গার্ড মুলার : জার্মান এক গোলমেশিনের কথা

গার্ড মুলার : জার্মান এক গোলমেশিনের কথা

গার্ড মুলার । কিংবদন্তী জার্মান ফুটবলার। জার্মানিকে জিতিয়েছেন ১৯৭৪ বিশ্বকাপ, তাও টোটাল ফুটবল দিয়ে বিশ্বমাতানো ইয়োহান ক্রুইফের নেদারল্যান্ডকে হারিয়ে ! জয়সূচক গোলটি তারই করা। এটা অবাক করার বিষয় যে, জার্মানি যে চারবার বিশ্বকাপ জিতেছে, প্রতিবারই এমন টিমকে হারিয়ে, যারা সেই সময় অন্য গ্রহের ফুটবল খেলছিল। যেমন ১৯৫৪ সালের হাঙ্গেরি। যারা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরের নয় বছরে ৩৫ টি ম্যাচ অপরাজিত ছিল, তাদের ছিল ফেরেঙ্ক পুসকাসের মতো খেলোয়াড় । শেষমেষ ফাইনালে এসে জার্মানি তাদের হারিয়ে দেয় ৩-২ গোলে। এটা ছিল ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম ট্র্যাজেডি।
.
১৯৭৪ বিশ্বকাপে রাজত্ব ছিল টোটাল ফুটবল নামের এক অভিনব উদ্ভাবনের। নেদারল্যান্ড ছিল টোটাল ফুটবলের আঁতুড়ঘর। তাদের রূপকথার নায়ক ছিলেন ইয়োহান ক্রুইফ। কেউ ভাবতে পারেনি এই টোটাল ফুটবল ফাইনালে পরাজিত হবে জার্মানদের শক্তির কাছে! তাই ঘটেছিল। গার্ড মুলার এর গোলে জার্মানি জিতে যায় ২-১ এ। কবর রচিত হয় টোটাল ফুটবলের। জার্মানদের রূপকথার নায়ক বনে যান গার্ড মুলার ।
.
তিনি পরিচিত ‘ দ্য নেশনস বোম্বার ‘ নামে। গোলমেশিন শব্দটা বোধহয় তার ক্ষেত্রেই যায়। জার্মানির হয়ে ৬২ ম্যাচে করেছেন ৬৮ গোল। বুন্দেসলীগায় ৪২৭ ম্যাচে ৩৬৫ গোল। ইতিহাসের অন্যতম টপ গোল স্কোরার তিনি। বিশ্বকাপের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১৪ গোল তার। এক ক্যালেন্ডার ইয়ারে (১৯৭২) সর্বোচ্চ ৮৫ গোলের রেকর্ড গার্ড মুলার এর।

রয়েছেন ফিফার সর্বকালের সেরাদের তালিকার প্রথম সারিতে। জার্মান জাতি তাকে নিয়ে গর্ব করতেই পারে এমনকি গোটা ফুটবল জাতিও। ইউরোপিয়ান ফুটবলার অফ দ্যা ইয়ার অর্থাৎ ব্যালেন ডি’অর নির্বাচিত হন ১৯৭০ সালে। ঐ বছর সাফল্যের সাথে একটি বুন্দেসলিগা সিজন শেষ করে ,৭০ বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ ১০ গোল করে নিজের করে নেন গোল্ডেন বুট, কিন্তু ট্রফি উঁচিয়ে ধরা হলো না। এরপর ৭৪ বিশ্বকাপে ৪ টি গোল করে এর মধ্যে একটি হল হল্যান্ডের বিপক্ষে ফাইনালে করা গোল ।বিশ্বকাপে অল-টাইম টপ স্কোরার হিসেবে ৩২ বছর আসনটি নিয়ে ছিল ।
.
ক্লাব ক্যারিয়ারঃ
.
গার্ড মুলার ফুটবল ক্যারিয়ার শুরু করেন “১৮৬১ নর্দলিনজেন” এর হয়ে ১৯৬০ সালে এখানে নিজের তিনটি বছর সফলতার সাথে শেষ করে ।ফলে তাকে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।সে যখন ৫ম ডিভিশনে খেলে সেই সময় এক মৌসুমে ৫২ টি গোল করে এই সময় সে স্কুলের হয়ে খেলত , তার চোখ ধাঁধানো স্কিল এবং গোল সংখ্যা দেখে তার স্থানিয় ক্লাব ‘১৮৬১ নর্দলিনজেন’ এর কর্মকর্তাদের নজরে পড়ে সেই বছর তারা মূলার কে সাইন করে ফেলে । গার্ড মূলার প্রতিদান হিসেবে ১৯৬০- ৬৪ সাল পর্যন্ত ১৮০ টি !!গোল করে এর মধ্যে বলিষ্ঠ ক্যারিয়ারে ৬৩-৬৪ মৌসুমে ৩১ ম্যাচে ৫১ গোল।
এবার মুলারের দিকে নজর দিলো জার্মানির সব থেকে নামিদামী অভিজাত ক্লাব বায়ার্ন মিউনিখ ।
.
.
বায়ার্ন মিউনিখঃ
.
১৯৬৪ সাল, শুরু করলেন বায়ার্নের হয়ে প্রফেশনাল ক্যারিয়ার সাথে পেলেন অন্য একজন লিজেন্ড ফ্রেঞ্জ বেকেনবাওর কে যিনি ১৯৭৪ বিশ্বকাপ জয়ে জার্মান দল কে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। যাইহোক প্রথম সিজনেই বাজিমাত করলেন গার্ড মূলার বাভারিয়ানদের হয়ে ৩৩ গোল করে বুন্দেসলিগাতে উন্নতি করলেন, ১৯৬৫ সালে শুরু হাওয়া নতুন মৌসুমে বায়ার্নকে আবার ফিরে পেল জার্মানির সবথেকে ঐতিহাসিক ক্লাবটিকে ফিরে পেল বুন্দেসলিগা। লীগে নিজের প্রথম মৌসুমে ভালো করতে না পারলেও দলকে একটা ভালো অবস্তানে রেখেছিলো কিন্তু ঐ মৌসুমে অর্থাৎ মূলার প্রথম মৌসুমেই বাভারিয়ানদের জার্মান কাপ জয়ে সাহায্য করলো।এর পরে ১৯৬৭,১৯৬৯,১৯৭১ সালে আরও তিন বার জার্মান কাপ হাতে উঁচিয়ে ধরে গার্ড মূলার ।
চার টি জার্মান কাপের সাথে যোগ হয় চারটি বুন্দেসলিগা টাইটেল, প্রথম বার লীগ শিরোপার দেখা পায় ১৯৬৮-৬৯ মৌসুমে এবং সর্বশেষ ১৯৭৩-৭৪ মৌসুমে এর আগের দুই মৌসুম ৭১-৭২, ৭২-৭৩ সহ হ্যাট্রিক লীগ শিরোপা ঘরে তুলে বায়ার্ন মিউনিখ এর মধ্যে ১৯৭১-৭২ এই মৌসুমে লিগের মাত্র ৩৪ ম্যাচ খেলে ৪০ গোল করে।
তিনি ১৯৬৪ সাল থেকে ১৯৭৯ সালের মধ্যে জার্মান ক্লাব বায়ার্ন মিউনিখের হয়ে ৪২৭ ম্যাচে ৩৬৫টি গোল করেন।১৯৭২ সালে ম্যুলার এক মৌসুমে ৮৫টি গোল করে বিশ্বরেকর্ড গড়েন। এ বিশ্বরেকর্ডটি দীর্ঘ ৪০ বছর অক্ষত ছিল। কিন্তু আর্জেন্টিনার ভুবনখ্যাত ফরোয়ার্ড লিওনেল মেসি ২০১২ সালে তা ভেঙ্গে দেন।
বায়ার্ন মিউনিখ এর হয়ে
.
.
শিরোপার তালিকাঃ
.
.
বুন্দেসলিগাঃ
.
১৯৬৮-৬৯, ১৯৭১-৭২,১৯৭২-৭৩, ১৯৭৩-৭৪ মোট চার টি এর মধ্যে হ্যাট্রিক শিরোপা জয়।
ইউরোপিয়ান কাপঃ ১৯৭৩-৭৪,১৯৭৪-৭৫,১৯৭৫-৭৬ টানা তিন বার
ইউরোপিয়ান কাপ উইনার্স কাপঃ ১৯৬৬-৬৭
ইন্টারকন্টিনেন্টাল কাপঃ ১৯৭৬
DFB-Pokal: ১৯৬৫-৬৬, ১৯৬৬-৬৭, ১৯৬৮-৬৯, ১৯৭০-৭১
Regionalliga Süd:১৯৬৪-৬৫

গার্ড মুলার : জার্মান এক গোলমেশিনের কথা
gollachhut.com

.
লদারদেল স্ট্রাইকার্সঃ
.
.
জার্মান অধ্যায় শেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি দেন গার্ড মুলার। যুক্তরাষ্ট্রে এসে ১৯৭৯ সালে নাম লিখায় ফোর্ট লদারদেল স্ট্রাইকার্সে এখানে মূলার ক্যারিয়ারের তিন’টি মৌসুম শেষ করে খেলোয়াড়ি জীবনের সমাপ্ত ঘোষণা করে। এই টিমের সাথে তিন মৌসুম থেকে ৭১ ম্যাচ খেলে ৩৮ টি গোল করে কিন্তু কোন ট্রফির দেখা পায়নি। গার্ড মুলার প্রফেশনাল ক্যারিয়ারে খেলেছে মাত্র তিনটি ক্লাবে সর্বমোট ৫৫৫ টি ম্যাচ খেলে ৪৮৭ টি গোল করে ।
.
.
আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারঃ
.
.
পশ্চিম জার্মানির হয়ে ১৯৬৬ থেকে ১৯৭৪ পর্যন্ত ৬২ ম্যাচে তার গোলসংখ্যা ৬৮। তিনি ১৯৭০ সালের বিশ্বকাপে ১০টি গোল করে সর্বোচ্চ গোলদাতা হন। ১৯৭৪-এর বিশ্বকাপে তিনি ৪টি গোল করেন। এর মাঝে শেষটি ছিল ফাইনাল ম্যাচে হল্যান্ডের বিপক্ষে ফলাফল নির্ধারণী গোল। দুটি বিশ্বকাপ খেলে মোট ১৪টি গোল করে তিনি দীর্ঘ ৩২ বছর বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড নিজের করে রেখেছিলেন গার্ড মুলার। ২০০৬ বিশ্বকাপে রোনালদো তাঁকে ছাড়িয়ে যান এর পর ২০১৪ বিশ্বকাপে স্বদেশী ক্লোসা তাকে এবং রোনালদোকে ছাড়িয়ে যায়।
.
জার্মানির হয়ে শিরোপাঃ
.
ফিফা ওয়ার্ল্ড কাপ বা বিশ্বকাপঃ১৯৭৪
ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ বা ইউরো কাপঃ১৯৭২
.
.
ব্যাক্তিগত অর্জন সমূহঃ
Ballon d’Or: 1970
German Footballer of the Year: 1967, 1969
Voted best Player 40 Years Bundesliga 1963–2003
Bundesliga Top Scorer: 1967, 1969, 1970, 1972, 1973, 1974, 1978
European Golden Shoe: 1970, 1972
FIFA World Cup Golden Boot: 1970
FIFA World Cup All-Star Team: 1970
UEFA European Championship Top Scorer: 1972
UEFA European Championship Team of the Tournament: 1972
European Cup Top Scorer: 1973, 1974, 1975, 1977
FIFA Order of Merit: 1998
FIFA 100: 2004
Golden Foot: 2007
Bravo Otto:
Gold award: 1973, 1974
Silver award: 1975
Bronze award: 1972, 1976

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

fourteen − 9 =