জন ড্রিউ : বিস্মৃত জোড়া গল্পের তালাশ

জন ড্রিউ : বিস্মৃত জোড়া গল্পের তালাশ
দিন-তারিখ খেয়াল নেই। প্রশ্নটা কেটে যাওয়া ঘুড়ির মতোই বহুদিন ধরে পাক খাচ্ছিল জন ড্রিউয়ের গহন মনের অন্দরে— প্রথম ক্রিকেট ম্যাচ দেখেছি কবে? মা-বাবা জানালেন, কেন্টে থাকাকালে এক ম্যাচে মুখোমুখি হয়েছিল দুই প্রতিবেশী গ্রাম। সেটাই ছিল জন ড্রিউয়ের দেখা প্রথম ক্রিকেট ম্যাচ। কিন্তু মাথার ওপর ব্রিটিশ রয়্যাল এয়ারফোর্স ও জার্মান এয়ারক্রাফট ডগফাইটে মত্ত থাকায় নিষ্ফলা থেকে যায় সে ম্যাচ। ‘ব্যাটল অব ব্রিটেন’-এর পাল্লায় পড়ে ফলাফল প্রসবের আগেই হারিয়ে যায় জন ড্রিউয়ের সেই প্রথম ক্রিকেট প্রেমের স্মৃতি। পরবর্তীতে পড়াশোনার জন্য তাকে চলে আসতে হয় গুজরাটে। সেখানে আরও চাগিয়ে ওঠে তার, ক্রিকেটের ইতিহাস খোঁড়াখুঁড়ির নেশা। বরোদায় কলেজের ছাত্র থাকাকালিন একদিন এক শিক্ষকের কাছ থেকে জন ড্রিউ জানতে পারেন, ভারতের মাটিতে প্রথম ক্রিকেট ম্যাচটা অনুষ্ঠিত হয়েছিল আরব সাগরের কোলঘেঁষা শহর— সুরাটে !
 
খেলাটাকে ভীষণ ভালোবাসেন জন ড্রিউ। কিন্তু তার ভালোবাসায় ‘সতীন’ হয়ে দাঁড়ায় চোখের ক্ষীণদৃষ্টি! বল ঠিকমতো দেখতে পেতেন না। ব্যাট হাতে ফরোয়ার্ড পাঞ্চই ছিল ক্রিকেটের প্রতি জন ড্রিউয়ের ভালোবাসার সর্বোচ্চ নৈবেদ্য। যখন দেখলেন, খেলার মাধ্যমে ক্রিকেটকে রপ্ত করা সম্ভব নয়, তখন থেকেই হাতে কলম তুলে নেন জন ড্রিউ। আসলে জন ড্রিউ হচ্ছেন সেই সব মানুষের একজন, যারা শৈশবেই নিজের জীবনের গতিপথটা আঁচ করতে পারেন। অল্প বয়সে জীবন নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা কম চালাননি। কিন্তু ব্যাটে-বলে না হওয়ায় সেই পুরনো প্রবাদটা আঁকড়ে ধরে বাঁচার সিদ্ধান্ত নেন— ‘যারা পারে তারা করে দেখায়; যারা পারে না, তারা লেখালেখি করে!’
 
জন ড্রিউ জানেন, ক্রিকেটে গল্পের অভাব নেই। একই গল্পের অনেক মোড়ক। নানা আঙ্গিকে উপস্থাপন হয়ে থাকে। এর মধ্যে কিছু গল্প বেঁচে থাকে মানুষের মুখে মুখে। বাকিগুলো মিথ। সাহিত্য ও ইতিহাসে ভালো দখল ছিল। ক্লাসের বইয়ের থেকেও শার্লক হোমস তাকে বেশি করে টানত। শরীরের ভেতর অনুসন্ধানী মনটা সার্বক্ষণিক প্রশ্ন করে চলত— কেন্টের সেই দুই গ্রামের মধ্যকার ম্যাচটা জার্মান বিমান বাহিনী পণ্ড করে দেয়ার পর কী ঘটেছিল? ভারতের প্রথম ক্রিকেট ম্যাচটাইবা কোথায় অনুষ্ঠিত হয়েছিল? মুখোমুখি হয়েছিল কোন দুটি দল?
 
১৯৪০, কেন্ট। ডারেন্ট ভ্যালিতে শোরহ্যামের মুখোমুখি হয়েছিল ফার্নিংহ্যাম— শৈশবে নিজের প্রথম দেখা ক্রিকেট ম্যাচটি সম্পর্কে অনুসন্ধানের শুরুতে এতটুকু তথ্যই জানতে পারেন জন ড্রিউ। সে ম্যাচটায় যারা অংশ নিয়েছিলেন, তাদের সবাই এখন মৃত। ৭৫ বছর পর এখন সে ম্যাচটাও তো মৃত— ভেবে নেন জন ড্রিউ।
 
অথচ কিছুদিন খোঁজ চালানোর পরই দেখা পান প্রথম সাফল্যের। খোঁজ মেলে সে ম্যাচের স্কোরকার্ডের! শোরহ্যামের একটি পানশালায় নিয়মিত যাতায়াত ছিল সামারফিল্ড নামে এক ক্রিকেট পরিবারের। ক্রিকেটের চারটি প্রজন্মকে ধারণ করছে তারা। টেলিফোন ডিরেক্টরি ঘেঁটে সামারফিল্ড পরিবারের খোঁজ বের করেন জন ড্রিউ। তাদের কাছে সযত্নে রক্ষিত ছিল ম্যাচটার স্কোরকার্ড। সবকিছুই আধুনিক! ম্যাচটা পণ্ড হওয়ার আগ পর্যন্ত ৮০/৫ রান নিয়ে ব্যাট করছিল ফার্নিংহ্যাম। দলটায় একজন খেলোয়াড় কম ছিল। আগের ইনিংসে ৯ উইকেটে ১০৬ রান তোলে শোরহ্যাম। বল-বাই-বল স্কোরিংয়ের পাশাপাশি বিমান হামলার কারণে ম্যাচটা পণ্ড হওয়ার বিবরণও লিপিবদ্ধ ছিল স্কোরকার্ডে। জন ড্রিউ স্কোরকার্ডটি আবিষ্কার করার পরের সপ্তাহে দেখা পান আরো বড় চমকের। তার এক কাজিন সংবাদপত্র ঘাঁটাঘাঁটি করে সে ম্যাচটার রিপোর্ট আবিষ্কার করে— ‘রেইড স্টপড প্লে’। প্রতিবেদনটি কার লেখা, তা উল্লেখ না থাকলেও জন ড্রিউ নিশ্চিত হন যে, ম্যাচ রিপোর্টটা তার প্রয়াত ক্রীড়া সাংবাদিক বাবার লেখা! ম্যাচ চলাকালে বিমান হামলার ব্যাপারে সবাইকে সতর্ক করতে কোনো সাইরেন বাজানো হয়নি। তখন ইংল্যান্ড দখলের চেষ্টায় মত্ত ছিল হিটলারের নািস বাহিনী। সেদিন ক্রিকেটের সুন্দর দিনটা তাই কলঙ্কিত হয়েছিল টেমস নদীর ওপর ৩০০ জার্মান বোমারু বিমানের অবিরত বোমা হামলায়। ম্যাচটায় কোনো ফলাফল না হলেও জন ড্রিউয়ের গ্রাম ফার্নিংহামকে হার মেনে নিতে হয়। ম্যাচ রিপোর্টে এ হারের পেছনে নািস বিমান বাহিনীর আক্রমণকে দুষেছিলেন জন ড্রিউয়ের বাবা।
 
১৯৪০ সালের একটা সামান্য ক্রিকেট ম্যাচ সম্পর্কে এখনো জানার উপায় আছে। পরিসংখ্যান, তথ্য-উপাত্ত, সংবাদপত্র— তার উৎস। কিন্তু ১৭২১ সালে অনুষ্ঠিত একটি ক্রিকেট ম্যাচ সম্পর্কে হাল আমলে জানার উপায় কী? স্কোরকার্ড, ম্যাচ রিপোর্ট, পরিসংখ্যান— এসব খুঁজে পাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না, কারণ তখন এসবের বালাই ছিল না। আর ম্যাচটা যেহেতু অনুষ্ঠিত হয়েছিল ভারতের মাটিতে, তাই কেউ পরিসংখ্যান রাখায় গা করবে না— এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু ভাগ্যদেবী প্রসন্ন ছিলেন জন ড্রিউয়ের প্রতি। সে সময়ের নাবিক ক্লেমেন্ত ডউনিংয়ের লেখা ‘এ হিস্টরি অফ দ্য ইন্ডিয়ান ওয়ারস’ বইয়ে ভারতবর্ষে ক্রিকেট খেলার ইঙ্গিত পান ড্রিউ। যদিও বইটা লেখা হয়েছিল সামরিক বিষয়াদি সম্পর্কে। মোগলদের সঙ্গে মারাঠাদের যুদ্ধ, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কৌশল নিয়ে লিখেছিলেন ডউনিং। বইটিতে তিনি জানান, গুজরাটে ক্যাম্বে উপসাগর অভিমুখে যাত্রা করেছিলেন তারা। কিন্তু প্রবল স্রোতের কারণে পথ ভুল হয় তাদের। ক্যাম্বে উপসাগরের আশপাশে একটা অজানা জায়গায় ১৫ দিনের জন্য আশ্রয় নেন তারা। সেখানে দুই দলে বিভক্ত হয়ে ক্রিকেট খেলেছিল ইস্ট ইন্ডিয়া নৌবহর। পরবর্তীতে জানা যায়, সে জায়গাটার নাম ছিল— চিনমাহ (এখন অস্তিত্ব নেই)। ক্যাম্বে উপসাগরের মূল বন্দর থেকে ৩০ মাইল দূরের একটি জায়গা। বইয়ে দুটি জায়গার উদাহরণ টানেন ডউনিং— কাপড় তৈরির জন্য তখনকার বিখ্যাত জম্বুসার পরগনা ও দাদর নদী-তীরবতী তানকারি বন্দর।
 
‘এমিলিয়া’ নামক জাহাজটির লেফটেন্যান্ট ছিলেন ডউনিং। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বাণিজ্য নৌকাগুলোকে স্থানীয় জলদস্যুদের হাত থেকে রক্ষা করতে পরবর্তীতে ‘হান্টার’ নামে আরো একটি জাহাজ পাঠায় ইংল্যান্ড। এমিলিয়ার সদস্য সংখ্যা ছিল ২০ জনের মতো। এদের মধ্যে শেতাঙ্গ মাত্র তিনজন। হান্টারের স্টাফ সংখ্যা ছিল সাকল্যে ৮০ জনের মতো। ডউনিং জানান, স্থানীয় কিছু মানুষ (প্রায় ২০ জন) ও ৪০ জনের মতো ইউরোপিয়ান মিলে সে ম্যাচটি খেলা হয়েছিল। এর পর ধীরে ধীরে দাদর নদীর তীরে ঘাঁটি গেড়ে বসে ক্রিকেট। কোম্পানির কাজে নিয়োজিত স্থানীয় কর্মকর্তা থেকে কর্মচারীদের সবাইকে তখন নিয়ম করে মাসে দুবার ক্রিকেট খেলতে হতো। তবে ডউনিং তার বইয়ে উল্লেখ করেননি, স্থানীয়দের সেই খেলাটা আসলে কিসের অংশ ছিল— ব্যায়াম নাকি বিনোদন? তবে বইয়ে এটা উল্লেখ করেছেন যে, ক্রিকেট খেলার জন্য তখন কোম্পানি কর্তৃক স্থানীয়দের নিয়মিত পারিশ্রমিক দেয়া হতো এবং মাঠের কোনো বাউন্ডারি ছিল না!
 
জন ড্রিউ যেখানে তার জীবনের প্রথম ক্রিকেট ম্যাচটা দেখেছিলেন, সে জায়গাটা ডার্টফোর্ট অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত— ডারেন্ট ভ্যালি। স্রোতস্বিনী ডারেন্ট নদী এখান থেকে টেমসে পতিত হওয়ার আগে ছুঁয়ে গেছে কেন্টের কোল। ১৭২০-২১ সাল নাগাদ ভারতীয় উপমহাদেশে অভিযাত্রার জন্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কর্তৃক কেন্টের এ অঞ্চল থেকেই ক্রু বাছাই করা হতো। তার পর দাদর নদী অভিমুখে যাত্রা করত কোম্পানির জাহাজ। এসব ভাবতে ভাবতে হঠাৎ করেই ভীষণ উত্তেজনা পেয়ে বসে জন ড্রিউকে। ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করলেও একটা অবিশ্বাস্য যোগসূত্রের সন্ধান পেয়ে যায় তার কবিসুলভ মন— ভারতবর্ষে যেসব ইংরেজ প্রথম ক্রিকেটের বীজ বপন করেছিলেন, তাদের শিকড় তো এ অঞ্চলেই প্রোথিত? ডারেন্ট নদী থেকে টেমস, আরব সাগর ও তার পর ভারত মহাসাগর— সেকালের নৌপথটি, দুটি ভিন্ন সভ্যতার মধ্যে ক্রিকেটের অদৃশ্য ‘ব্লাডলাইন’ হিসেবে ভেসে ওঠে জন ড্রিউয়ের মনের মানচিত্রে।
লেখক – মেহেদি হাসান

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

ten + 12 =