জিদান এসেছিলেন বাংলাদেশে

মার্সেই শহরের ছোট্টো একটি জায়গার নাম ‘টার্টেইন’।ইয়াজিদ এই ছোট্টো জায়গার সবচেয়ে ভালো ফুটবলার ছিলো না।তবে অন্যদের তুলনায় কিঞ্চিৎ বড়ো এবং পরিশ্রমী ছিল।তবে আরেকটি ব্যাপার যা অন্য সবার থেকে তাকে আলাদা করেছিলো সেটি হলো তার বাম-পা এবং হেড না দেয়ার প্রবণতা। পনেরো বছর বয়সে যখন ক্লাব কানসের হয়ে প্রথম প্র‍্যাকটিসে নামেন কোচ তার মাথাকে উদ্দেশ্য করে বল ছুঁড়ে মারলেন,সময়মতো মাথা সরিয়ে নিলেন ইয়াজিদ।ছোটকাল থেকেই নম্র,ভদ্র স্বভাবের ছেলেটির জন্যে ক্লাব ২৪০ প্রশ্নের ‘পার্সোনালিটি টেস্ট’ নিলেন,যার ফলাফল তার শৈশবের প্রতিচ্ছবি; মোটিভেটেড, ইগো বিহীন এবং যার কাছে নিজের চাওয়ার থেকে অন্যদেরটার গুরুত্ব ঢের বেশি।নিজে একজন রানী মৌমাছি হয়েও পছন্দ করতেন কর্মী-মৌমাছি হয়ে থাকতে।
হয়তো এইজন্যেই গোলে সরাসরি শুট করার সুযোগ পেলেও পাস দিতেন সতীর্থদের।

কানস থেকে যোগ দেন আরেক ফরাসি ক্লাব বোর্দোতে।১৯৯৪ সালে জাতীয় দলের হয়ে অভিষেক।চেক প্রজাতন্ত্রের বিরুদ্ধে যখন মাঠে নামে তখন খেলার বাকী আর তিরিশ মিনিট এবং ফ্রান্স পিছিয়ে আছে ০-২ গোলে।ওই সময়ের মধ্যেই দুই গোল করে ফ্রান্সকে হারের লজ্জা থেকে বাচালেন।ম্যাচশেষে ফোন করলেন কানস ক্লাবের সেই কোচকে যিনি তার মাথার উদ্দেশ্যে বল ছুঁড়েন।মুখে রাজ্যের হাসি নিয়ে বললেন তুমি কি আমার খেলা দেখেছিলে? আমি আজকে হেডে একগোল আর অন্যটি করেছিলাম বা-পায়ে।জিদানের মতোন এমন মেধাবী, অধ্যবসায়ী ফুটবলার যে কি না নিজের দুর্বল পা মানে বা-পায়ের উপর কাজ করা শুরু করেছিলেন তুলনামূলক দেরিতে।তারপরেও কাইজার ফ্রাঞ্জ বেকেনবাউয়ার বলেছিলেন যে আন্দ্রেস ব্রেহমের পরে দুপায়ে এমন সমান কার্যকারিতা এবং শক্তি জিদান ছাড়া অন্য কারো কাছে ছিলো না।

৯৮ এর ফ্রান্স বিশ্বকাপে ফাইনালের আগ পর্যন্ত জিদান নিজের ছন্দে মোটেও ছিলেন না।সৌদি আরবের বিপক্ষে ম্যাচে সৌদির এক ফুটবলারের গায়ে পাড়া দেয়ার কারণে বহিষ্কৃত হয়ে খেলতে পারেননি পরের দুই ম্যাচ।ইতালির বিরুদ্ধে কোয়ার্টার এবং ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে সেমি ফাইনাল দুই ম্যাচেই ছিলেন নিজের ছায়া হয়ে।ব্রাজিলের বিরুদ্ধে দুই গোল করেই তার স্বরূপে ফেরা।জিদানের নিজের টুর্নামেন্ট ছিলো ইউরো ২০০০।ফ্রান্স ফুটবলে অমর হয়েছেন এরপর থেকেই।ইঞ্জুরি,নিষেধাজ্ঞা ,ক্লান্তি এই টুর্নামেন্টে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি কিছুই।ইউরো ফাইনালের পরেরদিন দেখা করতে গিয়েছিলেন মার্সেই এ তার পরিচিত মৃত্যুশয্যায় থাকা এক বুড়োর সাথে।আর এয়ারপোর্টে সবাইকে অবাক করে দিয়ে অটোগ্রাফ দিয়েছিলেন এক কুকুরকে।

জিদানের ছোঁয়ায় বদলে যেত পুরো ফ্রান্স দল।এতটাই প্রভাব ছিলো তার দলের উপর।তার স্পর্শে লেজ ব্লুজরা হয়ে যেত এক।লিলিয়ান থুরাম, দলের সবচেয়ে বিবেচক ফুটবলার যিনি এককালে হতে চেয়েছিলেন যাজক অকপটে স্বীকার করলেন দলে জিজুর প্রভাব,”ফ্রান্স ফুটবল আগেও অনেক ভালো জেনারেশন পেয়েছিল কিন্ত তাদের সাথে আমাদের পার্থক্য আমাদের দলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং সিম্বোলিক ফুটবলারটি অত্যন্ত বিনয়ী”। দলের কেউ ভুল পাস দিলেও জিজুর মুখ থেকে বের হতো না একটি কটুবাক্য।

ফুটবলের পাশাপাশি জুডোও খেলতেন জিজু।জিদানের মা,মালিকাই জানালেন এই তথ্য।যদি সত্যি সত্যিই জিজু বেছে নিতেন জুডো সবচেয়ে বড়ো ক্ষতি হতো ফুটবলের,ফ্রান্সের।

গাছের উপরে বসে হলেও জিদানকে দেখার
অনন্য-সুবর্ণ সুযোগ হাতছাড়া করেনি জাকির হোসেন নামের ১৬ বছরের এক কৈশোর।জিদান বাংলাদেশে, আবার ফুটবল নিয়েও দেখিয়েছেন কারুকাজ। নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারেনি জাকিরের মতোন বাকীসব ছেলে-বুড়ো।

ফুল প্যান্টের উপরে ব্রাদার্স ইউনিয়নের শর্টস,গায়ে মোহামেডানের জার্সি প্রতিপক্ষ আবাহনী, আনন্দ করছেন তাকেই পাহারা দিতে রাখা পুলিশদের সাথে।না, একমাত্র জিদান ছাড়া অন্য কেউ করছেন এসব কল্পনা করাও পাপ।

জিদানের কেমন লেগেছিল বাংলাদেশ? বিনয়ী জিনেদিন ইয়াজিদ জিদানের বিনয়ী উত্তর হাজার হাজার মাইল দূরের ছোট্টো এক গ্রামের মানুষজনও আমাকে চিনে,ব্যাপারটা খুবই আনন্দের।না চেনার কোনো কারণ নেই জিজু, ভাষা-সংস্কৃতিগত পার্থক্য থাকলেও ফুটবলের যে কোনো ভাষা নেই!

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

ten + 5 =