তাই বলে অশ্লীল ট্রল কেন করা হবে ক্রিকেটারদের?

২০১৪ সালে যখন ক্যারিবিয়ান সফরে গেল বাংলাদেশ, সেন্ট লুসিয়া টেস্টে ১৪৩ রানের উদ্বোধনী জুটি গড়েছিলেন ক্রেইগ ব্র্যাথওয়েট ও লিওন জনসন। এবার সেই ব্র্যাথওয়েট ও ডেভন স্মিথ গড়লেন ১১৩ রানের জুটি। অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি, মাঝের চার বছরে ৬২ ইনিংসে ওয়েস্ট ইন্ডিজ আর কোনো শতরানের ওপেনিং জুটি পায়নি!

৪৩ রানে অলআউটের দিনে কেন প্রতিপক্ষের জুটির কথা? কারণ এটিও যে ভয়ানক এক মাথাব্যথা!

কালকে মজা করে লিখেছিলাম, এই উইকেটে প্রথম দিনে বোলিংয়ের ফায়দা নিতেই অলআউট হয়েছে বাংলাদেশ। যেভাবেই হোক, প্রথম দিনে বোলিং তো পাওয়া গেল! উইকেট তখনও বেশ প্রাণবন্ত, ঘাসগুলো জীবন্ত। ময়েশ্চার তখনও কিছু আছে। ওয়েস্ট ইন্ডিজকেও ৪৩ রানে অলআউট করতে হবে, এই দাবী করছি না। কিন্তু উইকেটের ফায়দাটুকু তো নেবে পেসাররা!

ফুল লেংথে ধারাবাহিক ভাবে বোলিং করে যেতে দেখলামই না। ফুল লেংথ যখন হয়, তা অনেক বাইরে। মুভমেন্ট মিলেছে ঠিকই, কিন্তু এত বাইরে যে ব্যাটসম্যানরা ছেড়েছে অনায়াসে। বাংলাদেশের ইনিংসের কথা ভাবুন। কতজন ব্যাটসম্যান আউট হয়েছেন বলে ব্যাট ছুঁইয়ে! কারণ ক্যারিবিয়ানরা সেই লাইন-লেংথেই বল করেছে যে ছাড়া কঠিন।

এরকম উইকেটে, এমন ভঙ্গুর ও অনভিজ্ঞ ব্যাটিং লাইন আপের বিপক্ষে পেসাররা ভালো না করলে আর কখন!

টেস্টে রুবেলের বোলিং নিয়ে অনেকবারই অনেক কথা হয়েছে। ১০টির বেশি উইকেট নেওয়া বোলারদের মধ্যে টেস্ট ইতিহাসেই সবচেয়ে বাজে বোলিং গড় তার। কিন্তু ইতিহাস তো বদলানোও যায়। এই উইকেটে না করলে আর কোথায়?

কামরুল রাব্বির বলে ক্যাচ মিস হয়েছে, দূর্ভাগ্যজনক। কিন্তু লাইন-লেংথের ধারাবাহিকতা কোথায়? ১০ ওভারে দিয়েছেন ৪৫ রান।

অভিষেকেই রাহিকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো ঠিক হয় হয়ত। তবে এটাও মনে রাখতে হবে, ৬২ প্রথম শ্রেণির ম্যাচ আর প্রায় দুইশ উইকেট নেওয়ার পর টেস্ট অভিষেক। বাংলাদেশের বাস্তবতায় এমন অভিজ্ঞতা ও এমন সাফল্য নিয়ে কোনো পেসারের টেস্টে আসা বিরল। সুইংয়ের সামর্থ্য আর নতুন বলে কার্যকারিতার কারণেই তাকে টেস্ট স্কোয়াডে নেওয়া। সত্যি বলতে, মুভমেন্ট তিনিই সবচেয়ে বেশি পেয়েছেন। কিন্তু ওই যে, লাইন-লেংথ অনিয়ন্ত্রিত ! এজন্যই চাপে ফেলতে পারেননি ব্যাটসম্যানদের, রান দিয়েছেন ওভারপ্রতি সাড়ে তিন করে…।

এই তো, কদিন আগেই ক্যারিবিয়ানে এরকম উইকেট পেয়ে দারুণ বোলিং করেছে লঙ্কান পেস আক্রমণ। সুরাঙ্গা লাকমল নাহয় আসলেই স্কিলফুল। কিন্তু অনভিজ্ঞ লাহিরু কুমারা, অভিষেক সিরিজে কাসুন রাজিথাও দারুণ করেছেন। এরকম উইকেটে সেটাই করার কথা। স্রেফ জায়গায় টানা বল ফেলে গেলেই তো হয়!

পেস বোলিং কোচ কোর্টনি ওয়ালশ দায়িত্বে আছেন দুই বছর হতে চলল। আমরা তার চেষ্টা দেখেছি। একাগ্রতা দেখেছি। আলাদা করে কাজ করা, ক্যাম্প করতে দেখেছি। দলের ক্রিকেটাররা তাকে নিয়ে ভালো বলেন। কাল খেলা শুরুর আগে নতুন কোচ স্টিভ রোডসও
টিভিতে বললেন, ওয়ালশ দলের ভেতরে খুব জনপ্রিয়। কিন্তু ওই সফরে ওয়ালশের কাছে যে একটু বেশিই চাই!

একটা কথা অনেকের মনে থাকে না, টেস্টে বাংলাদেশের পেস বোলিং কিন্তু কোনো বোলিং কোচের সময়ই ভালো ছিল না। কখনোই ভালো ছিল না। একসময় মাশরাফি ছিলেন। শাহাদাতের দু-একটি ঝলক ছিল, এই তো। কোনো পেসারের টানা ভালো করা বা পেস ইউনিটের ভালো করা টেস্টে কখনোই ছিল না। বাংলাদেশের অধিনায়কদের এটি নিয়ে হতাশাও বরাবরের। মুশফিক তো অধিনায়ক থাকার বিরক্ত হয়ে প্রেস কনফারেন্সেই কয়েকবার বলে ফেলেছেন যে ফিল্ডিং অনুযায়ী বোলিংয়ের বেসিকটুকুও করতে পারে না পেসাররা।

দেশে পেস বোলিংয়ের সংস্কৃতি নেই, ঘরোয়া ক্রিকেটে পেসারদের সুযোগ নেই, পেসার বের করা, গড়ে তোলার উদ্যোগ নেই, এসব নিয়ে অনেক কচলানো হয়েছে বছরের পর বছর। ফাস্ট বোলারদের যতটা পরিশ্রম করতে হয়, যতটা প্র্যাকটিস করতে হয়, নিজেকে মেইনটেইন করতে হয়… সবচেয়ে বড় কথা, মাঠের ভেতরে-বাইরে যতটা ডিসিপ্লিনড হতে হয়, আমাদের পেসারদের বেশির ভাগ তা করে কিনা, সেই প্রশ্নও আছে। তো এমন পেস আক্রমণকে ওয়ালশ ভয়ঙ্কর বানিয়ে তুলবেন, এই চাওয়া বাড়বাড়ি। সবই ঠিক আছে।

তবু এই সফরটায় ওয়ালশের কাছে কিছু চাই। ক্যারিবিয়ানে কিভাবে বোলিং করতে হয়, তার চেয়ে ভালো কে জানে? উইকেট, কন্ডিশন, সাগরের হাওয়া কোন মাঠে কেন দিক থেকে আসে, কখন কেমন থাকে, এসব তার চেয়ে ভালো কে জানে! আর এরকম সবুজ, বাউন্সি উইকেটও বাংলাদেশ পায় কালেভদ্রে। এই সিরিজে পেসাররা ভালো না করলে আর কোন সিরিজে করবে? প্রথম দিনে পেসারদের ব্যর্থতার দায় কিছুটা তাই ওয়ালশকেও দিতে চাই। জানি তিনি চেষ্টা করেছেন, এই সবকিছুই পেসারদের অবশ্যই বলেছেন, শেখানোর চেষ্টা করেছেন, তার পরও এই সফরে ভালো না করলে অন্তত দায় তাকে নিতেই হবে…।

গত সিরিজে শ্রীলঙ্কার রাজিথা ভালো করল, তাকে নিশ্চয়ই অভিষেক সিরিজেই জাদুমন্ত্রে ভালো বোলার বানিয়ে ফেলেননি তাদের বোলিং কোচ! উইকেটে সহায়তা ছিল। রাজিথা কাজে লাগিয়েছেন। আমাদের পেসাররা সেই বেসিকটুকুও না পারলে বোলিং কোচ কি করতে পারেন! তার পরও আবার বলছি, অন্তত এই সফরে ভালো না করলে ওয়ালশকে দায় নিতে হবে কিছু। এই যে স্যার অ্যান্ডি রবার্টস, স্যার কার্টলি অ্যামব্রোসরা নিয়মিত মাঠে আসছেন, তাদের সামনে বাংলাদেশের এমন বোলিংয়ে ওয়ালশের নিজেরও বিব্রত হওয়ার কথা। ওয়ালশকে কাঠগড়ায় দেখতে ভালো লাগবে না। বাকি সফরে তাই পেসারদের ভালো কিছুর আশায় থাকলাম।

ব্যাটিং নিয়ে এমন দিনে কিছু বলাই কঠিন। সবাই তো ব্যর্থ! ঘরোয়া ক্রিকেটে অন্তত কিছু উইকেট সবুজ, বাউন্সি রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়ে কখনোই রাখা হয় না, সেই পুরোনো কাসুন্দি ঘাঁটা যায়। সফরের প্রথম ইনিংসে প্রথম সকালে ওভারকাস্ট কন্ডিশনে এমন ঘাসের উইকেটে মানিয়ে নেওয়া কঠিন, সেটা বলা যায়। তার পরও ৪৩ কে কোনো যুক্তিতে ফেলা যায় না। দল কাল ব্যর্থ হয়েছে। চূড়ান্ত ব্যর্থ। সিম্পল। সব বাস্তবতা-সীমবদ্ধতা মেনেও বলতে হবে, সাকিব-তামিম-মুশি-রিয়াদরা এখন এত অভিজ্ঞ যে এইসব প্রতিকূলতা জয় করতে হবে ২২ গজে। ব্যর্থতার মূল দায় তাদেরই…

এমন উইকেট প্রত্যাশিতই ছিল। দেশে থাকতে কথা হয়েছে এটা নিয়ে। ম্যাচের আগের দিনও কোচ-অধিনায়ক বলেছেন, সবুজ উইকেটের জন্যই প্রস্তুতি নিয়েছেন তারা। মাঠে কিন্তু সেটির কোনো প্রতিফলনই পড়ল না। দ্বিতীয় ইনিংসে আর পরের টেস্টে জ্যামাইকায় ব্যাটিংয়ে লড়াইয়ের ছাপ দেখতে চাই।

নিজেরা ৪৩ রানের পর প্রতিপক্ষ ২ উইকেটে ২০১, ১৫৮ রানের লিড, হয়ত টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের সবচেয়ে বাজে দিন। ২০০৭ সালে পি সারা ওভালের প্রথম দিনে বাংলাদেশ লাঞ্চের পর দ্বিতীয় বলে গুটিয়ে গিয়েছিল ৬২ রানে। শ্রীলঙ্কা দিন শেষ করেছিল ১ উইকেটে ১৫৪ রানে। ওই বাজে দিনটিকে রাখা যায় এবারের কাছঅকাছি।

সবশেষে, বহুবার বলা কথা, সেই চর্বিত চর্বণ আরও একবার। যতদিন এসব চলবে, আমি বলেই যাব। দল খারাপ করলে হতাশ লাগবে, সমালোচনা হবে। ট্রলও হবে। কিন্তু গালিগালাজ কেন? অশ্লিল ট্রল কেন? ক্রিকেটারদের সীমা ছাড়ানো যাচ্ছেতাই অপমান কেন? একটি খারাপ দিন এসেছে। আরও আসবে। ভালো দিনও অনেক আসবে। খেলাটা ক্রিকেট, এসব হয়ই। এই দলটাই আমাদের অনেকবার আনন্দে ভাসিয়েছে। বুক চওড়া করে দিয়েছে। গর্বিত করেছে। তাদের ব্যর্থতাটুকুও মেনে নিতে শিখি, নাকি?

সমালোচনা করা, না করা নিয়েও ইদানিং দেখছি অনেকে ট্রল করে। দল খারাপ করলে অনেককেই বলতে দেখি, “এখন তো সমালোচনাও করা যাবে না, করলেই ফ্যানবয়রা ঝাঁপিয়ে পড়বে।” অদ্ভূত কথা, সমালোচনা করতে কবে কে না করেছে? প্রত্যাশা যেখানে জড়িয়ে, অপ্রাপ্তিতে সেখানে সমালোচনা হবেই। সাধারণ মানুষের সমালোচনা গঠনমূলক বা ক্রিকেটীয় দিক থেকেও হবে না সবসময়। অনেক ধরণের কথাই হবে। কিন্তু তাই বলে গালি কেন?

সমালোচনা, ট্রল মানুষ করতেই পারে। কিন্তু অপমান, গালি, অশ্লিল ট্রল করে অমানুষ।

লেখা – আরিফুল ইসলাম রনি 

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

4 × one =