জহির-কথন

জহির খানের অবসরের খবর শুনে অনেকেরই নিশ্চয়ই শুরুতে মনে হয়েছে, ‘জহির এখনও খেলছিলেন নাকি!’

‘সময়’ ব্যাপারটিই এমন। দৃষ্টিসীমার বাইরে থাকা মানে আড়ালে চাপা পড়া!

অথচ একটা সময়, মহেন্দ্র সিং ধোনি হয়ত টিম লিস্টে সবার আগে জহিরের নামটিই লিখতেন। একদিক থেকে শচীন টেন্ডুলকারের চেয়েও অপরিহার্য ছিলেন জহির। শচীনের শূন্যতা অন্য ব্যাটসম্যানরা মিলে হয়ত ঢেকে দিতে পারতেন, কিন্তু জহিরের অভাব ওই সময়ে পূরণ করবে কে!

জহিরের অভিষেকটা মোটামুটি ভালোই মনে আছে। ২০০০ সালে আইসিসি নক আউট বিশ্বকাপ। কেনিয়ার বিপক্ষে একই সঙ্গে যুবরাজ-জহিরের অভিষেক। এক ওভারে দুটিসহ ৩ উইকেট নিয়েছিলেন জহির। পরের ম্যাচে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ৮০ বলে ৮৪ করে নিজের আবির্ভাব জানান দিলেন যুবরাজ। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার রান তাড়ায় অ্যাডাম গিলক্রিস্ট ও স্টিভ ওয়াহর মহাগুরুত্বপূর্ণ উইকেট দুটি পেয়েছিলেন জহির…

কদিন পর টেস্ট অভিষেক। আমাদের অভিষেক টেস্টে। মনে আছে প্রায় সবই। দুই ইনিংসেই পেয়েছিলেন অপির উইকেট। টেস্টে জহিরের সেরা বোলিংটা তো স্পষ্টই চোখে ভাসে। আমাদের মিরপুরে, ২০১০ সালে। ক্রীড়া সাংবাদিকতায় আসার পর আমার সেটি প্রথম টেস্ট সিরিজ..

ওই টেস্ট এমনিই ভোলার নয় তামিম ইকবালের ইনিংসটির কারণে। কী ইনিংসটাই খেলেছিলেন তামিম! ভারতীয় বোলারদের চোখের পানি, নাকের পানি এক করে ছাড়ছিলেন। দলের রান যখন ২০০, তামিমের একারই ১৪২! সব গড়বড় করে দিলেন জহির। তামিমকে আউট করলেন এবং বাকিদেরও আউট করতেই থাকলেন। জহিরের রিভার্স সুইংয়ের জবাব জানা ছিল না কারও। ৮৭ রানে ৭ উইকেট..

রিভার্স সুইং। ভারতীয় পেসাররা যেটি শিখতে হাপিত্যেশ করতেন ও করছেন, জহির সেটিতে মাস্টার হয়ে উঠেছিলেন। পুরোনো বল হাতের তালুতে লুকিয়ে জহির যখন ছুটতেন, রোমাঞ্চকর একটা ব্যাপার ছিল। আর নতুন বল সিম-সুইং করানোই সহজাত ক্ষমতা তো ছিলই। ছন্দে থাকলে, গতি একটা সময় নব্বই মাইলের আশেপাশে থাকত নিয়মিতই। ওই সময়টায় জহির হয়ে উঠেছিলেন প্রায় পরিপূর্ণ ফাস্ট বোলার..

২০০৯ সালের ডিসেম্বর, নিজেদের ইতিহাসে প্রথমবার টেস্ট র‌্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষে উঠলো ভারত। শচীন বললেন, ‘স্বপ্ন সত্যি হলো।’ শচীন নিজে কিংবা অধিনায়ক ধোনি, নিশ্চয়্ই আলাদা করে ধন্যবাদ জানিয়েছিলেন জহিরকে। এই সাফল্যের একটা বড় কৃতিত্ব ছিল তো তাঁরই! সবসময়ই ৪-৫ উইকেট বা চোখে পড়েছে, এমন কিছু হয়ত ছিল না। কিন্তু মহাগুরুত্বপূর্ণ ২-৩ উইকেট, নতুন বলে, পুরোনো বলে বা দ্বিতীয় নতুন বলে এমন সব ব্রেক থ্রু দিয়েছে, শেষ পর্যন্ত ডেটি ম্যাচের ভাগ্য গড়ায় বড় ভূমিকা রেখেছে। যে টেস্ট জিতে ভারত এক নম্বরে উঠল, শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে সেই টেস্টেও ব্রাবোর্নে ৫ উইকেট নিলেন জহির…

২০১১ বিশ্বকাপ। যুবরাজ তো অবশ্যই ভারতের নায়ক। কিন্তু ধোনির পিঠ চাপড়ানো নিশ্চয়ই সবচেয়ে বেশি পেয়েছিলেন জহির। পেস প্রতিকূল উইকেটেও টুর্নামেন্ট জুড়ে যেভাবে বোলিং করেছিলেন, অধিনায়কের তা সবচেয়ে ভালো বোঝার কথা। যথারীতি সেই মোক্ষম সব সময়ে গুরুত্বপূর্ণ সব উইকেট। ফাইনালে প্রথম ৩ ওভারই মেডেন! টুর্নামেন্টে পেয়েছিলেন ২১ উইকেট। সব মিলিয়ে ৩ বিশ্বকাপে তার ৪৪ উইকেট…

ইংল্যান্ডের মাটিতে ভারত ২৩ বছর পর সিরিজ জিততে পেরেছিল দলে একজন জহির ছিল বলেই। ২০০৭ সালের সেই সিরিজে ৩ টেস্টে ১৮ উইকেট নিয়েছিলেন জহির…

টেস্ট ইতিহাসের তিনি তৃতীয় সফলতম বাঁহাতি পেসার। ভারতের ইতিহাসের দ্বিতীয় সফলতম পেসার। আরেকটি বিস্ময়কর তথ্য, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ২৩৭ বার বাঁহাতি ব্যাটসম্যানকে আউট করেচেণ জহির। পেস-স্পিন মিলিয়েই আর কোনো বাঁহাতি বোলার এত বেশি বাঁহাতি ব্যাটসম্যানকে আউট করতে পারেনি! ( ডানহাতি বোলারদের মধ্যেও জহিরের চেয়ে বেশি বাঁহাতি ব্যাটসম্যানের উইকেট নিয়েছেন আর কেবল মুরলি (৩২৫) ও শন পোলকের (২৫২)। জহিরের সবচেয়ে বেশি চার শিকারই বাঁহাতি– গ্রায়েম স্মিথ (১৪ বার), কুমার সাঙ্গাকারা (১১), সনাৎ জয়াসুরিয়া (১০) ও ম্যাথু হেইডেন (১০)…

১০ বছর আগেও ভারতের সর্বকালের সেরা টেস্ট দলে কপিলের পর দ্বিতীয় পেসার হিসেবে নিতে হতো হয়ত শ্রীনাথকে। এখন কপিলের সঙ্গে অবশ্যই জহির! ওয়ানডেতে তো বটেই…

তথ্য-উপাত্ত-পরিসংখ্যানের অলি-গলিতে চাইলে আরও ঘোরা যায়। তার চেয়ে জহিরের অধিনায়কের কথাটি দিয়েই শেষ করা যাক। জহিরের অবসরের খবরে ধোনি বলেছেন, ‘ভারতের ব্যাটিংয়ের জন্য টেন্ডুলকার যতটা, বোলিংয়ের জন্য ততটাই জহির।’

আক্ষরিক অর্থে হয়ত মানা মুশকিল। জহির বোলিংয়ের টেন্ডুলকার না অবশ্যই। তবে দলে অবদানের দিক থেকে টেন্ডুলকারের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে হয়ত বেশিই!

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

three × three =