তরুণদের হাত ধরে ফরাসী বিপ্লব?

তরুণদের হাত ধরে ফরাসী বিপ্লব?
নিজের ঘরের চেনা মাঠ পার্ক দে প্রিন্সেস।
১০ জুলাই, ২০১৬…
 
ইউরোর ফাইনালের নির্ধারিত সময়ের শেষ মিনিট।
 
ফ্রান্স লেফট ব্যাক প্যাট্রিস এভরার মাইনাস থেকে বল পেলেন আন্দ্রে পিয়েরে জিনিয়াক। দারুণ এক ঝটকায় ছিটকে গেলেন পর্তুগিজ সেন্টারব্যাক পেপে। দুর্দান্ত শট টা ফাঁকি দিলো আস্থার প্রতীক হয়ে খেলতে থাকা গোলরক্ষক রুই প্যাট্রিসিওকেও।
 
স্টেডিয়াম ভর্তি দর্শক উল্লাসে মেতে উঠতে গিয়েও থেমে গেলেন। বলটা জালের বদলে আঘাত করেছে নিয়ার পোস্টে।
 
নিয়তি হয়ত লেখা হয়ে গিয়েছিল তাতেই। ইঞ্জুরড ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো বিহীন পর্তুগাল ডিফেন্স করে গেলো দাঁতে দাঁত চেপে। পুরো সিজনে ফ্রান্স এর ক্লাব লিলের হয়ে নিষ্প্রভ থাকা এডার-এ ভর করে যেন ফিরে এলেন রোনালদো। এডার এর ৩৫ গজ দূর থেকে নেওয়া “শট অফ হিজ লাইফটাইম ” এ পর্তুগাল জিতে নিলো ইউরো ২০১৬… অভিজ্ঞতা আর তারুণ্যের মিশেলে টুর্নামেন্ট জুড়ে চোখ ধাঁধানো ফুটবল উপহার দেওয়া ফ্রান্স দলের ছোঁয়া হল না ১৮ বছর ধরে অধরা ট্রফিটা। নিজ মাঠ থেকে ফ্রেঞ্চ দর্শকরা ফিরলো চোখের জলে ভেসে।
 
ইউরোপে এখন স্বল্প পরিচিত, উঠতি ফর্ম এর নতুন কোন খেলোয়াড় এর নাম শুনলে মোটামুটি বলে দেওয়া যায় তার নাগরিকত্ব ফ্রান্স বা বেলজিয়ামের । ফ্রান্স ফুটবলে প্রতিভার এতটাই ছড়াছড়ি যে, তারা অনায়াসে দুটো দল গঠন করে বিশ্বকাপে পাঠাতে পারে, দুটো দলই অন্তত কোয়ার্টার ফাইনালে খেলার যোগ্যতা রাখে।
 
গোলবারে টটেনহ্যাম হটস্পারের হুগো লরিসের জায়গা পাকা। ৫-৬ বছর ধরেই ধারাবাহিক ভাবে ক্লাব ও দেশের হয়ে একই ছন্দে খেলে যাচ্ছেন। ৯৬ ম্যাচ খেলা হয়ে গেছে। রিফ্লেক্স, হ্যান্ডলিং, ডাইভিং… সব মিলিয়ে লরিস আদর্শ শটস্টপার, আদর্শ সুইপার কিপারও বটে।
 
দ্বিতীয় গোলরক্ষক হিসেবে সম্ভবত ফ্রান্স দলের হয়ে বিশ্বকাপ যাবেন পিএসজি র আলফনসো এরিওলা। তৃতীয় পছন্দের গোলরক্ষক হওয়ার জন্য লড়বেন মার্সেই এর স্টিভ মান্দান্দা ও বোর্দোর বেনোয়া কস্টিল। তবে লরিস ইঞ্জুরিতে না পড়লে এদের খেলার সম্ভাবনা খুব কম।
 
বাকারি সানিয়ার পর ফ্রান্স এর রাইটব্যাক পজিশনে থিতু হতে পারেননি কেউই। ম্যাথিউ দেবুশি, সেবাস্তিয়ান করচিয়া রা সম্ভাবনার ঝলক দেখিয়ে হারিয়ে গেছেন। মোনাকোর জিব্রিল সিদিবে ভালোই খেলছিলেন। তার ইঞ্জুরিতে কোচ দেশম কে নিস এর ৩৪ বছর বয়সী ক্রিস্টফ জ্যালেট এর শরণাপন্ন হতে হয়েছে। তবে এ মৌসুমে স্টুটগার্টের হয়ে ধারাবাহিক পারফর্ম করা বেঞ্জামিন পাভার্ড কে কোচ দলে ডেকেছেন। ফ্রেন্ডলি ম্যাচগুলোতে তার পারফরমেন্স বেশ আশাব্যঞ্জক। কে জানে, চমক দেখিয়ে তিনিও রাশিয়ার বিমানে উঠে যেতে পারেন ফ্রান্স এর ব্যাকআপ রাইটব্যাক হিসেবে।
তরুণদের হাত ধরে ফরাসী বিপ্লব?
লেফট ব্যাকে কোচের সবচেয়ে বড় ভরসা হতে পারতেন মোনাকো তে দুর্দান্ত মৌসুম কাটিয়ে পেপ গারদিওলার নজর কাড়া বেঞ্জামিন মেন্ডি। মৌসুম শেষ করা ইঞ্জুরিতে খুব সম্ভব ভেস্তে গিয়েছে তার বিশ্বকাপ স্বপ্ন। তাই ডিফেন্সের বামদিকে কোচের প্রথম পছন্দ হয়ত হবেন পিএসজি র লেভিন কুরজাওয়াই। বিকল্প হিসেবে থাকবেন বার্সেলোনার লুকাস দিনিয়ে।
 
সেন্টারব্যাক জুটি হিসেবে রিয়ালের রাফায়েল ভ্যারেন আর বার্সেলোনার স্যামুয়েল উমতিতির খেলার সম্ভাবনাই বেশি। অভিজ্ঞতার মূল্য দিয়ে দল সাজাতে চাইলে ভারানের জায়গায় লরাঁ কসিয়েনলি আসতে পারেন। এই মৌসুমে বার্সেলোনার দুর্ভেদ্য রক্ষণ এর অন্যতম স্তম্ভ এই উমতিতি। তাকে বেঞ্চে বসিয়ে রাখার বিলাসিতা হয়ত দেশম দেখাবেন না।
 
মুশকিল হল বিকল্প ডিফেন্ডার যারা আছেন, তাদের বড় মঞ্চে খেলার অভিজ্ঞতা নেই বললেই চলে। মূল একাদশে তারা খেলার সুযোগ পান কালেভদ্রে। মূল ডিফেন্ডার দের ইঞ্জুরি কিংবা ফর্মহীনতার কারণে জায়গা নেওয়ার মত পরীক্ষিত ডিফেন্ডারের অভাবে ফ্রান্স কে ভুগতে হতে পারে।
 
পিএসজি র প্রেসনেল কিমপেম্বে, স্টোক সিটির কুর্ট জুমা, সেভিয়ার ক্লেমেন্ত ল্যাংলেট, মার্সেই এর আদিল রামি দের দিয়ে ভারানে, কসিয়েনলি বা উমতিতির অভাব সহজে পূরণ হবার নয়।
 
মিডফিল্ডে ফ্রান্স এর তারকার অভাব নেই।
 
ফ্রান্স দলে আছে সব ধরনের কার্যকর মিডফিল্ডার।
 
ডেস্ট্রয়ার হিসেবে চেলসির এনগোলো কান্তের ক্লান্তিহীন ইন্টারসেপশন, বক্স টু বক্স ভূমিকায় ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের পল পগবার অফুরন্ত প্রাণশক্তি, সেন্ট্রাল মিডফিল্ডে বা ওয়াইড মিডফিল্ডে বায়ার্ন মিউনিখের কোরেন্টিন তোলিসোর সৃজনশীল পাসের পসরা… সবই প্রতিপক্ষ ডিফেন্স গুঁড়িয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।
 
ব্যাকআপ চাই? বেঞ্চে অপেক্ষায় রয়েছেন জুভেন্টাসের অভিজ্ঞ ব্লেইজ মাতুইদি, সেভিয়ার স্টিভেন এনজোনজি, ভ্যালেন্সিয়ার জিওফ্রে কন্ডোগবিয়া, নিউক্যাসল ইউনাইটেডের মুসা সিসোকো, পিএসজির আদ্রিয়েন র‍্যাবিওট রা।
 
উইং নিয়ে খুব সম্ভব মধুর সমস্যায় পড়তে হবে কোচ দিদিয়ের দেশম কে।
 
মার্সেই এর দিমিত্রি পায়েত, বার্সেলোনার ওসমানে দেম্বেলে, মোনাকোর থমাস লেমার, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের এর অ্যান্থনি মারশিয়াল, পিএসজির কিলিয়ান এমবাপ্পে, বায়ার্ন এর কিংসলে কোমান রা তো আছেনই, এই সিজন এর পারফরমেন্স বিবেচনায় লিঁওর হয়ে ১৬ গোল, ৬ এসিস্ট করা নাবিল ফেকির এবং মার্সেই এর হয়ে ১৬ গোল, ১০ এসিস্ট করা ফ্লোরিয়ান থোউভিনকেও উপেক্ষা করা মুশকিল।
 
বাকি রইল আক্রমণভাগ।
 
কোচের অবিসংবাদিত পছন্দ অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদের সুপারস্টার আঁতোয়া গ্রিজম্যান। তবে প্রথাগত নাম্বার নাইন বলতে যা বোঝায়, গ্রিজম্যান ঠিক তেমন নন। তিনি বরং মূল স্ট্রাইকার এর খানিকটা পেছনে থেকে প্লেমেকার অথবা সেকেন্ড স্ট্রাইকারের ভূমিকাতেই স্বচ্ছন্দ। ক্লাবে আগে ফার্নান্দো তোরেস তার সামনে নাম্বার নাইন হিসাবে খেলতেন, এখন খেলেন দিয়েগো কস্তা। সিজনের প্রথম ভাগে গ্রিজম্যান কে একক স্ট্রাইকার হিসেবে খেলানো হলেও নিষ্প্রভ ছিলেন তিনি। জানুয়ারি তে ডিয়েগো কস্তা যোগ দেওয়ার পর তিনি ফর্ম এ ফেরেন। এখন লিগে তার গোল ১৮ টি, এসিস্ট ৮ টি।
 
ফ্রান্স জাতীয় দলে কস্তার জায়গাটা নিতে পারেন আর্সেনাল স্ট্রাইকার আলেকজান্দ্রে লাকাজেত্তে। ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে নিজের প্রথম সিজনে ১০ গোল করে নিজের সামর্থ্য জানান দিয়েছেন তিনি। চেলসির অলিভিয়ের জিরুও কোচের পছন্দের তালিকায় আছেন। চমক হিসেবে থাকতে পারেন সেভিয়া ফরওয়ার্ড উইসাম বিন ইয়েদের। লিগে ৬ আর চ্যাম্পিয়নস লিগে রোনালদোর পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১০ গোল করে তিনিও কোচকে বার্তা দিয়ে রেখেছেন। রিয়াল মাদ্রিদের করিম বেনজেমা তার পরিকল্পনাতে নেই সেটা দিদিয়ের দেশম আগেই জানিয়ে রেখেছেন।
 
বিশ্বকাপে ফ্রান্স এর দুশ্চিন্তার কারণ হতে পারে তাদের বাছাই পর্বের পারফরমেন্স।
 
নেদারল্যান্ড, সুইডেন, বুলগেরিয়া, বেলারুশ, লুক্সেমবার্গকে নিয়ে গড়া কঠিন গ্রুপে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হলেও গোল করেছিল মাত্র ১৮ টি। নেদারল্যান্ড, সুইডেন, বুলগেরিয়া, বেলারুশ, লুক্সেমবার্গকে নিয়ে গড়া কঠিন গ্রুপে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হলেও গোল করেছিল মাত্র ১৮ টি যা গ্রুপ চ্যাম্পিয়নদের মাঝে দ্বিতীয় সর্বনিম্ন। ( সর্বনিম্ন ১৬ গোল আইসল্যান্ড এর)। পারফরমেন্স এর ওঠানামাও ছিল লক্ষণীয়। নেদারল্যান্ড কে ৪-০ গোলে উড়িয়ে দিলেও দুর্বল বেলারুশের কাছে অ্যাওয়ে ম্যাচে ১-৩ গোলে হারে ফ্রান্স, পাশাপাশি হোম ম্যাচেও লুক্সেমবার্গ এর সাথে গোলশূন্য ড্র করে ফ্রান্স।
 
বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়া, পেরু, ডেনমার্ক কে নিয়ে গড়া সহজ গ্রুপে পড়েছে ফ্রান্স। দ্বিতীয় রাউন্ড থেকেই হয়ত ফ্রান্স কে দিতে হবে কঠিন পরীক্ষা। তাতে ফরাসি তরুণ তুর্কী রা বাজিমাত করবে, না কি প্রত্যাশার চাপে নুয়ে পড়বে? সে প্রশ্নের উত্তরটা সময়ের হাতেই তোলা থাক।
লেখা ::: তানভীর হক তূর্য

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

18 − seven =