ডিয়েগো সিমিওনে : একজন মাঝমাঠের যোদ্ধা

অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদের কোচ হিসেবে এতটাই ভালো করেছেন যে মানুষজন ভুলেই বসে আছে মিডফিল্ডার ডিয়েগো সিমেওনের কথা।যার লড়াকু মনোভাব নিজ দলের সবাই হতে শুরু করে বিপক্ষ দল তো জানতোই,জানতো মাঠের ঘাসও।

নিতান্তই জয়ের অভিলাষ নাকি তার থেকেও বেশি কিছু নাকি ব্যাপারটা পুরোটাই অবসেশন!প্রতিপক্ষ সমর্থকদের কাছে যারা দাঁড়কাকের কর্কশ ডাকের মতোন শুধু ঘৃণায় পেয়েছেন আর নিজের সমর্থকদের কাছে অকুন্ঠ ভালোবাসা।হ্যা,এমনি ছিলেন “এল চোলো”।একজন ডিয়েগো সিমেওনে।

“হোল্ডিং অ্যা নাইফ বিটউইন মাই টিথ”,নিজের খেলার ধরন সম্পর্কে সিমেওনের অকপট স্বীকারোক্তি।এই ফ্রেজটাকে চাইলে অনেক আঙ্গিকে ব্যাখ্যা করা যাবে,কিন্তু এটা একদম পরিষ্কার যে রণলিপ্সুতা তার খেলার অঙ্গে অঙ্গে জড়িয়ে আছে।আর এই ব্যাপারটা সযত্নে লালন করা হয়েছে যখন সিমেওনে অল্প বয়স থেকেই খেলেছিল ল্যাৎসিও এবং ইন্টার মিলানে।

রাজধানী বুয়েনস আয়ার্সে ১৯৭০ সালে জন্মগ্রহন করা এল চোলোকে ছোটবেলা থেকেই সুযোগ দেয়া হয়েছিল ফুটবলার হিসেবে তার স্বপ্ন পূরন করার।যোগ দেন আর্জেন্টাইন ক্লাব ভেলেজ সার্স্ফেল্ডে।আর কোচ,ঠিক কোচ না অভিভাবক হিসেবে পান আর্জেন্টাইন ফুটবলে বেশ পরিচিত মুখ ভিক্টোরিও স্পিনেত্তোকে।স্পিনেত্তো আকাশি-সাদাদের হয়ে খেলেছেন ১৯৩০ এর মাঝামাঝি সময়ে এবং কোচ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন ১৯৫০ এর শেষ থেক ১৯৬০ এর শুরুর দিক পর্যন্ত।সিমেওনে যখন ভেলেজের যুবদলে যোগ দেয়,ততদিনে বয়স ৭০ ছোয়া স্পিনেত্তো,তার ভালোবাসার দল ভেলেজের যুবাদের কোচিং করাতেন। আর্জেন্টিনা সবসময় যে ধরনের ফুটবলের(লা নুয়েস্ট্রা)জন্যে বিখ্যাত সেই ট্যাক্টিক্সে হঠাৎ করেই মানুষের আস্থা চলে গেলো।যার কারণ অবশ্য ১৯৫৮ বিশ্বকাপে চেকোস্লোভাকিয়ার কাছে ৬-১ গোলের অসহায় আত্মসমর্পন। নতুন কোনো ছন্দের দরকার যা আবার আলবিসেলেস্তেদের হয়ে ফুটবলে সাফল্য আনবে।মিললো নতুন ছন্দের,ঠিক ছন্দ না প্রতিপক্ষের ছন্দ ভাঙ্গার কৌশল,অ্যান্টি-ফুটবল যার নাম।স্পিনেত্তোর নাম জুড়ে আছে এই স্টাইলের সাথে।স্পিনেত্তোও ফুটবল্ প্রেমী ছিলেন,খালি তার এই প্রেম একটু ভিন্নরূপ নিয়েছিল।চোখধাধানো ফুটবলীয় আর্টিস্টি বা দর্শকদের মন জুড়ানো ফুটবল খেলা ছিলো না তার আবেগের অংশ।স্পিনেত্তোর কাছে ফুটবল মানে জয়।তার আন্ডারে খেলে সিমেওনে হয়েছেন একজন যোদ্ধা।হার মানা যাবেনা কিছুতেই এবং জয় ছাড়া অন্যকিছুর উৎযাপন একেবারেই নিষিদ্ধ।অল্পের জন্যে মিসে মিলবে না “প্যাট অন দ্যা ব্যাক” বা ট্রিকারি করতে গিয়ে বল হারানোতে জুটবে না হাততালি। কোচ সিমেওনেকে একবার জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল কি আশা করেন তার প্লেয়ারদের কাছে? “প্রচেষ্টা”,যা অবিনিমেয়। ব্যক্তিগত স্বার্থের চেয়ে দলের স্বার্থ আগে এই মন্ত্র যে সিমেওনে স্পিনেত্তোর কাছে পেয়েছেন তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। ১৯৮৬ সালে ডিয়েগো ম্যারাডোনাকে বিশ্বকাপ তুলতে দেখা ১৬ বছর বয়সী সিমেওনের ফুটবলীয় গঠনকালীন সময়কে বলা যায় আর্জেন্টিনার ফুটবলের গোল্ডেন এরা।শহরতলী থেকে উঠে আসা বিশ্বকাপ জয়ী ম্যারাডোনা যেন এক অনুপ্রেরনার নাম।সিমেওনের ফুটবল স্বপ্ন যেন সত্যির পথে।

এর এক বছর পরেই মানে ১৭ বছর বয়সে ভেলেজ সার্স্ফেল্ডের হয়ে অভিষেক সিমেওনের,যদিও তার দল হেরেছে ১-২ এ।ডেব্যু সিজনেই দলের অতীব গুরুত্বপূর্ণ প্লেয়ার হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করেন।২৮ ম্যাচ খেলেছেন করেছেন ৪ গোল।সিমেওনের সুনাম হিসেবে আগ্রাসন সবদিকে ছড়িয়ে পড়লেও টেকনিক্যাল এবিলিটিও যথেষ্ট প্রতীয়মান।বক্স-টু-বক্স মিডফিল্ডার হিসেবে খেলা সিমেওনে করতে পারতেন সব।বিভিন্ন রেঞ্জে পাস দেয়া হতে শুরু করে,বিপক্ষ দলের আক্রমন ভেস্তে দেয়া এবং নিজদলের আক্রমনের ভিত গড়ে দেয়া।

ভেলেজে তিনবছর থাকার পরে ১৯৯০ এ ইতালির ক্লাব পিসাতে যায় সে।মাঝে ১৯৮৮ সালে আন্তর্জাতিক ফুটবলে অভিষেক্ও হয় এল চোলোর।পিসা কোনোমতেই ইউরোপের আকর্ষনীয় দলের মধ্যে পড়ে না কিন্ত ইতালির অভিজাত দলগুলোর বিপক্ষে খেলার সুযোগ তারাই প্রথম দেয় সিমেওনেকে।তার প্রথম সিজনেই ক্লাব হয়ে যায় রেলিগেটেড এবং পরবর্তী বছরেও প্রমোশনের দেখা না মিলাতে ইতালি অধ্যায় ১৯৯২ তে শেষ করে স্পেনে চলে আসেন সিমেওনে।যোগ দেন সেভিয়াতে।কোচ হিসেবে পান আর্জেন্টিনা্র অ্যান্টি ফুটবল স্কুল দর্শনের আরেক বিখ্যাত নাম কার্লোস বিলার্দো।

ষাটের দশকে আর্জেন্টাইন ক্লাব ফুটবল মাতিয়ে ছিল ক্লাব এস্তুদিয়ান্তেস,কার্লোস বিলার্দো ছিলেন ওই গ্রেট এস্তুদিয়ান্তেসের অন্যতম সদস্য।বিলার্দোরা খেলেছেন কোচ অসভালদো জুবেলদিয়াসের অধীনে।এই জুবেলদিয়াসই কোচ বিলার্দোর কোচিংকে আকৃতি দিয়েছে।অ্যান্টি ফুটবল নিয়ে কথা বলছি আর স্পিনেত্তোর কথা আসবে না তা কী করে হয়।বিলার্দোর গুরু মানে অসভালদো জুবেলদিয়াসের গুরু কিন্তু আর কেউ নন এই ভিক্টোরিও স্পিনেত্তো।মানে পরোক্ষভাবে বিলার্দো কোচিং আদর্শ পেয়েছেন স্পিনেত্তোর হাতে।বিলার্দোর হাতেই আসে আর্জেন্টিনার দ্বিতীয় বিশ্বকাপ।৯০তে ফাইনালে জার্মানির কাছে না হারলে জিততেন টানা দুই বিশ্বকাপ।১৯৯২ তে বিলার্দো দায়িত্ব নেন সেভিয়ার।বলা রাখা দরকার এই বিলার্দোই ১৯৮৮ সালে সিমেওনেকে দিয়েছিল প্রথমবারের মতোন জাতীয় দলে খেলার সুযোগ।সেভিয়াতে এই দুই আর্জেন্টাইনের সাথে যোগ দিয়েছিলেন আর কেউ নন স্বয়ং ডিয়েগো ম্যারাডোনা।

যদিও ম্যারাডোনা আর বিলার্দো সেভিয়াতে ছিলেন মাত্র একবছর,সিমেওনে ক্লাব ছাড়েন আরো এক বছর পরে,যোগ দেন আরেক স্প্যানিশ ক্লাব অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদে। সিমেওনে আর অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদ যেন একই সুতোয় গাথা।একে অন্যের পরম বন্ধু।লস কোলচেরোনোসরা আজীবন ছিল লসব্লাংকোসদের ছায়াতে।তাদেরকে সবসময় লড়তে হয়েছে রিয়াল মাদ্রিদের রাজনৈতিক আর অর্থনৈতিক প্রতাবের বিপক্ষে।১৯৯৫-৯৬ সিজনে আসে অ্যাটলেটির সাফল্য।জোহান ক্রুইফের ড্রিমটিমের ম্লান হওয়া আর তাতেই সার্বিয়ান কোচ র‌্যাডি এন্টিচের অধীনে লা-লীগ ও কোপা ডেলরে জিতে অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদ।মাত্র ২৪ বছর বয়স হলেও কোচ এন্টিচের অ্যাটলেটির হার্ট ছিল এল চোলো।সিমেওনে বনে গিয়েছিল একেবারে এক “কাল্ট হিরো”।সিমেওনের খেলার ট্রেডমার্ক ছিল হঠাৎ করেই মাঝমাঠ থেকে অ্যাটাকে যাবার।যেটিকে ফুটবল লেখক রায়ান বাল্ডি বলেছেন “লাঙ্গ বাস্টিং ব্রেক ফ্রম মিড টু অ্যাটাক”।নির্ভূল ট্যাকেলের মাধ্যমে বল নিজের আয়ত্বে এনে দলের কাউন্টার অ্যাটাক পরিচালনাও করতেন তিনি এবং ভিসেন্তে ক্যালদেরনের সবাই তাকে অনুকরন করতো।

১৯৯৭ সালে ইন্টারে চলে গেলেও আবার ফিরে আসেন প্রিয় ক্লাবে।২০০৩ এ খেলোয়াড় হিসেবে আর আট বছর পরে কোচ।১৯৯৭-২০০৩ এই ৬ বছরের স্পেলে সিমেওনে ছিলেন ইন্টার আর ল্যাৎসিওর সাফল্যের অনুঘটক।ইতালিতে থাকাকালীন দ্বিতীয় সিমেওনে মানে ৯৭-০৩ এর খেলায় এসেছে পরিবর্তন।ডীপ লাইং বল উইনার হিসেবেই বেশি ভালো করতে লাগলেন,সাথে ট্যাক্টিক্যালি সলিড।এই কারণে তাকে ইন্টার থেকে দলে নেন সুইডিশ কোচ সভেন গোরান এরিকসন।এরিকিসনের ল্যাৎসিও ছিল অ্যাটাকিং ফুটবলের পসরা বসানো দল।ভেরন,নেদভেদ,ক্রেসপোরা খেলেছেন দূর্দান্ত ফুটবল।কিন্ত রোমান ক্লাবটির ইতিহাসের দ্বিতীয়বারের মতন লীগ শিরোপা(স্কুডেত্তো)জয়ের পিছনে অসামান্য অবদান সিমেওনে এবং মাঝমাঠ সম্পর্কে তার ণত্ব-ষত্ব জ্ঞানের। ল্যাৎসিও থেকে আবার অ্যাটলেটিকো থেকে ফিরে যান ২০০৩ সালে।দুই সিজন থাকার পরে চলে আসলেন নিজদেশে।স্বদেশী ক্লাব রেসিং এর হয়ে শেষ মাঠে নামেন।তুলে রাখেন প্লেয়ার সিমেওনের বুটজোড়া এবং পড়ে নিলেন ম্যানেজার সিমেওনের স্যুট-বুট। দুইটি কোপা আমেরিকা শিরোপা ও সাথে আরেকটি ফিফা কনফেডারেশন কাপ জয় ছিল ১৪ বছর ধরে জাতীয় দলের হয়ে খেলা সিমেওনের অর্জন।খেলেছেন ১০৬ ম্যাচ।আকাশিসাদা জার্সিতে সিমেওনের কথা বললে না চাইলেও চলে আসে ১৯৯৮ বিশ্বকাপে বেকহামে লালকার্ডের কথা।সিমেওনের ট্যাকেলে পড়ে যাওয়া বেকহাম রাগের মাথায় লাথি মেরে বসেন সিমেওনেকে,সিমেওনেও মাটিতে পড়ে গেলেন এবং নিশ্চিত করলেন বেকহামের লাথিটা যাতে রেফারির চোখ না এড়ায়।নিজে হলুদ কার্ড খেলেও সিমেওনের সহজাত গেইমসম্যানশিপে(বৈধ তবে অখেলোয়াড়সুলভ) আচরণে বেকহামকে ঠিকই লালকার্ড দেখান রেফারি টিম মিল্টন নিয়েলসন।

এ ব্যাপারে ২০০২ সালে “দ্যা অবসারভার”কে সিমেওনে বলেন “আমি ট্যাকেল করি এবং আমরা দুইজনই পড়ে যাই,আমি উঠে দাড়ানোর সময় বেকস আমাকে পেছন থেকে লাথি মারে।আমি সেই সুযোগের সদ্ব্যবহার করি এবং আমার বিশ্বাস আমার জায়গায় যেই থাকতো সেও একই কাজ করতো”। ব্যাপারটা দৃষ্টিকটু ছিল,চক্রান্তমূলকও।তারপরেও সুযোগ এসেছে তা নিতে হবে কারণ “ভিক্টোরি ইজ প্যারামাউন্ট”।আর একজন ডিয়েগো সিমেওনের কাছে এর থেকে শ্রেষ্ঠ আর কিছু হতে পারে নাহ।আফটার অল হি হিজ দ্যা ওয়ান প্লেয়িং উইথ আ নাইফ বিটউইন হিজ টিথ।

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

seventeen + 8 =