জেইমি ভার্ডি : এক রূপকথার গল্প

সময়টা বেশী নয়। মাত্র চার বছর। চার বছরের ব্যবধানে জীবনে এত কিছু পরিবর্তন ঘটে যাবে, বোধহয় স্বয়ং জেইমি ভার্ডিও কল্পনা করেননি। চার বছর আগে খেলতেন অপেশাদার লিগে, এখন সেই ভার্ডিকেই মানা হচ্ছে বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ লীগ ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ একজন স্ট্রাইকার।

11990624_929447300479809_7967495891427870746_n

টাইম মেশিনে করে আরো একটু পেছনে চলে যাওয়া যাক। সাল ২০০৩। রুড ভ্যান নিস্টলরয় নামের এক ওলন্দাজ স্ট্রাইকার তখন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের হয়ে মাঠ কাঁপাচ্ছেন। দুই মৌসুম (২০০২-২০০৩, ২০০৩-২০০৪) জুড়ে টানা দশ ম্যাচে গোল করে এই স্ট্রাইকার ইউনাইটডকে তখন মাত্র জিতিয়েছেন ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ আর এফএ কাপ। ম্যানচেস্টার থেকে তখন আরও দূরে, পূর্বের এক শহর শেফিল্ডে ফুটবল খেলা ১৬ বছর বয়সী এক ছেলেকে তখন শেফিল্ড ওয়েনসডে নামের এক ক্লাব ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ওয়েনসডেতে খেলার যোগ্য নয় সে ছেলে। কারণ কি জানেন? কারণ ক্লাবে খেলার মত যথেষ্ট লম্বা ছেলেটা ছিল না!

292624

এই ছেলেটাই জেইমি ভার্ডি।

শৈশবের প্রিয় ক্লাব শেফিল্ড ওয়েনসডে থেকে বাতিল হয়ে একরকম ভেঙ্গেই পড়েন ভার্ডি। সিদ্ধান্ত নেন আর ফুটবল খেলবেনই না। কিন্তু খেলাটা যার নেশা, সে কি চাইলেই না খেলে থাকতে পারে? এদিকে আশ্চর্যজনক হলেও সত্যি, ওয়েনসডে তাঁকে ছেড়ে দেওয়ার ঠিক কিছুদিন পরেই মোটামুটি হুট করেই ২০ সেন্টিমিটার মত লম্বা হয়ে যান ভার্ডি!

ফলে আট মাস পর ২০০৩ সালে অপেশাদার দল স্টকব্রিজ পার্ক স্টিলস এর যুবদলে যোগ দেন ভার্ডি। নিজেকে চালানোর জন্য টাকা ছিল না, ফলে একইসাথে কার্বন ফাইবার কারখানার শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন তিনি। পঙ্গু মানুষের জন্য লোহার স্প্লিন্ট বানানো ছিল ভার্ডির কাজ। সারাদিন বেগার খেটে রাতে খেলা। এই ছিল ভার্ডির জীবন। আশ্চর্য লাগছে না? আমরা যারা সবসময় মনে করি ফুটবলারদের জীবন মানেই ফুলশয্যা, ভার্ডির জীবন ছিল তার উজ্জ্বল ব্যতিক্রম।

স্টকব্রিজ পার্ক স্টিলস এ ভার্ডি
স্টকব্রিজ পার্ক স্টিলস এ ভার্ডি

যুবদল থেকে মূল দলে উত্তীর্ণ হতে ভার্ডির লাগে ৪ বছর মত। ৪ বছর পর ২০০৭ সালে স্টকব্রিজের মূল দলে যোগ দেন তিনি, বেতন ছিল কত জানেন? মাত্র ৩০ পাউন্ড। চার বছরে ১০৭ ম্যাচ খেলে ৬৬ গোল করার পর ২০১১ সালে ক্রু আলেকজান্দ্রা, রথারহ্যাম ইউনাইটেডের মত অপেক্ষাকৃত পরিচিত ক্লাবে না গিয়ে ভার্ডি সিদ্ধান্ত নেন আরেক অপেশাদার ক্লাব হ্যালিফ্যাক্স টাউনে যোগ দেওয়ার। মাত্র ১৬,০০০ পাউন্ডের বিনিময়ে হ্যালিফ্যাক্স কিনে নেয় ভার্ডিকে, ম্যানেজার নিল অ্যাসপিন তখনই বুঝেছিলেন ছেলেটার মধ্যে কিছু একটা আছে। হ্যালিফ্যাক্সের হয়ে প্রথম ট্রেনিং সেশানে যখন ভার্ডি যোগ দেন, ছিল না একটা ভালো বুটজোড়া।

গোলের ধারা বজায় ছিল হ্যালিফ্যাক্সেও
গোলের ধারা বজায় ছিল হ্যালিফ্যাক্সেও

হ্যালিফ্যাক্সে এক মৌসুমে থাকার পর ফ্লিটউড টাউনে যোগ দিয়ে ভার্ডি এবার ফুটবলারের জীবনটাকেই মুখ্য হিসেবে বেছে নেন। ফ্লিটউডেও গোলের ধারা বজায় ছিলই। ফলে এবার ভার্ডির ফর্ম চোখে পড়ে পিটারবরো ইউনাইটেড, কার্ডিফ সিটি, লেস্টার সিটির মত মোটামুটি বড় ক্লাবগুলোর।

article-2083961-0F5E657000000578-794_468x286

২০১২ সালে তার মত এক অপেশাদার লিগে খেলা এক খেলোয়াড়ের পেছনে ১ মিলিয়ন পাউন্ড খরচ করে হইচই ফেলে দেয় লেস্টার। লেস্টারের সাবেক ম্যানেজার নাইজেল পিয়ারসন বোধহয় চিনতে পেরেছিলেন ভার্ডির প্রতিভা, তাই লেস্টারের হয়ে প্রথম মৌসুমে জঘন্য খেলে যখন সমর্থকদের দুয়ো শুনতে শুনতে খেলাটাই ছেড়ে দেওয়ার কথা ভাবছিলেন তিনি, এই পিয়ারসনই বুঝিয়ে সুঝিয়ে ভার্ডিকে আবার খেলার প্রতি মনোনিবেশ আনতে সহায়তা করেন। আজকের এই ভার্ডি তাই পিয়ারসনেরই সৃষ্টি।

Leicester-City-Leicester-Jamie-Vardy-Nigel-Pearson-Foxes-LCFC-298418

এরপরে আর পিছে ফিরে তাকাতে হয়নি ভার্ডিকে। এখন খেলছেন প্রিমিয়ার লিগে। আর কালকে ত ভেঙ্গে ফেললেন রুড ভ্যান নিস্টলরয়ের সেই আপাত-অস্পৃশ্য রেকর্ডখানাই। নিস্টলরয়ের সাবেক ক্লাব ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের বিপক্ষে গোল করেই প্রিমিয়ার লিগে টানা এগারো ম্যাচে গোল করে রেকর্ডের পাতায় নিজের নাম লেখালেন জেইমি ভার্ডি। আর এখন ত রয় হজসনের ইংল্যান্ড দলেরও এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ তিনি, খেলে ফেলেছেন ৪ ম্যাচ, ফর্মের জঘন্যরকম পতন না হলে ইউরো ২০১৬তে জায়গা একরকম নিশ্চিতই। এর মধ্যেই ভার্ডির প্রথম ক্লাব স্টকব্রিজ পার্ক স্টিলস সিদ্ধান্ত নিয়েছে ক্লাবের মাঠের একটা স্ট্যান্ডের নামকরণ করা হবে ভার্ডির নামে! জীবন কত চমৎকারই না দেখায় মানুষকে!

শোনা যাচ্ছে, রিয়াল মাদ্রিদ, বার্সেলোনা, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, আর্সেনাল, লিভারপুলের মত ক্লাব তাঁকে দলে নিতে আগ্রহী। কারখানার শ্রমিক থেকে বার্নাব্যুর ফুটবল-মন্দিরে ভার্ডির ঠাঁই হলে আশ্চর্যান্বিত হবেন না যেন!

কমেন্টস

কমেন্টস

One thought on “জেইমি ভার্ডি : এক রূপকথার গল্প

মন্তব্য করুন

four + eight =