জিনেদিন জিদান যেভাবে ট্যাকটিকসের লড়াইয়ে হেরে গেলেন ভালভার্দের কাছে

মেসি রবার্তো পাওলিনিও ভার্মায়েলেন এবং লিগ জেতার পথে বার্সার আরেক ধাপ

লা লিগার মহাগুরুত্বপূর্ণ এল ক্লাসিকোতে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী বার্সেলোনার কাছে নিজেদের মাঠ সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে ৩-০ গোলে বিধ্বস্ত হয়েছে রিয়াল মাদ্রিদ। লুইস সুয়ারেজ, লিওনেল মেসি আর অ্যালেইক্স ভিদালের গোলে এই মহামূল্যবান জয়টি তুলে নেয় তারা, ফলে লা লিগা অর্ধেক শেষ হতে না হতেই চতুর্থ স্থানে থাকা রিয়াল মাদ্রিদের চেয়ে ১৪ পয়েন্টে ও দ্বিতীয় স্থানে থাকা অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদের চেয়ে ৯ পয়েন্টে এগিয়ে গেল তারা। তাই লিগের দ্বিতীয়ার্ধে সেরকম বড় অঘটন না ঘটলে এবারের লিগ শিরোপা যে বার্সেলোনাতেই যাচ্ছে, এ কথা বলাই যায়। যেখানে কালকে যদি রিয়াল মাদ্রিদ নিজেদের মাঠে বার্সেলোনাকে হারাতে পারতো, তাহলে পয়েন্ট টেবিলে তাদের পয়েন্টের ব্যবধান হয়ে যেত ৮। লিগের দ্বিতীয়ার্ধে তখন রিয়াল মাদ্রিদের শিরোপা বহাল রাখাটা অসম্ভব হত না হয়ত, যেটা কি না এখন লাগছে। এবং এর পেছনে রিয়াল মাদ্রিদ দায়ী করতে পারে কেবলমাত্র তাদের কোচ জিনেদিন জিদান কে। বার্সেলোনার কোচ আর্নেস্তো ভালভার্দের কাছে ট্যাকটিকাল লড়াইয়ে একরকম ধরাশায়ী হয়েছেন মাদ্রিদ কোচ জিনেদিন জিদান।

কিভাবে? দেখা যাক!

গোল্লাছুটে এই দুই দলের মহারণের আগেই বলা হয়েছিল, দুই দল মোটামুটি একই ফর্মেশানে খেলবে, ৪-৪-২ ফর্মেশানে। হয়েছেও তাই। দুই দলই ৪-৪-২ ফর্মেশানে দলকে মাঠে নামিয়েছিল। এমনকি, গোল্লাছুট দুই দলের যে একাদশ কল্পনা করেছিল, মোটামুটি সেই একাদশই নামিয়েছিল দুই দল। শুধুমাত্র রিয়াল মাদ্রিদ কোচ জিনেদিন জিদান অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার ইসকো আলারকোন এর বদলে মাঠে নামিয়েছিলেন ক্রোয়েশিয়ান মাতেও কোভাচিচকে। মূলত এই একটা পরিবর্তনই রিয়াল মাদ্রিদকে ডুবিয়েছে।

দেখে নেওয়া যাক দুই দলের মূল একাদশ কিরকম ছিল –

রিয়াল মাদ্রিদ – কেয়লর নাভাস ; দানি কারভাহাল, সার্জিও রামোস, রাফায়েল ভ্যারেন, মার্সেলো ভিয়েরা ; লুকা মডরিচ, মাতেও কোভাচিচ, ক্যাসেমিরো, টোনি ক্রুস ; করিম বেনজেমা, ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো

জিনেদিন জিদান যেভাবে ট্যাকটিকসের লড়াইয়ে হেরে গেলেন ভালভার্দের কাছে

বার্সেলোনা – মার্ক অ্যান্দ্রে টের স্টেগেন ; সার্জি রবার্তো, জেরার্ড পিকে, থমাস ভারামায়েলেন, জর্ডি অ্যালবা ; ইভান রাকিটিচ, পাউলিনিও, সার্জিও বুসকেটস, অ্যান্দ্রেস ইনিয়েস্তা ; লিওনেল মেসি, লুইস সুয়ারেজ

একটু আগে যা বলছিলাম, ৪-৪-২ ডায়মন্ড ফর্মেশানে অ্যাটাকিং মিডে ফর্মে থাকা ইসকো আলারকোনকে বসিয়ে ক্রোয়েশিয়ান মিডফিল্ডার মাতেও কোভাচিচকে নামিয়েছিলেন জিদান। কোভাচিচের উপরে শুধু এবং শুধুমাত্র একটাই দায়িত্ব দিয়েছিলেন তিনি। আর তা হল লিওনেল মেসি কে মার্ক করার। মেসি যেখানে যান সেখানে যাওয়ার, মেসি যেখান থেকে পাস নেবেন সে জায়গাটা আটকে দেওয়া, যেখানে গিয়ে পাস দেবেন সেখানে গিয়ে তাঁর পা থেকে বলটা কেড়ে নেওয়া – এটাই ছিল গতকাল কোভাচিচের একমাত্র দায়িত্ব। কোচ জিনেদিন জিদান তাকে এটাই করতে দিয়েছিলেন। কেননা ইসকো আর কোভাচিচের মধ্যে তুলনামূলকভাবে কোভাচিচ একটু বেশী রক্ষণাত্মক, আর ইসকো একটু বেশী আক্রমণাত্মক। ইসকোকে দিয়ে মেসিকে মার্ক করার কাজটা সেভাবে হতনা বলেই ইসকোকে না নামিয়ে কোভাচিচকে নামিয়েছিলেন কোচ জিনেদিন জিদান।

প্রথমার্ধে এ কাজ করায় মোটামুটি সফলই হয়েছিলেন কোভাচিচ। মেসি সেরকম সফলভাবে ডিবক্সে থাকতে পারেননি মেসি, সেটা কোভাচিচের জন্যই। আর রিয়াল মাদ্রিদের খেলোয়াড়রা জানত এই ম্যাচ হারলে লিগ জয়ের আশা কার্যত শেষ হয়ে যাবে, তাই হয়তোবা প্রথম থেকেই নিজেদের মাটিতে বার্সার থেকে অনেক ভালো খেলছিলো। গোল করার যে সুযোগগুলো এই সময়ে এসেছিলো মাদ্রিদের কাছে, তা হয় রোনালদো, নয় বেনজেমা – এদের কারণেই নষ্ট হয়েছে।

কিন্তু প্রথমার্ধ শেষ হয়ে যাওয়ার পরেই আসল রূপে দেখা যায় বার্সেলোনাকে। কোচ আর্নেস্তো ভালভার্দে জিনেদিন জিদান এর ট্যাকটিকসে প্রথমার্ধে ব্যাকফুটে চলে গেলেও পরে ঠিকই এই ট্যাকটিকসের ফাঁকফোকর খুঁজে বের করে দ্বিতীয়ার্ধে মাঠে পাঠান দলকে। যেটা আগেই বলেছিলাম, মেসির পিছে পিছে থাকতে থাকতে কোভাচিচ মাঝমাঠ থেকে প্রায়সময়েই সরে যাচ্ছিলেন, ফলে ওদিকে বার্সেলোনা মিডফিল্ডার ইভান রাকিটিচ আর পাওলিনিওকে মার্ক করার জন্য এক ক্যাসেমিরো ছাড়া কেউই ছিলোনা। আবার সেন্ট্রাল অ্যাটাকিং মিডফিল্ড ভূমিকায় খেললেও পাওলিনিও প্রথাগত বার্সা মিডফিল্ডারদের মত ওরকম নরম-সরম মিডফিল্ডার নন, যিনি ড্রিবল আর নিখুঁত পাসের ক্যারিশমায় স্ট্রাইকারদেরকে খেলাবেন। পাওলিনিওর ভূমিকাটা অনেকটাই প্রথাগত শক্তিশালী বক্স-টু-বক্স মিডফিল্ডারের, যার কাজই হল মাঝে মাঝেই স্ট্রাইকারদের সাথে ডিবক্সে উঠে গিয়ে প্রতিপক্ষ ডিফেন্সকে শক্তির জোরে হারানো, দলের অন্য স্ট্রাইকারদের জন্য জায়গা সৃষ্টি করা, শক্তিশালী হেড এর মাধ্যমে গোলমুখে শট নেওয়া ইত্যাদি। এ কাজটা ওদিন রিয়াল মাদ্রিদের সাথে অনেক করতে পেরেছেন তিনি। কারণ ঐ একটাই, কোভাচিচের কারণে মিডফিল্ডে অনেক জায়গা ফাঁকা ছিল, যে জন্য বার্সার প্রথম গোলটায় দেখবেন ইভান রাকিটিচ অনেকক্ষণ পর্যন্ত মিডফিল্ড থেকে একাই বলকে টেনে নিয়ে এসে পরে একটা কার্যকরী পাস দিতে পেরেছিলেন ডানে থাকা সার্জি রবার্তোকে, যে রবার্তোই সুয়ারেজের গোলে সহায়তা করেন।

জিনেদিন জিদান এর এই কোভাচিচ এক্সপেরিমেন্টের মাশুল আরেকজনকে দিতে হয়, তিনি জার্মান মিডফিল্ডার টোনি ক্রুস। সবসময় সেন্ট্রাল মিডফিল্ডের একটু বামদিকে খেললেও কখনই এই জার্মান মিডফিল্ডারকে বামদিকে বেশী সামনে গিয়ে উইঙ্গারের মত ভূমিকা নিয়ে ক্রস করার বিষয়টা দায়িত্ব নিয়ে করা লাগেনা, সেটা করেন ইসকো বা মার্কো অ্যাসেনসিওর মত খেলোয়াড়েরা। কিন্তু এই ম্যাচে ইসকো না থাকার কারণে ক্রুসের উপর এই উটকো দায়িত্বটা এসে পড়ে, কারণ ৪-৪-২ ফর্মেশানে দলকে খেলাতে পছন্দ করা জিনেদিন জিদান এর ট্যাকটিকসের একটা বিশাল অংশ জুড়েই রয়েছে ক্রসভিত্তিক ফুটবল। একে ত নিজের স্বাভাবিক খেলার বহির্ভুত ছিল বিষয়টা, তার উপর বার্সেলোনা রাইটব্যাক সার্জি রবার্তো অসাধারণ খেলে তাকে ঐ কাজটা শান্তিমত করতেও দেননি। তারপর মাঠে নেলসন সেমেদো আসার পর রিয়াল মাদ্রিদের রাইটব্যাক দানি কারভাহাল লাল কার্ড খেয়ে মাঠের বাইরে চলে গেলে তো সার্জি রবার্তো নিজের পরিচিত সেন্ট্রাল মিডফিল্ড পজিশনেই চলে যান।

জিনেদিন জিদান যে শুধুমাত্র মেসিকে মার্ক করতে গিয়ে নিজের স্বাভাবিক খেলাটা না খেলে নিজেদের ক্ষতিটা করলেন, সেটা বুঝতে পারেন তিনি শেষ দশ-পনেরো মিনিটে। যখন মাঠে দুই উইঙ্গার গ্যারেথ বেল আর মার্কো অ্যাসেনসিওকে নামান তিনি। সেই সময়টুকু বার্সাকে বেশ ভালোভাবেই চেপে ধরে তারা – কিন্তু বাধা হয়ে দাঁড়ান তখন বার্সা গোলরক্ষক মার্ক অ্যান্দ্রে টের স্টেগেন।

ফলে আর গোল করতে হয়নি রিয়াল মাদ্রিদকে। নিজমাঠে পরাজয়ই বরণ করতে হয় তাদের।

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

fourteen + 10 =