জর্ডান হেন্ডারসন – স্টিভেন জেরার্ডের যোগ্য উত্তরসূরি?

পালা-পরিবর্তন...
পালা-পরিবর্তন…

এক বছর আগেও এই কথা বললে সবাই এই লেখককে পাগল বলতেও কুণ্ঠাবোধ করতেন না, এবং সেটাই ছিল স্বাভাবিক। কিন্তু এখন এই কথা বলা হলে বোধহয় দু’বার ভাবতেই হবে!

মৌসুম শেষে লিভারপুল ছেড়ে অ্যাটলান্টিক পাড়ি দিয়ে লস অ্যাঞ্জেলস গ্যালাক্সিতে নাম লেখাচ্ছেন ক্লাবের কিংবদন্তী অধিনায়ক স্টিভেন জেরার্ড। একসময় যেই জেরার্ডকে ছাড়া লিভারপুল কল্পনাই করা যেত না, এখন সময় পরিক্রমায় সেই জেরার্ডকে ছাড়াই কোচ ব্রেন্ডান রজার্সকে সাজাতে হবে সব রণপরিকল্পনা, যে রণপরিকল্পনা মাঠে বাস্তবায়ন করার গুরুভার থাকবে এই ইংলিশ মিডফিল্ডারের উপর, জেরার্ডের পর লিভারপুলের অধিনায়কত্বের ব্যাটন উঠবে যার হাতে, সেই জর্ডান হেন্ডারসন, যিনি বর্তমানে লিভারপুলের সহ-অধিনায়ক, এবং এখন প্রায়শই জেরার্ডের অনুপস্থিতিতে অধিনায়কত্বের আর্মব্যান্ড ওঠে যার বাহুতে।

লিভারপুলের সহ অধিনায়ক ; জর্ডান হেন্ডারসন
লিভারপুলের সহ অধিনায়ক ; জর্ডান হেন্ডারসন

পরিসংখ্যানের দিক থেকে বিবেচনা করলে এখনই কিন্তু হেন্ডারসন লিভারপুলের অন্যতম সেরা অধিনায়ক! কি, বিশ্বাস হচ্ছে না? মনে হচ্ছে মুদ্রাস্ফীতির চূড়ান্ত উদাহরণ রচনা করে যে অপরীক্ষিত ২০ বছর বয়সী এক ইংলিশ মিডফিল্ডারকে চারবছর আগে ২০ মিলিয়ন পাউন্ডের চোখ কপালে তোলা দামে আরেক ইংলিশ ক্লাব স্যান্ডারল্যান্ড থেকে দলে ভিড়িয়েছিল লিভারপুল, সে কিভাবে লিভারপুলের অন্যতম সেরা অধিনায়ক হয়ে যেতে পারে এরই মধ্যে?

জেরার্ডের পর লিভারপুলের আর্মব্যান্ড উঠবে এই পোড়-খাওয়া হেন্ডারসনের হাতেই
জেরার্ডের পর লিভারপুলের আর্মব্যান্ড উঠবে এই পোড়-খাওয়া হেন্ডারসনের হাতেই

পরিসংখ্যান কিন্তু তাই বলে। যদিও কথিত আছে, “মিথ্যা তিন প্রকার : মিথ্যা, ডাঁহা মিথ্যা ও পরিসংখ্যান”, তাও একেবারেই ফেলে দেওয়া যায় না তথ্যটা। এই মৌসুমে জেরার্ডের অনুপস্থিতিতে এরই মধ্যে ১২ বার লিভারপুলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন হেন্ডারসন, যার মধ্যে নয়টি জয়সহ লিভারপুল ড্র করেছে তিনটি ম্যাচে, হারেনি একটিতেও!

আপাতদৃষ্টিতে ভারপ্রাপ্ত অধিনায়কত্বের অ্যাসিড টেস্টে পাশ করে গেলেও আসল প্রশ্ন কিন্তু সেটা না। আসল প্রশ্ন হল স্টিভেন জেরার্ড-নামক যে বটবৃক্ষ লিভারপুলকে গত প্রায় ১৬ বছর ধরে দিয়ে আসছে নির্ভরতার ছায়া, তাঁর পাকাপাকিভাবে লস অ্যাঞ্জেলস এ চলে যাওয়ার পর হেন্ডারসন কি পারবেন সফলভাবে তাঁর শূণ্যতা পূরণ করতে?

hi-res-610c391fd714feeb9bc15595bce2f608_crop_north

তাঁর আগে একটু ফ্ল্যাশব্যাকে যাওয়া যাক। ২০১১ সালে স্যান্ডারল্যান্ডের ঘরের ছেলে হেন্ডারসনকে দলে নেওয়ার জন্য তৎকালীন লিভারপুল ম্যানেজার ‘কিং’ কেনি ডালগ্লিশ যখন ২০ মিলিয়ন পাউন্ড খরচ করলেন, সবচে আশাবাদী লিভারপুল সমর্থকটিও তাঁদের এই নতুন খেলোয়াড় সম্বন্ধে মনেহয়না বেশী আশাবাদী ছিলেন।

স্যান্ডারল্যান্ড থেকে ২০ মিলিয়ন পাউন্ডের বিনিময়ে লিভারপুলে নাম লেখান হেন্ডারসন
স্যান্ডারল্যান্ড থেকে ২০ মিলিয়ন পাউন্ডের বিনিময়ে লিভারপুলে নাম লেখান হেন্ডারসন

আর তখন সেরকম কোন লিভারপুল সাপোর্টারও বোধকরি চাননি হেন্ডারসনের মত কেউ ক্লাবে আসুক, তাও আবার ২০ মিলিয়ন পাউন্ডের মত বিশাল প্রাইস-ট্যাগ গায়ে লাগিয়ে। হেন্ডারসনকে না চাওয়াটাও তখন অস্বাভাবিক কিছু ছিল না। কারণ লিভারপুলের সমর্থকরা তখন চেয়ে চেয়ে দেখছিলেন প্রায় বলতে গেলে একই দামে বা সামান্য বেশী দামে প্রতিপক্ষ চেলসি কিনে নিচ্ছে হুয়ান মাতার মত প্রতিভাকে, সামির নাসরির মত সুপারস্টার চলে যাচ্ছেন ম্যানচেস্টার সিটিতে, প্রায় অর্ধেকেরও কম দামে বরুশিয়া ডর্টমুন্ড থেকে রিয়াল মাদ্রিদে পাড়ি জমিয়েছেন নুরি সাহিন, আর্সেনাল থেকে সেস ফ্যাব্রিগাস চলে গেছেন বার্সেলোনাতে।

হুয়ান মাতার মত খেলোয়াড় যেখানে প্রায় একই দামে চেলসিতে যাচ্ছিলেন, সেখানে হেন্ডারসনের আসাটা লিভারপুলের সমর্থকেরা অতটা ভালোভাবে মেনে নিতে পারেননি প্রথমে...
হুয়ান মাতার মত খেলোয়াড় যেখানে প্রায় একই দামে চেলসিতে যাচ্ছিলেন, সেখানে হেন্ডারসনের আসাটা লিভারপুলের সমর্থকেরা অতটা ভালোভাবে মেনে নিতে পারেননি প্রথমে…

তাই এসব বড় বড় নামের পাশে তখন জর্ডান হেন্ডারসন এর নামটা একরকম বেমানানই ছিল। মূলত একজন সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার হলেও একাধিক পজিশানে খেলার ক্ষমতা থাকার সাথে ইংলিশ মার্কেটের হাইপ ও মুল্যস্ফীতি যোগ হয়েই হেন্ডারসনের দাম একরকম অকল্পনীয়ই ছিল তখনকার সময়ে।

লিভারপুলে আসার পর...
লিভারপুলে আসার পর…

article-2001741-0C7DBB2A00000578-609_634x545

লিভারপুলের হয়ে নিজের তৃতীয় ম্যাচেই বোল্টন ওয়ান্ডারার্সের বিপক্ষে গোলের খাতা খোলা হেন্ডারসনের প্রথম বছরটা ভালো কাটেনি একেবারেই। কোচ কেনি ডালগ্লিশের পুনঃপুনঃ এক্সপেরিমেন্টের শিকার হয়ে ৪-৪-২ ফর্মেশানে হেন্ডারসনকে প্রায়ই খেলতে হত রাইট মিডফিল্ডার হিসেবে, নিজের স্বাভাবিক পজিশান সেন্ট্রাল মিডফিল্ডে নয়। কারণ লিভারপুলে তখন সেন্ট্রাল মিডফিল্ডারদের সমাবেশ, অধিনায়ক স্টিভেন জেরার্ড থেকে শুরু করে হেন্ডারসনের সাথে একই ট্রান্সফার উইন্ডো তে ব্ল্যাকপুল থেকে লিভারপুলে আসা চার্লি অ্যাডাম, আগের মৌসুমে চার্লটন অ্যাথলেটিক থেকে আসা জনজো শেলভি, ব্রাজিলিয়ান মিডফিল্ডার লুকাস লেইভা, ক্লাব অ্যাকাডেমির উদীয়মান তরুণ জেয় স্পিয়ারিং – হেন্ডারসনের তাই সেন্ট্রাল মিডফিল্ডে জায়গা পাওয়াটা একরকম অসম্ভবই ছিল।

লিভারপুলের হয়ে প্রথম গোল করার পর...
লিভারপুলের হয়ে প্রথম গোল করার পর…

এমন না যে হেন্ডারসন আগে কখনো রাইট মিডফিল্ডে খেলেননি, স্যান্ডারল্যান্ডেও খেলেছেন রাইট মিডফিল্ডে, কিন্তু অবশ্যই লিভারপুলের একটা খেলোয়াড়ের উপর প্রত্যাশাটা স্যান্ডারল্যান্ডের একটা খেলোয়াড়ের মত হবে না। মাত্র লিভারপুলে এসেছেন, বয়সও কম, হেন্ডারসনের অবস্থাটা অনেকটা ছিল “জ্যাক অফ অল ট্রেইডস, মাস্টার অফ নান” এর মত। হ্যাঁ, এমন নয় যে তিনি রাইট মিডফিল্ডার হিসেবে একেবারেই খেলতে পারতেন না, কিন্তু সেটা লিভারপুল সমর্থকদের উচ্চাশা পূরণ করতে পারত না, ‘মিড’ বা ‘লোয়ার’ টেবিল ক্লাবের জন্য তাঁর তখনকার খেলাটা ছিল উপযুক্ত। তার উপর মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে ছিল পিঠে ‘বিক্রম-বেতাল’ এর সেই বেতালের মত ২০ মিলিয়ন পাউন্ডের প্রাইস-ট্যাগ। ফলে লিভারপুল সমর্থকরা বলতে গেলে তাঁর কাছে প্রতি ম্যাচেই ম্যাচজয়ী পারফর্মেন্স চাইতেন। অবশ্য সমর্থকদের দোষও দেওয়া চলে না, আপনি যখন কোন ফুটবলারের পিছনে ২০ মিলিয়ন পাউন্ড ঢালবেন, তখন অবশ্যই আপনি প্রতি ম্যাচে তাঁর কাছ থেকে ম্যাচজয়ী পারফর্মেন্সই চাইবেন!

হেন্ডারসনকে ক্রমাগত আউট অফ পজিশানে খেলিয়ে সমালোচিত হয়েছিলেন তৎকালীন কোচ কেনি ডালগ্লিশও
হেন্ডারসনকে ক্রমাগত আউট অফ পজিশানে খেলিয়ে সমালোচিত হয়েছিলেন তৎকালীন কোচ কেনি ডালগ্লিশও

ফলে দলে হেন্ডারসন এর অবস্থানটা মোটামুটি অচ্ছুতই থেকে গেল। শুরু হল বেঞ্চে বসে থাকার দিন। তাঁর সাথে আরেক ইংলিশ মিডফিল্ডার স্টুয়ার্ট ডাউনিংও খেলছিলেন জঘন্য, যাকে হেন্ডারসনের সাথেই দলে এনেছিল লিভারপুল – মোটামুটি একই দাম দিয়ে। তাই এই হেন্ডারসন-ডাউনিং, আর তাঁর ঠিক আগের ট্রান্সফার উইন্ডোর আরেক ফ্লপ সাইনিং অ্যান্ডি ক্যারল – এই তিন জন মিলিয়ে লিভারপুলের ট্র্যান্সফার পলিসিকেই ফেলে দিয়েছিলেন প্রশ্নের মুখে। সমর্থকেরাও চাচ্ছিলেন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এই তিনজনের হাত থেকে নিষ্কৃতি পেতে।

হেন্ডারসন-ক্যারল-ডাউনিং ; লিভারপুলের ট্রান্সফার কমিটিই পড়ে গিয়েছিল প্রশ্নের মুখে
হেন্ডারসন-ক্যারল-ডাউনিং ; লিভারপুলের ট্রান্সফার কমিটিই পড়ে গিয়েছিল প্রশ্নের মুখে

দুঃস্বপ্নের প্রথম মৌসুম শেষে কোচ কেনি ডালগ্লিশ দলের দায়িত্ব ছেড়ে দিলে দলের ম্যানেজার হিসেবে আসেন বর্তমান ম্যানেজার ব্রেন্ডান রজার্স। বলা বাহুল্য, প্রথমদিকে হেন্ডারসন এই রজার্সেরও খুব প্রিয়পাত্র কেউ ছিলেন না, ২০১১-১২ গ্রীষ্মকালীন ট্রান্সফার উইন্ডোতে ফুলহ্যামের হয়ে দুর্দান্ত খেলা অ্যামেরিকান মিডফিল্ডার ক্লিন্ট ডেম্পসি ও রজার্সের সাবেক শিষ্য সোয়ানসিতে খেলা আইসল্যান্ডের মিডফিল্ডার গিলফি সিগার্ডসনকে দলে নেওয়ার জন্য লিভারপুল কোমর বেঁধে নামে, ফলে দলে জর্ডান হেন্ডারসনের জায়গা ক্রমশঃ প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। ঐবছর গ্রীষ্মকালীন দলবদলের শেষদিনে লিভারপুল স্টোক সিটির কাছে বিক্রি করে দেয় চার্লি অ্যাডামকে, জর্ডান হেন্ডারসনকেও ফুলহ্যামের কাছে বিক্রি করে দেওয়ার জন্য জোর চেষ্টা চালায়। হেন্ডারসনকে দিয়ে ফুলহ্যাম থেকে ক্লিন্ট ডেম্পসিকে নিয়ে আসবে লিভারপুল, পরিকল্পনা ছিল অনেকটা এমনটাই।

শেষমুহূর্তে ক্লিন্ট ডেম্পসি লিভারপুলে নাম না লিখিয়ে টটেনহ্যাম হটস্পারে চলে গেলে সেটা একরকম শাপে বরই হয় হেন্ডারসনের জন্য!
শেষমুহূর্তে ক্লিন্ট ডেম্পসি লিভারপুলে নাম না লিখিয়ে টটেনহ্যাম হটস্পারে চলে গেলে সেটা একরকম শাপে বরই হয় হেন্ডারসনের জন্য!

কিন্তু বেঁকে বসেন হেন্ডারসন নিজে, লিভারপুলে থেকে নিজেকে প্রমাণ করার সিদ্ধান্ত নেন তিনি, সিদ্ধান্ত নেন কোচ ব্রেন্ডান রজার্সকে ভুল প্রমাণিত করার। হেন্ডারসনের ঘুরে দাঁড়ানো শুরু মূলত সেখান থেকেই।

এরপর আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি হেন্ডারসনকে। সমালোচনা শুনে শুনে ঋদ্ধ হয়েছেন নিজে, নিজেকে করে তুলেছেন আরও শাণিত। গত মৌসুমে প্রিমিয়ার লিগে লিভারপুলের দ্বিতীয় হয়ে দীর্ঘ পাঁচ বছর পর চ্যাম্পিয়নস লিগে জায়গা করে নেওয়ার পিছে সেন্ট্রাল মিডফিল্ডে অধিনায়ক সহ-অধিনায়ক জেরার্ড-হেন্ডারসনের ভূমিকা ছিল একরকম সর্বাধিক, সুয়ারেজ-স্টারিজের গোলগুলোর পাশাপাশি। এখানে একটা কথা না বললেই নয়, ২০১৩-১৪ মৌসুমে টটেনহ্যামের মাঠে গিয়ে তাদের ৫-০ গোলে বিধ্বস্ত করে আসে লিভারপুল, সে ম্যাচে খেলেননি জেরার্ড, হেন্ডারসনের উপর দায়িত্ব এসে বর্তায় সেন্ট্রাল মিডফিল্ডে থেকে টটেনহ্যামের পাওলিনিও-ডেম্বেলে-এরিকসেনদের আটকানোর।

টটেনহ্যামের বিপক্ষে সেই ম্যাচে গোল করার পর জর্ডান হেন্ডারসন...
টটেনহ্যামের বিপক্ষে সেই ম্যাচে গোল করার পর জর্ডান হেন্ডারসন…

প্রত্যাশার চেয়েও ভালো খেলেন হেন্ডারসন। নিজেকে প্রমাণ করেন লিভারপুল মাঝমাঠের ইঞ্জিনরুম হিসেবে – যার প্রাণশক্তি অফুরন্ত, প্রতিপক্ষের পা থেকে বল কেড়ে না নেওয়া পর্যন্ত যার বিরাম নেই। সেটাই ছিল হেন্ডারসনের ক্যারিয়ারের টার্নিং পয়েন্ট।

এরপর থেকে হেন্ডারসনের খেলার ইউএসপি-ই অনেকটা হয়ে গেছে এইরকম, মিডফিল্ডকে ভরিয়ে দেবেন প্রাণপ্রাচুর্য ও শক্তিতে, অনেকটা ম্যানচেস্টার সিটির হয়ে ইয়ায়া ট্যুরে কিংবা জুভেন্টাসের হয়ে আর্তুরো ভিদাল যেরকম করেন।

BR
ইয়ায়া ট্যুরে
আর্তুরো ভিদাল
আর্তুরো ভিদাল

লিভারপুলের সফল গত মৌসুমে কোচ ব্রেন্ডান রজার্স জেরার্ডকে খেলিয়েছিলেন ডিপ-লায়িং প্লেমেকার (Deep-lying Playmaker) হিসেবে, জেরার্ডের অসাধারণ পাসিং এর কার্যকারিতাকে সম্পূর্ণরূপে পাওয়ার জন্য, জুভেন্টাস-ইতালির হয়ে যে পজিশানে খেলেন আন্দ্রেয়া পিরলো, বার্সার হয়ে জাভি ও রিয়াল-স্পেন-বায়ার্নের হয়ে জাবি আলোনসো। এই পজিশানে খেলার জন্য পাশে একজনকে থাকা লাগে যে কিনা অবিরত তাঁকে “ডিফেন্সিভ শিল্ড” হিসেবে রক্ষা করে যাবে যাতে তিনি পাস ও থ্রু-বলের মাধ্যমে পুরো দলের খেলাকে মাঝমাঠ থেকেই নিয়ন্ত্রণ করবেন। জুভেন্টাসে পিরলোকে এই শিল্ড দেন আর্তুরো ভিদাল, ইতালিতে দেন ড্যানিয়েলে ডি রসি, রিয়ালে থাকার সময় জাবি আলোনসোকে ডিফেন্সিভলি এভাবে রক্ষা করতেন স্যামি খেদিরা।

JS53648917

লিভারপুলে থেকে এই ভূমিকাটাকে খুব ভালোভাবে রপ্ত করেছেন জর্ডান হেন্ডারসন। হয়তবা ট্যুরে-ভিদালদের সাথে এখনই তুলনায় যাওয়াটা বাতুলতা শোনাতে পারে, কিন্তু কার্যকারিতার দিক দিয়ে ভিদাল-ট্যুরে-ডি রসি দের থেকে কোন অংশে কম নন সমর্থকদের আদরের এই ‘হেন্ডো’। বক্স-টু-বক্স নিরন্তর দৌড়িয়ে পুরো খেলার ‘টেম্পো’ ধরে রাখাও হেন্ডারসনের খেলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক।

গত মৌসুমে লিভারপুলের সাফল্যের অন্যতম প্রধান কারণ ছিল মাঝমাঠে অধিনায়ক ও সহ-অধিনায়কের জুটি
গত মৌসুমে লিভারপুলের সাফল্যের অন্যতম প্রধান কারণ ছিল মাঝমাঠে অধিনায়ক ও সহ-অধিনায়কের জুটি

হেন্ডারসনের অন্যতম প্রধান একটি গুণ হল তাঁর ক্রমাগত শিখতে চাওয়ার, শিখার প্রবণতা। কোচ রজার্স ত আদর করে বলেই দিয়েছেন, “অনুশীলন করানোর জন্য হেন্ডারসন একজন আদর্শ ছেলে”, এই শিখতে চাওয়ার অভ্যাসের জন্যই লিভারপুলে তাঁর মোটামুটি চার বছরের ক্যারিয়ারে ইতোমধ্যেই খেলে ফেলেছেন সেন্ট্রাল মিডফিল্ড, ডিফেন্সিভ মিডফিল্ড, রাইটব্যাক, রাইট উইং, রাইট উইংব্যাক, সেন্ট্রাল অ্যাটাকিং মিড অঞ্চলে।

bleacherreport

গত মৌসুমের শেষদিকে, যে মৌসুমে ২৩ বছর পর লিগ শিরোপা জিততে জিততে শেষপর্যন্ত জিততে পারেনি লিভারপুল, অনেক লিভারপুল সমর্থক এখনো মনে করেন ম্যানচেস্টার সিটির বিরুদ্ধে হেন্ডারসন লাল কার্ড না দেখলে মৌসুমের শেষ তিন ম্যাচের দুইম্যাচ খেলতে পারতেন তিনি (চেলসি ও ক্রিস্টাল প্যালেসের বিপক্ষে), খেলতে পারেননি বিধায় সেইখানেই স্বপ্নসমাধি ঘটেছে লিভারপুলের। লিভারপুল হেরে বসে ঐ দুই ম্যাচেই।

গত মৌসুমের টার্নিং পয়েন্ট?
গত মৌসুমের টার্নিং পয়েন্ট?

নিজের সর্বশেষ প্রকাশিত আত্মজীবনীতে লিভারপুলের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের কোচ স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসন হেন্ডারসন সম্পর্কে মতামত দিয়েছিলেন এই বলে যে, “হেন্ডারসন ত হাঁটু দিয়ে দৌড়ায়, এভাবে খেলতে থাকলে অতি শীঘ্রই ও বড় কোন সমস্যায় পড়বে”, মজার ব্যাপার হল যে হেন্ডারসনকে নিয়ে ফার্গুসনের এই বিষেদ্গার, চার বছর আগে এই হেন্ডারসনকে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে আনার জন্য কম কাঠখড় পোড়াননি ফার্গুসন! ঠিক যেমনটা লিভারপুলের অধিনায়ক স্টিভেন জেরার্ড সম্বন্ধে তিনি লিখেছেন, “জেরার্ড টপ, টপ লেভেলের খেলোয়াড় নয়”, দেজাভ্যু হল নিজের আগের আত্মজীবনীতেই ফার্গুসন স্বীকার করেছিলেন চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী হলেও তিনি স্টিভেন জেরার্ডকে নিজের দলে চেয়েছিলেন!

hi-res-185559244-sir-alex-ferguson-poses-during-a-press-conference-ahead_crop_north

এবার আসা যাক লিভারপুলের বর্তমান অধিনায়ক স্টিভেন জেরার্ডের সাথে তুলনায় ভবিষ্যত অধিনায়ক জর্ডান হেন্ডারসনের অবস্থান কোথায়। এটা কোনধরণের বলার অপেক্ষাই রাখে না পরিশ্রম ও অধ্যবসায়ের পাশাপাশি জেরার্ডের যেটা ছিল সেটা হল তাঁর অকল্পনীয় ‘ন্যাচারাল ট্যালেন্ট’। যে প্রতিভা তাঁকে দিয়েছে তাঁর নিজ জেনারেশানের শ্রেষ্টতম ইংলিশ মিডফিল্ডারের তকমা – বেকহ্যাম স্কোলস ল্যাম্পার্ড এর পাশাপাশি। এটা ঠিক, বেকহ্যাম-স্কোলসদের মত জেরার্ড হয়ত অত ব্যক্তিগত-দলগত পুরষ্কারে ভূষিত নন, কিন্তু টানা ষোলটা বছর ধরে একরকম বলতে গেলে লিভারপুলের মত দলকে নিজের একার কাঁধে বয়ে নিয়ে চলেছেন তিনি, যেদিক থেকে স্কোলস বেকহ্যাম ল্যাম্পার্ড রা বেশ পিছিয়েই বলা যায়। জর্ডান হেন্ডারসনের হয়ত জেরার্ডের মত সেরকম যুগান্তকারী প্রতিভা নেই, কিন্তু তাঁর দিনরাত টানা পরিশ্রম করার যে ক্ষমতা, প্রতিনিয়ত শেখার যে আগ্রহ – যে আগ্রহটা তাঁকে লিভারপুল ত্যাগের মুখ থেকে আজ লিভারপুলের অধিনায়ক হবার পথে নিয়ে এসেছে, সে অধ্যবসায় যে অর্জনের দিক দিয়ে জেরার্ডকে ছুঁয়ে ফেলবেনা, তা বলার আগে বেশ ভালোমত ভাবতেই হবে।

হেন্ডারসন কি পারবেন জেরার্ডের মত প্রভাব বিস্তার করতে?
হেন্ডারসন কি পারবেন জেরার্ডের মত প্রভাব বিস্তার করতে?

image-23-for-steven-gerrard-s-liverpool-fc-career-in-pictures-gallery-901736175 image-27-for-steven-gerrard-s-liverpool-fc-career-in-pictures-gallery-233152082 image-39-for-steven-gerrard-s-liverpool-fc-career-in-pictures-gallery-584832667

জেরার্ডের মত মাঠে অধিনায়কের ইম্প্রেশান আনার জন্য হেন্ডারসন যে অবিরাম খেটে যাচ্ছেন, তাঁর প্রমাণ পাওয়া যায় এই মৌসুমে হেন্ডারসনের ম্যাচগুলো দেখলে। দুইদিন আগে লিগে ম্যানচেস্টার সিটির সাথে লিভারপুলের ম্যাচটার কথাই চিন্তা করুন। জেরার্ড খেলেননি সেদিন। ডিবক্সের বাইরে থেকে ডান পায়ের জোরালো শটে লং রেইঞ্জে হেন্ডারসন যে গোলটা দিলেন, টিভিসেটের সামনে বা মাঠে থাকা দর্শকরা চোখ কচলাতে বাধ্য হয়েছেন এটা জানার জন্য যে গোলটা কি আদৌ হেন্ডারসনের ছিল, না জেরার্ডের!

সিটির বিপক্ষে গোলের পর জর্ডান হেন্ডারসন
সিটির বিপক্ষে গোলের পর জর্ডান হেন্ডারসন

সবশেষে বলা যায়, স্টিভেন জেরার্ডের মত প্রকৃতিপ্রদত্ত প্রতিভা হয়ত নেই হেন্ডারসনের, জেরার্ডের মত নিয়মিত গোলের দেখাও হয়ত পাননা তিনি, কিন্তু ম্যাচের বিভিন্ন পরিস্থিতিতে বিভিন্ন গেইমপ্ল্যানের সাথে নিজেকে খাপ খাওয়ানোর যে প্রবণতাটা হেন্ডারসনের মধ্যে আছে, সেটাই তাঁকে লিভারপুলের অধিনায়ক হিসেবে অনন্য করে তুলবে একদিন। হয়ত তিনি লিভারপুলের পরবর্তী জেরার্ড হবেননা কখনই, যেটা কারোর পক্ষেই হওয়া কার্যত অসম্ভব – তিনি হবেন লিভারপুলের প্রথম ও একমাত্র হেন্ডারসন।

মাঠে হেন্ডোর বকাবকির শিকার হতে হয় অনেককেই, বাদ যান না জেরার্ডও!
মাঠে হেন্ডোর বকাবকির শিকার হতে হয় অনেককেই, বাদ যান না জেরার্ডও!

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

10 + 2 =