টাইব্রেকার ফান রাইড নয়

খেলাধুলার ইন্ডাস্ট্রিটা একটা ধ্রুব সত্যের উপরে চলে । খেলার ধরন যতোটা স্নায়ুক্ষয়ী, খেলাটায় মজার জায়গাটা ততো বেশি, খেলাটায় মজার জায়গাটা ততো গভীর । এই ধ্রুব সত্যটা সারা দুনিয়ার মানুষের জন্যে প্রযোজ্য। আপনি ক্রিকেট দেখলে বোলারটা শেন বন্ড বা শোয়েব আক্তার হলে যেভাবে রক্তটা ফুটে , সেভাবে সাধারণ্যে ল্যান্স ক্লুজনার বা অল্প গতির অন্য কোন বোলার হলে রক্তটা ফুটে না । ঘন্টায় দেড়শ কিলোমিটার গতি আমাদের স্নায়বিক উত্তেজনা দেয়, আমরা মজা পাই । এবি ডি ভিলিয়ার্স বা গেইলের ১০০ মিটারের ছক্কা আমাদের স্নায়বিক উত্তেজনা দেয়, আমরা মজা পাই । ফুটবলের ব্যাপারটাও একই । ৯০ মিনিটের খেলার পুলকটা আমাদের স্নায়ুতে ধীরে ধীরে বিল্ড আপ করে । আর মুদ্রার অন্যপিঠে টাইব্রেকারের পুলক? ১০টা শ্যুট প্রত্যেকটা সর্বোচ্চ ২০-২৫ সেকেন্ড করে সময় নিয়ে ২০০-৩০০ সেকেন্ড সময়ে এত উত্তেজনা ? মাঝে মাঝে ওভারডোজ হয়ে যায়, স্নায়বিক উত্তেজনার স্রেফ ওভারডোজ ।
এই কথা কয়টা বলে নেওয়ার কারণ হচ্ছে টাইব্রেকার বা ১২০ মিনিটের খেলা শেষে যে শ্যুট আউটটা হয় , সেটা নিয়ে কয়েকটা কথা বলবো । দুই সপ্তাহের মধ্যে দুটো হাইভোল্টেজ টাইব্রেকার দেখে ফেললাম । গত সপ্তাহে দেখলাম কোপা আমেরিকার ফাইনালের টাইব্রেকার আর্জেন্টিনা আর চিলির মধ্যে । আর গতরাতে জার্মানি আর ইতালির শ্যুট আউট । শ্যুট আউটের কায়দা কৌশল বা টেকনিক নিয়ে কথা বলার ধৃষ্টতা আমি দেখাবো না । আমি যে কথাগুলো বলবো, সেগুলো স্রেফ আমার নিজের কথা আমার নিজের মনের ভেতরের কথা ।
২০০৪ সালের কোপা আমেরিকার ফাইনালটাই খুব সম্ভবত ফুটবল দর্শক ক্যারিয়ারে আমার প্রথম বড় শ্যুট আউট । আর্জেন্টিনা আর ব্রাজিল ছিলো ফাইনালে । শ্যুট আউটে ব্রাজিল জিতে যায় এ কথাটা খুব ভালোভাবে মনে আছে । পাঁড় ব্রাজিলভক্ত হওয়াতে ব্রাজিলের শ্যুটআউট গুলো নিয়ে আগে কথা বলছি কারণ হচ্ছে আগে আপনাদের জানিয়ে দিতে চাই আপনার দল টাইব্রেকারের একপাশে থাকলে কেমন লাগে সেই ফিলিংসটা নিয়ে আগে বলে ফেলতে চাই । চিলির সাথে ২০১৪ বিশ্বকাপে আমাদের টাইব্রেকারটাতে হাল্ক আর উইলিয়ান খুব সম্ভব মিস করে ফেলে । কিন্তু বিশ্বাস করুন, আপনার দল যখন শ্যুট আউটে যায়, প্রত্যেকটা শ্যুটের আগেই আপনার মনে হয় , এটা মিস হচ্ছে । কাকতালীয়ভাবে, দলের সেরা তারকাটা শ্যুট করতে গেলে সেটা আরো বেশি করে মনে হয় । মার্সেলো, নেইমার আর ডেভিড লুইজ চিলির সাথে ঐ সেকেন্ড রাউন্ড ম্যাচটাতে সাকসেসফুল পেনাল্টি নেয় । কিন্তু শ্যুট নেবার সময় সবচেয়ে বেশি ভয় পেয়েছিলাম নেইমারকে নিয়েই । আর নিজের দলের একদম ডিসাইসিভ পেনাল্টিটার সময় টিভি পর্দায় টানা তাকানোর সাহসটা কম লোকেরই থাকে । বোলো হরিজোন্তের ম্যাচটাতে গঞ্জালো হারার শ্যুটটার সময় উপরে ফ্যানের দিকে তাকিয়ে ছিলাম । কমেন্ট্রিতে কান পেতে ছিলাম …
বিশ্বাস করুন, ট্রাইবেকারে জেতার আনন্দ ৯০ মিনিটের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি আনন্দ । আর হেরে যাবার কষ্টটা? ৯০ মিনিটে হারার কষ্টের চেয়ে কয়েক শ গুণ বেশি । তবে এখানে সব ম্যাচই যে একরকম তা কিন্তু নয় । ২০১১ এর কোপাতে প্যারাগুয়ের সাথে ব্রাজিলের হেরে যাবার ম্যাচটার কথাটা ভালোমত মনে আছে । ভাগ্যের ফেরে, ব্রাজিল একটা শ্যুটও গোল করতে পারলো না। ভাবা যায়??? ৫টা শ্যুটের সবগুলোই মিস ? এ ধরনের ম্যাচগুলোতে উত্তেজনা থাকে না । স্নায়ুর চাপ থাকে না । হতাশা থাকে আর বিরক্তি থাকে অনেক বেশী মাত্রায়।
তবে টাইব্রেকারটা আপনার দল না থাকলে একটা ফান রাইড । অস্বাভাবিক রকমের মজার ফান রাইড । তখন কোন শ্যুটারের চেহারায় নার্ভাসনেস দেখে মজা লাগে , গোল কিপারের নচন কুর্দন দেখে মজা লাগে । চাপের চোটে মেসি বা শোয়াইনস্টেগারের মত বিখ্যাত কেউ শ্যুটটা আকাশে মারলে তা দেখে ফুটবলের অংশ বলে মনে হয় । কেউ একজন পার্ফেক্ট পেনাল্টি নিয়ে ফেললে সেটা নিয়ে অনেক প্রশংসা করতে মনে চায়। গোলকিপার হয়ে বুঁফো ঠিক দিকে ঝাঁপ দিয়ে দিলে ওর ক্লাস নিয়ে আরো একবার উচ্চধারণা হয়ে যায় । নিজের দল ছাড়া শ্যুট আউটে অন্য দল খেললে আমরা যেন খেলার লোক হিসেবে একটু বেশিই বিবেচক লেভেলে চলে যাই ।
কথাগুলোর বটমলাইন হলো, টাইব্রেকার জিনিসটা আপনার ঘাড়ের উপর দিয়ে গেলে আপনি লজিকছাড়া উন্মত্ত হতে বাধ্য । আর থার্ড দুটো পার্টি খেললে ? ট্রাইবেকার এক ফান রাইড …

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

5 × three =