ক্রিকেট স্পিরিটের আদৌ কোন অস্তিত্ব আছে কি?

ক্রিকেট স্পিরিটের আদৌ কোন অস্তিত্ব আছে কি?

ক্রিকেট এর স্পিরিট ব্যাপারটি আমার কাছে বরাবরই বিভ্রান্তিকর। ‘মানকাডিং’-এর কথাই ধরুন। নন-স্ট্রাইক প্রান্তের ব্যাটসম্যান এগিয়ে গেলে রান আউট করার নিয়ম আছে। আইনই এটা। অথচ রান আউট করলে স্পিরিট নিয়ে টানাটানি পড়ে। যেটা আইনে আছে, সেটা কিভাবে স্পিরিট বিরুদ্ধ হয়!

বিশেষ করে এই যুগে, যেখানে টিভি রিপ্লেতে রান আউট নির্ধারিত হয় মিলিমিটারের ব্যবধানে। সেখানে নন-স্ট্রাইক প্রান্তের ব্যাটসম্যান এক ইঞ্চি এগিয়ে থাকা মানেও বড় সুবিধা। সে সুবিধা নেবে, অথচ তাকে রান আউট করলে ক্রিকেট এর ‘স্পিরিট গেল’ বলে রব উঠবে!

আবার ‘ওয়াক’ করার কথা ভাবুন। আম্পায়ার হয়ত ভুল করে বা বুঝতে না পেরে আউট দেননি। কিন্তু ব্যাটসমান যদি বোঝে যে আউট, তাহলে চলে যাওয়া উচিত। কেন? এই যে আম্পায়াররা কত কত বার ভুল আউট দেন, তখন যদি ব্যাটসম্যান গো ধরেন যে উইকেট ছাড়বে না, তখন মানা হবে?

এখন রিভিউয়ের যুগে এটা নিয়ে বিতর্ক কমেছে। তবু কিছুটা আছেই। আমি মনে করি, আম্পায়ার আউট না দিলে ব্যাটসম্যানের ‘ওয়াক’ করা অপরাধের সামিল। পেশাদারী এই যুগে এসব টুকটাক আবেগ দেখিয়ে দেশের জয়, দলের জয়ের সম্ভাবনার সঙ্গে আপোস করা উচিত নয়। তার পরও তর্কের খাতিরে ধরে নিলাম, ‘ওয়াক’ করলে তার মহত্ব বা বিশাল হৃদয়ের প্রশংসা করা যায়। কিন্তু ‘ওয়াক’ না করলে কেন ক্রিকেট এর স্পিরিট নষ্ট হবে? আম্পায়ার ভুল আউট দিলে স্পিরিট নষ্ট হয় না? ভুল আউট যদি খেলার অংশ হয়, আউট হয়েও বেঁচে যাওয়া খেলার অংশ হওয়াই উচিত।

সহনীয় মাত্রায় বল টেম্পারিং কেন ক্রিকেট স্পিরিটের বিরুদ্ধে হবে, এটা আমার মাথায় ঢোকে না। বিশেষ করে বোলারদের হাত-পা বেঁধে রাখার যুগে আমি মনে করি কিছুটা টেম্পারিং করা বোলারদের অধিকার হওয়া উচিত। রিচার্ড হ্যাডলি, ওয়াসিম আকরাম, ব্যারি রিচার্ডস, ভিভ রিচার্ডসরা নানা সময়ে এই কারণেই টেম্পারিংয়ের বৈধতা দাবী করেছেন। যদি এটা ক্রিকেট স্পিরিট বিরুদ্ধই হতো, বা খুব গুরুতর কিছু হতো, তাহলে কি এসব গ্রেটরা বৈধতা দিতে বলতেন?

যদি বলকে খুব বেশ বিকৃত করা হয়, খুব বেশি কিছু করা হয়, তাহলে তো আম্পায়ার খালি চোখেই ধরতে পারবেন। ব্যবস্থাও নেওয়া হবে। কিন্তু যদি সেটা নিখুঁত ভাবে করা হয়, আম্পায়ারও বুঝতেই না পারে, তাহলে সেটা অসাধারণ শিল্প। দুর্দান্ত একটা স্কিল এটা।

সব দলই সব দলের বিপক্ষে করার চেষ্টা করে, অনেক সময়ই করে। যারা নিখুঁত ভাবে করতে পারে, তারাই ফায়দা বেশি নিতে পারে। যুগে যুগে হয়ে আসছে। আধুনিক যুগে আরও বেশি হচ্ছে। আমাদের দেশে এসেও ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়াসহ অনেক দলে করে গেছে। আমরা অসহায় দেখেছি। কারণ কিছু করার ছিল না। ধরিয়ে দিতে পারিনি, কারণ তারা সুনিপুন ভাবে করেছে। নিজেরাও করতে পারিনি, কারণ সেই স্কিল আমাদের নেই।

এই যে স্মিথ-ওয়ার্নারদের এক বছরের নিষেধাজ্ঞা হলো, তাতে টেম্পারিং থামবে? একটুও না। একেবারে সিমিং উইকেট হলে অন্য কথা, কিন্তু এখনকার বাস্তবতায় ৮০-৯০ ভাগ উইকেট যেমন থাকে, তাতে টেম্পারিং না করে উপায় থাকে না। অস্ট্রেলিয়া করবে, সব দলই করবে। এবং পরিকল্পনা করেই করবে। আগেও সব দল টেম্পারিং নিয়ে গবেষণা করত। এখন গবেষণা করবে, কিভাবে আরও নিখুঁত ভাবে, সবার চোখকে ফাঁকি দিয়ে আরও ভালোভাবে করা যায়। টেম্পারিং এখন যেমন ‘ওপেন সিক্রেট’, তেমনই থাকবে। আইনে অবৈধ, কিন্তু বাস্তবে নরম্যাল প্র্যাকটিস হয়েই রইবে।

টেম্পারিংয়ের জন্য আইসিসির যে শাস্তির বিধান আছে, সেটিই প্রমাণ করে এটা এমন কোনো গুরুতর অপরাধ নয়। এই যে স্মিথকে এক টেস্ট নিষিদ্ধ করা হলো, এটিই বিরল ব্যাপার। টেম্পারিংয়ের দায়ে নিষিদ্ধ আগে হয়েছিলেন আফ্রিদি ও শচিন টেন্ডুলকার। টেন্ডুলকারেরটা তবু পরে তুলে নেওয়া হয়। আর কেউ নিষিদ্ধ হয়েছেন বলে মনে পড়ে না। আথারটন, ওয়াকার, দ্রাবিড়, ফিল্যান্ডার, দু প্লেসি (২ বার), শানাকাসহ ধরা পড়া অন্য প্রায় সবাই জরিমানা দিয়েই পার পেয়েছেন। অনেকের ক্ষেত্রেই এবারের মত “ফরেন অবজেক্ট’ ছিল। আইনটিই এমন, খুব বড় কিছু নয়। আগেই একটা লেখায় লিখেছি, এবারও স্মিথ স্বীকার না করলে কিছুই হতো না। ব্যানক্রফটের যেমন কিছু জরিমানা হয়েছে, সেটিতেই সীমাবদ্ধ থাকত।

স্মিথ স্বীকার করার ফলে কি হলো? তথাকথিত ক্রিকেটীয় চেতনার কি যায়-এসেছে? কিছুই না। যা যাওয়ার, স্মিথেরই গেছে। টেম্পারিং চলতেই থাকবে। কিন্তু ভবিষ্যতে কেউ ভুলেও স্বীকার করবে না।

ব্যক্তিগত ভাবে আমি স্মিথের ওপর যার পর নাই হতাশ। যতটা শক্ত মানসিকতার ভেবেছিলাম তাকে, তার ধারেকাছেও নন। অস্ট্রেলিয়ান ক্যাপ্টেনদের এরকম নরম মানসিকতার মানায় না। আগের পোস্টেই লিখেছিলাম, হয়ত ব্যানক্রফটের পাশে দাঁড়াতেই স্বীকার করে নিয়েছে। এমনও হতে পারে, সাময়িক আবেগে করে ফেলেছে। অবশ্যই অনুতপ্ত হয়ে স্বীকার করেনি। কারণ অস্ট্রেলিয়া ও অন্য দলগুলি এসব বরাবরই করে আসছে। এদিন হুট করে অনুতাপ হওয়ার কিছু নেই। ক্ষনিকের আবেগই হয়ত ছিল। কারণ যেটিই হোক, স্মিথ নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন, কত বড় বোকামি করে ফেলেছেন। তার ক্যারিয়ারটাই এখন অনিশ্চয়তায় এই এটির জন্য। উল্টো বেচারা ওয়ার্নারও ফেঁসে গেল। এমন কত ওয়ার্নার-স্মিথরা ঠিকই দাপটে এই এক বছরও টেম্পারিং করবে!

বলার অপেক্ষা রাখে না, ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার শাস্তিটা বড্ড বাড়াবাড়ি হয়ে গেছে। জেমস সাদারল্যান্ড যদিও বলেছেন, টেম্পারিংয়ের জন্য জন্য নয়, ক্রিকেট খেলাটার স্পিরিট বিরুদ্ধ কাজের জন্য, ক্রিকেট খেলাটার ক্ষতি করার জন্য এই শাস্তি। এটাও আমার কাছে কেমন হাস্যকর মনে হয়। অস্ট্রেলিয়ানরা যে মাত্রার স্লেজিং যুগ যুগ ধরে করে আসছে, সেটায় ক্রিকেট স্পিরিট নষ্ট হয় না? অস্ট্রেলিয়ায় খেলতে যাওয়া প্রতিটি দলের জন্য অনেক বড় চ্যালেঞ্জ ওখানকার মিডিয়া ও দর্শক। মাঠে যাচ্ছেতাই বলে দর্শকেরা। প্রতিপক্ষের জন্য এটা অনেক বড় মানসিক টর্চার। ক্রিকেট স্পিরিট নষ্ট হয় না এতে?

একটা ব্যাপার হলো, জাতীয় দলের অধিনায়ক যখন ভরা সংবাদ সম্মেলনে এভাবে স্বীকার করেন, তখন সেটা ন্যাশনাল ইন্টেগ্রিটির ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। শুধু একটি ক্রিকেট দল নয়, জাতি হিসেবে ‘অস্ট্রেলিয়ানরা প্রতারণা করেছে’, এই দৃষ্টিকোণ থেকে ভাবতে থাকে। এই কারণে হয়ত দৃষ্টান্তমূলক শান্তির পথে হেঁটেছে। তার পরও শাস্তিটা বাড়াবাড়ি হয়েছে। মোটা অঙ্কের জরিমানা হতে পারত, আইসিসির মতো এক ম্যাচ না হোক, আরও কয়েক ম্যাচ বা কিছুদিন নিষিদ্ধ করতে পারত। যা হয়েছে, বেশিই বেশি হয়ে গেছে। ফিক্সিং বা ডোপ পাপের মত শাস্তি হয়ে গেছে।

আবারও বলছি, ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার এই শাস্তিতে টেম্পারিং থামবে না। তবে স্বীকার করার বোকামি একেবারেই হয়ত বন্ধ হবে। সেদিক থেকে দৃষ্টান্তই হয়ে থাকবে!

আর আইসিসির ক্ষেত্রে, অনেকেই বলছেন ক্রিকেট এ টেম্পারিংয়ের শাস্তি আরও কঠোর করতে। আমি মনে করি, শাস্তি কঠোর করা সমাধান নয়। কোনো লাভ হবে না। সহনীয় মাত্রায় (সেই মাত্রাটা নিয়ে আলোচনা হতে পারে) টেম্পারিং বৈধতা দেওয়াই সমাধান।

আবারও বলছি, যে ব্যাপারটি নিয়মিত হচ্ছে, ওপেন সিক্রেট, সবারই জানা যে হচ্ছেই… সেটি ধরা পড়লেই কেবল ক্রিকেটীয় চেতনার বুলি আওড়ানো আমার কাছে ক্রিকেটীয় ভণ্ডামি মনে হয়…

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

one × one =