চরমতম অন্যায়ের শিকার তাসকিন

::::: মুস্তাফিজুর রহমান খান :::::

 

সাধারণত আমি কখনো আমার পেশাগত বিষয় সম্বন্ধে সেরকম কোন পোস্ট দিই না বা লিখি না, কিন্তু যেহেতু এই বিষয়টার সাথে তাসকিন ও টাইগার্স (বাংলাদেশ ক্রিকেট দল) যুক্ত আছে, আমার মনে হয় জিনিসগুলো সবারই জানা দরকার, আমি সবাইকে জানাতে দায়বদ্ধ।

 

তাসকিন আহমেদ ও আরাফাত সানি সানির ‘অবৈধ’ বোলিং অ্যাকশান সম্বন্ধে যখনই রিপোর্ট করা হল, সেটার প্রতিক্রিয়া কিরকম হওয়া উচিৎ সেটা সম্বন্ধে বিসিবির সাথে আমার আলোচনা হয়। প্রথমে ত আইসিসি তাসকিন ও সানির অ্যাকশান রিপোর্ট হবার সাথে সাথেই তাদের পরীক্ষা করাতে চাচ্ছিল তাদের অ্যাকশান বৈধ কি না সেটা জানার জন্য (অর্থাৎ ৯ মার্চ), আমিই বিসিবিকে একটা খসড়া প্রস্তাবনা তৈরিতে সাহায্য করি, যেখানে বলা হয়েছিল তাসকিন ও সানির বোলিং পরীক্ষা প্রিলিমিনারি বা কোয়ালিফাইং ম্যাচগুলো শেষ হবার পরেই যাতে করা হয়, যেটা কিনা যথেষ্টই আইসিসির নীতিসিদ্ধ একটা আবেদন ; এবং আইসিসি তখন আমাদের আবেদনে সাড়াও দেয়, কোয়ালিফাইং ম্যাচগুলোর পরে তাসকিন ও সানির বোলিং পরীক্ষা করানোর ব্যাপারে সম্মত হয় আইসিসি, ফলে আয়ারল্যান্ড ও ওমানের সাথে খেলতে পারে তাসকিন।

 

তাসকিনের ইন্ডিপেনডেন্ট অ্যাসেসমেন্ট রিপোর্ট আমি দেখেছি, যেটা কিনা বিসিবিই আমাকে দিয়েছে। বোলিং অ্যাকশান কোন ক্ষেত্রে অবৈধ হতে পারে সেই সংক্রান্ত আইসিসির নিয়মকানুনও আমি দেখেছি (ICC Regulations for the Review of Bowlers Reported with Suspected Illegal Bowling Actions), সাথে দেখেছি যেই ম্যাচে তাসকিনের বোলিং অ্যাকশান সম্বন্ধে ম্যাচ অফিসিয়াল সন্দেহ পোষণ করেছিলেন, সেই রিপোর্টটাও।

Know-Taskin-Ahm12065

আমি লক্ষ্য করলাম, মূল্যায়ন রিপোর্ট বা অ্যাসেসমেন্ট রিপোর্টে তাসকিনের ‘স্টক’ ও ‘ইয়র্কার’ বলগুলোকে অবৈধ বলা হয়নি। তাসকিনকে মোট ৯টা বাউন্সার বল করতে বলা হয়েছিল, সেই ৯টা বাউন্সারের মধ্যে তিনটা বাউন্সার আইসিসির কাছে অবৈধ বলে মনে হয়েছে। মনে হয়েছে ঐ তিনটা বাউন্সার তাসকিন অবৈধ বোলিং অ্যাকশানের সাহায্যে করেছে।

 

এখন শুরু হবে আসল কাহিনী।

 

আইসিসির রেগুলেশান ২.২.৬. তে স্পষ্ট উল্লেখ আছে বোলারের অ্যাকশান মূল্যায়ন পরীক্ষা চলার সময় (ইনডিপেন্ডেন্ট অ্যাসেসমেন্ট) বোলারকে ঠিক সেইসব বলই করতে বলা হবে যেই বল বা ডেলিভারিগুলোর জন্য তাঁকে রিপোর্ট করা হয়েছে ম্যাচ অফিসিয়াল দ্বারা। যে ম্যাচে তাসকিনের বোলিং অ্যাকশান রিপোর্ট করা হয়েছিল (নেদারল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচ), মজার ব্যাপার হচ্ছে সেই ম্যাচে তাসকিন একটাও বাউন্সার দেয়নি! একটাও না! সুতরাং বাউন্সার বল করার জন্য তাসকিনের অ্যাকশানকে সন্দেহজনক বলা যেতে পারে না। কারণ সে নেদারল্যান্ডের বিপক্ষে ঐ ম্যাচে কোন বাউন্সারই দেয়নি। আরও মজার ব্যাপার হচ্ছে, নেদারল্যান্ড ম্যাচের ম্যাচ অফিসিয়ালের রিপোর্টে কোন নির্দিষ্ট বলের বা ডেলিভারির অ্যাকশানকে সন্দেহজনক বলা হয়নি। শুধু বলা হয়েছে ”বোলিং অ্যাকশানের বৈধতা নিয়ে সন্দেহ (concerned with the legality of the action)”। সুতরাং এটা বলা যেতেই পারে, বাউন্সারের জন্য তাসকিনকে ধরা হয়নি।

210947.3

বোলিং মূল্যায়ন পরীক্ষার সময়ে তাসকিন কে ৯ টি বাউন্সার বল করতে বলা হয় বলে জানা যাচ্ছে। আইসিসি এর ষ্ট্যাণ্ডার্ড অ্যানালাইসিস প্রটোকল অনুযায়ী, তাসকিন কে কমপক্ষে ৬টি বাউন্সার বল পরীক্ষার জন্য করতে বলা যেতে পারে। কিন্তু আবার, আইসিসি এর রেগুলেশন ২.২.৬ অনুযায়ী,একজন বোলার কে ল্যাবে পরীক্ষা দেওয়ার সময়ে সেই সব ডেলিভারি গুলো কে হিসাবে নেওয়া যাবে না,যাদের নামে আম্পায়ার বা ম্যাচ রেফারী রিপোর্ট করেন নি। রেগুলেশন ২.২.৬, প্রটোকল এর চেয়ে প্রাধান্য পেয়ে থাকে প্রয়োগের সময়ে,প্রটোকল ব্যাপারটি শুধুমাত্র রেগুলেশন এর সম্পুরক হিসেবেই প্রয়োগ হয়। যেহেতু তাসকিন কে তার বাউন্সার বল গুলোর জন্য সন্দেহের আওতায় আনা হয় নি ( নেদারল্যান্ড ম্যাচ এ তাসকিন বাউন্সার ই দেন নি) , তাই নিয়ম অনুযায়ী তাসকিন কে তার ল্যাব এ করা বাউন্সার বল গুলোর জন্য সন্দেহের আওতায় আনা যাবে না ।

আবারও বলে রাখা ভালো যে, তাসকিনের ‘স্টক’ এবং ‘ইয়র্কার’ ডেলিভারিগুলোতে কোন ধরনের কোন সমস্যা খুঁজে পায়নি আইসিসি। এই দুই ধরণের ডেলিভারিই কিন্তু তাসকিন পুরো নেদারল্যান্ডস ম্যাচ জুড়ে করেছিল, যেই ম্যাচের জন্যই তাঁর বোলিং অ্যাকশানকে সন্দেহজনক বলা হয়েছে। সুতরাং এটা বলা যেতেই পারে যে উক্ত ম্যাচে তাসকিন অবৈধ অ্যাকশানে কোন বলই করেননি। অর্থাৎ আইসিসির অফিসিয়াল ভুল ছিলেন, তাদের রিপোর্টও ভুল ছিল। সুতরাং তাঁকে এই অজুহাতে নিষিদ্ধ করার কোন প্রশ্নই আসেনা। আইসিসির রেগুলেশান তৈরিই করা হয়েছে ম্যাচ চলাকালীন সময়ে কোন বোলার অবৈধ অ্যাকশানে বোলিং করল নাকি সেটা জানার জন্য, ল্যাব টেস্টে কোন বোলারের বলকে অবৈধ লাগলো নাকি সেটা জানার জন্য নয়! কিন্তু তাসকিনকে আপাতদৃষ্টিতে ল্যাবে করা বলের উপর ভিত্তি করেই নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

আরও কিছু বিষয় এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, তাসকিনকে মোট নয়টি বাউন্সার করতে বলা হয়েছিল পরীক্ষাগারে। নয়টি বাউন্সার। তাও মাত্র তিন মিনিটের মধ্যে। তিন মিনিটে নয়টি বাউন্সার ত কোন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ম্যাচেই করতে বলা হয়না, এবং ম্যাচের মধ্যে সে করবেও না। টি-টোয়েন্টিতে এক বোলারকে এক ওভারে মাত্র একটিই বাউন্সার করার অনুমতি দেওয়া হয়। রিপোর্টে বলা হয়েছে, এই নয়টি বাউন্সারের মধ্যে মাত্র তিনটি বাউন্সারের অ্যাকশান আইসিসির কাছে অবৈধ বলে মনে হয়েছে। যে তিনটি বাউন্সারের গতি আবার ঐ নয়টা বাউন্সারের মধ্যে সবচেয়ে কম ছিল। বলে রাখা ভালো, অতিরিক্ত কম সময়ের ব্যবধানে ঐসময় তাসকিনকে তিনটা আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলতে হয়েছে, ঐ ম্যাচগুলো খেলার জন্য ঐ সময়ের মধ্যেই নিয়মিত প্রস্তুতি নিতে হয়েছে, তাঁর উপর পথের যাত্রার ধকল ত ছিলই। ঢাকা-ধর্মশালা-চেন্নাই ; কম ত আর না!  স্বাভাবিকভাবেই তাসকিন ক্লান্ত ছিল। তাঁর উপর মাত্র তিন মিনিটের ব্যবধানে নয়-নয়টি বিশেষ বল (বাউন্সার) করতে গিয়ে ঐসময় তাঁর টেকনিকে খুঁত এসে পড়াটাও অস্বাভাবিক কিছু না।

Taskin-Ahmed

আইসিসির রেগুলেশান ২.১.১ অনুযায়ী, অভিযুক্ত বোলারের কোন কোন ধরণের ডেলিভারি সন্দেহজনক সেটা স্পষ্টভাবে ম্যাচ অফিসিয়ালকে উল্লেখ করতে হবে রিপোর্টে, কেন ম্যাচ অফিসিয়ালরা উক্ত ডেলিভারি সম্বন্ধে উদ্বিগ্ন, সেটা উল্লেখ করতে হবে। যেটা কিনা তাসকিনের ক্ষেত্রে উল্লেখ করা ছিল না। তাসকিনের ক্ষেত্রে কোন বিশেষ ডেলিভারির দিকে আঙ্গুল না তুলেই অনেকটা জেনারালাইজড করে বলা হয়েছে “concerned about the legality of the bowling action”, তাই এটা এখন বলা যেতেই পারে যে ম্যাচ অফিসিয়ালের রিপোর্টও আইসিসির রেগুলেশানের তথা নিয়মনীতির পরিপন্থী।

 

আবার, আইসিসির রেগুলেশান ২.২.১৩ অনুযায়ী কোন বোলারের মূল ডেলিভারি বা ‘স্টক’ ডেলিভারি যদি ঠিক থাকে বা বৈধ থাকে কিন্তু কোন বিশেষ ডেলিভারি যদি অবৈধ থাকে, তাহলে বোলারকে শুধুমাত্র ঐ বিশেষ ডেলিভারি না করার জন্য সতর্ক করে দেওয়া হয়, এবং বোলার আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বোলিং করে যেতে পারেন শুধুমাত্র ঐ বিশেষ ডেলিভারি না করে, অন্যান্য ডেলিভারিগুলো করতে পারেন নির্ঝঞ্ঝাটে । এই ক্ষেত্রে বোলারকে শুধুমাত্র ঐ বিশেষ ডেলিভারি না করার জন্য সতর্ক করে দেওয়া হয়, বোলারকে নিষিদ্ধ করা হয় না। সুতরাং, তাসকিনের যেহেতু মূল বা ‘স্টক’ ডেলিভারিতে কোন সমস্যা নেই, এবং তাঁর ৯টা বাউন্সারের মধ্যে মাত্র তিনটির অ্যাকশানে সমস্যা ধরা পড়েছে, সেহেতু তাসকিনকে সর্বোচ্চ সতর্ক করে দিতে পারে আইসিসি, নিষিদ্ধ নয়!

 

সুতরাং এটা বলা যেতে পারে যে, তাসকিনকে অন্যায়ভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আমি বিসিবিকে পরামর্শ দিয়েছি উক্ত যুক্তির আলোকে রেগুলেশান ২.৩.১ এর অধীনে আবারও সিদ্ধান্তটা বিবেচনা করতে।

 

ফাইজলামির একটা সীমা আছে।

 

মূল লেখা – https://www.facebook.com/mustafizur.rahmankhan.3/posts/948942668507229

 

লেখক – বিসিবি আইনজীবী

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

seventeen − eight =