পাওয়ার প্লে-তে রাজ্জাকদের আসতে হয়না । বাধ্য হয়ে ডেথ ওভার সামলাতে হয়না সাকিবদের । এবার পালা তাসকিন, আলামিনদের ।

এবার বাংলাদেশ মাঠে নামে মাত্র একজন স্পেশালিষ্ট স্পিনার নিয়ে ।

গতির তারুন্য উড়ে যায় পাকিস্থান, ভারত, দঃ আফ্রিকা ।

এবার আর প্রোটিয়া বধে বিশ্বকাপে সাকিব, রাজ্জাকদের লড়তে হয়না । দায়িত্ব নিয়েছে পেসার রুবেল তাসকিনরা । এবি, গ্রায়েমরা এখন আর বোকা বনেনা সাকিবদের কাছে । এ্যাণ্ডারসন, ব্রডদের স্টাম্প মাটিতে চুমু খায় রুবেলদের ইয়র্কারে ।

রুবেলের ইনজুরি আর শৃংখলা ভঙ্গের সুযোগ এবার ট্রয়ো তাসকিন-মোস্তা-আলামিন । সাথে অভিভাবক ম্যাশ ।

এশিয়া কাপে সাফল্য অতঃপর বিশ্বকাপে মাশরাফির নেতৃত্বে এই ত্রয়ীর স্বপ্নযাত্রা ।

ভালো কিছুর স্বপ্নে যখন গোটা জাতি বিভর তখনই এলো এক অপ্রত্যাশিত ঝড় ।

অবৈধ বোলিং এ্যাকশনের দায়ে অভিযুক্ত তরুন তুর্কি তাসকিন আহমেদ ।

বিস্ময়ে ফ্যালফ্যাল করে হেসে দিলো ছেলেটি ।

taskin mash

দৃঢ়কন্ঠে নিজের সততার জানান দিয়ে রওনা দিলো পরিক্ষা দিতে ।

ল্যাবে ছবিও তুললো সেলফি পাগল ছেলেটি । আরেক অভিযুক্ত সতীর্থ সানি দোষী সাব্যস্ত হলেও তাসকিনের ব্যাপারে নির্ভার ছিল গোটা জাতি ।

তবে ঝড়টা কালঝড় ছিল তা এবার জানা গেল । ল্যাব টেস্টে প্রহসন চলেছিল তাসকিনের উপর । কিন্তু মুখ বুঁজে সয়ে গেল ।

আইসিসির নিয়ম লংঘিত হলো প্রতিটি টেস্ট স্টেপে ।

বোমা ফাটালেন তদারককারী আইনজীবি । ষড়যন্ত্রের গন্ধ এবার পরিস্কার হলো গ্রীস্মের দ্বিপ্রহর আলোকের ন্যয় ।

ভারত-পাকিদের কাছে নিজেদের বিকিয়ে দেওয়া আইসিসি বাদী, বিচারক হয়ে ক্রিকেট ইতিহাসে রচনা করলেন এক জঘন্য অধ্যায় ।

দেশে ফেরার পথে ছেলেটি অসহায়ভাবে
বললো ‘Nothing to say’ । পুরুষত্বহীন ICC ১৯শে মার্চকে দিলো ক্রিকেটের কলংকময় দিবসের উপহার ।

গোটা জাতি স্তদ্ধ, মানতে পারলেননা অভিভাবক মাশরাফি । মানতে পারলেননা সতীর্থ সাকিব । প্রেস কনফারেন্স আর ফেসবুক স্টেটাসে ম্যাশ-সাকিরা হয়ে উঠলো জাতির মুখপাত্র ।

হতবাক জাতি এখন পাগলপ্রায় । উন্মাদের ন্যয় কায়মানোবাক্য তারা এখন এই অবিচারের বিচার প্রার্থনায় ।

দিন পাল্টায় ।

তাসকিনরা ফিরবে একদিন । তাদের ফিরতেই হবে ।

আর সেদিন তাদের প্রলয়ংকারী ঝড় গতিতে খড়কূটোর মত উড়ে যাবে হিংসুক, নপুসংক ক্রিকেট সাম্রাজ্যবাদীরা ।

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

2 × five =