ট্যাকটিক্যাল মাস্টারক্লাস

ট্যাকটিক্যাল মাস্টারক্লাস।

এই দুটো শব্দ ছাড়া আর কি-ই বা বলতে পারেন আপনি এই সপ্তাহে ম্যানচেস্টার সিটির মাঠ এতিহাদে সিটির বিপক্ষে লিভারপুলের পারফরম্যান্সকে? রিভার প্লেট, ভিয়ারিয়াল, রিয়াল মাদ্রিদ, মালাগা হয়ে ম্যানচেস্টার সিটিতে আসা পোড় খাওয়া ম্যানেজার ম্যানুয়েল পেলেগ্রিনিকে যেভাবে ট্যাকটিক্সের প্রত্যেকটা ক্ষেত্রে হারালেন লিভারপুলের ম্যানেজার ইয়ুর্গেন ক্লপ – আর কোন শব্দ মাথাতেও আসার কথা না আসলে।

ক্লপকে নিয়ে মাতামাতি আগে থেকেই ছিল, বলা হচ্ছিল প্রিমিয়ার লিগে ওয়েঙ্গার আসার পর থেকে সবচেয়ে বড় দাঁওটা মেরেছে লিভারপুলই, বিশ্বসেরা একজন ম্যানেজার দলে আনার ক্ষেত্রে। প্রথম তিন ম্যাচে ড্র, পরের তিন ম্যাচে জয়, এরপর ক্রিস্টাল প্যালেসের কাছে পচা শামুকে পা কেটে যাওয়ার সাথে সাথেই বিপক্ষ দলের সমর্থকরা বলা শুরু করে প্রিমিয়ার লিগে ক্লপের হানিমুন একরকম শেষ, এখন মুখোমুখি হতে হবে রূঢ় বাস্তবতার। যে বাস্তবতায় নিজেদের দিনে যেকোন দলই হারিয়ে দিতে পারে যেকোন দলকে। যে বাস্তবতায় ১৩ রাউন্ড শেষ হয়ে যাওয়ার পরেও লিগের শীর্ষস্থান থাকে রিয়াদ মাহরেজ-জেইমি ভার্ডি’র অখ্যাত লেস্টার সিটির কাছে, যে বাস্তবতায় গত মৌসুমের চ্যাম্পিয়ন চেলসিকে এই মৌসুমের প্রায় এক তৃতীয়াংশ শেষ হয়ে যাবার পরেও ঘোরাঘুরি করতে হয় অবনমনের দোরগোড়ায়।

কিন্তু আসলেই কি হানিমুন শেষ ক্লপের? লিগের অন্যতম দাবিদার ম্যানচেস্টার সিটিকে তাদের নিজ মাঠেই ঘোল খাইয়ে যেন তিনি জানান দিলেন, মাত্র দুই-তিন ম্যাচ জিতে আরামকেদারায় বসে প্রেস কনফারেন্সগুলোতে শুধুশুধু ফটরফটর করার লোক তিনি নন। ইয়ুর্গেন ক্লপ মিনস বিজনেস।

Manchester-City-vs-Liverpool (3)

এতিহাদের প্রত্যেকটা মিনিটে মনে হয়েছে শুধু এই কথাটাই। এই ক্লপের লিভারপুল কাউন্টার-অ্যাটাকিং লিভারপুল, রজার্সের সময়কার নিজের শক্তি নিয়ে সন্দিহান লিভারপুল না। এই লিভারপুল নিজেদের শক্তির সম্পূর্ণ ব্যবহার করা লিভারপুল। এই লিভারপুল ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের বিপক্ষে স্ট্রাইকার ড্যানি ইংস আর অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার রবার্টো ফার্মিনিওকে যথাক্রমে রাইট উইংব্যাক ও লেফট উইংব্যাক পজিশানে খেলানোর লিভারপুল না। এই লিভারপুল স্টোক সিটির কাছে ৬-১ গোলে বিধ্বস্ত হবার লিভারপুল না, এই লিভারপুল সিটিকে ৪-১ গোলে বিধ্বস্ত করার লিভারপুল।

ক্লপ জানতেন, নিজেদের মাঠে সিটিকে নিজেদের মত করে খেলতে দিলে নিজেদের মরণ নিজেদেরই ডেকে আনা হবে। সমাধান? সিটিকে নিজেদের মত খেলতে না দেওয়া! এই সহজ সমীকরণটাই ক্লপ মিলিয়েছেন বিভিন্ন ট্যাকটিক্সের বেড়াজালে সিটি কোচ ম্যানুয়েল পেলেগ্রিনিকে আবদ্ধ করে। সিটিকে নিজেদের মত করে খেলতে দিলে কি হবে সেটা বোঝা গেছে ৩৪ মিনিটের মধ্যে সিটির ৩ গোল খাওয়ার পরেই হাফটাইমের ঠিক আগে আচমকা সার্জিও অ্যাগুয়েরোর একটা গোল শোধ করা থেকে। গোলটায় লিভারপুল ডিফেন্সের তেমন কিছু করার ছিল না, ছিল না গোলরক্ষক সিমোন মিনিওলেইয়ের কিছু করার, যদিও ডিফেন্ডার মার্টিন স্কার্টেলকে দোষ দেওয়া গেলেও যেতে পারে। যে সুযোগটা নিয়েছে সিটি, নিয়েছেন অ্যাগুয়েরো, শোধ করেছেন একটি গোল।

এক গোল শোধ করে শুধু সান্ত্বনাই পেয়েছেন অ্যাগুয়েরো
এক গোল শোধ করে শুধু সান্ত্বনাই পেয়েছেন অ্যাগুয়েরো

লিভারপুলে আসার পর একটা জিনিস নিয়েই আক্ষেপ থাকতে পারে ক্লপের, সেটা হল ইনজুরি-জর্জর স্কোয়াড। এই মৌসুমে রজার্সের আমলের সেরা পারফর্মার স্ট্রাইকার ড্যানি ইংস অ্যান্টেরিওর ক্রুশিয়েট লিগামেন্ট ইনজুরির কারণে পুরো মৌসুমের জন্য মাঠের বাইরে, সেরা স্ট্রাইকার ড্যানিয়েল স্টারিজের যখন-তখন হাঁটুর ইনজুরির প্রকোপও এখন আর অস্বাভাবিক কিছু না, ডিফেন্সে এই মৌসুমের সেরা পারফর্মার মামাদু সাখোও মাঠের বাইরে, আর জেরার্ড যাওয়ার পর লিভারপুলের অধিনায়কত্বের আর্মব্যান্ড পাওয়া জর্ডান হেন্ডারসনও মাঠের বাইরে। কিন্তু যেকোন প্লেয়ারের কাছ থেকেই সেরাটা বের করে আনা যার অভ্যাস, তিনি এতকিছুতে দমবেন কেন?

দুই ব্রাজিলিয়ানের সাম্বায় বিধ্বস্ত সিটি
দুই ব্রাজিলিয়ানের সাম্বায় বিধ্বস্ত সিটি

সিটির বিপক্ষে নামালেন তাই রবার্টো ফার্মিনিওকে। এই ফার্মিনিও রজার্সের আমলে উইংব্যাকে খেলা ফার্মিনিও না। ক্লপ তাকে নামালেন স্ট্রাইকার হিসেবে। বেঞ্চে ৩২ মিলিয়ন ম্যান ক্রিস্টিয়ান বেনটেকে আছে। থাকুক, সমস্যা কি? বুন্দেসলিগা থেকেই ফার্মিনিওর খেলা দেখে আসা ক্লপ ভালো করেই জানতেন ফার্মিনিওর সেরাটা কিভাবে বের করে আনা যেতে পারে। অন্যান্য সকল ম্যানেজার ফার্মিনিওকে ভাবতেন একজন অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার হিসেবেই, যাকে উইংয়েও খেলানো যেতে পারে। ক্লপ ভাবলেন ভিন্নটা। ক্লপের দৃষ্টিতে ফার্মিনিও আসলে একজন স্ট্রাইকার, যিনি কিনা অ্যাটাকিং মিডেও খেলতে পারেন। ফলে চেলসি ম্যাচের মত এই ম্যাচেও ফার্মিনিওকে খেলালেন তিনি স্ট্রাইকার হিসেবে, আর সাথে দুই প্রান্তে দুই উইঙ্গার ছিলেন অ্যাডাম লালানা আর আরেক ব্রাজিলিয়ান ফিলিপ ক্যুটিনিও। এই তিনজনের অনবরত মুভমেন্ট আর লিঙ্ক-আপে দিশেহারা হয়ে গেল সিটির দুই সেন্টারব্যাক এলিয়াক্যুইম মাঙ্গালা আর মার্টিন ডেমিকেলিস। ফলাফল? ফার্মিনিওর ক্রস ক্লিয়ার করতে গিয়ে মাঙ্গালার হাস্যকর আত্মঘাতী গোল!

মাঙ্গালার হাস্যকর সেই আত্মঘাতী গোল
মাঙ্গালার হাস্যকর সেই আত্মঘাতী গোল

পুরো ম্যাচটাই সিটির কেটেছে এরকম খাবি খেতে খেতে। পুরো মৌসুম দুর্দান্ত খেলতে থাকা, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের বিপক্ষে রুনি-মাতা দের পকেটে ভরে রাখা নিকোলাস ওটামেন্ডিকে কেন বেঞ্চে বসে থাকতে হল – সেটা একটা চূড়ান্ত আশ্চর্যের বিষয়। হয়তোবা মাত্রই আর্জেন্টিনার হয়ে খেলে এসেছেন দেখে ওটামেন্ডিকে নামানোর ঝুঁকি নিতে চাননি পেলেগ্রিনি, কিন্তু যেখানে ইনজুরির কারণে ডিফেন্সের নির্ভরতা অধিনায়ক ভিনসেন্ট কম্পানি খেলতে পারছেন না, সেখানে পেলেগ্রিনি ওটামেন্ডিকে বসিয়ে রেখে প্রিয় শিষ্য মার্টিন ডেমিকেলিস কে খেলানোটা কতটা যুক্তিযুক্ত হয়েছে সেটার উত্তর পেলেগ্রিনি ইতোমধ্যেই পেয়ে গেছেন। অথচ ডিফেন্স নিয়ে তথৈবচ অবস্থা থাকার কথা ছিল লিভারপুলের। সেরা সেন্টারব্যাক মামাদু সাখো ইনজুরির কারণে মাঠের বাইরে, তাঁর পরিবর্তে মাঠে নামেন ভুলে ভরা ক্রোয়েশিয়ান সেন্টারব্যাক দেয়ান লভরেন। এই লভরেনই পরে খেললেন লিভারপুলের জার্সি গায়ে নিজের অন্যতম সেরা একটা ম্যাচ। বাতাসে ছিলেন দুর্দান্ত, সিটির ক্রস বা শটগুলোও ফিরিয়ে দিয়েছেন অসাধারণ দক্ষতার সাথে। ওদিকে অ্যাগুয়েরোর গোলের জন্য স্কার্টেলের বিন্দুমাত্রও দোষ থেকে থাকলে সেটাও তিনি কাটিয়ে দিয়েছেন ৮১ মিনিটে জেইমস মিলনারের কর্নার থেকে অসাধারণ ভলিতে এক গোল করার মাধ্যমে। রাইটব্যাক পজিশানে ন্যাথানিয়েল ক্লাইন ছিলেন দুর্দান্ত। সাবেক লিভারপুল উইঙ্গার রাহিম স্টার্লিং যে বিশেষ সময়ে জ্বলে উঠে নিজের ৪৯ মিলিয়ন পাউন্ড দামের যথার্থতা প্রমাণ করতে পারলেন না, তা ত এই ক্লাইনের জন্যই! পুরো মৌসুমে দুর্দান্ত খেলা সিটির বামপ্রান্ত স্টার্লিং-কোলারভকে নিষ্ক্রিয় রাখার অন্যতম কারিগর ছিলেন তিনি। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ভক্তরা মৌসুমের শুরুতে তাদের সদ্য কেনা রাইটব্যাক মাত্তেও দারমিয়ানকে ন্যাথানিয়েল ক্লাইনের থেকে অনেক ভালো হিসেবে দাবি করলেও প্রতি সপ্তাহে এখন দুইজনের পারফরম্যান্স দেখে তুলনামূলকভাবে কে ভালো আর কে না সেটা বোধহয় আস্তে আস্তে পরিস্ফুটিত হয়ে উঠছে।

ক্লাব বদল হল, ভাগ্য কি বদল হল?
ক্লাব বদল হল, ভাগ্য কি বদল হল?

দুইদলের সেন্ট্রাল ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডের দায়িত্বে ছিলেন যথাক্রমে ইয়ায়া ট্যুরে এবং লুকাস লেইভা। লুকাসের প্রতি যথেষ্ট শ্রদ্ধা রেখেই বলছি, কোয়ালিটির দিক দিয়ে তিনি ইয়ায়ার চেয়ে অনেকটাই পিছিয়ে। কিন্তু ক্লপের আমলে লুকাসের খেলা দেখে সেটা বোঝা যাচ্ছে কই? জার্মান কোচের আমলে এই ব্রাজিলিয়ান যেন নিজেকে নতুন করে খুঁজে পেয়েছেন। যেটার সর্বশেষ উদাহরণ সিটির বিপক্ষে। হাফটাইমে লুকাসের দৌরাত্ম্যে ত আর এমনি এমনিতেই ইয়ায়ায় ট্যুরে কে উঠে আসতে হয়নি! মিডফিল্ডে আরেক ভুল পেলেগ্রিনি করেছেন ফার্নান্ডিনিওকে বসিয়ে ফার্নান্ডোকে খেলানোয়। ফার্নান্ডো-ইয়ায়া ; লিভারপুলের বিধ্বংসী কাউন্টারপ্রেসিং ফুটবল আটকানোর জন্য এই জুটি কখনই অতটা স্পিডি না। ফলে যার খেসারত দিতে হয়েছে পেলেগ্রিনিকে।

স্কোরলাইন ৪-১ দেখালেও, যদি ৮-১ বা ৯-১ ও হত, কোন আশ্চর্যের কিছু থাকত না। এতটাই ভালো খেলেছে লিভারপুল। চাইলেই প্রথমার্ধে একটা নয়, তিনটা গোল করে হ্যাটট্রিক পূর্ণ করতে পারতেন ম্যান অফ দ্য ম্যাচ রবার্টো ফার্মিনিও। ওদিকে লিভারপুল জার্সি গায়ে নিজের অন্যতম সেরা খেলাটি খেলা অ্যাডাম লালানা দুর্দান্ত খেললেও কিছু সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগেছেন, ফলে লিভারপুল লিড আরও বাড়াতে পারেনি। দেখা গেল বামপ্রান্ত থেকে অসাধারণভাবে উঠে গিয়ে সামনে থাকা ক্যুটিনিও বা ফার্মিনিওকে থ্রু বল দেওয়ার চমৎকার সুযোগ থাকলেও তা না দিয়ে পাশে এমরে চ্যান কে পাস দিয়েছেন, যেখানে ক্যুটিনিও বা ফার্মিনিওকে দিলে গোল হয়ে যেত। এসব হালকাপাতলা সিদ্ধান্তহীনতা কাটিয়ে না উঠতে পারলে হয়ত নিয়মিত প্রথম একাদশে সুযোগ নাও পেতে পারেন লালানা, কারণ বেঞ্চে অপেক্ষা করছেন বেনটেকে-স্টারিজ-হেন্ডারসন-আইবরা। লালানা ফার্মিনিওর এরকম ছটখাট কিছু খামতির সাথে সিটি গোলরক্ষক জ্যো হার্টের বীরত্বই মূলত আরও বেশী গোলবঞ্চিত করেছে লিভারপুলকে।

নিজে দুর্দান্ত খেললেও দলের লজ্জা এড়াতে পারেন নি হার্ট
নিজে দুর্দান্ত খেললেও দলের লজ্জা এড়াতে পারেন নি হার্ট

এমরে চ্যান, অ্যাডাম লালানা, রবার্টো ফার্মিনিও, লুকাস লেইভা, মামাদু সাখো – ক্লপের ছোঁয়ায় প্রত্যেকে আজ ভিন্ন খেলোয়াড়। মূল একাদশের বেশ কিছু খেলোয়াড় না থেকেই এমন দুর্দান্ত লিভারপুল। হেন্ডারসন-বেনটেকে-স্টারিজ-সাখো রা নিয়মিত খেলতে পারলে আর ক্লপের এরকম ট্যাকটিক্যাল মাস্টারক্লাস চালু থাকলে কে জানে, বড় কিছু ঘটে যেতেও পারে!

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

seven − 6 =