জাঁ ফতেঁ : ফরাসি রেকর্ডের বরপুত্র

জাঁ ফতেঁ

ফ্রান্স শুধু বিশ্বকাপের জন্মই দেয়নি (ফুটবল বিশ্বকাপের প্রতিষ্ঠাতা জুলে রিমে ফ্রেঞ্চ নাগরিক) সেই সাথে তাদের রয়েছে এমনও কিছু রেকর্ড যা পৃথিবীর কারো পক্ষে সম্ভব নয় অতিক্রম করা অথবা প্রায় অসম্ভব বললেই চলে। প্রথম রেকর্ড যেটি কারো পক্ষেই অতিক্রম করা সম্ভব নয় সেটি হচ্ছে বিশ্বকাপের প্রথম গোলদাতা হচ্ছেন লুসিয়েঁ লরাঁ, একজন ফ্রেঞ্চ খেলোয়াড় যিনি ১৯৩০ সালের ১৩ জুলাই মেক্সিকোর বিপক্ষে বিশ্বকাপের প্রথম গোলটি করেন। দ্বিতীয় রেকর্ড সেটিও অতিক্রম করা অসম্ভব না হলেও তার খুব কাছাকাছি। সেটি হচ্ছে এক আসরে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড , এই রেকর্ডটি হচ্ছে ফ্রেঞ্চ স্ট্রাইকার জাঁ ফতেঁ এর ; তিনি সুইডেনে অনুষ্ঠিত ১৯৫৮ সালের বিশ্বকাপে একাই ১৩ টি গোল করেন। পেলে, ম্যারাডোনা, রোনালদো নাজারিও, গার্ড মুলার, ইউসেবিও, ক্লোসা অনেকেই চেষ্টা করেছেন কিন্তু তার ধারে কাছেও কেউ যেতে পারেননি এবং ভবিষ্যতেও কেউ পারবেন বলে মনে হয়না। বিশ্বকাপে একজন খেলোয়াড় সর্বোচ্চ ৭ টি ম্যাচ খেলতে পারে আর জাঁ ফতেঁ ১৩ টি গোল করেছিলেন ৬ ম্যাচ খেলে। এই কিংবদন্তী ফ্রেঞ্চ খেলোয়াড়কে নিয়েই আজ আমার আয়োজন ।

জাঁ ফতেঁ এর জন্ম হয় ১৯৩৩ সালের ১৮ জুন মরোক্কোর মারাকেশ শহরে : তার বাবা ছিলেন ফ্রেঞ্চ এবং মা ছিলেন স্প্যানিশ। তখন মরক্কো ছিল ফ্রান্সের নিয়ন্ত্রণাধীন, তার বাবা ফ্রান্সের সেনাবাহিনীর সদস্য হিসেবে মরক্কো যান এবং মরোক্কোর সৌন্দর্যে তিনি মুগ্ধ হয়ে সেখানেই রায় যান। তাদের ঘরে ৭ টি সন্তান আসে যাদের মাঝে জাঁ ফতেঁ হচ্ছেন চতুর্থ। খেলাধুলার প্রতি ভালোবাসা তিনি পারিবারিক সূত্রেই পান। তার বাবা ছিলেন রাগবি ও ফুটবল খেলোয়াড় যিনি পরবর্তীতে রেফারির দায়িত্ব পালন করেছিলেন ; বাবার দেখা দেখি পরিবারের সকল সদস্যরাই ফুটবলার হন তবে সকলের মাঝে জাঁ ফতেঁ এর প্রতিভা ছিল ভিন্ন, অসাধারণ, এক কথায় নজরকাড়া। মারাকেশ শহরের খেজুর বাগানেই তিনি প্রথম খেলা শুরু করেন, পরবর্তীতে পারিবারিক কারণে সপরিবারে মারাকেশ থেকে কাসাব্লাঙ্কা চলে যান এবং এখানে তিনি তার ফুটবল টেকনিককে পরিপক্ক করেন। তার শারীরিক গঠন ছিল খাটো ও খুব হালকা যার কারণে ছোট বেলা থেকেই দৈহিক ফুটবল থেকে শৈল্পিক ফুটবলকেই তিনি অগ্রাধিকার দিতেন এবং মারাকেশ ও কাসাব্লাঙ্কার রাস্তায় তিনি শিখেছিলেন অসাধারণ নৈপূণ্যের ফুটবল।

অন্য সব মরোক্কান ও আফ্রিকান শিশুদের মত ছোটবেলায় তারও আইডল ছিলেন লারবি বেন বারেক, মরোক্কান বংশোদ্ভূত এক খেলোয়াড় যিনি ৪০ দশকে ফ্রেঞ্চ ক্লাব মার্সেই তে খেলতেন এবং ফ্রান্সের জাতীয় দল হয়েও খেলেছিলেন। জাঁ ফতেঁ এর ছোটবেলার স্বপ্ন ছিল তার আইডলের মত তিনিও যেন ফ্রান্সে গিয়ে খেলতে পারেন। তার এই স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে তাকে খুব বেশি সময় অপেক্ষা করতে হয়নি। যৌবনেই তার অসাধারণ ট্যালেন্ট ও গোল করার দক্ষতা সকলের নজর কাড়ে ; এমন কোনো ম্যাচ খুব কম ছিল যেই ম্যাচ তিনি গোল না দিয়ে শেষ করতেন। তার এই অসাধারণ ট্যালেন্টের কারণে তিনি মরোক্কান জাতীয় দলের ডাক পান এবং ১৯৫২ সালের ২৫ ডিসেম্বর ফ্রান্সের মার্সেই শহরে একটি প্রীতি ম্যাচে মরক্কো মুখোমুখি হয় ফ্রান্সের দ্বিতীয় দলের । সেই ম্যাচে মরোক্কোর জার্সি গায়ে মাঠে নেমেছিলেন ২০ বছর বয়সী জাস্ট জাঁ ফতেঁ। মরক্কো ৩-০ গোলের ব্যাবধানে পরাজিত হয় কিনতু জাঁ ফতেঁ এর প্রতিভা নজর কাড়ে অলিম্পিক নিস্ ক্লাবের ম্যানেজারের। তার ট্যালেন্ট দেখে সে বছরেই অলিম্পিক নিস্ তাকে চুক্তিবদ্ধ করে। এভাবেই মরক্কো থেকে তিনি চলে আসেন তার বাবার আসল দেশ ফ্রান্সে।

১৯৫৩ সালের ৩০ জুলাই একটি জাহাজে করে তিনি কাসাব্লাঙ্কা থেকে ফ্রান্সে আসেন। খেলার মাঠে আর্জেন্টাইন লুইস কার্নিলিয়া এর সাথে তিনি অতুলনীয় এক জুটি গড়ে তুলেন এবং প্রতি ম্যাচেই জাঁ ফতেঁ তার ফুটবল টেকনিক ও ট্যাক্টিক্সের উন্নয়ন করতে থাকেন। ফ্রান্সে এসে তিনি এতো দ্রুত নিজেকে মানিয়ে নেন যে কয়েক মাস পর ১৯৫৩ সালের ১৭ ডিসেম্বর ফ্রান্সের অনুর্ধ ২১ জাতীয় দলের সাথে অভিষেক করেন ও অভিষেক ম্যাচেই একটি হ্যাট্রিক করেন। সুইজারল্যান্ডে অনুষ্ঠিত ১৯৫৪ সালের বিশ্বকাপের প্রাথমিক দলে তার নাম থাকলেও শেষ দল থেকে তাকে বাদ দেয়ার কারণে সেই বিশ্বকাপ খেলতে তিনি ব্যার্থ হন।

পরবর্তী ২ মৌসুমে জাঁ ফতেঁ এর নাম এতো দ্রুত সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে যে অলিম্পিক নিসের মত ক্লাবের পক্ষে এতো বড় লেভেলের খেলোয়াড় ধরে রাখা কষ্টকর হয়ে যায়। তাকে দলভুক্ত করার জন্য এগিয়ে আসে তখনকার ফ্রান্সের সবথেকে শক্তিশালী ও ইউরোপের অন্যতম শক্তিশালী দল স্টাডে রিমস ; সেই সময় রিমস এর প্রধান খেলোয়াড় ছিলেন আরেক ফ্রেঞ্চ কিংবদন্তি রেমন্ড কোপা যিনি ১৯৫৬ সালে রিয়েল মাদ্রিদে যোগদান করেন। রেমন্ড কোপাকে বিক্রির কারণে দর্শকের মাঝে শুরু হয় চরম অসন্তোষ ও উত্তেজনা। কোপা শুধু রিমস এরই নয়, সমস্ত ফ্রান্সের জন্যই ছিলেন একমাত্র হিরো। দর্শকদের উত্তেজনাকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য রিমস সিদ্ধান্ত নেয় ফ্রান্সের উদীয়মান তারকা জাঁ ফতেঁ কে দলভুক্ত করার। রিমস তৎকালীন রেকর্ড সমতুল্য ১ লক্ষ ৫ হাজার ফ্রাঁ ট্রান্সফার ফি দিয়ে জাঁ ফতেঁ কে চুক্তিবদ্ধ করে। এই ট্রান্সফার ফি ছিল তার থেকেও বেশি যা রিয়াল মাদ্রিদের লিজেন্ডারি প্রেসিডেন্ট সান্তিয়াগো বার্নাব্যু খরচ করেছিলেন কোপা কে আনার জন্য। রিমসে এসে তিনি তার ক্যারিয়ারের সর্বোচ্চ সময়টি পার করেন। তার গোলের অবদানে রেইমস ফ্রেঞ্চ লীগ শিরোপা ও ফ্রেঞ্চ কাপ দুটিই জয়লাভ করে।

১৯৫৮ সালের বিশ্বকাপে ফ্রান্স ছিল সময়ের অন্যতম সেরা দল ; জাতীয় দলে তখন একই সময়ে খেলতেন PIANTONI, JEAN VINCENT, MARYAN WISNIESKI, RAYMOND KOPA দের মত ৪ জন অফেন্সিভ ও অভিজ্ঞ খেলোয়াড় যাদের কাউকেই বেঞ্চে বসানো সম্ভব নয়। কিনতু ফতেঁ এর ট্যালেন্টকেও উপেক্ষা করার মত অবস্থা ছিলোনা। তাই কোচ সিদ্ধান্ত নেয় ৫ জনকেই একসাথে খেলানোর যদিও সেটি ছিল খুব বেশি আক্রমণাত্মক। বিশেষ করে কোপার সাথে তিনি গড়ে তুলেন এক ডেডলি এটাক।

তার অসাধারণ ও অমানবিক পারফর্ম্যান্সের কারণে পেলের সাথে তিনি হয়ে যান সেই বিশ্বকাপের আইকনিক ফিগার। প্রথম ম্যাচ প্যারাগুয়ের বিপক্ষেই শুরু হয়ে যায় ফতেঁ ফেস্টিভ্যাল শো যা চলতে থাকে শেষ ম্যাচ পর্যন্ত। প্যারাগুয়ের বিপক্ষে করেন ৩ গোল, যুগোস্লাভিয়ার বিপক্ষে ২ গোল, স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ১, নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে ২ ও ব্রাজিলের বিপক্ষে করেন ১ গোল। সেমিফাইনাল ম্যাচে ফ্রান্স পেলে, গারিঞ্চা, দিদি, ভাবা, জাগালো দের ব্রাজিলের বিপক্ষে পরাজিত হয় এবং ফাইনাল ম্যাচে সেই ব্রাজিলই বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়। তৃতীয় পজিশনের লড়াই ম্যাচে জার্মানির বিপক্ষে ফতেঁ আরও ৪ গোল করেন। এভাবেই পুরো টুর্নামেন্টে তার গোল হয় ১৩ যার মধ্যে ৮ টি ছিল ডান পায়ের, ৪ টি ছিল বাম পায়ের ও একটি ছিল হেডের। টুর্নামেন্ট শেষে পেলেও স্বীকার করতে বাধ্য হন যে সেই বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড় ছিলেন জাঁ ফতেঁ, কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত সেই সময়ে গোল্ডেন সু, গোল্ডেন বলের মত ব্যক্তিগত কোনো পুরষ্কার না থাকার কারণে তার এই কৃতিত্ব আনুষ্ঠানিক কোনো স্বীকৃতি পায়নি।

বিশ্বকাপ শেষে ফতেঁ এক জাতীয় নায়ক হিসেবে দেশে ফিরে আসেন। তাকে দলভুক্ত করার জন্য এগিয়ে আসে রিয়াল মাদ্রিদ ও বার্সেলোনা কিন্তু রেইমস চ্যাম্পিয়ন্স লীগ ট্রর্ফি জয়ের উদ্দেশ্যে তাকে রাজার সমতুল্য বেতন দিয়ে চুক্তি বৃদ্ধি করে দলে রেখে দেয়। সে বছর রেইমস চ্যাম্পিয়ন্স লীগ জয়ের খুব কাছেও গিয়েছিলো। ১৯৫৮/৫৯ সালের ফাইনাল ম্যাচে তারা দি স্টেফানো, কোপা, গেন্তো দের লিজেন্ডারি রিয়াল মাদ্রিদের বিপক্ষে ২-০ গোলের ব্যবধানে পরাজয় বরণ করে। যাই হোক সেই আসরে ১০ টি গোল করে সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়েছিলেন ফতেঁ। সেই সময়গুলো ছিল তার জন্য স্বপ্নের মত। সমস্ত ফ্রান্স ও বিশ্বজুড়ে ছিল তার নাম। বিভিন্ন কোম্পানি তাদের ব্র্যান্ড এডভার্টাইসিংয়ের জন্য বেছে নোয়েছিলো ফতেঁ কে। তিনি ছিলেন ইতিহাসের প্রথম ফুটবলার মডেল যিনি ফুটবলের সাথে সাথে ব্রান্ডিংয়ের কাজও করতেন সমান ভাবে। এতো জনপ্রিয়তার পরও তিনি কখনো পরিবর্তন হয়ে যাননি, তার পরিবার ও পারিবারিক বন্ধনকে সর্বদাই সবকিছুর ওপরে স্থান দিয়েছেন।

যখন সবকিছুই চলছিল স্বপ্নের মত ঠিক এমন সময় ১৯৬০ সালের ২০ মার্চ সবকিছু পরিণত হয় দুঃস্বপ্নে। লীগের একটি ম্যাচ চলাকালীন সময়ে SOCHEAUX এর ডিফেন্ডার একটি ফাউল করে তার পায়ের হাড় ভেঙে দেন। তখন তার বয়স মাত্র ২৭। ১ বছর খেলার মাঠ থেকে দূরে থেকে ফিরে আসার সাথে সাথেই আবারও একই পায়ে ইনজুরিতে পড়েন। অতঃপর ১৯৬২ সালের ০৬ জুলাই মাত্র ২৯ বছর বয়সে তিনি অফিসিয়ালি ফুটবল থেকে অবসর নিতে বাধ্য হন। তার ক্যারিয়ার ছিল যেমন সুন্দর তেমনই দ্রুত : ফ্রান্সের জাতীয় দল হয়ে মাত্র ২০ ম্যাচ খেলে ২৭ গোল করেন। তার অবসর ছিল সমস্ত ফ্রান্সের জন্য একটি শোকের বিষয়।

এভাবেই শেষ হয়ে যায় ফুটবলের এক কিংবদন্তির ইতিহাস ; ইনজুরি না হলে হয়তো আরও অনেক রেকর্ড তিনি গড়তে পারতেন। তবে ইনজুরির আগেই যেই রেকর্ডটি তিনি করে ফেলেছেন সেটি ভাঙতে হয়তো কয়েক শতাব্দীও যথেষ্ট নয় , হয়তোবা সেটি আজীবন সুরক্ষিতই থেকে যাবে।

লিখেছেন : আরাফাত ইয়াসের 

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

1 × 4 =