ডিফেন্স, মিডফিল্ড না উইং – কোনটা শক্তিশালী করবে লিভারপুল?

এপ্রিলের শেষ, লিগ শেষ হতে দলগুলোর মাত্র চার-পাঁচটা করে ম্যাচ বাকী। ফলে যথারীতি দলবদলের বাজার নিয়ে গুঞ্জন শুরু হয়ে গেছে। আনুষ্ঠানিকভাবে দলগুলো জুনের এক তারিখ থেকে খেলোয়াড় কিনতে-বেচতে পারলেও, তার আগে কোন খেলোয়াড় নিজের দলের জন্য উপযুক্ত সেটা পছন্দ করতে ত বাধা নেই তাই না? আজকের আলোচনা লিভারপুল নিয়ে।

গত কয়েকটা বছরের মত এই বছরেও যথারীতি লিভারপুল টপ ফোরের একটা দল হবার জন্যই লড়ছে। বিগত কয়েক মৌসুমে স্টিভেন জেরার্ড, লুইস সুয়ারেজের মত খেলোয়াড়ের অভাব তারা এখনো ঠিকঠাকমত পূরণ করতে পারেনি। সাথে বিভিন্ন পজিশানে ফ্লপ খেলা কিছু খেলোয়াড় ত আছেই যাদেরকে বদলানো সময়ের দাবী।

লিভারপুলের জন্য সবচেয়ে দরকারী এখন নিজের ডিফেন্সকে আরও শক্তিশালী করা। গোলকিপিং পজিশানে এই মৌসুমে বেলজিয়ান সিমোন মিনিওলেত আর জার্মান লরিস ক্যারিয়াস কেউই সন্তোষজনক পারফরম্যান্স দেখাতে পারেননি, ফলে স্বাভাবিকভাবেই লিভারপুল সমর্থকদের মধ্যে শোরগোল পড়েছে দলে নতুন গোলরক্ষক নিয়ে আসার জন্য। সে ক্ষেত্রে যে নামটি বারবার লিভারপুলের জন্য দলবদলের বাজারে উঠে আসছে, তিনি হলেন ম্যানচেস্টার সিটির গোলরক্ষক, এই মৌসুমে ধারে ইতালির ক্লাব তোরিনোতে খেলতে যাওয়া ইংল্যান্ড নাম্বার ওয়ান জ্যো হার্ট। এমনকি লিভারপুল কিংবদন্তী জেইমি ক্যারাঘারও হার্টকে দলে দেখার জন্য নিজের ভোট দিয়ে ফেলেছেন আকারে ইঙ্গিতে। গোলকিপিং পজিশানে অন্যান্য টার্গেটের মধ্যে রয়েছেন ক্রিস্টাল প্যালেসের ফরাসী গোলরক্ষক স্টিভেন মানদান্দাও। কিন্তু মৌসুমের সর্বশেষ কিছু ম্যাচে সিমোন মিনিওলেতের ভালো পারফরম্যান্স কোচ ইউর্গেন ক্লপকে ভাবতে বাধ্য করছে আদৌ কি লিভারপুলের নতুন গোলরক্ষকের দরকার আছে কি না সেটার জন্য। ফলে মোটামুটি ধরে নেওয়া যায়  পরবর্তী মৌসুমেও ক্যারিয়াস আর মিনিওলেত দিয়েই গোলবার সামলাবে লিভারপুল।

এদিকে ডিফেন্সও একরকম ঢেলে সাজাতে হবে লিভারপুলকে। বর্তমানে দলে সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার হিসেবে আছেন ক্যামেরুনিয়ান জ্যল মাতিপ, ক্রোয়েশিয়ান দেয়ান লভরেন, ইংল্যান্ডের তরুণ প্রতিভা জ্যো গোমেজ, এস্তোনিয়ার পোড় খাওয়া সৈনিক র‍্যাগনার ক্লাভান। আর মাঝে মাঝে ব্রাজিলিয়ান মিডফিল্ডার লুকাস লেইভাকেও সেন্ট্রাল ডিফেন্স সামলানোর কাজ করতে হয়। আর ওদিকে ক্রিস্টাল প্যালেসে ধারে পাঠানো হয়েছে ফরাসী সেন্টারব্যাক মামাদু সাখোকে।

মামাদু সাখোকে ক্লপ বিশেষ পছন্দ করেন না, ফলে ক্রিস্টাল প্যালেসের হয়ে তিনি যত ভালো খেলাই দেখান না কেন লিভারপুলে ফেরত আসার সম্ভাবনা তার খুবই ক্ষীণ। সামনের মৌসুমেই সাখোকে প্যালেসের কাছে পাকাপাকিভাবে বিক্রি করে দিতে পারে লিভারপুল। এক্ষেত্রে লিভারপুল দাম হাঁকাতে পারে ৩০ মিলিয়ন পাউন্ডের মত। র‍্যাগনার ক্লাভানকে মূলত আনা হয়েছিল ব্যাকআপ সেন্টারব্যাক হিসেবে, ফলে মৌসুমশেষে তিনিও ক্লাব ছাড়তে পারেন। ওদিকে দশ বছর লিভারপুলে থাকার পর এ মৌসুমে দল ছাড়ার চূড়ান্ত সম্ভাবনা আছে লুকাস লেইভারও। ওদিকে কালকেই ২০২০ পর্যন্ত সপ্তাহপ্রতি এক লাখ পাউন্ডের চুক্তি করার মাধ্যমে লিভারপুলে নিজের থেকে যাওয়াটা নিশ্চিত করেছেন দেয়ান লভরেন। ফলে আপাতত সেন্টারব্যাক হিসেবে ক্লপের হাতে অপশান আছে লভরেন, মাতিপ আর গোমেজ। দলে এক দুইটা সেন্টারব্যাক আনার জন্য ক্লপ খুবই তৎপর থাকবেন, সেটা বোঝাই যাচ্ছে। সেক্ষেত্রে ক্লপের এক নাম্বার পছন্দ সাউদাম্পটনের ডাচ সেন্টারব্যাক ভার্জিল ভ্যান ডাইক। শোনা যাচ্ছে, ভ্যান ডাইকের জন্য নিজেদের রেকর্ড ট্রান্সফার ফি ভাংতে পর্যন্ত দিতে রাজী আছে লিভারপুল। ৫০ মিলিয়ন পাউন্ডের বিনিময়ে হলেও ভ্যান ডাইক কে চায় তারা। কিন্তু ভ্যান ডাইককে পাওয়াটা সহজ হবেনা, কারণ ভ্যান ডাইকের প্রতি ম্যানচেস্টার সিটি, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, চেলসি – মোটামুটি সবাইই আগ্রহী। তবে ভার্জিল ভ্যান ডাইক নিজে ম্যানচেস্টার সিটিতে গার্দিওলার সাথে কাজ করতে আগ্রহী শোনা যাচ্ছে, সেক্ষেত্রে লিভারপুলের অনেক কিছুই করতে হবে ভ্যান ডাইককে পাওয়ার জন্য। সেন্ট্রাল ডিফেন্সে লিভারপুলের আরেকটা টার্গেট হতে যাচ্ছেন বার্নলির ইংলিশ সেন্টারব্যাক মাইকেল কিন। যদিও মাইকেল কিন লিভারপুলের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে খেলে গেছেন এককালে, তবুও, সঠিক ট্রান্সফার ফি এর বিনিময়ে কিন কে লিভারপুলে দেখা গেলেও আশ্চর্যের কিছু থাকবেনা।

ভার্জিল ভ্যান ডাইকের জন্য ৫০ মিলিয়ন পাউন্ড পর্যন্ত খরচ করতে রাজী লিভারপুল

লেফটব্যাকে সমস্যাটা লিভারপুলের নতুন কিছু না। সেই প্রিমিয়ার লিগ যেই ২৬ বছর আগে থেকে শুরু হয়েছে, তখন থেকেই লিভারপুলের লেফটব্যাকে ভালো কেউ ছিলেন না। এক জন আর্ন রিসা ছাড়া লিভারপুল সুপারস্টার লেফটব্যাক কখনই পায়নি। জিমি ট্রায়োরে, ফাবিও অরেলিও, এমিলিয়ানো ইনসুয়া, হোস এনরিকে, অ্যান্দ্রেয়া ডসেনা, আলি সিসোখো, সর্বশেষ আলবার্তো মোরেনো – কেউই ভালো পারফরম্যান্স দিয়ে সেরকম নজর কাড়তে পারেননি। এমনকি এই মৌসুমেও লিভারপুল ইংলিশ মিডফিল্ডার জেইমস মিলনারকে মেইকশিফট লেফটব্যাক বানিয়ে কাজ চালাচ্ছে। তাই বলাই যাচ্ছে এ মৌসুমে ক্লাব ছাড়ছেন আলবার্তো মোরেনো। ফলে লেফটব্যাকেও নতুন কাউকে দেখা যেতে পারে লাল জার্সি গায়ে। এবং এই পজিশানে ইউর্গেন ক্লপের এক নাম্বার পছন্দ ফুলহ্যামের ইংলিশ লেফটব্যাক রায়ান সেসেনিওন। অন্যান্য লেফটব্যাকদের মধ্যে ক্লপের পছন্দের তালিকায় আছেন অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদের লেফটব্যাক থিও হার্নান্দেজ, হাল সিটির লেফটব্যাক অ্যান্ড্রু রবার্টসন। মূলত সেসেনিওন আর হার্নান্দেজের মধ্যে যেকোন একজনকে পাওয়ার জন্যই চেষ্টা চালিয়ে যাবে লিভারপুল, অর্থাৎ ক্লাব থেকে আলবার্তো মরেনোর চলে যাওয়া নিশ্চিত। মরেনোর প্রতি ইন্টার মিলান আর এসি মিলানের আগ্রহের কথা শোনা যাচ্ছে, তার জন্য ১৫ মিলিয়ন পাউন্ডের মত চাইতে পারে লিভারপুল। অর্থাৎ জেইমস মিলনারের ব্যাকআপ হিসেবে হোক কিংবা নতুন মূল একাদশের জন্যই হোক, লেফটব্যাক একটা আসছেই লিভারপুলে, যদি সবকিছু ঠিকঠাক থাকে। রাইটব্যাকে ন্যাথানিয়েল ক্লাইন যথারীতি লিভারপুলের মূল পছন্দ থাকবেন, তার ব্যাকআপ হিসেবে ট্রেন্ট অ্যালেক্সান্ডার আরনল্ডকে রাখা হবে।

এদিকে সেন্ট্রাল মিডফিল্ডে বেশ কয়েকজন চলে যেতে পারেন দল থেকে, তার উপর লিভারপুলের সেন্ট্রাল মিডফিল্ডারদের ইনজুরির বিষয়টা ত আছেই। লুকাস লেইভা চলে যেতে পারেন, থাকবেন না কেভিন স্টুয়ার্টও। এমরে চ্যানকেও এখনও পর্যন্ত নতুন চুক্তির প্রস্তাব দেওয়া হয়নি। আর ওদিকে অধিনায়ক জর্ডান হেন্ডারসনের ইনজুরি সমস্যা – সবকিছু মিলিয়েই সেন্টার মিডফিল্ডেও নতুন মুখ আনার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে লিভারপুল। আরবি লিপজিগের মিডফিল্ডার নাবি কেইটাকে দলে আনার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে তারা। ক্লপের অন্যান্য পছন্দের মিডফিল্ডারদের তালিকায় আছেন এফসি পোর্তোর দানিলো পেরেইরা আর নিসের ফরাসী মিডফিল্ডার রিকার্ডো পেরেইরা। তবে মূলত নাবি কেইটাকে দলে আনার জন্যই চেষ্টা চালিয়ে যাবে তারা, এটা বোঝাই যাচ্ছে।

আরও দেখুন…

নিজেদের কিভাবে গড়বে আর্সেনাল?

সিটি ঢেলে সাজানোর ছক গার্দিওলার

অ্যাটাকিং মিডফিল্ড ও উইং – এই পজিশান গুলোতে দুই একজন নতুন মুখ দেখা যেতে পারে। মূলত উইঙ্গার পজিশনটা, কেননা দলে প্রথাগত উইঙ্গার কেবলমাত্র একজনই আছেন, সেনেগালিজ উইঙ্গার সাদিও মানে। ওয়াইড মিডফিল্ডার হিসেবে ক্লপের পছন্দের তালিকায় বহুদিন ধরেই আছেন বরুশিয়া ডর্টমুন্ডের ক্রিস্টিয়ান পিউলিসিচ, বেয়ার লেভারক্যুজেনের জুলিয়ান ব্র্যান্ট, আর্সেনালের অ্যালেক্স-অক্সলেড চেম্বারলাইন। এদিকে বায়ার্ন মিউনিখের ব্রাজিলিয়ান উইঙ্গার ডগলাস কস্টারও নাম শোনা যাচ্ছে জোরেশোরে। আরবি লিপজিগের আরেকজন, উইঙ্গার এমিল ফোর্সবার্গের জন্যেও আগ্রহী লিভারপুল। রিয়াল মাদ্রিদের দুইজন – মার্কো অ্যাসেনসিও আর ইসকো’র জন্যও ক্লপ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন, অ্যাসেনসিওর জন্য এরইমধ্যে ৫০ মিলিয়ন ইউরোর একটা প্রস্তাবও পাঠিয়েছিলেন তিনি, কিন্তু জিনেদিন জিদান তার এই উইঙ্গারকে বেচতে চান না, সাফ জানিয়ে দিয়েছেন। ওদিকে ইসকোর বাবার সাথেও লিভারপুলের কর্মকর্তা কথাবার্তা শুরু করে দিয়েছেন বলে জানা যাচ্ছে। দল ছাড়তে যাচ্ছেন লাজার মার্কোভিচ।

সময় শেষ?

ওদিকে নতুন স্ট্রাইকার আসতে পারেন লিভারপুলে। বারংবার ড্যানি ইংস আর ড্যানিয়েল স্টারিজের ইনজুরির জন্য বিরক্ত ক্লপ এবার স্টারিজকে বেচেই দেবেন বলে জানা গেছে। স্ট্রাইজের জন্য আগ্রহী ওয়েস্টহ্যাম। স্টারিজ চলে গেলে পুরো স্কোয়াডে প্রতিষ্ঠিত স্ট্রাইকার বলতে শুরু ডিভক অরিগি আর ড্যানি ইংসই থাকবেন। ওদিকে ড্যানি ইংস আবার একদিন ঠিক থাকেন ত দশদিন ইনজুরিতে পড়ে থাকেন। তাই একটা নতুন স্ট্রাইকার আনাটাও ক্লপের এজেন্ডার শীর্ষেই থাকবে। সেক্ষেত্রে ক্লপের পছন্দগুলো হল – আরবি লিপজিগের জার্মান স্ট্রাইকার টিমো ওয়ার্নার, অলিম্পিক লিওঁর ফরাসী স্ট্রাইকার অ্যালেক্সান্ডার ল্যাকাজেটে, অ্যাথলেটিক বিলবাওয়ের স্প্যানিশ স্ট্রাইকার ইনাকি উইলিয়ামস।

এখন পর্যন্ত তাই অবস্থাদৃষ্টে যা মনে হচ্ছে, ক্লপ যদি তার শীর্ষ পছন্দনীয় খেলোয়াড়দের দলে আনতে পারেন, তাহলে নতুন মুখ দেখা যাবে নিম্নোক্তদের –

ভার্জিল ভ্যান ডাইক

রায়ান সেসেনিওন

নাবি কেইটা

ডগলাস কস্টা

অ্যালেক্স-অক্সলেড চেম্বারলাইন

ইনাকি উইলিয়ামস

আর দল ছাড়ছেন –

ড্যানিয়েল স্টারিজ

মামাদু সাখো

লুকাস লেইভা

আলবার্তো মরেনো

লাজার মার্কোভিচ

টিয়াগো ইলোরি

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

eighteen − thirteen =