চীনে ফুটবল বিপ্লব

Img214825698

এতদিন বিশ্বখ্যাত ফুটবলারদের তীর্থক্ষেত্র হিসেবে ইংল্যান্ড, জার্মানি, ফ্রান্স, স্পেইন, ইতালির লিগগুলোকেই ভাবা হত, বিভিন্ন দলবদলের বাজারে অফুরন্ত টাকা উড়িয়ে এসব লিগের ক্লাবগুলোকেই দেখা যেত বিশ্বের সেরা সব ফুটবল প্রতিভাকে দলে ভেড়াতে। সাথে বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ডস, সুইজারল্যান্ড, ব্রাজিল কিংবা আর্জেন্টিনা – এসব দেশের লিগগুলোও কিন্তু কম বিখ্যাত নয়। কিংবা বয়স্ক ফুটবলারদের ক্যারিয়ার সায়াহ্নের লিগ হিসেবে কাতারি বা আমেরিকান এমএলএস – এসব লিগের নামও শোনা যায়।

এসব দেশের তালিকায় নাম লেখাতে এবার বেশ জোরেশোরেই ফুটবল বিশ্বে নিজেদের আগমনী বার্তা ঘোষণা করেছে বিশ্বের সবচেয়ে বেশী জনসংখ্যার দেশ – চীন। নিয়ে এসেছে তাদের চাইনিজ সুপার লিগ নিয়ে। অর্থের ঝনঝনানিতে এরই মধ্যে বিশ্বের শ্রেষ্ঠতম লীগগুলোর সাথে পাল্লা দিতে শুরু করেছে তারা।

চীনে বিশ্বের সবচেয়ে বেশী মানুষ বাস করে, অজানা নয় কারোরই। প্রায় প্রত্যেক বৈশ্বিক ক্রীড়ার প্রতিযোগিতায় চীনকে দেখা যায় পদক জয়ের তালিকায় শীর্ষ পাঁচের মধ্যে থাকতে। প্রতি বছর চীন থেকে বিভিন্ন খেলার কুশলী ও বিশ্বখ্যাত অনেক খেলোয়াড়- জিমন্যাস্ট, ডাইভার, টেনিস খেলোয়াড়, হার্ডলার, ব্যাডমিন্টন খেলোয়াড়, সাঁতারু বের হয়ে আসে। সে হিসাব করলে এক ফুটবলেই বরং চীনে পিছিয়ে ছিল এতদিন। বিশ্বের সেরা খেলোয়াড়ের সর্বোচ্চ আসর ফুটবল বিশ্বকাপে সর্বশেষ চীনকে দেখা গেছিল সেই ২০০২ সালে। সে আসরে কিছুই করতে পারেনি তারা, তারপর ত ফুটবলের কোন বড় আসরে তাদের দেখাই যায় না। অবস্থা পরিবর্তন করতে অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে এবার আঁটঘাট বেঁধেই নেমেছে তারা।

প্রেসিডেন্ট জি জিয়ানপিং ফুটবলের দারুণ ভক্ত, স্বাভাবিকভাবেই চাইবেন নিজের দেশের অভ্যন্তরীণ ফুটবল কাঠামো উন্নত করে দেশের জাতীয় দলকে শক্তিশালী করতে। দেশের অভ্যন্তরীণ ফুটবল কাঠামোর উন্নয়ন ঘটাতে সবচেয়ে বেশী প্রয়োজন দেশীয় লিগের উন্নয়ন। লিগে অফুরন্ত টাকা ঢেলে উন্নয়নের কাজে তাই পিছপা হচ্ছে না চাইনিজরা। যে টাকার লোভে মৌমাছির ঝাঁকের মত দলে দলে বিশ্বের নামীদামী অনেক খেলোয়াড় নাম লেখাচ্ছেন চাইনিজ বিভিন্ন ক্লাবে। বিশেষত ব্রাজিলিয়ানরা। মানসম্পন্ন খেলোয়াড়েরা ত বটেই, যদু-মধু অনেক খেলোয়াড়দেরকেও আকাশছোঁয়া অর্থের বিনিময়ে নিজেদের ক্লাবে ভেড়াচ্ছে চাইনিজ ক্লাবগুলো।

গতবছর প্রায় ১৩ মিলিয়ন পাউন্ডের বিনিময়ে ব্রাজিলের অ্যাটলেটিকো মিনেইরো থেকে চাইনিজ ক্লাব শানডং লুনেংয়ে যোগ দেওয়া ব্রাজিলিয়ান অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার ডিয়েগো তারদেইয়ি ঠিকই বলেছেন, ব্রাজিলে খেলা অনেক বেশী মানসম্পন্ন ও কম্পিটিটিভ হলেও, চীন ব্রাজিলের থেকে দিচ্ছে অনেক বেশী অর্থনৈতিক নিশ্চয়তা, যা ব্রাজিলের দরিদ্র ফুটবলারদের কাছে অনেকটা আকাশের চাঁদ হাতে পাওয়ার মতই।

২০১১ সালে নাম না জানা এক আর্জেন্টাইন অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার দারিও কনকা’র জন্য চাইনিজ ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বেশী টাকা ব্যয় করেছিল চাইনিজ ক্লাব গুয়াংঝু এভারগ্রান্ডে, প্রায় ৭ মিলিয়ন পাউন্ড। শুরুটা তখন থেকেই করে দিয়ে গিয়েছিলেন কনকা, পথ দেখিয়ে দিয়েছিলেন বিশ্বের ফুটবলারদের। সেই থেকে শুরু, মাঝে চীনে এসে খেলে গেছেন দিদিয়ের দ্রগবা, নিকোলাস আনেলকা, লুকাস ব্যারিওস, সেইডু কেইটা, এইডুর গুডইয়োনসেন, আলেসান্দ্রো ডিয়ামান্টির মত অনেক পরিচিত-অপরিচিত খেলোয়াড়। আর এবার ত আরো ভালো করে গা ঝাড়া দিয়ে উঠেছে চাইনিজ সুপার লিগ। ত দেখে নেওয়া যাক চীনের কোন কোন ক্লাব কাকে কাকে প্রলুব্ধ করতে পারল…

  •  গুয়াংঝু এভারগ্রান্ডে

চাইনিজ ক্লাবগুলোর মধ্যে এই গুয়াংঝু এভারগ্রান্ডেরই মনেহয় বহিঃর্বিশ্বের খেলোয়াড়দের প্রতি আগ্রহ সবচেয়ে বেশী। যে দারিও কনকার কথা বলা হল একটু আগে, এই দারিও কনকাকে কিনে চাইনিজ ফুটবলে বৈশ্বিক ছোঁয়া লাগানোর কাজটা কিন্তু শুরু করেছিল এই গুয়াংঝু এভারগ্রান্ডেই। এই গতকালকেই অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদের কলম্বিয়ান স্ট্রাইকার জ্যাকসন মার্টিনেজকে ৪২ মিলিয়ন ইউরোর বিনিময়ে কিনে হইচই ফেলে দিয়েছে তারা, যেটা কিনা কোন এশিয়ান ক্লাবের জন্য একটি বিশ্বরেকর্ড ট্রান্সফার ফি। তাছাড়া ক্লাবটিতে বর্তমানে আছেন আরো তিন ব্রাজিলিয়ান – ব্রাজিলের হয়ে কনফেডারেশানস কাপ জেতা টটেনহ্যাম হটস্পারের সাবেক সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার পাওলিনিও। ১৪ মিলিওন ইউরোর বিনিময়ে গতবছর চার বছরের চুক্তিতে এভারগ্রান্ডেতে নাম লিখিয়েছেন তিনি। ক্লাবে বর্তমানে আরও আছেন ব্রাজিলিয়ান স্ট্রাইকার অ্যালান কারভালহো ও ব্রাজিলের হয়ে একটি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলা অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার রিকার্ডো গৌলার্ত। তাঁদেরকেও আনা হয়েছে যথাক্রমে ১১ ও ১৫ মিলিয়ন ইউরোর বিনিময়ে। ক্লাবে আরও খেলে গেছেন বরুশিয়া ডর্টমুন্ডের হয়ে বুন্দেসলিগাজয়ী প্যারাগুইয়ান স্ট্রাইকার লুকাস ব্যারিওস, ইতালির হয়ে মাঠ মাতানো অ্যাটাকার রবার্তো জিলার্দিনো ও অ্যালেসসান্দ্রো ডিয়ামান্টি। খেলে গেছেন একসময়ে বিশ্বের অন্যতম সেরা স্ট্রাইকার রবিনিও-ও।

2A16035600000578-3143247-Chinese_club_Guangzhou_Evergrande_have_signed_Tottenham_midfield-a-25_1435587217258
ও ভালো কথা, শুধু খেলোয়াড়ই নয়, কোচ নির্বাচনের ক্ষেত্রেও গুয়াংঝুর বহিঃর্বিশ্ব-প্রীতি চোখে পড়ার মত। ২০১২ থেকে ২০১৪ পর্যন্ত এখানে কোচিং করিয়ে গেছেন ইতালির বিশ্বকাপজয়ী কোচ মার্সেলো লিপ্পি, তারপর কিছুদিন কোচ হিসেবে ছিলেন লিপ্পিরই শিষ্য, ব্যালন ডি’অর জয়ী ডিফেন্ডার ফ্যাবিও ক্যানাভারো। বর্তমানে গুয়াংঝুর কোচ ব্রাজিলের হয়ে ২০০২ বিশ্বকাপজয়ী কোচ লুইজ ফেলিপে স্কলারি।

jackson-martinez

  •  সাংহাই শেনহুয়া

গুয়াংঝু এভারগ্রান্ডের সাথেই এই ক্লাবের নাম করা যেতে পারে – বৈশ্বিক স্টারদের দলে ভেড়ানোর ক্ষেত্রে। খেলে গেছেন দিদিয়ের দ্রগবা, নিকলাস আনেলকাদের মত অনেক সুপারস্টারেরাই, আনেলকা ত আবার এককাঠি সরেস – কিছুদিন সাংহাইয়ের কোচের দায়িত্বও পালন করেছেন। বর্তমানে ক্লাবটিতে খেলছেন এভারটনের সাবেক অস্ট্রেলিয়ান কিংবদন্তী মিডফিল্ডার টিম ক্যাহিল, পোর্তো ও ইন্টারের সাবেক মিডফিল্ডার কলম্বিয়ান ফ্রেডি গুয়ারিন, চেলসি-নিউক্যাসল-ওয়েস্টহ্যামের সাবেক স্ট্রাইকার ডেম্বা বা, গ্রিক ডিফেন্ডার আভরাম পাপাদোপৌলোস। কোচভাগ্য খারাপ না সাংহাইয়েরও। বিভিন্ন সময়ে এখানে কোচিং করিয়ে গেছেন সাবেক আর্জেন্টাইন কোচ সার্জিও বাতিস্তা, ফুলহ্যামের সাবেক ফরাসী কোচ জ্যাঁ টিগানা।

Nicolas Anelka of Shanghai Shenhua photo01

  •  বেইজিং গুয়াং

তালিকার পরবর্তী নাম বেইজিং গুয়াংয়ের। এ বছর ব্রাজিলিয়ান লিগজয়ী করিন্থিয়ান্সের দল ফাঁকা করতে এই বেইজিং গুয়াংয়ের ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য, করিন্থিয়ানসকে লিগ জিতিয়েই টাকার লোভে চিনে পাড়ি জমিয়েছেন এই দলের রেনাতো অগাস্টো, র্যা লফ এর মত তারকা খেলোয়াড়েরা – সাথে গতবছরে দলে যোগ দেওয়া ব্রাজিলিয়ান ক্লেবার ত ছিলেনই। কোচ হিসেবে রয়েছেন ইতালিয়ান সিরি আ এর কিংবদন্তী কোচ আলবার্তো জাক্কেরনি।

  •  জিয়াংসু সুনিং

গুয়াংঝু, সাংহাই, বেইজিংদের সাথে পাল্লা দিয়ে এবার সমানে খরচ করেছে যে আরেকটি চাইনিজ ক্লাব – সেটা হল জিয়াংসু সুনিং। দুই ব্রাজিলিয়ান মিডফিল্ডার চেলসির রামিরেস ও শাখতারের অ্যালেক্স টিসেইরাকে কিনতে দুইবার ট্রান্সফার রেকর্ড ভেঙ্গেছে তারা, রামিরেসকে কিনতে খরচ করেছে ২৫ মিলিয়ন পাউন্ড, টিসেইরাতে এনেছে ৫০ মিলিয়ন ইউরো দিয়ে। আরেক ব্রাজিলিয়ান স্যামিরও এসেছেন এখানে।

  •  হেবেই চায়না ফরচুন

চীনের শীর্ষ বিভাগে এইবারই প্রথম খেলছে হেবেই চায়না, নিজেদের এই উপলক্ষ্যকে রাঙ্গাতে কার্পণ্য করছে না তারাও, আর্সেনাল ও রোমার সাবেক আইভোরিয়ান উইঙ্গার জার্ভিনিওকে দলে ভিড়িয়েছে ১৯ মিলিয়ন ইউরোর বিনিময়ে। মার্শেই, কুইন্স পার্ক রেইঞ্জার্স ও সেভিয়ার হয়ে খেলা ক্যামেরুনিয়ান অধিনায়ক স্টেফানে এমবিয়াকেও দলে নিয়েছে তারা, এসেছেন প্রিমিয়ার লিগে খেলা একসময়ের পরিচিত মুখ নেনাদ মিলিয়াসও।

Screen-Shot-2016-01-26-at-09.54.22

  •  শানডং লুনেং

আর্জেন্টিনার হয়ে কখনো নিজের প্রতিভার প্রতি সুবিচার না করতে পারা খেলোয়াড়দের তালিকা করলে দক্ষিণ আমেরিকার লিগগুলোর কিংবদন্তী ওয়াল্টার মান্টিলোর নাম থাকবে প্রথমদিকেই। ক্যারিয়ার সায়াহ্নে তিনিও চলে এসেছেন চীনের টানে। সাথে করিন্থিয়ান্সের লিগজয়ী আরেক ব্রাজিলিয়ান ডিফেন্ডার জিলও খেলছেন এখন এই শানডং লুনেংয়ে। আছেন আনঝি মাখাচকালা, আল জাজিরার সাবেক ব্রাজিলিয়ান ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার জুসিলেইও। আর সেই দিয়েগো তারদেইয়ি ত আছেনই এখানে। কোচ হিসেবে আছেন সাবেক ব্রাজিলিয়ান কোচ মানো মেনেজেস।

  •  সাংহাই এসআইপিজি

দারিও কনকার কথা বলে লেখাটা শুরু করেছিলাম, যার জন্যই মূলত চীনের এই বিপ্লবের কথা জানতে পেরেছিল পুরো বিশ্ব। সেই কনকাই এখন এভারগ্রান্ডে থেকে ফ্লুমিনেন্স হয়ে এখন খেলছেন সাংহাই এসআইপিজিতে। ২০১০ বিশ্বকাপে ঘানার সেই স্ট্রাইকার আসামোয়া জিয়ানের কথা মনে আছে? এখানে আছেন তিনিও। শুধু আছেন বললে ভুল হবে, স্যান্ডারল্যান্ডের সাবেক এই স্ট্রাইকার বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ বেতনভোগী খেলোয়াড় সেখানে। কোচের দায়িত্বে আছেন সাবেক ইংল্যান্ড ও ম্যানচেস্টার সিটি কোচ সভেন গোরান এরিকসন।

750x-1 Shanghai SIPG

এ ত গেল যারা চীনে খেলেছেন বা খেলছেন তাঁদের খবর। শীর্ষ ইউরোপীয় লিগগুলোতে শীতকালীন দলবদল ১-২ ফেব্রুয়ারিতে শেষ হয়ে গেলেও চীনে দলবদলের সময়সীমা শেষ হবে ২৬ তারিখে। ফলে আরও অনেক আন্তর্জাতিক তারকা যে চীনের পথে পাড়ি দেবেন তা আর বলার অপেক্ষা রাখেনা। এই কয়দিনে যারা চীনে পাড়ি জমাতে পারেন তারা হলেন –

রাদামেল ফ্যালকাও (স্ট্রাইকার, কলম্বিয়া, চেলসি)
ফার্নান্দো টরেস (স্ট্রাইকার, স্পেইন, অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদ)
পাপিস দেম্বা সিসে (স্ট্রাইকার, সেনেগাল, নিউক্যাসল ইউনাইটেড)
লুইজ আদ্রিয়ানো (স্ট্রাইকার, ব্রাজিল, এসি মিলান)
চেইক তিওতে (মিডফিল্ডার, আইভোরি কোস্ট, নিউক্যাসল ইউনাইটেড)
ইজেক্যুইয়েল লাভেজ্জি (ফরোয়ার্ড, আর্জেন্টিনা, প্যারিস সেইন্ট জার্মেই)
রোনালদিনিও (মিডফিল্ডার, ব্রাজিল)
সুলে আলি মুনতারি (মিডফিল্ডার, ঘানা)
হাল্ক (স্ট্রাইকার, ব্রাজিল, জেনিত সেইন্ট পিটসবার্গ)
ইয়ায়া ট্যুরে (মিডফিল্ডার, আইভোরি কোস্ট, ম্যানচেস্টার সিটি)
জন টেরি (ডিফেন্ডার, ইংল্যান্ড, চেলসি)
টমাস রসিচকি (মিডফিল্ডার, আর্সেনাল)

কিছুদিন পর আপনার ক্যাবল অপারেটর ইএসপিএন স্টার স্পোর্টস বাদ দিয়ে চাইনিজ কোন স্পোর্টস চ্যানেল দিয়ে দিলে অবাক হবেন না যেন!

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

three + twelve =