ঘরের মাঠে হালির লজ্জা

প্রথমেই বলে নিচ্ছি দুইদিন পার করে এই লেখা দেওয়ার কারণ যথাসম্ভব হতাশা, রাগ, ক্ষোভটা কাটিয়ে উঠা। গত শতাব্দীর সেরা ক্লাব রিয়াল মাদ্রিদ। এই এই কয় বছর আগেও স্বপ্নের স্কোয়াড ‘গ্যালাকটিকো’ রাজত্ব করে গিয়েছে এই দলে। আপনি যদি গত পরশুর ম্যাচটি পুরোটা দেখে থাকেন তো আপনার মনে হওয়া স্বাভাবিক গ্যালাকটিকোদের উত্তরসূরিরা কিভাবে এতটা বাজে খেলতে পারে! তাও ঘরের মাঠ সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে। বেশিরভাগ খেলোয়াড়কেই খুব গা ছাড়া মনে হচ্ছিল যেখানে ম্যাচটি পুরোপুরি ডমিনেট করেছে বার্সা। বল পজেশন রেখে দুর্ধর্ষ আক্রমন ভাগ আর মিডে ‘বুড়ো’ ইনিয়েস্তার সাথে রবার্তোকে নিয়ে দুর্দান্ত সব কাউন্টার আ্যাটাক বার্সার যেখানে সেসব ঠেকাতে ব্যস্ত রিয়াল নিজেদের সীমানা ট্র‍্যাকব্যাক না করেই তাড়াহুড়া করে আক্রমণ করতে গিয়ে বিপদে পড়েছে বারবার। শেষ বাঁশী বাজার আগ পর্যন্ত এই একই দৃশ্য ছিল ম্যাচের সবেচেয়ে কমন দৃশ্য। অনেক দিনের মধ্যে রিয়াল মাদ্রিদের সবচেয়ে জঘন্য পারফরম্যান্স নিঃসন্দেহে। ১১ মিনিটে দুর্দান্ত এক সংঘবদ্ধ আ্যাটাকে সুয়ারেজের ক্লাসি ফিনিশে এগিয়ে যায় বার্সেলোনা। ততক্ষনে অবশ্য বল দখলে জঘন্য পারফরম্যান্সের প্রদর্শন শুরু হয়ে গেছে রিয়ালের। আধ মিনিটও নিজেদের পায়ে একটানা বল রাখতে পারেনি বেনিতেজের শিষ্যরা। ততক্ষনে আরো গোল খাওয়া সময়ের ব্যাপার মনে হচ্ছিল রিয়ালের। রিয়ালের হাত থেকে খেলা ফসকে যায় প্রথমার্ধেই ৩৯ মিনিটেই। গোল করে দলকে ২-০ লিড এনে দেন বার্সার হয়ে এই মৌসুমে দুর্দান্ত খেলতে থাকা নেইমার। প্রথমার্ধের বাঁশি বাজার পর টানেলে যখন ফিরছেন খেলোয়ারেরা তখন বার্নাব্যুতে ‘florentino dimision’, ‘florentino out’ ধ্বনিতে মুখর দর্শকরা। দ্বিতীয়ার্ধে কিছুটা ভালোভাবেই শুরু করেছিল রিয়াল কিন্তু তা মিলিয়ে যেতে সময় লাগেনি। দিকভ্রম রিয়ালের জন্য যথেষ্ট ছিলেন ইনিয়েস্তা আর সুয়ারেজ। তাদের আরো দুই গোলে ৪-০ গোলে জয় পায় বার্সা! ম্যাচ নিয়ে বলতে গেলে প্রথমেই রাফা বেনিতেজের হাস্যকর ফল্টই চোখে পড়ে সবার আগে। রাফা সম্পূর্ণ আ্যাটাকিং একটা সেটআপে টিম গড়লেন অথচ বার্সেলোনার পসেসিভ মাইন্ডসেট আটকাতে মিডফিল্ডে ক্যাসেমিরোর মত একজনকে রাখলেন না! ক্যাসেমিরো হয়ত একজন গেম চেঞ্জার নাহ কিন্তু তার উপস্থিতি অন্তত রিয়াল মাদ্রিদকে আরো সলিড ডিফেন্স দিতে পারত। তার মত এমন একজনকে রিয়ালের প্রয়োজন ছিল যে ব্যাক ফোর কে প্রোটেক্ট করে হোল্ডিং এ মদ্রিচ আর ক্রুসকে সাপোর্ট দিবে যারা কিনা টপ ফোর রোনালদো, বেনজেমা, বেল, হামেস থেকে কোন সাপোর্টই পাননি! আক্রমনভাগকে স্বাধীন খেলার সুযোগ দিতে যেয়ে এমনই এলোমেলো ট্যাকটিক্স দাড় করালেন যেখানে আক্রমনের চারজন শুধু চেয়ে চেয়েই দেখলেন! ৪-২-৩-১ এ নামা রিয়ালকে দেখে বুঝা কঠিন ছিল আসলেই কোন ফর্মেশনে খেলছিল তারা। মিডফিল্ড আর আক্রমনের মধ্যে কম্বিনেশনের অভাবটাই সবেচেয়ে ভুগিয়েছে রিয়ালকে। যখন আক্রমনের চারজনের তিনজনই সাম্প্রতিক সময়ে ইনজুরি থেকে ফিরেছে তখন এমন ট্যাকটিক্স রাফা কিভাবে নিলেন আমার মাথায় আসে নাহ। যেখানে আক্রমন কিছুটা ভালোর দিকে যাচ্ছিল সেখানে ডিফেন্স ক্রমেই জঘন্য হচ্ছিল। ডিফেন্সে সবচেয়ে ভরসার নাম এই মুহুর্তে ভারানে। আর তাকেই কিনা একের পর এক চোখে লাগার মত ভুল পাসে মনে হচ্ছিল বর্ণান্ধ। আর রামোস ঠিকভাবে সুয়ারেজকে বলতে গেলে ট্র‍্যাকই করতে পারছিলেন না। দানিলোকে রাইটে একরকম সুযোগই দেননি তার স্বদেশি নেইমার। দুর্দশার এই দিনে একমাত্র মার্সেলোকেই মনে হয়েছে কিছুটা সলিড। একটি গোল লাইন ক্লিয়ারেন্স ছাড়াও তার লেফট ফ্ল্যাংকে বার্সার আক্রমনের সুযোগ যথেষ্ট আটকিয়েছেন তিনি। অথচ তাকেই কিনা রাফা উঠিয়ে নিলেন কারভাহালকে নামাতে! তার সেটেল্ড পজিশনে পাঠালেন দানিলোকে যেখানে সম্ভবত এই প্রথম খেললেন দানিলো। পুরো ম্যাচে এর চেয়ে হাস্যকর আর কিছু ছিল না। এছাড়া আরো কিছু বেসিক ভুল যেগুলো চোখে পড়েছে তা হল প্রেসিং এ। ডিফেন্স আর মিডের মধ্যে যোগাযোগ টা স্মোথ না হওয়ায় যখনি বার্সার প্লেয়াররা বল নিয়ে মাদ্রিদের সীমানায় ঢুকছিল তখন মদ্রিচ আর ক্রুসের প্রেসিং নিচের ডিফেন্ডারকে দন্দ্বে ফেলে দিচ্ছিল বারবার আর তাতেই ভারানের আর রামোসের ভুল মুভ আর চার্জ প্রতিপক্ষকে সুযোগ করে দিচ্ছিল আরো সহজে পাসে জায়গা নেওয়ার। ম্যাচের সেরা খেলোয়াড় হামেস কে উঠিয়ে ইস্কোকে নামানোটাও খুব একটা ভালো লাগেনি আমার। সব মিলিয়ে বার্সাকে পুরোপুরি মিসজাজ করেছেন রাফা সাহেব। ট্যাকটিক্স গুলো মাঠে মারা গিয়েছে হাস্যকরভাবে। আর হ্যাঁ খেলোয়াড়দেরও যে ফল্ট নেই এমন কিন্তু না। রোনালদোর অফফর্ম, বেলের সাথে সমঝোতার অভাব, বেনজেমার লর্ডগিরি সব মিলিয়ে একটা টিম হয়ে দাড়াতেই পারেনি রিয়াল। ক্লাব প্রেসিডেন্ট পেরেজ কি করে এর দায় এড়িয়ে যাবেন?? মাত্র এক সিজন খারাপ করায় কার্লোকে স্যাক করাটা কত বড় ভুল ছিল তা বলা বাহুল্য। তার উপর এমন একজনকে আনলেন যিনি চেলসি, ন্যাপলির মত দলে স্যাক হওয়ার রেকর্ডধারী। কি দলটাই না ছিল দুই বছর আগে! অথচ সেই দলটা বলতে গেলে ধংস করে দিয়েছেন! এমন সব প্লেয়ার কিনেছেন যারা ১০ ম্যাচ খেললে ১৫ ম্যাচ ইনজুরিতে কাটায়। বিক্রি করেছেন সব ইনফর্ম খেলোয়াড়দেরকে। তার উচ্চাভিলাষী আর ব্যাবসায়ী মনোভাব কিভাবে ভেতরে ভেতরে এমন একটা দলকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে তা গত কয়েক বছরের পারফরম্যান্স আর মাঠের বাইরের ঘটনায় স্পষ্ট। আর কথা বাড়াতে চাই না। ক্ষোভ ঝারতে গেলে তা শেষই হবে না। আগের মত মাইটি রিয়ালকে দেখতে চাই আবার। চাই রাউলের মত নিবেদিতপ্রান কয়েকটা মাদ্রিদিস্তা, চাই ব্যবসার চেয়ে খেলাকে প্রাধান্য দিবে এমন ধৈর্যশীল একটা ম্যানেজমেন্ট।

 

Hala madrid y nadamas

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

5 − two =