জিঞ্জার প্রিন্স

::::: জুহায়ের সাদমান খান :::::

ফেসবুকে ঢুকে আজকাল প্রথমেই ‘অন দিস ডে’ দেখা হয়। আজকেও ব্যাতিক্রম না। আজকে ঢুকে একটা প্যাটার্ন লক্ষ্য করলাম। বিগত প্রতিটি বছরেই এই দিনে আমি একজনকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানিয়েছি। লোকটির নাম পল এরন স্কোলস।

পল স্কোলসের জীবনবৃত্তান্ত দিব না। ওটা সবাই জানে। একজন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ফ্যান হিসাবে আমার নিজের অভিমতে পৃথিবীর সেরা মিডফিল্ডারটিকে নিয়ে দু একটা কথা বলব আরকি।

১৮ নম্বর জার্সি পরিহিত লালচুলো ছোটখাটো একজন মিডফিল্ডার। প্রথম দেখায় হ্যারি পটারের উইজলি পরিবারের কোন সদস্য মনে হওয়া অস্বাভাবিক কিছু না। বল পায়ে এলেও জাদু দেখিয়ে দেন টুকটাক। মেশিনের মত ৬০ গজি পাস দাওয়া যেন তার কাছে ডালভাত। বক্সের বাইরে থেকে রকেটগতি শটে গোল করা তো তার কাছে ট্যাপ ইনের সমতুল্য। এবং হ্যাঁ, জঘন্য পর্যায়ের ল্যাংও তিনি মাঝেমধ্যে মেরে বসতেন।

Paul-Scholes-Manchester-United-Fulham-Premier_1885109

স্কোলস তার ক্যারিয়ারজুড়েই ছিলেন পাদপ্রদীপ থেকে দূরে। এলাম, খেললাম, জয় করলাম, বাসায় গেলাম ধরণের একজন মানুষ। বেকহামের গ্ল্যামার কখনোই তার ছিল না, ল্যাম্পার্ড-জেরার্ডের মত জনপ্রিয়তাও ছিল না। অথচ যারা ফুটবলের সাথে সরাসরিভাবে যুক্ত, তাদের কাছে পল স্কোলস ছিলেন ওই প্রজন্মের অবিসংবাদিতভাবে সেরা ইংরেজ মিডফিল্ডার। জিনেদিন জিদান, জাভির মত খেলোয়াড়েরা স্কোলসকে তাদের দেখা সেরা মিডফিল্ডারের মর্যাদা দিয়েছেন। লিওনেল মেসির কাছে স্কোলস লা মাসিয়ার একজন শিক্ষক – কারণ সেখানে স্কোলসের খেলা নিয়ে বিস্তর গবেষণা করা হয়। স্কোলসকে সতীর্থ হিসাবে পেলে আরও অনেক বেশি গোল করতেন পেলে – বলেছেন স্বয়ং পেলেই।

কিন্তু হায়, যারা ৪ বছর পরপর ফুটবল দেখতে বসে তারা তার মান বুঝল না। যেখানে বিশ্বের অন্যান্য যেকোন দলে হয়ত স্কোলসকে ঘিরেই দল সাজানো হত, সেখানে ইংল্যান্ড দলে তাকে ঠেলে দাওয়া হল বাঁ প্রান্তে। একজন কমেডিয়ানের ভাষ্যমতে – ‘ইংল্যান্ড এতদিন পর একটা বিশ্বমানের খেলোয়াড় পেয়েও তাকে কাজে লাগাতে পারল না, এটা একটা বড় ট্র্যাজেডি। এ যেন একজন ৩ বছর বয়সী শিশুর হাতে ল্যাপটপ তুলে দাওয়ার মত।’ ইউরো ২০০৪ এর পরপরই অভিমানী স্কোলসের অকাল অবসর। আন্তর্জাতিক স্তরে ফিরলেন না আর কখনো।

0945708

এই ভুলটা কখনোই করেননি স্যার আলেক্স ফার্গুসন। তিনি জানতেন এই ‘ক্লাস অফ ৯২ গ্র্যাজুয়েট’ তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়। তাকে ঘিরেই দল সাজাতেন। গিগস বাঁয়ে, বেকহাম ডানে, মাঝে সঙ্গী অধিনায়ক রয় কিন। পরে বেকহামের জায়গায় রোনালদো এলেন। এরপর কিনের জায়গায় ক্যারিক, ফ্লেচার। কোনই ব্যাপার না। অন্যরা পরিবর্তিত হলেও স্কোলস থাকলে ভরসা আছেই, এটাই যেন বার্তা।

তুমি যদি বল পায়ে দ্বিধাগ্রস্থ হও, স্কোলসকে পাস দিয়ে দাও, কারণ সে জানে বলটা দিয়ে কি করতে হবে। এটাই ফর্মুলা। বড়ই সহজ ছিল ফুটবল খেলা, বড়ই আনন্দময় ছিল সেটা দেখা। ২+২=৪ এর মত সহজ সমীকরণ।

স্কোলস আসলে কত বড় মাপের খেলোয়াড় ছিলেন ওটা স্পষ্ট হয়ে যায় ২০১১ সালে তার প্রথম (৬ মাসের অবসর) এবং বিশেষ করে ২০১৩ সালে তার দ্বিতীয় অবসরের পর। এত বছরের মসৃণপ্রায় পথ হঠাত ঢাকা-চট্টগ্রাম হাইওয়ের মত ভাঙ্গাচোরা রাস্তা হয়ে যায়। একটু পরপর দুপ্রান্তে ৬০ গজি পাস দাওয়া চাট্টিখানি ব্যাপার না এটা বুঝতে পারে সমর্থকরা। দূরপাল্লা শটকে গোল তো বটে, গোলমুখি করাও যে বিরাট একটা ব্যাপার, এটাও সমর্থকরা আস্তে আস্তে মেনে নেয়। মাঝমাঠে একটি মানুষ রোবটের মত এসব কর্মসাধণ করেছে বিগত প্রায় ২০ বছর ধরে। ‘স্পয়েল্ট’ হয়েছে সমর্থকেরা।

ব্যক্তিগতভাবে আমার প্রিয় স্কোলস মোমেন্ট হল ২০০৮ চ্যাম্পিয়ন্স লিগ সেমিতে বার্সেলোনার বিপক্ষে তার জয়সূচক গোলটি। দূরপাল্লার বুলেটটি ক্রমেই ভালদেসের কাছ থেকে দূরে সরে গেল। টপ কর্নার। ওয়াট এবাউট দ্যাট। ২০০৮ সালেই ইউনাইটেড চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জেতে তৃতীয়বারের মত। মস্কো ফাইনালে অবদান রেখে ১৯৯৯ সালে সাস্পেনশনের কারণে ফাইনাল না খেলার অতৃপ্তি ঘুচিয়েছিলেন তিনি।

দুদিন আগে ওল্ড ট্রাফোর্ডে ইউনিসেফের চ্যারিটি ম্যাচে পুরোনো দিন ফিরিয়ে এনেছিলেন তারা। বেকহাম, গিগস, স্কোলস একই দলে। ফার্গি কোচ। বেকহামের ক্রস থেকে স্কোলসের হেডেড গোল। নেত্রকোনায় জল। ওহ, বলাই হয়নি, স্কোলস হেড থেকেও প্রচুর গোল করতেন। ছোটখাটো মানুষ হিসেবে যা বড়ই ইম্প্রেসিভ।

 

রিও ফার্দিনান্দ তাকে ডাকতেন ‘স্যাট ন্যাভ’ (স্যাটেলাইট ন্যাভিগেটর)। ইউনাইটেড সমর্থকেরা তাকে ডাকে ‘জিঞ্জার প্রিন্স’। বয়স তার আজ হল ৪১। হাজার বছর বেঁচে থাকো তুমি, পল স্কোলস। তোমার অভাব কখনই পূরণ হবে না। শুভ জন্মদিন।

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

four × 1 =