ডেভিড বেকহাম : ফুটবলার নাকি ফ্যাশন আইকন?

‘ম্যাইটার বল’ ঘাসের উপরে এক অ্যাঙ্গেলে রাখা আছে। বলটি ফুটবলারদের মাঝে ‘ঘূর্ণিত-মন্তক’ ঘটাতে বেশ সেয়ান। এক-দুই কদম পেছালেন। পায়ের মোজাজোড়া অন্য ফুটবলারদের তুলনায় কিঞ্চিৎ নিচে পড়া।কিন্ত তিনি রুই কস্তা নকলনবিশ নন। কোমরে হাত,চোখের খরশান দৃষ্টি একবার মাইটার বলের দিকে তো আরেকবার গোলপোস্টের দিকে। গ্রহনক্ষেত্রের কোন নির্দিষ্ট আবক্র পথে বলটিকে পাঠাবেন নিজের ভাবিবোধকে কাজে লাগিয়ে তাই যেন স্থির করে নিলেন। ক্যামেরাটা তার দিকে তাক করে আছে,অধিনায়কের আর্মব্যান্ড তার হাতকে যেন পরম আলিঙ্গনে ধরে রেখেছে। গোলপোস্টের সামনে অতন্দ্র প্রহরীর মতো অপেক্ষারত আছেন গোলরক্ষক। রেফারি ফু দিলেন বাঁশিতে,এগিয়ে এসে বলটিকে পাঠালেন আগেই ভেবে রাখা ঠিকানার উদ্দ্যেশে,জালের শীর্ষ কোণে এবং ডেভিড বেকহাম ইংল্যান্ডকে নিয়ে গেলেন ২০০২ বিশ্বকাপের মূল পর্বে।


ফুটবলীয় দৃষ্টিকোন থেকে বেকহাম একজন আন্ডাররেটেড খেলোয়াড়,তথাপি দলের চরম মুহুর্তে তার ভূমিকা অপরিসীম।এই ব্যাপারটিকে কখনোই অতিরঞ্জন মনে হবে না। ৯৪/৯৫ সিজনে যখন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড থেকে লোনে তাকে প্রেস্টনে পাঠানো হলো নিজের ফুটবলীয় দক্ষতা সম্পর্কে খানেকটা হলেও হতাশ হয়েছিলেন, কিন্ত হার না মানা প্রত্যয় তাকে দিয়েছিল অনুপ্রেরণা।যার ফলাফল প্রেস্টনের হয়ে অভিষেকেই গোল,তাও আবার সরাসরি কর্ণার থেকে,যা ফুটবলে কদাচিৎ দেখা যায়। প্রেস্টনের হয়ে খেলেছেন মাত্র পাঁচ ম্যাচ,গোল করেছেন দুটি। একটির কথা মাত্রই বললাম, অন্যটি বেকহামের নিজের প্রিয় ছিল। অনুমান করাই যাচ্ছে কোন ধরনের গোল সেটি। হ্যাঁ,ফ্রি কিকেই আসে প্রেস্টনের হয়ে দ্বিতীয় গোল। এই অল্পকিছু ম্যাচেই নিজের জাত চেনালেন। স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসনও যা বোঝার বুঝে গেলেন,নিয়ে আসলেন ওল্ড ট্রাফোর্ডে।

প্রাণান্তকর ডান-পা আর উইঙ্গার হিসেবে সুনাম পেতে শুরু করলেন। আর ফ্রি-কিক ছিল বেকহামের হলমার্ক, রেসলার হলে এটাই হত তার সিগনেচার মু্ভ, ইম্প্যাক্ট থাকতো স্টিভ অস্টিনের স্টানার বা ব্রাদার্স অফ ড্রেসট্রাকশনের আন্ডারটেকার ও কেইনের চোকস্ল্যামের মতোন।


আগের মৌসুমে শিরোপা সংখ্যা শূন্য হওয়ায় কোচ ফার্গুসনের উপরে মিডিয়া এবং সমর্থকদের একটা বাড়তি চাপ ছিল স্টার প্লেয়ার কেনার জন্যে। কিন্ত কোচ ভরসা রাখলেন তরুনদের উপর।ভরসা রাখলেন “ফার্গুসনস ফ্লেজলিঙ্গস”দের উপর;নিকি বাট,রায়ান গিগস,পল স্কোলস,নিভিল(ফিলিপ,গ্যারি)ভ্রাতৃদ্বয় এবং ডেভিড বেকহাম। ওই মৌসুমে প্রিমিয়ার লীগ ও এফ.এ কাপ জয়ে ভূমিকা রাখলেন বেকহাম।


১৯৯৬/৯৭ মৌসুমের প্রথম ম্যাচে ইউনাইটেডের প্রতিপক্ষ উইম্বলডন। আশানুরূপ ইউনাইটেড ২-০ গোলে এগিয়ে। ১০ নাম্বার জার্সি পরিহিত খোশপোশাকি হরিদ্বর্ণ চুলের অধিকারী বেকহাম বল পেলেন মাঝমাঠে নিজের অর্ধে। এমন এক সিদ্ধান্ত নিলেন যা নিজের ক্যারিয়ারকে একদম পরিবর্তন করে দিল। একদম অধীত ঔদাসিন্যে অ্যাডিডাস প্রেডাটর বুট দিয়ে বলে লাথি মারলেন।দুর্ভাগা উইম্বলডনের গোলি নীল সালিভান বেকহামের সাথে নেমে পড়লেন এক টেলেকেনিটিক যুদ্ধে। দুইজনেই চাচ্ছেন বল যাতে নিজেদের মান্য করে। ৬০ গজ দূর থেকে বেকহামের পায়ের জাদুতে বল ন্যানোসেকেন্ডের মধ্যে জালে জড়াতে লাগলো। নীল সালিভানের ছিল না কিছুই করার।’অ্যান্ড উইথ দ্যাট আ স্টার ওয়াজ বোর্ন’।


বেকহাম ট্রেনিং এ আসতো সবার আগে আর যেত সবার পরে।নিজের ছাত্র সম্পর্কে স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসন বলেন বেকহাম যখন প্রথমে ক্লাবে আসে সে ক্লাবের সাথে সকাল-বিকাল অনুশীলন করার পরে সন্ধ্যায় স্কুলছাত্রদের সাথে আবার নেমে পড়তো মাঠে, জোর করে মাঠ থেকে তাকে তুলে নিতে হতো। অন্যদের জন্যে ডেভিড ছিল এক উদাহরণসরুপ। বেকহাম আর ফার্গুসনের সম্পর্ক ছিল পিতা-পুত্রের মতন। বেকহামের বিপদে সবার আগে আসতেন ফার্গুসন,বেকহামও যেকোন দরকারে ছুটে যেতেন তার কাছে।


১৯৯৮ সাল বেকহামের জন্যে মোটেই সুখকর ছিল না। ফ্রান্স বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বাদ পড়ার জন্যে দ্বায়ী করা হয় তাকে।নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার স্বীকার বেকহাম যেন ক্লাবেও হারিয়ে ফেলেছেন ছন্দ। কারণ ততদিনে ফুটবলের বাইরেও তার অস্তিত্ব মিলতে শুরু করেছে অন্য এক রঁজক জীবনের। নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন একজন আসল ৯০ দশকের স্টাইল আইকন হিসেবে। কেন হবে না! “দিয়ামান্তে কানের দুল,বুটকাট জিন্স এবং টিম্বারল্যান্ড বুটস ইন টোও” অন্য কাকে এমন মানাতো? তারকাখ্যাতির শীর্ষচূড়ায় নিজের অবস্থান যখন ধার্য ঠিক তখনই ‘প্রেস অ্যান্ড পাবলিকের’ সমালোচনার তীব্র ধারালো তীর ছোড়া শুরু হলো। কিন্ত ডেভিড বেকহাম তাদের পাত্তা দিলেন না বিন্দুমাত্র। পুরা সিজন জুড়েই ইউনাইটেড শেষের দিকে যেভাবেই হোক জয় ছিনিয়ে আনতেন,যা তাদের শুরুর দিকের বাজে খেলার দ্বায়মুক্তি।

স্পার্সের বিরুদ্ধে সিজনের শেষ ম্যাচে বেকহামের দল ০-১ এ পিছিয়ে।টিপিক্যাল বেকহামীয় গোল মানে বক্সের বাইরের থেকে গোল করে দলকে ম্যাচে ফেরালেন। শেষপর্যন্ত ২-১ ম্যাচ এবং পরবর্তীতে লীগও জিতে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড। লীগ জয়ের পরে এবার আসলো স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসনের প্রথম চ্যাম্পিয়নস লীগ জয়।বায়ার্ন মিউনিখের সাথে ফাইনালে সবাই জানে যে নায়ক ছিল টেডি শেরিঙ্গহাম এবং বর্তমানে ক্লাবের কোচ ওলে গানার সলসায়ার। এই ম্যাচে অসম্ভব প্রেশারের মধ্যেও বেকহাম খেলেছিল অনন্যসাধারণ ফুটবল। নিষেধাজ্ঞার জন্যে খেলতে পারেননি মিডফিল্ড ডুয়ো রয় কিন ও পল স্কোলস;এই দুজনের অভাব পূরণ করা অসম্ভব কিন্ত বেকহাম নিজের সাধ্যের বাইরে গিয়ে করেছেন অনন্যসাধন।সেরা পারফর্ম্যান্স হিসেবে ফুটবল ইতিহাসে সবসময় উপেক্ষিত হয়েছে বেকহামের এই খেলা। ফাইনালের দুটো গোলই এসেছে তার কর্ণার থেকে। ১৯৯৯ সালই বেকহামের জীবনের সেরা হয়ে থাকবে।ট্রেবল জিতেছেন।রিভালদোর কাছে হেরে দ্বিতীয় হয়েছেন ইউরোপ ও ফিফা বর্ষসেরার পুরস্কারে। এই বছরেই বিয়ে করেছিলেন পপস্টার ভিক্টোরিয়াকে।


এক্সক্লুসিভ ম্যাগাজিন ডিল,অত্যাধিক পার্টি এবং ছেলে ব্রুকলিনের বাবা হঠাৎ করেই বেকহামের পরিচয় হয়ে উঠেছে এই ব্যাপারগুলো।ফুটবলার বেকহামকে ভুলে বসেছেন অনেকেই। লিজেন্ডারি ফুটবলার জর্জ বেস্ট বলতেন যে বেকহামে বা-পায়ে খেলতে পারে না, হেড দিতে পারে না, ট্যাকল করতে পারে না, অনেক গোলও করে না; এসব বাদ দিতে সে ঠিকই আছে। এভাবেই মানুষ মনে রাখে বেকহামকে।

মন্দের ভালো ফুটবলার তবে খুবই ভালো ব্যবসায়ী।কিন্ত বেকহাম যা করতে পারতেন অন্য সবার পক্ষে সেটা পারতপক্ষে অসম্ভব। প্রথম ইংলিশ ফুটবলার হিসেবে ভিন্ন চার দেশের ফুটবল লীগ জিতেছেন।চ্যালেঞ্জ নিতে ভালোবাসতেন। তো আচ্ছা বলুন কে এগিয়ে আসতো যখন ইংল্যান্ডের বিশ্বকাপে যাওয়ার জন্যে প্রয়োজন ছিল একটি মিরাকেলের। ওই সময়ে বেকহাম ছাড়া অন্য কেউ যদি এমন মিরাকেল ঘটাতে পারতো বলে আপনার মনে হয় তাইলে আপনি নিতান্তই মিথ্যা বলছেন।ইংলিশদের ভালোবাসায় সিক্ত হতে লাগলেন,সমর্থকরাও সাগ্রহে মেনে নিলেন তাদের অধিনায়ককে। একেক সপ্তাহে একেক চুলের ঢঙ! পপস্টার বউ! বিভিন্ন ধরনের পোশাক! হলিউড!! এগুলা কোনো ব্যাপারই না,কারণ আমরা ডেভিড বেকহামের কথা বলছি।

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

7 + twelve =